ঢাকা, বুধবার, ২১ শ্রাবণ ১৪২৭, ০৫ আগস্ট ২০২০, ১৪ জিলহজ ১৪৪১

শিল্প-সাহিত্য

‘হাস্যরসাত্মক বই সম্পর্কে কিছু একটা বলা সত্যিই কঠিন কাজ’ : হাওয়ার্ড জেকবসন

অনুবাদ : রবাব রসাঁ | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১০-১০-১৯ ১২:৪৯:০৫ পিএম
‘হাস্যরসাত্মক বই সম্পর্কে কিছু একটা বলা সত্যিই কঠিন কাজ’ : হাওয়ার্ড জেকবসন

হাওয়ার্ড জেকবসন বিস্মিত হতেন, যদি একজন তরুণ ব্রিটিশ লেখক হিসেবে তিনি ম্যান বুকার পুরস্কারটি পেতেন। আগে এই পুরস্কার হাতছাড়া হওয়া সত্ত্বেও ৬৮ বছর বয়সী এই লেখক অবশেষে তার এগারতম উপন্যাস ‘দ্য ফিনক্লার কোয়েশ্চন’-এর (The Finkler Question) জন্যে এই পুরস্কারটি পেলেন।

বুকার প্যানেলের চেয়ারম্যানের বর্ণনায় উপন্যাসটি ‘খুব মজার, অবশ্যই অনেক বুদ্ধির খেলা রয়েছে। অনেক দুঃখ রয়েছে, রয়েছে অনেক সূক্ষ্মতা। ’

হাস্যরসাত্মক উপন্যাসের প্রকৃতি নিয়ে ব্রিটেনে বেশ আলোচনা সৃষ্টি করেছে উপন্যাসটি। জ্যাকবসন ‘টাইম’ সাময়িকীর এবারের সংখ্যায় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিষয়টি আলোচনা করেছেন। বাংলানিউজের পাঠকদের জন্য এটি তুলে দেওয়া হলো।
 

টাইম : অতীতে আপনার বুকার পাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা আর পাওয়া হয়ে উঠেনি। আর এ বছর টম ম্যাকার্থির উপন্যাস ‘সি’ পুরস্কার পাওয়ার খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল। পুরস্কার ঘোষণার সময় আপনি কি খুব অবাক হয়েছিলেন?

হাওয়ার্ড জ্যাকবসন : আমি জানি না যে, এমন নিষ্পাপ আনন্দ প্রকাশের দিন অবশিষ্ট আছে কিনা। আমি অনেক আনন্দিত হয়েছি। প্রায় পাঁচ হাজার ই-মেইল পেয়েছি। এদের অনেককেই আগে চিনতাম বলে মনে পড়ছে না। আমি শান্তভাবেই এটাকে উদযাপন করেছি। সবকিছুই বেশ মজায় কেটেছে। বইটির কয়েকটি সমালোচনা নিয়ে আমেরিকা তখন ঘুম থেকে জেগে উঠছিল।

টাইম : ‘দ্য ফিনকের কোয়েশ্চন’ প্রথম হাস্যরসাত্মক বই যা বুকার পুরস্কার পেল-- এমন মন্তব্যকে আপনি কীভাবে দেখেন?

জ্যাকবসন : সহজভাবে বলতে গেলে বলা যায়, আমার বইটিই প্রথম হাস্যরসাত্মক উপন্যাস নয়, যা বুকার পেয়েছে। আগের পুরস্কারপ্রাপ্তদের মধ্যে কিংসলে অ্যামিস, পি এইচ নিউবি এবং সালমান রুশদি নিঃসন্দেহে তাদের সমৃদ্ধ হাস্যরসাত্মক ঐতিহ্য নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। আমি আগে বলেছিলাম যে বুকার হাস্যরসাত্মক উপন্যাসকে গুরুত্ব দেয় না। আর এ বছরের ভুল ব্যাখ্যা হলো যে, ‘দ্য ফিনক্লার কোয়েশ্চন’ প্রথম হাস্যরসাত্মক বইয়ের পরিবর্তে যেন আমিই প্রথম হাস্যরসাত্মক ঔপন্যাসিক হিসেবে পুরস্কারটি পেলাম।

হাস্যরসাত্মক বই সম্পর্কে কিছু একটা বলা সত্যিই কঠিন কাজ। কেননা, যা আমার কাছে আনন্দদায়ক তা আরেকজনের জন্য আনন্দদায়ক নাও হতে পারে। হাস্যরসাত্মক উপন্যাসের জন্যে পুরস্কার পাওয়া কঠিনই বটে। কারণ, কমেডি অনেক সময় বিপত্তি ঘটাতে পারে। পুরস্কার পেতে হলে বিচারকদের প্যানেলে সবাইকে একমত হতে হবে। তবে সব পাঠক বিষয়টি সম্পর্কে একমত নাও হতে পারেন। একটি সিরিয়াস উপন্যাস নিয়ে কেউ কিছু বলেন না। এটি কতটা সিরিয়াস তা নিয়েও কেউ প্রশ্ন করেন না। কিন্তু হাস্যরসাত্মক উপন্যাসের বিষয়টি আলাদা। এটা নিয়ে অনেক তর্ক করা যায়।

টাইম : আপনি কি মনে করেন যে সোশ্যাল নেটওয়ার্কের কারণে উপন্যাস ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে?

জ্যাকবসন : একসময় আমি সাহিত্যের শিক্ষকতা করতাম এবং তখন পুরো বইটাই পড়াতে হতো। ইংল্যান্ডে এমন অনেকেই রয়েছেন যে, পুরো উপন্যাসটা কখনও পড়েন না। পড়েন শুধু নির্বাচিত অংশ। এমন মানুষের ব্যতিক্রমও রয়েছে। তবে ফেসবুক, টুইটার এবং অন্যান্য সোশ্যাল নেটওয়ার্কের কারণে অনেকেই বই পড়ার অভ্যাসটা হারিয়ে ফেলছেন। ব্লগ এমন একটা ধারণা সৃষ্টি করেছে যে, লেখালেখি হচ্ছে এক ধরনের মত বিনিময়। লোকজন ব্লগে একটা উপন্যাস নিয়ে লিখবেন যে, এটি একটি অখাদ্য কাজ হয়েছে। এবং তারা এমন জঘন্য লেখার জন্য খুব নিন্দা জানাবেন। আসলে বাস্তবে তারা বলতে চাচ্ছেন, ‘আমি আপনার কাজের সঙ্গে একমত নই। ’ আমি তো এমন পরিবেশে বড় হইনি যেখানে ‘প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস’ বা ‘গ্রেট এক্সপেকটেশনস’ নিয়ে বলব আমি এর সঙ্গে একমত পোষণ করি।

সোশ্যাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আমরা একটি উপন্যাস সম্পর্কে ভালোমন্দ মত প্রকাশ করতে পারি। সাহিত্যের বিষয়টি হচ্ছে যে, আপনি লিখেন বা পড়েন, এটা নিয়ে মতামত প্রকাশ করার কিছু নেই। মানুষ হিসেবে মতামতটা আমাদের জীবনের জঘন্যতর অংশ। শিল্পকর্ম নিয়ে মতামত জানানোর কিছু নেই। ‘যদি ঔপন্যাসিক হিসেবে আমার কোনও মতামত থাকে তাহলে বুঝতে হবে আমি ব্যর্থ’-- কথাটি বলেছিলেন ডি এইচ লরেন্স। আমিও তাই বলি।

টাইম : হাস্যরসাত্মক সাহিত্যের একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে ইহুদিদের। এক্ষেত্রে আপনি কাদের মাধ্যমে বেশি অনুপ্রাণিত হয়েছেন?

জ্যাকবসন : অনেকই হয়তো মনে করেন যে আমি খ্যাতিমান আমেরিকান ইহুদি সাহিত্যিক সল বেলো, ফিলিপ রথ এবং  জোসেফ হেলারদের রাস্তায় হাঁটছি। কিন্তু আমি আসলে একজন প্রথাগত ব্রিটিশ সাহিত্যিক। যখন আজ থেকে প্রায় তিরিশ বছর আগে আমি আমার প্রথম উপন্যাসটি লিখি তখন কিন্তু আমি আমেরিকান-ইহুদি লেখকদের বই পড়িনি। পড়েছিলাম ইংরেজ ঔপন্যাসিক চার্লস ডিকেন্স, জেন অস্টেন এবং স্যামুয়েল জনসনের লেখা। তাদের চমৎকার বাক্যনির্মাণ ও লেখনশৈলী এবং বুদ্ধিদীপ্ত হাস্যরসাত্মক গল্প আমাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। আসলে আমি এমন একজন লেখক হতে চেয়েছিলাম কিন্তু হয়ে উঠতে পারিনি। আমি ইংরেজি সাহিত্যে ইহুদি সঙ্গীতের মাধুর্য এনেছি।

টাইম : আপনি কি আশাবাদী যে এই বুকার বিজয়ের মাধ্যমে ভালো হাস্যরসাত্মক উপন্যাসের মৌলিক গুরুত্ব একটি উন্নত স্থান দখল করতে পারবে?

জ্যাকবসন : আমি আশা করি যে এই পুরস্কার সবার আগে আমার মৌলিক গুরুত্বটাকে একটি উন্নত স্থানে স্থাপন করবে। এবং আমেরিকায় এ নিয়ে অনেক আগ্রহের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। সাহিত্যের প্রথম কাজে হলো পাঠককে আনন্দদান। এই ধারণাটি খুবই ভীতিকর যে, অনেকে মনে করেন বিনোদন এবং ভালো সাহিত্য পরস্পরের শত্রু। ধারণাটি এমন যে, যদি আপনি বিনোদন পেতে চান তাহলে আপনাকে হালকা মেজাজের কিছু পড়তে হবে। আমি চাই এই পুরস্কার পাওয়ার ফলে পাঠক হাস্যরসাত্মক উপন্যাস হাতে নেবেন এবং ভাববেন, ‘ওয়াও, সত্যিই আমি এটা উপভোগ করতে পারছি। ’ তারা আরো ভাবতে পারবেন এবং হাসিমুখেই তারা অনেক জটিল এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মুখোমুখি হতে পারবেন। এটা কি আমাদের সবার জন্যই মজার হবে না?

বাংলাদেশ স্থানীয় সময় ১২১০, অক্টোবর ১৯, ২০১০

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa