[x]
[x]
ঢাকা, শুক্রবার, ৯ আষাঢ় ১৪২৫, ২২ জুন ২০১৮

bangla news

রবীন সেনগুপ্ত: মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরার অকুতোভয় ছবিযোদ্ধা

মাজেদুল নয়ন, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১৬-১২-২৯ ৭:৫০:৫১ পিএম

রবীন সেনগুপ্ত-ছবি: দীপু মালাকার-বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালো রাতে ঢাকায় পাক বাহিনীর বর্বরোচিত হামলার পর প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলা।

আগরতলা, ত্রিপুরা: ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালো রাতে ঢাকায় পাক বাহিনীর বর্বরোচিত হামলার পর প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলা। ২৬ মার্চ সকাল থেকেই আগরতলায় সুশীল সমাজ ও ছাত্ররা দলে দলে রাস্তায় নেমে এই হামলার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। চলে গণস্বাক্ষর সংগ্রহের কর্মসূচি। দুপুরের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের একটি ৬ ফুট প্রতিকৃতি টানানো হয়। ভারত সরকারকে পদক্ষেপ নিতে সেখান থেকেই আহ্বান জানানো হয়।

মুক্তিযুদ্ধের সময় ৪১ বছরের যুবক রবীন সেনগুপ্ত। কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো ও তাঁর আর্জেন্টাইন বিপ্লবী বন্ধু চে গুয়েভারার অনুসারী ওই যুবকের কাছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হয়ে উঠেছিল নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ। নিজের কাছে থাকা ক্যামেরাগুলোকে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন রণাঙ্গনে।
রবীন সেনগুপ্ত-ছবি: দীপু মালাকার
রবীন সেনগুপ্ত ‘‘পাক আক্রমণের প্রথম প্রহর থেকেই জড়িয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে, ঘুরেছেন শরণার্থী শিবিরে, সীমান্তবর্তী প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে, ঘনিষ্ঠভাবে দেখেছেন সর্বস্তরের যোদ্ধাদের এবং আক্রমণাভিযানের সঙ্গী হয়ে এসেছেন মুক্তাঞ্চলে, যুদ্ধের উত্তপ্ত ময়দানে। বিজয়ের দিনে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সঙ্গে প্রবেশ করেছেন ঢাকায়, প্রত্যক্ষ করেছেন জাতির পরম গৌরব মুহূর্ত।’’ ছবির যোদ্ধা হয়ে গেরিলাযুদ্ধ থেকে সম্মুখ সমর এবং সবশেষে ১৬ ডিসেম্বরে রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের দৃশ্য ধারণ করেছেন তিনি। পরদিন ১৭ ডিসেম্বরে গৃহবন্দিত্ব থেকে বঙ্গবন্ধু পরিবারের মুক্ত হওয়ার দৃশ্যও ধারণ করতে ভোলেননি রবীন সেনগুপ্ত।  

 রবীন সেনগুপ্তের ক্যামেরায় তোলা ছবিগুলো হয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ের অতুল সাক্ষ্য। তার তোলা সাদা-কালো বহু ছবির সঙ্গে আছে বেশ কিছু দুর্লভ রঙিন ছবিও।
রবীন সেনগুপ্ত-ছবি: দীপু মালাকার
২০১২ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে সন্মানসূচক 'ফ্রিডম অব লিবারেশন ওয়ার অনার' গ্রহণ করেন রবীন সেনগুপ্ত।

কোনো নিয়মিত গণমাধ্যমে কাজ করতেন না রবীন।বরং ফ্রি-ল্যান্সার হিসেবে ছবি তুলে গণমাধ্যমগুলোতে পাঠাতেন। যুদ্ধের বছর এপ্রিলের মাঝামাঝিতে বাংলাদেশের এমএনএ আব্দুল মান্নানের সঙ্গে  চলে যান সাবরুমে। ফেনী নদীর এপারের সাবরুম থেকে দেখা যাচ্ছিল, বাংলাদেশের খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলা জ্বলছে। লাশের পর লাশ ভাসছে ফেনী নদীতে। নারীদের নগ্ন করে নদীতে নামানো হয়েছে। পাকিস্তানি হানাদারদের অত্যাচার দেখে ঘৃণা আর বিষাদে কুঁকড়ে যান রবীন। একটি বেড়ার ফাঁক থেকে ক্যামেরায় ক্লিক করতে থাকেন তিনি। রামগড় থেকে গুলি চালায় হানাদারেরা। একটি শিমুল গাছের পেছনে গিয়ে নিজেকে আড়াল করেন তিনি।
আখাউড়ায় পাকবাহিনীকে পরাভূত করে মিত্রবাহিনীর সাঁজোয়া বহর এগিয়ে চলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিকে
১নং সেক্টরে শুভপুর ব্রিজ ধ্বংস করতে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসছিলেন সেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়াউর রহমান। আগরতলা ফেরার সময় মান্নান ও রবীনের সঙ্গে দেখা হয় জিয়ার। সেখানে পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচার ও ভয়াবহতা নিয়ে কথা হয় তাদের। তাদের ছবি তোলেন রবীন।

আগরতলায় এসে পৈতৃক ফটো স্টুডিও ‘সেন অ্যান্ড সেন'এ ছবি ডেভলপ করে বিভিন্ন পত্রিকায় নিজ খরচে ডাকে পাঠিয়ে দিতেন। অবশ্য শেষ দিকে বিবিসিসহ অন্যান্য বৈশ্বিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা তার ছবির জন্যই অপেক্ষা করতেন। কারণ গেরিলা ও মিত্রবাহিনীর সঙ্গে অকুতোভয় রবীন সেনগুপ্ত প্রবেশ করতেন বাংলাদেশে। অন্য আলোকচিত্রীদের বেশিরভাগই তুলতেন শরণার্থী শিবিরের ছবি।

রবীন সেনগুপ্তের ছবিতে স্থান পেয়েছে ত্রিপুরার শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়া মানুষের চরম কষ্ট ও অসহায়ত্ব, তাদের নিজ বাসভূমে ফেরার আকুতি, গেরিলা ট্রেইনিং ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের কঠোর-কঠিন দিন, গেরিলা অপারেশনের পূর্বের মিটিং, গেরিলা অপারেশনের ফায়ারিং, বিস্ফোরণ, মিত্রবাহিনীর যুদ্ধযানের বহর, সেক্টর কমান্ডারদের ব্রিফিং, ট্রেঞ্চে অবস্থান নেয়া শরণার্থীদের জীবন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের শ্বাসরুদ্ধকর সব ছবি।
মুক্তিযোদ্ধাদের সংঘটিত বিস্ফোরণে উড়ে গেল আরেকটি সেতু
যুদ্ধের মুহুর্তগুলোকে ধরে রাখতে রবীন সেনগুপ্তের কাঁধে সারাক্ষণ ঝোলানো থাকতো ৩টি ক্যামেরা ও একটি রেকর্ডার। টুইন লেন্সের রোলে ফ্লেক্স, ক্যানন ৩৫ মিমি, নিক্কন উইথ টেলেপ্লেটো ক্যমেরা ব্যবহার করতেন তিনি। সেলুলয়েডে চিত্র ধারণ করতেন এবং টেপ রেকর্ডারে যুদ্ধের দামামার শব্দ ও বিভিন্ন কথোপকথন ধারণ করতেন। তবে ধারণ করা চিত্রগুলো আজ পর্যন্ত চলচ্চিত্রে রূপান্তর করা সম্ভব হয়নি।

১ ডিসেম্বর থেকেই রেডিও ও মাইকযোগে পাকিস্তানি বাহিনীকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হতে থাকে। কিন্তু তাতেও তাদের বোধোদয় হয়নি। ৩ ডিসেম্বর ভারতীয় মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মিলিত সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে আখাউড়ায় দম্ভ চূর্ণ হয় পাকিস্তানিদের।

১৪ ডিসেম্বরই জানতে পারেন পরের দিন হয়তো ঢাকার রেসকোর্সে আত্মসমর্পণ করবে পাকবাহিনী। ঐতিহাসিক মুহুর্ত ধারণ করতে ঢাকার পথে রওয়ানা করেন। কিন্তু কুমিল্লায় তখনো শক্ত অবস্থান গেড়েছিল পাকবাহিনী। ট্রাকে করে আগরতলা থেকে বিলোনিয়া হয়ে ফেনীতে ঢোকেন। এরপর লঞ্চে চাঁদপুরে।
অস্ত্রচালনার প্রশিক্ষণ নিচ্ছে শত্রু নিধনে উদগ্রীব মুক্তিযোদ্ধারা
রাতের বেলায় সার্চ লাইট জ্বালিয়ে লঞ্চ যাচ্ছে ঢাকা। এমন সময় চারিদিক থেকে গুলির আওয়াজ। তারা ভাবলেন, হয়তো পাকবাহিনী তখনো অবস্থান করছে নদীর পাড়ে। দ্রুত সব আলো নিভিয়ে সবাই শুয়ে পড়লেন লঞ্চের ডেকে। মাঝ নদীতে ভাসতে থাকে লঞ্চ।

সকালের আলো ফুটতেই স্টিমারে এসে ওঠেন চাঁদপুরের ছাত্রলীগ নেতা মুনীর। দেখেই বলেন, ‘‘রবীন দা, আমরা ভেবেছিলাম হানাদারেরা রাতের আঁধারে পালাচ্ছে।’’

গুলি লেগে রাতেই অকেজো হয়ে গিয়েছিল লঞ্চ। তাদের জন্য মুনীর একটি স্টিমার নিয়ে আসেন। তাতে চড়ে মুন্সিগঞ্জের ঘাটে এসে নামেন রবীন। সেখান থেকে বাসে ঢাকায়।
রবীন সেনগুপ্ত-ছবি: দীপু মালাকার
প্রথমে যান রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে। একটি দেশকে পঙ্গু করে দেয়ার জন্য বুদ্ধিজীবিদের হত্যা করে ফেলে রাখা হয় ওই বধ্যভূমিতে। সেখানকার বহু ছবি ধারণ করেন। চতুর্দিকে ছড়ানো পচাগলা লাশ আর লাশ। ভয়াবহ, নৃশংসতার নারকীয় দৃশ্য। হৃদয়বিদারক এসব দৃশ্য দেখে রাগে-দু:খে দাঁত কিড়মিড় করছিলেন রবীন।

এরপর ১৬ ডিসেম্বরে ছুটে যান রমনার রেসকোর্স ময়দানে। ক্যামেরাবন্দী করেন পাক হানাদারদের বেল্ট, ক্যাপ খুলে আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক সব মুহুর্ত।

নিজের আবেগকে সংবরণ করতে পারেননি রবীন। কয়েকজন পাকসেনাকে জিজ্ঞাসা করেন, কেন তারা এই ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে?

অভিযোগ অস্বীকার করে ‘শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করছিলাম’ বলে দাবি করে তারা। তখন নিজের কাছে থাকা কিছু ছবি দেখিয়ে হানাদারদের জিজ্ঞাসা করেন, 'এই কি শান্তি প্রতিষ্ঠার নমুনা?'
রবীন সেনগুপ্ত-ছবি: দীপু মালাকার
আত্মসমর্পণের পর উর্দুতে একটি চিরকুট লিখে সবার চোখ এড়িয়ে তা এক সঙ্গীকে দেন জেনারেল রাও ফরমান আলী। সেই সঙ্গী সেটি মাটিতে ফেলে দেন। দৃষ্টি এড়ায়নি রবীনের। সেটি কুড়িয়ে নিয়ে নিজের কাছে রেখে দেন রবীন। রাও ফরমানের স্বাক্ষর করা চিরকুটে যা লেখা ছিল তা বাংলা করলে দাঁড়ায়, ‘'তারাই বেঈমান বললো'’।

পরের দিন ১৭ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধুর পরিবার পরিজন গৃহবন্দী অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসে। সেখানেও ছুটে যান রবীন। ছবি তোলেন পুরো পরিবারের। বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের কাছে জানতে চান ২৫ মার্চ রাতের ঘটনা। রেকর্ড করেন ঐতিহাসিক সব কন্ঠস্বর।

২৩ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ঢাকায় আসার ছবিও তোলেন রবীন সেনগুপ্ত। তিনি কথা বলেন তাজউদ্দীনের সঙ্গে।

এরপর রক্ত দিয়ে কেনা একটি সদ্য-স্বাধীন দেশের বাতাস গায়ে মেখে রওয়ানা করেন নিজের দেশের উদ্দেশ্যে। দেশে ফিরে নিজের তোলা ছবিতে ছবিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ধারণ করেন অ্যালবামে।

রবীন সেনগুপ্ত বলেন, ‘‘শুধু ফটোগ্রাফার হলেই যুদ্ধের ছবি তোলা যায় না। আর  আমার মতো ফ্রি ল্যান্সারের জন্য তা ছিল বড় চ্যালেঞ্জের। বরং নিপীড়িত মানুষের জন্য সেই অনুভূতি থাকতে হয়, বিপ্লবের সঙ্গী হওয়ার মানসিকতা থাকতে হয়, যা টেনে নেয় সমরে।’’

সহযোগিতায়:
আরও পড়ুন:
** শরণার্থী ক্যাম্পের স্বেচ্ছাসেবক অমর সিং
** আখাউড়ার যুদ্ধ ও ত্রিপুরার মানুষের বিরল ত্যাগ!
** ‘ভাই, মেরে লাশকো ভারতমে ভেজ দেনা!’
** অমরখানা: ৬নং সেক্টরের বড় এক যুদ্ধক্ষেত্র
** পাটগ্রামের ত্রিমুখী ডিফেন্স ছিল পাকসেনাদের কাছে ‘চীনের প্রাচীর’
** তেলডালার রসদে রৌমারীতে পূর্ণাঙ্গ রণ-প্রশিক্ষণ ক্যাম্প
** বাবাজী বললেন, ‘এক ইঞ্চ আন্দার আন্দার বোম্বিং কারো’
** ভোগাই নদীর ওপাড় থেকে তেলিখালী, চেলাখালী

** আমীর ডাকাতের বাড়িতে থেকে চরাঞ্চলে গেরিলা আক্রমণ
** তোরা, তেলডালা থেকে মুজিব ক্যাম্প
** পাকবাহিনীর ওপর গারো-হাজংদের প্রতিশোধের আগুন

বাংলাদেশ সময়: ০৮০০ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ৩০, ২০১৬
এমএন/জেএম

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

একাত্তর বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত

Alexa