ঢাকা, বুধবার, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ২২ মে ২০২৪, ১৩ জিলকদ ১৪৪৫

শিল্প-সাহিত্য

ধারাবাহিক উপন্যাস

মানুষখেকোর দ্বীপ | পর্ব-৯

আলম শাইন | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১০১৩ ঘণ্টা, জানুয়ারি ১২, ২০২৪
মানুষখেকোর দ্বীপ | পর্ব-৯

সৈকতের কাছ ঘেঁষে বনের দক্ষিণ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে অর্পিতা। দ্বীপবাসীর বাসস্থান খুঁজতে ওদের পেছন পেছন এই পর্যন্ত এসেছে।

ওরা সৈকত ধরে হেঁটে এখানে এসে মোড় নিয়েছে অন্যত্র। অর্পিতা বনের পাশ ঘেঁষে হেঁটে এখানে পৌঁছেছে। সামনে এগোবে কি না, তা নিয়েই দ্বিধায় আছে এখন। সামনে এগোলে ঝুঁকি আছে, সেটাও জানে অর্পিতা। তাই মনস্থির করতে পারছে না এই মুহূর্তে কী করা উচিত। দ্বীপবাসীরা যদি হিংস্র স্বভাবের হয়ে থাকে তাহলে বিপদ অনিবার্য। বিষয়টা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছে অর্পিতা।

দ্বীপে টিকে থাকতে হলে খাবার এবং মানুষ সবই প্রয়োজন। কতদিক সামলাবে, তা বুঝতে পারছে না অর্পিতা। বাবা-মা আর তিয়াসকেও খুব মনে পড়ছে। তিয়াস বেঁচে আছে কি না, বেঁচে থাকলে সমুদ্রে ভাসছে নাকি কোথাও আশ্রয় নিতে পেরেছে, সেসব জানতে উদগ্রীব হয়ে আছে। কিন্তু দ্বীপে সংবাদটা জানার কোনো মাধ্যম নেই। একদিকে জীবন বাঁচানোর প্রচেষ্টায় প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে লড়ছে, অন্যদিকে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বনে বনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এমতাবস্থায় প্রিয়জনদের নিয়ে ভাবতে পারছে না আর। তাই মাথা থেকে আপাতত দুঃচিন্তার চাপ কমিয়ে ফেলতে চাচ্ছে সে। এমনিই তো বনের গা ছমছম পরিবেশ, তার ওপর অনিশ্চিত গন্ত্যবের উদ্দেশে ঘুরে বেড়ানো যে কতটা কঠিন কাজ তা বোঝানো যাচ্ছে না। অর্পিতা আর ভাবতে পারছে না কিছুই। তবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে দ্বীপবাসীর বাসস্থান খুঁজে বের করার। মানুষ হিসেবে যদি ওরা শান্তশিষ্ট হয় তবে দ্বীপে কাটাতে সমস্যা হবে না। ওদের সাহায্যে একদিন না একদিন মূল ভূখণ্ডে পৌঁছাতে পারবে।

ভেবেচিন্তে হাঁটতে হাঁটতে সমতল থেকে কিছুটা উপরের দিকে উঠে এলো অর্পিতা। পাহাড়ের নিচে দাঁড়িয়ে আছে এখন। দ্বীপের একমাত্র পাহাড় এটাই। পাহাড়ের অবস্থান একেবারেই দ্বীপের মাঝ বরাবর। দ্বীপের একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্ত পর্যন্ত পাহাড়ের বিস্তৃতির কারণে মনে হচ্ছে এখানে ভিন্ন দু’টি দ্বীপের অবস্থান। অবার মধ্যখানে পার্টিশন থাকায় কেউ ইচ্ছে করলে ঝটপট বনের পুব থেকে পশ্চিমে যাতায়াতও করতে পারে না। ওপারে যেতে হলে পাহাড় ডিঙিয়ে যেতে হয়। সেক্ষেত্রে যেমন অধিক সময়ের প্রয়োজন, তেমনি পরিশ্রমও প্রচুর। কিছুটা ঝুঁকিও আছে। বরং সৈকত ধরে ঘুরে গেলে যাতায়াতে সুবিধা হয়। দ্বীপবাসীরা সাধারণত পাহাড় ডিঙানোর চেষ্টা করে না, বনের বাইরে দিয়ে ঘুরে যাতায়াত করে।

সেন্টিনেল দ্বীপের বনভূমি কিছুটা রুক্ষ এবড়োখেবড়ো; সমতল নয়। বনের যত্রতত্রে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিশাল বিশাল পাথরখণ্ড। বন্ধুর পথ; স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলাও করা যায় না, হাঁটতে গেলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। শুধু বনভূমিতেই পাথরের বিস্তৃতি নয়, সমস্ত দ্বীপজুড়েই পাথরের রাজত্ব। পাথরগুলো আকৃতিতে এতটাই বড় যে, দূর থেকে পাথরের চাঁইগুলোকে ছোটখাটো টিলা মনে হয়। শুধু এই দ্বীপেই নয়, আন্দামান-নিকোবরের বেশ কিছু দ্বীপের পরিবেশ রুক্ষ টাইপের। তবে সেই রুক্ষতার মধ্যেও এক ধরনের জাদুকরি মায়াবী টান উপলব্ধি করা যায়। তাই তো আন্দামানে পর্যটকদের আকর্ষণ বেড়েই চলছে দিন দিন। এ জন্যই হয়েতোবা অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়দের কাছে আন্দামান-নিকোবর অনন্য একটি দর্শনীয় স্থান হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে। তাছাড়া আন্দামান ভ্রমণে গেলে একসঙ্গে সাগর-পাহাড়-নদী-ঝর্নাধারার সাক্ষাৎ মেলে। সাক্ষাৎ মেলে বিভিন্ন আদিবাসীদের সঙ্গেও। সব মিলিয়ে খুব উপভোগ করার মতো একটা জায়গা আন্দামান-নিকোবর।

সেন্টিনেল দ্বীপের পরিবেশ রুক্ষ হলেও সৌন্দর্যের কমতি নেই। দ্বীপের পরতে পরতে সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে। এই বনে এঁটেল বা দোআঁশ মাটির উপস্থিতি নেই বললেই চলে। সমস্ত দ্বীপজুড়েই বালি আর কাঁকরের বিস্তৃতি। অভ্যাস না থাকলে যে কারো পক্ষে দ্বীপে বা বনভূমিতে খালি পায়ে হাঁটাহাঁটি করা কষ্টসাধ্যের। তেমনি কষ্টের শিকার হচ্ছে অর্পিতাও।

পাহাড়ের কাছে এসে দাঁড়াতেই অর্পিতা কিছুটা আশাবাদী হলো। কারণ পাহাড়ের গায়েই ঝর্ণার সন্ধান মেলে; ঝর্নার সন্ধান পেলে বেঁচে থাকার জন্য প্লাস পয়েন্ট হবে। ফলের রস সাময়িক পানির চাহিদা পূরণ করলেও সরাসরি পানি পানের বিকল্প নেই। বিষয়টা মাথায় নিয়ে ঝর্নার সন্ধানে এদিক-সেদিক তাকাতে লাগল। এদিকের পাহাড়ের ঢাল অনেকটাই খাড়া, হেঁটে বেশি উঁচুতে ওঠা যায় না। পাহাড়ের কাছাকাছি জঙ্গলও তেমন একটা ঘন নয়, তবে উঁচু উঁচু গাছ-গাছালি প্রচুর। গাছের মাথার উপরে তাকালে ভয় ধরে যায়, এতটাই দৈত্যাকৃতির গাছগুলো। পাহাড়ের উপরে উঠতে পারলে অর্পিতার জন্য খানিকটা সুবিধা হতো। উপর থেকে অনেক কিছু দেখতে পেতো। বিশেষ করে খাবার জল এবং জলযানের যাতায়াত পর্যবেক্ষণ করা যেত সহজেই।

পাহাড়ে চড়া খুবই জরুরি। অর্পিতা চেষ্টা করছে পাহাড়ে চড়তে, সফল হতে পারেনি শারীরিক দুর্বলতার কারণে। তাছাড়া এদিকের পাহাড়ের দেয়ালটাও খাড়া, আবার নেই নির্দিষ্ট কোনো পথঘাট। তার মানে এদিকে দ্বীপবাসীর যাতায়াতও নেই। যাতায়াত থাকলে পাহাড়ের গায়ে হাঁটার রাস্তা তৈরি হতো। রাস্তা না থাকায় জায়গাটা নিরাপদ মনে হলো অনেকটাই।

চেষ্টা করেও অর্পিতা যখন পাহাড়ে চড়তে সফল হয়নি, তখন পরিকল্পনা করল গাছে চড়ার। যেকোন একটা গাছে চড়তে পারলেও মোটামুটি দ্বীপের অনেকখানি জায়গা নজরে পড়ত। সমস্যা হচ্ছে, গাছে চড়তে জানে না সে। আট-দশটা বাঙালি মেয়েদের মতোই অর্পিতাও গাছে চড়তে পারদর্শী নয়। যার জন্য সে বনে কাত হয়ে পড়া গাছ-গাছালির সন্ধান করতে লাগল। ওরকম একটা গাছ খুঁজে পেলে অনেকটা সুবিধা হতো। বনে কাত হয়ে পড়া অনেক গাছ আছে, খুঁজলেই পেয়ে যাবে সেই বিশ্বাস আছে ওর।

কাত হয়ে পড়া গাছ খুঁজতে খুঁজতে অর্পিতা কিছুটা উঁচুতে উঠে এলো। সামান্য উঠতেই সে হাঁপিয়ে পড়েছে, আর পারছে না উপরে উঠতে। তাই পাহাড়ের খাঁজে বসল একটু জিরিয়ে নিতে। আশপাশে তাকিয়ে সরু পথ খোঁজার চেষ্টা করল, নজরে পড়েনি। পথের সন্ধান না পেয়ে এবার ঝর্নার সন্ধানে মরিয়া হয়ে উঠল। যতদূর দৃষ্টি যায় তন্ন তন্ন করে খুঁজল; ঝর্নার সন্ধান পায়নি। তবে চেষ্টাটা একেবারেই বিফলে যায়নি। ঝর্নার সন্ধান না পেলেও খাদ্যের সন্ধান পেয়েছে ঠিকই। কিছু পেঁপে গাছ নজরে পড়েছে, পাহাড়ের নিচের দিকে। গাছে পেঁপে পেকে টসটস করছে। পাকা পেঁপে গাছে ঝুলতে দেখে অর্পিতার জিভে জল চলে এলো। তার ওপরে পাখ-পাখালিও ঠুকরে খাচ্ছে পেঁপেগুলো, তা দেখে হঠাৎ করে খিদে আরও বেড়ে গেল। পেট ভরতে হলে পেঁপের বিকল্প নেই এই মুহূর্তে। জাম্বুরার রসে কিছুটা পিপাসা নিবারণ হলেও পেট ভরেনি। পেঁপে খেলে পেট ভরবে নিশ্চয়ই। তাছাড়া পেঁপে পুষ্টিকর ফল, শরীরের দুর্বলতাও কাটবে। সমস্যা হচ্ছে খাবার পানি নিয়ে। প্রচুর পিপাসা পেয়েছে, পানি খেতে পারছে না এখনো। সমুদ্রের নোনাজল পেটে ঢুকেছিল কিছু, তারপর থেকে আর পানি খাওয়া হয়নি। তাও বেশ কয়েক ঘণ্টা আগের ঘটনা সেটা। জ্ঞান ফেরার পর পাকা তেলাকুচা ও জাম্বুরা ছাড়া আর কিছুই খাওয়া হয়নি।

অর্পিতা নিশ্চিত দ্বীপে খাবার পানির ব্যবস্থা আছে, না হলে এখানে লোকজন বসবাস করতে পারত না। সুতরাং ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হবে ওকে।

গাছের নিচে অনেক পেঁপে পড়ে স্তূপাকার হয়ে আছে। পেঁপেগুলোর অধিকাংশই পঁচা। লোকজনের যাতায়াত থাকলে এতগুলো পেঁপে পড়ে থাকার কথা নয়। এতে দ্বিতীয়বার প্রমাণিত হয়েছে দ্বীপবাসীর যাতায়াত নেই এদিকে। বিচার বিশ্লেষণ করে জায়গাটা নিরাপদ হিসেবে ধরে নিয়েছে অর্পিতা।

পাহাড়ের খাঁজে দাঁড়িয়ে একটা পেঁপে ছিঁড়ল অর্পিতা। পেঁপেটা বেশ বড়োসড়ো, পাকা টসটসে। সমস্যা হচ্ছে, পেঁপের খোসা ছাড়ানোর মতো হাতে কোনো জিনিসপত্র নেই। ধারালো কোনো পাথরখণ্ডও হাতের কাছে নেই। তাই দু’হাতের তালুতে রেখে মৃদু চাপ দিয়ে পেঁপেটা ফাটিয়ে ফেলল। তারপর তৃপ্তিসহকারে পেট ভরে পেঁপে খেলো।

খেয়েদেয়ে পুনরায় কাত হয়ে পড়া গাছের সন্ধানে হাঁটতে লাগল। বনে অনেক গাছ-গছালি আছে কাত হয়ে পড়া, কিন্তু এদিকে যুৎসই গাছ নেই একটাও। খুঁজতে খুঁজতে পরিশেষে একটা গাছের সন্ধান পেলো, যেটার অবস্থান একেবারে বনের কিনার ঘেঁষে। এমন একটা গাছ এতক্ষণ ধরে খুঁজছিল অর্পিতা। গাছটা কাত হয়ে পড়লেও বেঁকে উপরের দিকে উঠেছে। চেষ্টা করলেই বাঁকা অংশে চড়তে পারবে। সময় অপচয় না করে হিম্মত নিয়ে গাছে চড়তে পা বাড়াল। অর্পিতা আগে কখনো গাছে চড়েনি, অভ্যাস না থাকায় পা রাখতে পারছে না গুঁড়িতে। পা পিছলে পড়ছে বারবার। তারপরেও সে হাল ছাড়ার পাত্র নয়। যেভাবে হোক গাছে উঠতেই হবে ওকে। গাছের উপর থেকে পর্যবেক্ষণ করতে সুবিধাও হবে ওর। ধৈর্য ধরে কিছুক্ষণ চেষ্টা করে গাছের একটা ডালে চড়তে সক্ষম হয়েছে অর্পিতা। ডালে সোজা হয়ে দাঁড়ালে সৈকতের মোড় থেকে হাতের ডানে অনেক ফাঁকা জায়গা নজরে পড়বে। খুব সতর্ক হয়ে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। না হলে বিপদে পড়ার সম্ভাবনা আছে, কারণ এদিকে দ্বীপবাসীর যাতায়াত থাকে সব সময়। তাই যতটা সম্ভব পাতার আড়ালে লুকিয়ে চারপাশে তাকিয়ে দেখতে লাগল। সমুদ্রের নীল-সবুজ জল, সৈকতের বালির ঢিবি গাছ থেকে স্পষ্ট নজরে পড়ল। অপূর্ব সেই সৌন্দর্য অর্পিতাকে খুব মোহিত করল। কষ্টের মধ্যেও খানিকটা ভালো লাগল মনোমুগ্ধকর পরিবেশ দেখে। তন্ন তন্ন করে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল আশপাশ। বারবার এখানে আসার সুযোগও নেই। এই জায়গা থেকে চলে গেলে ফিরে আসাও কষ্ট হবে। সুতরাং ভালো করেই সবকিছু দেখে শুনে গাছের উপর থেকে নামতে হবে।

ডালে দাঁড়িয়ে কয়েক সেকেন্ড তাকাতেই অর্পিতা দেখতে পেলো বনের পশ্চিম কিনারের জঙ্গল অনেকটাই ফাঁকা। তার মানে এদিকে জনপদ অথবা ফাঁকা জায়গার বিস্তৃতি রয়েছে। আবার ফাঁকা জায়গায় জলাশয় থাকারও সম্ভাবনা আছে। অর্পিতা আরও ভালো করে দেখার চেষ্টা করল আশপাশ। এবার নজরে পড়ল পাতার ছাউনি দেওয়া ছোট ছোট বেশ কিছু ডেরা-কুটির। কুটিরের চারপাশে গাছের ডালপালা দিয়ে বানানো নড়বড়ে প্রাচীরও রয়েছে। ডেরা-কুটিরগুলোর তেমন শ্রীছাদও নেই, শক্তপোক্তও নয়। অর্পিতা শিওর, এই ডেরা-কুটিরগুলো দ্বীপবাসীর বাসস্থান।

দ্বীপবাসীর বাসস্থানের সন্ধান পেয়ে অর্পিতার মনোবল বেড়ে গেল দ্বিগুণ। এখন আর দু’টি বিষয়ের খোঁজখবর নিতে হবে, পানি আর বেঁধে আনা লোকটার পরিণতি সম্পর্কে জানতে হবে। তাহলে অর্পিতা নিজের মতো করেই দ্বীপে কাটাতে পারবে। তবে পানি নিয়ে ভাবনা কমে এসেছে। দ্বীপবাসীর বাসস্থানের আশপাশেই পানির সন্ধান পাওয়া যাবে; নিশ্চিত হয়েছে সে। এখন বাসস্থান নিয়েই ভাবনা বেশি। দ্বীপবাসী যদি বহিরাগত মানুষের ওপর অত্যাচার নিপীড়ন না করে তাহলে ওদের ডেরা-কুটিরেই আশ্রয় নেবে সে। তাই দ্বীপবাসীর গতিবিধি লক্ষ্য করছে গাছের ডালে দাঁড়িয়েই। বিশেষ করে বেঁধে আনা লোকটাকে খুঁজছে। লোকটার সন্ধান পেলে সব কিছুর সমাধান মিলে যাবে।

অর্পিতা গাছের এক ডাল থেকে অন্য ডালে সরে এলো। পাশের তে-ডালে দাঁড়িয়ে আছে সে। এই ডাল কিছুটা উঁচু হওয়ায় দৃষ্টির পরিধিও বেড়েছে। দ্বীপবাসীর বাসস্থানও স্পষ্ট নজরে পড়ছে, নজরে পড়ছে ওদের জীবনধারার খণ্ডচিত্রও।

পাতার ফাঁকফোকর দিয়ে চোখ বের করে অর্পিতা সামনে তাকিয়ে দেখছে। লক্ষ্য করছে দ্বীপবাসীরা হুড়োহুড়ি করে জড়ো হতে লাগল নির্দিষ্ট একটা জায়গায়। দু-চারজন করে অনেকেই সমবেত হলো জায়গাটায়। গোল চক্করের মতো করে দাঁড়াল। তারপর একে অপরের হাত ধরাধরি করে নাচানাচি শুরু করল। নারী-পুরুষ সবাই একত্রিত হয়েই উল্লাস করছে অনাবৃত শরীরে। দ্বীপবাসীর অনাবৃত চেহারায় নজর পড়তেই অর্পিতা ভীষণভাবে লজ্জিত হলো। ওদের বীভৎস উল্লাস দেখে অর্পিতার মনে সন্দেহের দানা বাঁধল। বেঁধে আনা লোকটার পরিণতি নিয়েও শংকিত হলো। জিওগ্রাফি চ্যানেলে দেখেছে নরখাদকেরা হত্যাকাণ্ড ঘটানোর আগে উন্মাদের মতো উল্লাস করতে। যদি সেরকম কিছু হয়, তাহলে লোকটার কপালে দুঃখ আছে। পাশাপাশি ধরে নিতে হবে সে নিজেও দ্বীপে টিকে থাকতে পারবে না। লুকিয়ে-চুকিয়ে বন-জঙ্গলে কাটানোও সম্ভব নয়। তাছাড়া দ্বীপবাসীর চোখ ফাঁকি দিয়ে লুকিয়ে থাকতে পারলেও হিংস্র প্রাণীদের কবল থেকে রক্ষা পাওয়া কঠিনই হবে।

মধ্য দুপুরেই বনের ভেতর অন্ধকারাচ্ছন্ন লাগছে। বিকেল হলে তো নিশ্চয়ই আরও অন্ধকার নেমে আসবে বনে। তাই বিকেল ঘনিয়ে আসার আগেই বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। যার জন্য দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ল অর্পিতা। এখুনি কিছু একটা করতে না পারলে রাত কাটানো কঠিন হয়ে পড়বে।

সামনে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল অর্পিতা। দ্বীপবাসীরা উন্মাদের মতো উল্লাস করতে করতে এক সময় সবাই গোল হয়ে বসল মাটিতে। মনে হচ্ছে ওরা কোনো শলাপরামর্শ নিয়ে ব্যস্ত, অথবা খাদ্য গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ওদের জীবনধারা স্বচক্ষে দেখতে খানিকটা কৌতূহলী হয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইল অর্পিতা। হঠাৎ ওর নজর গেল গোল চক্করের মধ্যখানে স্তূপাকারে রাখা কিছু জিনিসের ওপর। ওগুলো দেখে অর্পিতার আরও কৌতূহল বেড়ে গেল। ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করল, কিন্তু স্পষ্ট বুঝতে পারছে না। তবে যতটা বুঝতে পেরেছে, ওগুলো খণ্ড খণ্ড মাংসের স্তূপ। দেখতে অনেকটা জবাইকৃত পশুর মাংসের মতো। মাংসগুলো ঘিরেই সবাই অধীর আগ্রহে বসে আছে। অনেকটাই শৃঙ্খলা মেনে বসেছে। মনে হচ্ছে ওরা কারো নির্দেশের অপেক্ষায় বসে আছে। বিষয়টার শেষ অব্দি দেখতে অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে অর্পিতা।

দেখতে দেখতে ওদের সামনে হৃষ্টপুষ্ট কেউ একজন চলে এলো। সাধারণত দ্বীপবাসীদের মধ্যে এখনো এমন হৃষ্টপুষ্ট কাউকে দেখেনি অর্পিতা। সেই লোকটা এসেই কী যেন একটা নির্দেশ করল সবাইকে। নির্দেশ পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে সবাই স্তূপ থেকে কিছু একটা হাতে নিয়ে মুখে পুরে চিবুতে লাগল। বেশ আনন্দের সঙ্গে খাচ্ছে ওরা। বিষয়টা বুঝতে আর বাকি রইল না অর্পিতার। ভয়ে ওর হাত-পা থরথর করে কাঁপতে লাগল। অর্পিতা যা ধারণা করেছে মূলত তাই-ই ঘটছে। দ্বীপবাসীরা নরখাদক তা এখন প্রমাণিতও হয়েছে ওর কাছে। নিশ্চয়ই বেঁধে আনা লোকটাকেই মেরে কাঁচা চিবিয়ে খাচ্ছে ওরা। আসলে এই শিকারটা যে ওদের স্বগোত্রীয়দের একজন, তা অবশ্য অর্পিতার জানা নেই। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে আর সেদিকে তাকাতে পারল না সে। বীভৎস দৃশ্য দেখে কাঁপতে কাঁপতে অবশেষে বসে পড়ল গাছের তে-ডালে। ভাগ্যিস একহাতে গাছের ডাল ধরা ছিল, না হলে ১০-১৫ ফুট নিচে পড়ে যেত। এমতাবস্থায় অর্পিতার শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল, রক্ত হিম হয়ে এলো, মাথাটাও চক্কর দিতে লাগল। চলবে...

মানুষখেকোর দ্বীপ। পর্ব-১
মানুষখেকোর দ্বীপ। পর্ব-২
মানুষখেকোর দ্বীপ। পর্ব-৩
মানুষখেকোর দ্বীপ। পর্ব-৪
মানুষখেকোর দ্বীপ। পর্ব-৫

মানুষখেকোর দ্বীপ | পর্ব-৬
মানুষখেকোর দ্বীপ | পর্ব-৭
মানুষখেকোর দ্বীপ | পর্ব-৮

আলম শাইন: কথাসাহিত্যিক, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক কলামিস্ট

বাংলাদেশ সময়: ১০০৫ ঘণ্টা, জানুয়ারি ১২, ২০২৪
এমজেএফ/আরএইচ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।