ঢাকা, মঙ্গলবার, ৭ আশ্বিন ১৪২৭, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৩ সফর ১৪৪২

শিল্প-সাহিত্য

শতবর্ষে রবীন্দ্রনাথের ডাকঘর

ফজলুল হক সৈকত | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২৩০৬ ঘণ্টা, জানুয়ারী ১৯, ২০১১
শতবর্ষে রবীন্দ্রনাথের ডাকঘর

রবীন্দ্রনাথের নানান রূপ। তাই, নাট্যকার রবীন্দ্রনাথকে আমরা হয়তো ভুলতে বসেছি তাঁর কবিতা-গান আর গল্প-কাহিনীর প্রবল বাতাসে।

অথচ মানবজীবনের বহু-বিচিত্র বিষয়াদি তিনি হাজির করেছেন নাটকের ক্যানভাসে। প্রকৃতি, মানব-মন, আনন্দ-বেদনা আর পাওয়া-না-পাওয়ার অনেক হিসেব হয়তো মিলবে রবিঠাকুরের নাটকের সংলাপে, চরিত্রের গতি-অন্বেষায় ও বিকাশে। মানুষের প্রবণতাগুলিকে আলোড়িত করবার জন্য রবীন্দ্রনাথের সার্বক্ষণিক যে আকুলতা, তার সরল-স্বাভাবিক-প্রত্যাশিত চিন্তাবলি সারিবদ্ধভাবে সাজানো রয়েছে তাঁর নাটক-বুননের কৌশলে আর সৃষ্ট নাটকীয়তায়।

ডাকঘর (রচনাকাল: ১৯১১) নাটকটি রবীন্দ্রনাথ তাঁর গীতাঞ্জলি-গীতালি পর্বে লিখেছেন। সে সময়ে কবি বিশেষভাবে মৃত্যু-আকাঙ্ক্ষায় একটি অস্বাভাবিক মানসিক পর্যায়-স্তর অতিক্রম করছিলেন; স্বভাববিরুদ্ধ এই প্রবণতার কালে তিনি গভীর বেদনা ও অশান্তি দ্বারা প্রবলভাবে তাড়িত হয়েছিলেন। মানসিক-দৌর্বল্য আর সংসার-সম্বন্ধীয় ক্লান্তি তাঁকে ধরে বসেছিল। ১৯১২ সালে লিখিত এক পত্রে রবীন্দ্র-মানসের এই বিশেষ পরিস্থিতির পরিচয় পাই আমরা। কবি লিখছেন : ‘এখানে [শিলাইদহে] আসবামাত্রই আমার সেই অসহ্য ক্লান্তি ও দুর্বলতা দূর হয়ে গেছে। এমন সুগভীর আরাম আমি অনেক দিন পাইনি। এই জিনিসটি খুঁজতেই আমি দেশ-দেশান্তরে ঘুরতে চাচ্ছিলুম; কিন্তু এ যে এমন পরিপূর্ণভাবে আমার হাতের কাছেই আছে সে জীবনের ঝঞ্ঝাটে ভুলেই গিয়েছিলুম। কিছুকাল থেকে মনে হচ্ছিল মৃত্যু আমাকে তার শেষ বাণ মেরেছে এবং সংসার থেকে আমার বিদায়ের সময় এসেছে- কিন্তু যস্য ছায়ামৃতং তস্য মৃত্যুঃ,- মৃত্যুও যাঁর অমৃতও তাঁরি ছায়া- এতদিনে আবার সেই অমৃতের পরিচয় পাচ্ছি। ’

ব্যক্তিগতভাবে রবীন্দ্রনাথ স্বাধীনচেতা ছিলেন; তাঁর চারপাশের মানুষকেও স্বাধীনতা ভোগের আনন্দ দিতে পেরেছেন তিনি- মুক্তির আনন্দ আর পাবার শান্তিকে তিনি অনুভব করতেন স্বাভাবিক সত্যের পাটাতনে রেখে। তাই মানসিক ক্লান্তি থেকে সহজ মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে তিনি লালন করতে সমর্থ হয়েছেন আপন উদারতায়। ডাকঘরে তাঁর সেই মুক্তিপাগল মন বারবার উঁকি দিয়েছে শিল্পের কলকাঠি হাতে নিয়ে। সাময়িক বিশ্রাম, প্রকৃতির সান্নিধ্য আর সংসারের যাবতীয় আক্রমণ থেকে মাঝেমধ্যে খানিকটা দূরে অবস্থান নিয়ে তিনি কাটিয়ে উঠেছেন মানসিক ক্লান্তি আর মৃত্যুভয়। মনোগত-দৌর্বল্যজাত যে অনুভূতি দ্বারা আলোড়িত হয়েছিলেন কবি, সেই অভিজ্ঞান থেকে সৃষ্টি হয়েছে ডাকঘর নাটকের পরিপ্রেক্ষিত ও ক্যানভাস। ডাকঘর রচনার সময় নাট্যকারের মানসিক অবস্থা অনুধাবন করবার জন্য, নাটকটির মূল স্রোত ও প্রবাহ সম্বন্ধে আপাত ধারণা নেবার প্রয়োজনে, সে সময়ে তাঁর লেখা দুটি চিঠির অংশবিশেষ এখানে উদ্ধৃত হলো :

ক] ‘আমি দূর দেশে যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি। আমার সেখানে অন্য কোনো প্রয়োজন নেই, কেবল কিছুদিন থেকে আমার মন এই বলছে যে, যে পৃথিবীতে জন্মেছি সেই পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করে নিয়ে তবে তার কাছ থেকে বিদায় নেব। এর  পরে আর তো সময় হবে না। সমস্ত পৃথিবীর নদী গিরি সমুদ্র এবং লোকালয় আমাকে ডাক দিচ্ছে- আমার চারদিকের ক্ষুদ্র পরিবেষ্টনের ভিতর থেকে বেরিয়ে পড়বার জন্য মন উৎসুক হয়ে পড়েছে। আমরা যেখানে দীর্ঘকাল থেকে কাজ করি সেখানে আমাদের কর্ম ও সংসারের আবর্জনা দিনে দিনে জমে উঠে চারদিকে একটা বেড়া তৈরি করে তোলে। আমরা চিরজীবন আমাদের নিজের সেই বেড়ার মধ্যেই থাকি, জগতের মধ্যে থাকিনে। অন্তত মাঝে মাঝে সেই বেড়া ভেঙে বৃহৎ জগৎটাকে দেখে এলে বুঝতে পারি আমাদের জন্মভূমিটি কত বড়- বুঝতে পারি জেলখানাতেই আমাদের জন্ম নয়। তাই আমার সকলের চেয়ে বড় যাত্রার পূর্বে এই ছোট যাত্রা দিয়ে তার ভূমিকা করতে চাচ্ছি- এখন থেকে একটি করে বেড়ি ভাঙতে হবে তারই আয়োজন। ...’

খ] ‘বেরো, বেরো, বেরো, রাস্তায় বেরিয়ে পড়্, ফাঁকায় ছুটে আয়, আর একদণ্ড ঘরে নয়, এই কথাটা এমন করে অন্তরে বাহিরে ধ্বনিত হয়ে উঠেছে যে, আজ আমার আর অন্য কোনো কথা চিন্তা করবার জো নেই- এর কাছে অন্য সকল কথাই আমার কাছে তুচ্ছ। ’

ডাকঘর নাটকটি রবীন্দ্রনাথের আপন-মৃত্যুভাবনা থেকে সৃষ্টি হয়েছে। ১৯১৫ সালে নাট্যকার রবীন্দ্রনাথ আশ্রমবাদীদের কাছে তাঁর নাটকের বিষয়-ভাবনা ও পরিপ্রেক্ষিত সম্বন্ধে কতগুলি বক্তৃতা দিয়েছিলেন; বক্তৃতার এক পর্বে ডাকঘর বিষয়ে তিনি জানিয়েছেন যে, আকস্মিকভাবে তাঁর মনের ভেতরে দেয়ালঘেরা পরিচিত জগত থেকে বাইরে বেরিয়ে পড়বার আহ্বান হাতছানি দিয়েছিল; অবসন্ন কোনো অবসরে অলস প্রহর কাটানোর সময় তখন তিনি অনুভব করতেন মৃত্যু-অভিমুখে কিংবা চরম মুক্তির দিকে ধাবিত হবার ডাক। তিনি কবি; তাই বুঝতে পেরেছিলেন যে, মনের ভেতরের কোনো অপ্রকাশ অনুভূতিকে প্রকাশ করতে পারলে কিছুটা হলেও শান্তি পাওয়া যায়। সেই অভিপ্রায় থেকেই এই নাটকটির গল্প সাজিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। বিদায়ের যাতনা, কোমলতা আর অজানাকে জানবার আনন্দকে কথামালায় রূপ দিয়েছেন নাটক রচয়িতা। জগতের প্রবল ও সত্যপ্রবাহের সাথে নিজেকে শামিল করতে পেরে তিনি পুলকও বোধ করেছেন কতকটা।

পার্থিব জ্ঞান, মানুষের বাঁচবার প্রাসঙ্গিকতা, দুনিয়ার সৌন্দর্য চোখে দেখার আর অনুভব করার আনন্দ- এই সব চিন্তারাজি সাজিয়ে তুলেছেন নাট্যকার অমলের জীবন-অভিজ্ঞানের অনুভব-প্রভায়। মাধবের সাথে অমলের কথোপকথন থেকে আমরাও জেনে নিতে পারি অমলের জীবনবোধের আলো-আঁধারিমাখা উপলব্ধির সুখ-প্রাপ্তি :
‘অমল : আমি যদি কাঠবিড়ালি হতুম তবে বেশ হত। কিন্তু পিসেমশায়, আমাকে কেন বেরোতে দেবে না?
মাধব দত্ত : কবিরাজ যে বলেছে বাইরে গেলে তোমার অসুখ করবে।
অমল : কবিরাজ কেমন করে জানলে?
মাধব দত্ত : বল কী অমল! কবিরাজ জানবে না! সে যে এত বড়ো বড়ো পুঁথি পড়ে ফেলেছে।
অমল : পুঁথি পড়লেই কি সব জানতে পারে?
মাধব দত্ত : বেশ! তাও বুঝি জান না?
অমল : (দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া) আমি যে পুঁথি কিছুই পড়িনি- তাই জানিনে। ...
অমল : আমি, যা আছে সব দেখবো- কেবলই দেখে বেড়াব।
মাধব দত্ত : শোনো একবার। দেখবে কী? দেখবার এত আছেই বা কী?
অমল : আমাদের জানলার কাছে বসে সেই-যে দূরে পাহাড় দেখা যায়- আমার ভারি ইচ্ছে করে ঐ পাহাড়টা পার হয়ে চলে যাই। ’

অমলের মুক্তিপাগল মন; তাই সে দইওয়ালা হয়ে দূর গ্রামে ফেরি করতে চায়, কাজের অন্বেষায় বেরিয়ে পড়তে চায় অজানা কোনো এলাকার দিকে, ডাকহরকরার মতো চিঠি বিলিয়ে বেড়াতে চায়, সুধার সাথে ফুল কুড়াতে চায়, বালকদের সাথে খেলতে বোরোতে চায়, ঘণ্টাবাদক হয়ে বাজাতে চায় সময়-জানানো ঘণ্টা। অমল অসুস্থ হয়ে ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে শুয়ে-বসে থেকে নিজের মনের ভেতরে বিশাল পৃথিবীর একটা রূপ কল্পনা করেও নিয়েছে যেন; কিংবা কে জানে, হয়তো আর জনমে সে পৃথিবীর পরিচিত সব পথ-ঘাট ঘুরে-বেড়িয়েছে কিছুকাল। দইওয়ালার সাথে কথোপকথনে তার সেই কল্পনাবিলাসের বা অজ্ঞাত কোনো পূর্ব-অভিজ্ঞতার ছবি আবিষ্কার করি আমরা ‘দইওয়ালা : আমাদের গ্রাম সেই পাঁচমুড়া পাহাড়ের তলায়। শামলী নদীর ধারে।
অমল : পাঁচমুড়া পাহাড়- শামলী নদী- কী জানি, হয়তো তোমাদের গ্রাম দেখেছি- কবে সে আমার মনে পড়ে না। ...কিন্তু আমার মনে হয় আমি দেখেছি। অনেক পুরনোকালের খুব বড়ো বড়ো গাছের তলায় তোমাদের গ্রাম- একটি লাল রঙের রাস্তার ধারে। ...সেখানে পাহাড়ের গায়ে সব গোরু চড়ে বেড়াচ্ছে। ... মেয়েরা সব নদী থেকে জল তুলে মাথায় কলসি করে নিয়ে যায়- তাদের লাল শাড়ি পরা। ’

অমলকে না কি দইওয়ালা বলেছিল যে, তার ছোট বোনঝিটিকে অমলের সাথে বিয়ে দেবে। তাই অমল ভেবেও নিয়েছিল তার ভাবি-অনাগত সংসারের কথা- ‘আমার টুকটুকে বউ হবে- তার নাকে নোলক, তার লাল ডুরে শাড়ি। সে সকালবেলা নিজের হাতে কালো গোরু দুইয়ে নতুন মাটির ভাঁড়ে আমাকে ফেনাসুদ্ধ দুধ খাওয়াবে, আর সন্ধের সময় গোয়ালঘরে প্রদীপ দেখিয়ে এসে আমার কাছে বসে সাত ভাই চম্পার গল্প করবে। ’

পৃথিবীর চিরায়ত এক ছবি কবি রবীন্দ্রনাথ অমলের কল্পনাজগতে সাজিয়ে তুলেছেন যেন। আর অমলকেও বোধ করি বানিয়েছেন কোনো এক চিরন্তন পৃথিবী-পথিকের আদলে। অমলের মনে যুক্ত করেছের অপার আনন্দ। তাই হয়তো এই আলো-বাতাসময় পৃথিবীর সন্তান অমল দইওয়ালাকে বলছে- ‘আমাকে তোমার মতো ঐরকম দই বেচতে শিখিয়ে দিয়ো। ঐরকম বাঁক কাঁধে নিয়ে- ঐরকম খুব দূরের রাস্তা দিয়ে। ’

ডাকঘর নাটকটিতে রূপকার মূলত তিনটি অনুভবকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়েছেন- মৃত্যুর প্রবল বাসনা, অনির্দেশ অপরিচিত সুদূরের জন্য আগ্রহ আর প্রবাস-যাতনার আকুলতা। কাহিনীর প্রধান ধারক বা কেন্দ্রীয় চরিত্র কিশোর অমল এই তিনটি মনোভাবের উপাদানে নির্মিত এক প্রতীকী সৃষ্টি। কেবল অমল প্রতীকী নয়; নাটকটিতে বর্ণিত চিঠি এবং ডাকঘরও প্রতীকী। রহস্য আর অজানাকে জানবার জন্য চিঠি এবং চিঠির আনন্দ ও অসামান্যতাকে ধারণ করে আছে ডাকঘর নামক প্রতিষ্ঠান।

রবীন্দ্রভাবনায় চিঠির ব্যাপক প্রভাবের পরিচয় পাওয়া যায়। একবার কবি লিখলেন : ‘প্রত্যহ প্রভাতে ঘুম হইতে উঠিবামাত্র আমার মনে হইত, যেন দিনটাকে একখানি সোনালী-পাড়-দেওয়া নূতন চিঠির মতো পাইলাম। লেফাফা খুলিয়া ফেলিলে যেন কী অপূর্ব খবর পাওয়া যাইবে। ’

ডাকঘর নাটকে অমলকে আমরা রাজার চিঠির জন্য অপেক্ষা করতে দেখি। প্রাসঙ্গিক পাঠ নিতে পারি :
‘অমল : তুমি ডাক-হরকরাকে বলে দেবে আমারই নাম অমল- আমি এই জানালার কাছটায় বসে থাকি।
মোড়ল : কেন বলো দেখি।
অমল : আমার নামে যদি চিঠি আসে-
মোড়ল : তোমার নামে চিঠি। তোমাকে কে চিঠি লিখবে?
অমল : রাজা যদি চিঠি লেখে তা হলে-’

নাটকটিতে পারিপার্শ্বিকতা নির্মিত হয়েছে প্রাসঙ্গিকভাবে। যেমন ডাকহরকরাকে আমরা পাই অমলের কাঙ্ক্ষিত-চরিত্ররূপে; যে সুখ হতে অমল নিদারুণরূপে বঞ্চিত, ডাকপিয়নের পেশার মধ্যে সে ওই সুখের ছায়া দেখতে পায়। এই ছায়া মুক্তির আনন্দের ছায়া। আবার ফেরিওয়ালা, খেলতে-যাওয়া ছেলেদের দল, ফুল-কুড়ানো খুকি- সবাই যেন অসুস্থ-ঘরে বন্দিথাকা অমলের কাছে এক একটি আনন্দের কেন্দ্রবিন্দু। কি সে অমলের সুখ- কি সে মুক্তির আনন্দ, তা আমরা- সাধারণ পাঠক সহজে ধরতে পারি না। অসুস্থ অমল মনে মনে সুখ-জগতের বাসিন্দা হয়ে উঠেছে। দু-একটি উদ্ধৃতি দেখে নেওয়া যাক :
ক] ঘণ্টা-বাজিয়ে প্রহরীকে অমল বলছে-

“কেউ বলে ‘সময় বয়ে যাচ্ছে’, কেউ বলে ‘সময় হয়নি’। আচ্ছা, তুমি ঘণ্টা বাজিয়ে দিলেই তো সময় হবে?... বেশ লাগে তোমার ঘণ্টা- আমার শুনতে ভারি ভালো লাগে- দুপুরবেলা আমাদের বাড়িতে যখন সকলেরই খাওয়া হয়ে যায়- পিসেমশায় কোথায় কাজ করতে বেরিয়ে যান, পিসিমা রামায়ণ পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েন, আমাদের খুদে কুকুরটা উঠোনে ঐ কোণের ছায়ায় লেজের মধ্যে মুখ গুঁজে ঘুমোতে থাকে- তখন তোমার ঐ ঘণ্টা বাজে- ঢং ঢং ঢং, ঢং ঢং ঢং। তোমার ঘণ্টা বেশ বাজে!”

খ] এলাকার মালিনীর মেয়ে সুধাকে অমল বলছে ‘ফুল তুলতে চলেছ? তাই তোমার পা দুটি অমন খুশি হয়ে উঠেছে- যতই চলেছ, মল বাজছে ঝম্ ঝম্ ঝম্। আমি যদি তোমার সঙ্গে যেতে পারতুম তা হলে উঁচু ডালে যেখানে দেখা যায় না, সেইখান থেকে আমি তোমাকে ফুল পেড়ে দিতুম। ’

রবি ঠাকুর তাঁর খেয়া কবিতা-গ্রন্থের ‘মুক্তিপাশ’ কবিতায় কষ্টের-বিরহের যন্ত্রণাকে প্রকাশ করেছেন এভাবে-
‘ওগো নিশীথে কখন এসেছিলে তুমি
কখন যে গেছ বিহানে
তাহা কে জানে। ...
রুদ্ধ আছিল আমার এ গেহ,
আজ নয়ন মেলিয়া এ কি হেরিলাম
বাধা নাই কোনো বাধা নাই-
আমি বাঁধা নাই!
দেখিনু কে মোর আগল টুটিয়া ঘরে ঘরে যত দুয়ার জানালা
সকলি দিয়েছে খুলিয়া-
রুদ্ধ দুয়ার ঘরে কতবার
খুঁজেছিল মন পথ পালাবার। ’

ডাকঘর নাটকে সৃষ্ট চরিত্রগুলিকে স্পষ্টভাবে তিন শ্রেণীতে বিভাজন করা চলে; এই বিভক্তি থেকেও প্রকাশ পায় নাট্যকারের জীবনভাবনার কিছু বাস্তব ছবি। অমলকে ঘিরে যে মানুষদের বিচরণ তাদের একদল অমলকে ভালোবাসে না, তাকে আবদ্ধ করে রাখতে চায় (কবিরাজ ও মোড়ল); আরেকদল তাকে ভালোবাসে, কিন্তু বাইরের আলো-বাতাসে যেত দিতে চায় না (মাধব দত্ত, দইওয়ালা, পাহারাদার, বালকগণ, সুধা); আর অন্যদল অমলকে ভালোবাসে এবং সকল আবদ্ধতা থেকে খোলা-পরিবেশে মুক্তির পথে তার বহির্গমন কামনা করে (ঠাকুর্দা, রাজ-কবিরাজ)। কবিরাজ ও মোড়ল সমাজের চিরপরিচিত সরল-অনাধুনিক মানুষের প্রতিনিধি- বিশ্রাম এবং সহজ-বাস্তবতা যাদের চিন্তার সীমানা; অমলের প্রত্যাশা ও আচরণ তাদের কাছে অসহ্যরকম বাড়াবাড়ি। মাধব দত্ত, দইওয়ালা, পাহারাদার, বালকগণ, সুধা- এরা সংসারী কিংবা সংসারের চারদেয়ালে আটকে-পড়া মানুষ। জীবনের স্বাদ এরা ভোগ করতে জানে সমাজ-সংসারের দাবির ভেতরে থেকে; জীবনকে উপভোগের সূত্রাবলি তাদের কাছে অজানা-অধরা। সান্ত্বনা আর অহেতুক-বাড়তি স্নেহই এদের সম্বল; স্বাভাবিক-সাধ্যের অতিরিক্ত কিছু ভাবতে এরা অক্ষম- কল্পনাবিলাসে চরম অবিশ্বাস তাদের মনে। অপরদিকে ঠাকুর্দা আর রাজ-কবিরাজ জগতের বৃহৎরূপ সম্বন্ধে অবগত; অযৌক্তিক মৃত্যুভয় দ্বারা তারা তাড়িত নয়; সুদূরকে দেখবার, অজানাকে জানবার আর যা কিছু নতুন, যা কিছু আধুনিক, তাতে তাদের অবিচল আস্থা। বন্দিদশায় জীবনকে আটকে না রেখে মুক্তির মধুর স্বাদ গ্রহণে তাদের প্রবল আগ্রহ; অমলের মুক্তির জন্য তারা যেন কোনো প্রেরিত অপরিসীম শক্তির আবাহন।

অমল মাধব দত্তের পালিত পুত্র। অসুস্থ অমলকে নিয়ে; অমলের মৃত্যুর আশঙ্কায় তার দিনরাত ভাবনার কোনো অন্ত নেই। নাট্যকার জানাচ্ছেন মাধবের সে আকুলতার কথা :

‘মাধব দত্ত : মুশকিলে পড়ে গেছি। যখন ও ছিল না, তখন ছিলই না- কোনো ভাবনাই ছিল না। এখন ও কোথা থেকে এসে আমার ঘর জুড়ে বসল; ও চলে গেলে আমার এ ঘর যেন আর ঘরই থাকবে না। কবিরাজমশায়, আপনি কি মনে করেন ওকে-
কবিরাজ : ওর ভাগ্যে যদি আয়ু থাকে, তাহলে দীর্ঘকাল বাঁচতেও পারে; কিন্তু আয়ুর্বেদে যে রকম লিখছে তাতে তো-’

অমলের চিকিৎসার জন্য আঞ্চলিক কবিরাজের ব্যবস্থাপত্র- ঘরের সমস্ত জানালা-দরোজা বন্ধ রাখা, সার্বক্ষণিক ঘরের মধ্যে অবস্থান করা প্রভৃতি অগ্রসরতার চাদরে ঢাকা পড়ে রাজকবিরাজের আগমনে এবং সব বন্ধ দরোজা-জানালা খুলে দেবার আদেশের মধ্য দিয়ে। আর এভাবেই অমল প্রবেশ করে মুক্তির প্রথম ধাপে। অতঃপর অপো রাজার আগমন অথবা তাঁর পাঠানো কোনো বারতা।

অমলের সুস্থতা-অসুস্থতা বিষয়ে আঞ্চলিক কবিরাজ ও রাজকবিরাজের অভিমত, অমল ও অন্যান্যের ভাবনা এবং পারিপার্শ্বিক অনুষঙ্গ বুঝবার জন্য নাটকের কিছু কিছু অংশ আমাদেরকে বিশেষভাবে জেনে নিতে হয়-
ক]
‘কবিরাজ : আমি তো পূর্বেই বলেছি, ওকে বাইরে একেবারে যেতে দিতে পারবেন না।
মাধব দত্ত : ছেলেমানুষ, ওকে দিনরাত ঘরের মধ্যে ধরে রাখা যে ভারি শক্ত। ’

খ]
‘ছেলেরা : তুমি বেরিয়ে এসো-না, খেলবে চলো।
অমল : কবিরাজ আমাকে বেরিয়ে যেতে মানা করেছে।
ছেলেরা : কবিরাজ! কবিরাজের মানা তুমি শোন বুঝি। চল্ ভাই চল্, আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে।
অমল : না ভাই, তোমরা আমার এই জানালার সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে একটু খেলা করো- আমি একটু দেখি। ’

গ]
‘রাজকবিরাজ : একি! চারিদিকে সমস্তই যে বন্ধ। খুলে দাও, খুলে দাও, যত দ্বার-জানলা আছে সব খুলে দাও। (অমলের গায়ে হাত দিয়ে) বাবা, কেমন বোধ করছ?
অমল : খুব ভালো, খুব ভালো কবিরাজমশায়। আমার আর কোনো অসুখ নেই, কোনো বেদনা নেই। আঃ সব খুলে দিয়েছ- সব তারাগুলি দেখতে পাচ্ছি- অন্ধকারের ওপারকার সব তারা। ’

জগতকে-জীবনকে দেখবার যে আনন্দ, তা থেকে দূরে সরে থেকে সত্যিকারের আনন্দকে ধরা যায় না- এই সত্য জানাতে চেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ অমলের ভাবগতির অনুভবের মধ্য দিয়ে। সংসারি মাধব- একরকম লোভী মাধব অমলের কাছে রাজার আগমনের সম্ভাবনার কথা জানতে পেরে রাজার কাছ থেকে সংসারের উন্নতির জন্য আর্থিক আনুকূল্য লাভের অনুরোধ জানাতে বলে। অবশ্য অমলের খেয়াল ভিন্ন দিকে। অমলের সংসার আমাদের মতো দেয়ালঘেরা কয়েকটি ঘরের সমষ্টির সংসার নয়; তার সামনে অবারিত জগত-সংসার। তাই সে মাধবকে জানায়, রাজার কাছে তার সম্ভাব্য-কল্পিত প্রার্থনার কথা- ‘আমি তার কাছে চাইব, তিনি যেন আমাকে তাঁর ডাকঘরের হরকরা করে দেন- আমি দেশে দেশে ঘরে ঘরে তাঁর চিঠি বিলি করব। ’ বালক অমল- অপরিণত অমল পার্থিব সকল সুখ-সুবিধাকে অতিক্রম করে জগত-স্রষ্টার ডাকে সাড়া দেবার জন্য প্রস্তুত; তাঁর বারতা সকলের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য তৈরি।

নাটকের ফ্রেমে- অমলের জানালার সামনে তৈরি হয় ডাকঘর। অনেক প্রতীতি রাজার অমলের কাছে আসতে দেখি আমরা। রাজার আগমনের ইঙ্গিত-বারতাও অমলের কানে আসে- অস্পষ্ট পেন্সিলে আঁকা কোনো ছবির ক্যানভাসের মতো। আর নাটকের শেষদৃশ্যে অমলকে ঘুমিয়ে পড়তে দেখা যায়। সুধা তার জন্য ফুল নিয়ে আসে। কবিরাজ জানায় রাজা ডাকলে অমলের ঘুম ভাঙবে- অমল রাজার ডাকের অপোয় আছে। বালিকা সুধা কবিরাজকে অনুরোধ করে, অমল জাগলে সে যেন তার কানে কানে বলে দেয়- ‘সুধা তোমাকে ভোলেনি। ’

এ নাটকে অমলের নিদ্রাও একধরনের প্রতীকী পরিবেশনা। সত্যিকারের মৃত্যুকে হয়তো ইঙ্গিত করে না এই নিদ্রা; যাপিত জীবনেও চেতনার এক স্তর থেকে অপর স্তরে গমনের আভাস হতে পারে এই নিদ্রার উপস্থিতি। নাট্যকার হয়তো জীবন্মুক্তিকেই তুলে ধরতে চেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ হয়তো অমলকে সৃষ্টি করার মাধ্যমে নিজের অবসন্নতা-আচ্ছনমুক্তির আগ্রহ-অভিলাষ ব্যক্ত করেছেন শিল্পমাধ্যমের উদার উঠানে। কবির বলাকা (১৯১৬) কবিতা-গ্রন্থে যে গতিভাবনার প্রকাশ আমরা দেখি, তাও বোধ করি তাঁর এই বেরিয়ে-পড়বার- চঞ্চলতার অন্য রকম কোনো বহির্প্রকাশ মাত্র। অসুস্থতাকালে রবীন্দ্রনাথ বিশ্রামের অবসরে বাড়ির ছাদে অথবা প্রকৃতির কাছাকাছি নীরবে কালযাপনের যে অভ্যাস গড়ে তুলেছিলেন, তার আড়ালে লুকিয়ে ছিল শক্তি সঞ্চয়ের ইচ্ছাশক্তি ও প্রবণতা। ডাকঘরে অমলের বিশ্রাম বা নিদ্রায়ও বোধ করি সেরকম কোনো বিষয়ের অবতারণার উপস্থিতি বর্তমান।

ডাকঘর নাটকের পরিসর দীর্ঘ নয়- স্বল্প ও পরিমিত কাঠামোয় অতি-অপরিহার্য চিন্তা ও আভাসে রূপায়িত হয়েছে কাহিনীর অবয়ব ও ফ্রেম। আর ক্লাইমেক্সের জটিলতা পরিহার করে শান্তিময় আবহ নির্মাণ করে অপ্রকাশ মায়ালোকের কোনো অধরা রহস্যময়তাকে হাজির করেছেন রবীন্দ্রনাথ। কালপরিসীমা কিংবা জাতিপরিচয়ের সংকীর্ণতা থেকে দূরে আদিগন্ত ভূগোল আর অশেষ ইতিহাসের বিরাট ক্যানভাসে সাজিয়েছেন তিনি এই ছোট নাটকের বিপুল চিন্তারাজি-কল্পনারাজি। আর নাটকটিতে রয়েছে এক ধরনের নীরব গীতলতা- যা পাঠককে অনায়াসে প্রবেশ করায় উদার-অনুভবের বিরল ভুবনে।

বাংলাদেশ সময় ২২৫০, জানুয়ারি ১৯, ২০১১

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa