ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৬ আষাঢ় ১৪২৬, ২০ জুন ২০১৯
bangla news

বিশ্বকাপের বিতর্ক, বিতর্কের বিশ্বকাপ

ওয়ার্ল্ড কাপ ডেস্ক | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১৯-০৫-২২ ৯:৫৭:৫৩ পিএম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

ক্রিকেট ভদ্রলোকের খেলা হলেও এতে বিতর্কের দাগ কিন্তু কম লাগেনি। বিশেষ করে বিশ্বকাপের মতো বিশাল আসরে তা আরও ভিন্ন মাত্রা পায়। সাম্প্রতিক সময়ে যেসব বিতর্ক চাক্ষুষ করেছে ক্রিকেটবিশ্ব, তা বিগত বিশ্বকাপগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে নিতান্তই পানি-ভাত। তো চলুন তেমনই কিছু বিতর্কে চোখ বুলিয়ে আসি:

শেন ওয়ার্নের নিষিদ্ধ হওয়া (২০০৩)
শেন ওয়ার্ন-ছবি: সংগৃহীত

ক্রিকেটের অন্যতম বড় বিতর্ক বলা হয় এটাকে। টানা দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা ধরে রাখার লড়াইয়ে নামার ঠিক আগে ঘটে সেই ক্রিকেটবিশ্ব কাঁপিয়ে দেওয়া ঘটনা। ওয়ার্ন তখন লেগ স্পিনের রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত আর অজিদের মূল স্পিন ভরসা। বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগে সেই তিনিই কিনা ধরা খেলেন নিষিদ্ধ মাদক গ্রহণ করে! তাও কেন জানেন? তাকে যেন আরও সুন্দর দেখায়! ফলাফল, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে সোজা বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ১ বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকেই নিষিদ্ধ করা হলো তাকে। তবে কপাল ভালো তার অমন হুট করে নিষিদ্ধ হওয়া অজিদের মনোবলে তেমন ফাটল ধরাতে পারেনি। বরং, রিকি পন্টিংয়ের নেতৃত্বে সেবার সব প্রতিপক্ষকে রীতিমত তুলোধোনা করে শিরোপা হাতে তুলেছে অস্ট্রেলিয়া।

বব উলমারের মৃত্যু (২০০৭)
বব উলমার-ছবি: সংগৃহীত

২০০৭ বিশ্বকাপ। ১৮ মার্চ সকাল। আগেরদিন গ্রুপ পর্বের ম্যাচে আয়ারল্যান্ডের কাছে হেরে বিধ্বস্ত পাকিস্তান ক্রিকেট দলের জন্য এদিন সকালেই বিশাল ধাক্কা হয়ে এলো কোচ বব উলমারের অকস্মাৎ মৃত্যু। কিংস্টোনের জ্যামাইকা পেগাসাস হোটেলের রুমে মুখ থুবড়ে পড়ে ছিলেন এই সাবেক প্রোটিয়া কোচ। তার মৃত্যু অনেকটা সময় ক্রিকেট বিশ্বকাপে অন্ধকার ছায়া হয়ে ছিল। শুরুতে তার মৃত্যু নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। তদন্তের শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল তাকে বিষ প্রয়োগে মারা হয়েছে। পরে যদিও ঘোষণা করা হয় তার স্বাভাবিক মৃত্যুই হয়েছে, তবে সন্দেহ তাতে কমেনি বরং বেড়েছে। কেননা, আইরিশদের কাছে পাকিস্তানের অমন অসহায় পরাজয় প্রায় কেউই স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেনি। আর পাকিস্তান দলের কয়েকজনের সঙ্গে জুয়াড়িদের সম্পর্কের কথা তো কারো অজানা নয়। ঘটনা যাই হোক না কেন, উলমারের মৃত্যু যে ক্রিকেটের অন্ধকারতম অধ্যায় তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

দাঙ্গার কারণে শ্রীলঙ্কাকে পয়েন্ট ছেড়ে দেয় অস্ট্রেলিয়া, উইন্ডিজ (১৯৯৬)
ছবি: সংগৃহীত

১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপ চলাকালীন সময় শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বোমা হামলা চালায় তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলাম (এলটিটিআই)। এই ঘটনায় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে শ্রীলঙ্কা সফরে অস্বীকৃতি জানায় অস্ট্রেলিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ফলে লঙ্কানদের পয়েন্ট ছেড়ে দিতে হয় তাদের। এতে লঙ্কানরা লাভবান হয়ে গ্রুপের শীর্ষে চলে যায়। পরে ফাইনালে অজিদের হারিয়ে প্রথমবারের মতো শিরোপা ঘরে তুলে অর্জুন রানাতুঙ্গার দল।

ফ্লাওয়ার, ওলোঙ্গার বিদ্রোহ (২০০৩)
নিজ দেশের সরকারের প্রতি বিদ্রোহ ঘোষণা করেন অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার ও ওলোঙ্গা

গণতন্ত্রের জন্য ক্রিকেটারদের লড়াইয়ের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন দুই সাবেক জিম্বাবুইয়ান ক্রিকেটার অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার ও হ্যানরি ওলোঙ্গা। নিজ দেশ জিম্বাবুয়ের রাষ্ট্রপতি রবার্ট মুগাবের স্বৈরশাসনের প্রতিবাদে বিশ্বকাপে কালো আর্মব্যান্ড পরে খেলার ঘোষণা দেন সেসময়ের অধিনায়ক ফ্লাওয়ার ও ওলোঙ্গা। সারা বিশ্বেই তাদের এমন সিদ্ধান্ত সাধুবাদ পেলেও কিন্তু নিজ দেশের সরকার কর্তৃক তাদের পরিবারকে আক্রান্ত হতে হয়। বিশ্বকাপ শেষে অবসর নিয়ে নেন দুজনেই।

বিতর্কিত বৃষ্টি আইনে বিদায় নেয় দক্ষিণ আফ্রিকা (১৯৯২)
বিতর্কিত বৃষ্টি আইনে যেবার বাদ পড়ে দক্ষিণ আফ্রিকা

প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে এসেই সেমিফাইনালে পা রাখার কীর্তি গড়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। সেমিতে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল ইংল্যান্ড। ম্যাচে বৃষ্টি বাগড়ার আগে ১৩ বলে প্রোটিয়াদের দরকার ছিল ২২ রান। এরপর ফের খেলা শুরু হলে ৭ বলে লক্ষ্য দাঁড়ায় ২২ রান। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে স্কোর বোর্ডে নতুন লক্ষ্য দেখা যায়, ১ বলে ২২ রান! হ্যাঁ, চোখ কচলাতে কচলাতে দর্শক দেখলো এই অবিশ্বাস্য ঘটনা। বলা হলো, নিয়ম অনুযায়ী (ওইসময়ের ফলপ্রসূ ওভারের নিয়মে) লক্ষ্যটা তাই দাঁড়ায়। শেষ বলতা আলতো টোকায় সিঙ্গেলের উদ্দেশ্যে মেরে হেঁটে হেঁটে প্রান্ত বদল করেন প্রোটিয়া ব্যাটসম্যান ব্রায়ান ম্যাকমিলান।

ইডেন গার্ডেনে দর্শকদের তুমুল বিশৃঙ্খলা (১৯৯৬)
ইডেন গার্ডেন যেন রণক্ষেত্র

ক্রিকেটে ভারতীয় দর্শকদের বাড়াবাড়ি নতুন কিছু নয়। ম্যাচের ফল মনমতো না হলেই তাদের ক্ষিপ্ত হয়ে উঠার সবচেয়ে বাজে নজির ১৯৯৬ বিশ্বকাপে দেখা যায়। সেবার সেমিফাইনালে মুখোমুখি হয় শ্রীলঙ্কা ও ভারত। ২৫২ রানের লক্ষ্য তাড়ায় ভালোই খেলছিল ভারত, কিন্তু সেই মাত্র দলের প্রাণভোমরা শচীন টেন্ডুলকার ৬৫ রান করে বিদায় নিলে, তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে শুরু করে ভারতীয় ব্যাটিং লাইনআপ। একসময় ১২৮ রানেই ৮ উইকেট হারিয়ে ফেলা ভারত যখন পরাজয়ের প্রহর গুনছে, স্বাগতিক দর্শকরা শুরু করলো তুমুল বিশৃঙ্খলা। মাঠে বোতল ছুড়ে মারা এবং গ্যালারির সিটে আগুন ধরিয়ে দেওয়ায় শেষে খেলা সেখানেই শেষ করে লঙ্কানদের জয়ী ঘোষণা করেন ম্যাচ আম্প্যায়ার।

ক্রনিয়ে ও এয়ারপিস বিতর্ক (১৯৯৯)
হ্যান্সি ক্রনিয়ে

ক্রিকেটে নতুন নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারে প্রয়াত কোচ বব উলমার ও আরেক প্রয়াত প্রোটিয়া অধিনায়ক হ্যান্সি ক্রনিয়ের কোনো তুলনা ছিল না। কিন্তু ১৯৯৯ বিশ্বকাপে তারা প্রযুক্তির ব্যবহারে একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করে বসেন। ভারতের বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম ম্যাচে, ক্রনিয়েকে মাঠেই এয়ারপিস ব্যবহার করতে এবং ড্রেদিং রুমে থাকা উলমারের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। ভারতের ওপেনিং ব্যাটসম্যান সৌরভ গাঙ্গুলি বিষয়টা খেয়াল করেন এবং সঙ্গে সঙ্গে মাঠের আম্পায়ারদের অবহিত করেন। পরে ম্যাচ রেফারির সঙ্গে আলোচনা শেষে ক্রনিয়েকে এয়ারপিস খুলে ফেলতে বলেন। যদিও এটা আইনসিদ্ধ ছিল না, কিন্তু রীতিসিদ্ধ যে ছিল না তা তো সহজেই অনুমেয়।

সহ-অধিনায়কত্ব থেকে ফ্লিনটফের অপরাসিত হওয়া (২০০৭)
অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফ

ক্যারিবিয়ানে বাজে কারণে শিরোনামে আসেন সাবেক ইংলিশ অলরাউন্ডার অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফ। নিজেদের প্রথম ম্যাচেই শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে যায় ইংল্যান্ড। অথচ সেই রাতেই সেন্ট লুসিয়ায় মাতাল অবস্থায় নৌকা চালাতে গিয়ে আহত হন তিনি। ফলে ইংল্যান্ডের সহ-অধিনায়কের পদ থেকে অপসারিত হতে হয় তাকে। এমনকি এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞাও দেওয়া হয় তাকে।

ভারতের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা- আসল না নকল (২০১১)
বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে ভারতীয় দল

প্রথম বিশ্বকাপ জেতার ঠিক ২৮ বছর পর দ্বিতীয় শিরোপার স্বাদ পায় ভারত। কিন্তু এক রিপোর্টে দাবি করা হয়, সেবার ভারতীয় দল যে শিরোপা নিয়ে উৎসব করে তা আসলে রেপ্লিকা!

ইন্ডিয়া টুডে’র এক রিপোর্টে দাবি করা হয়, ২৯ মার্চে শ্রিলংকা-নিউজিল্যান্ডের মধ্যকার সেমিফাইনাল শেষে আসল ট্রফি কলম্বো থেকে ভারতে আনার পর মুম্বাই কাস্টমস তা নিজেদের জিম্মায় নিয়ে নেয়। মূলত ট্রফি আনার জন্য যে ট্যাক্স দিতে হয় তা পরিশোধ না করায় তা ফের দুবাইয়ে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। 

যদিও আইসিসি দাবি করে, যেটা ভারতীয় ক্রিকেটারদের হাতে দেখা যায় সেটাই আসল আর বিমানবন্দর থেকে যেটা জিম্মায় নেওয়া হয় সেটাই আসল। কিন্তু মানুষের মুখ কি আর তাতে বন্ধ করা যায়? এর পেছনে বড় যুক্তি হলো, যেটা কাস্টমসে আটকে দেওয়া হলো তার মূল্য দেখানো হয় ৬০ লক্ষ রুপি। তাছাড়া প্রশ্ন দেখা দেয়, নকল ট্রফির আবার ট্যাক্স কিসের?

যে বিশ্বকাপ ফাইনাল অন্ধকারে খেলা হয়েছিল (২০০৭)
বিশ্বকাপ ফাইনাল অন্ধকারে খেলেছিল শ্রীলঙ্কা ও অস্ট্রেলিয়া

২০০৭ বিশ্বকাপের ফাইনাল ঘিরেও আছে বিতর্ক। ২৮ হাজার দর্শকের সামনে সেবার অন্ধকারে ফাইনাল ম্যাচের একটা বড় অংশ খেলা হয়েছিল। ম্যাচটি আবহাওয়ার বৈরিতায় ডাকওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতিতে আকারে ছোট হয়ে আসে। ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ব্রিজটাউনের কেনসিংটন ওভালে, যেখানে ফ্ল্যাডলাইট নেই। যখন চারিদিক অন্ধকার হয়ে আসে আম্পায়াররা দুই দলের অধিনায়ককে ডেকে ম্যাচের বাকি ওভারগুলো পরেরদিন খেলতে বলেন। 

কিন্তু দুই দলই বুঝতে পারে একটা ম্যাচের ফলাফল আসার মতো যথেষ্ট ওভার খেলা হয়ে গেছে। ফলে আর খেলার দরকার নেই। অজিরা উৎসবের প্রস্তুতিও নিতে শুরু করে দেয়। কিন্তু তাদের ফের মাঠে ডেকে নিয়ে ম্যাচ শেষ করতে বলা হয়। লঙ্কান অধিনায়ক মাহেলা জয়াবর্ধনে এবং অজি অধিনায়ক রিকি পন্টিং দুজনে মিলে সিদ্ধান্ত নেন লম্বা রান আপে বোলিং করা হবে না এবং শেষ তিন ওভারের জন্য শুধু স্পিনার ব্যবহার করা হবে। 

শেষ কয় ওভারে ৯ রান সংগ্রহ করতে পারে শ্রীলঙ্কা। ওই ঘটনা সেসময় আলোড়ন তুলে দিয়েছিল। এই ঘটনায় পরে ওই ম্যাচের আম্পায়ার- স্টিভ বাকনর, আলিম দার, রুদি কোয়ের্তজেন (থার্ড আম্পায়ার), বিলি বাউডেন এবং জেফ ক্রো (ম্যাচ রেফারি)- সবাইকে পরবর্তী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বরখাস্ত করা হয়।

বাংলাদেশ সময়: ২১৫৭ ঘণ্টা, মে ২২, ২০১৯
এমএইচএম

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Alexa
cache_14 2019-05-22 21:57:53