[x]
[x]
ঢাকা, সোমবার, ১০ বৈশাখ ১৪২৫, ২৩ এপ্রিল ২০১৮

bangla news

ইছামতির পাড় থেকে সাতক্ষীরায় যুদ্ধ

ইকরাম-উদ দৌলা, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১৬-১২-২৯ ৭:১৫:৫৬ পিএম
ভারতের উত্তর ২৪পরগনার ইছামতি নদীর তীরে টাকি রাজবাড়ী ঘাট। এপারেই ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্যাম্প-ছবি: কাশেম হারুণ

ভারতের উত্তর ২৪পরগনার ইছামতি নদীর তীরে টাকি রাজবাড়ী ঘাট। এপারেই ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্যাম্প-ছবি: কাশেম হারুণ

বাংলাদেশের সাতক্ষীরা আর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হাসনাবাদের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে ইছামতি নদী। এ নদীর ঠিক মাঝ বরাবর দু’দেশের সীমা যে অংশে টানা হয়েছে, সে অংশের এপাড়ে ভারতের টাকি। মূলত এটার নাম টাকি রাজবাড়ী এলাকা।

উত্তর চব্বিশ পরগনা, পশ্চিমবঙ্গ: বাংলাদেশের সাতক্ষীরা আর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হাসনাবাদের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে ইছামতি নদী। এ নদীর ঠিক মাঝ বরাবর দু’দেশের সীমা যে অংশে টানা হয়েছে, সে অংশের এপাড়ে ভারতের টাকি। মূলত এটার নাম টাকি রাজবাড়ী এলাকা।

রাজবাড়ী একেবারে নদীর পাড়ে অবস্থিত। যদিও সেটার বিরাট অংশ অনেক আগেই নদী গর্ভে চলে গেছে। ইছামতির এপাড়েই ’৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ছিল মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প।

ওপারে সাতক্ষারীরার শ্যামনগর, কালীগঞ্জ প্রভৃতি এলাকা। আর এপারে টাকি, বশিরহাটসহ বিভিন্ন এলাকা। ওপার থেকে সাধারণ মানুষ যুদ্ধের সময় এপারে ইছামতির তীরবর্তী এলাকাগুলোতেই অবস্থান নিতেন।
ভারতের উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাটের রমজান দফাদার।তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ্ স্বাক্ষী-ছবি: কাশেম হারুণ
টাকি রাজবাড়ীর পশ্চিম দিকেই স্থানীয় কলেজ ও হাইস্কুল। এখানেই ছিল মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প। মার্চের দিকেই এখানে ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। এরপর প্রতিরাতেই ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে ওপারে গিয়ে হামলা চালাত মুক্তিবাহিনী। তাদের কভারিং ফায়ার দিতেন ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা।

রাত হলেই ভারতীয় সেনারা মুক্তিবাহিনীর গেরিলাদের নিয়ে ওপারে সাতক্ষীরায় বিভিন্ন অঞ্চলে যেতেন। অনেক সময় যশোর, খুলনাতে আক্রমণে যেতেন তারা। সেখান থেকে রাজাকার, আবার কখনোবা পাকসেনাদের ধরে আনতেন। এরপর কয়েকদিন ক্যাম্পে রেখে তথ্য নেওয়া চেষ্টা করা হতো। এরপর কোনো রাতে তাদের ইছামতির পাড়েই দাঁড় করিয়ে হত্যা করা হতো।

জুন-জুলাইয়ের দিকে ভারতীয় নৌ-বাহিনীও ব্যাপক সহায়তা করে। সে সময় ভারী গানবোট দিয়ে মুক্তিবাহিনীকে ব্যাক আপ দেওয়া হয়। আস্তে আস্তে তারা নদীর ওপারে ডিফেন্স গড়ে সাতক্ষীরায় ভেতর ও খুলনায় বিভিন্ন অঞ্চলে মার্চ করে। নভেম্বরের দিকে এপার থেকে আর তেমন আক্রমণে যেতে হয়নি মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীকে। তখন তারা ওপারেই অনেকটা শক্ত ডিফেন্স গড়ে ফেলেছে।
ভারতের উত্তর ২৪ পরগনার হাসনাবাদের টাকির বাসিন্দা স্বপন সাহা। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি শরণার্থী হয়ে ভারতে আশ্রয় নেন-ছবি: কাশেম হারুণ
এদিকে বশিরগহাটের ঘোড়াঘাড় সীমান্তে ছিল ভারতীয় আর্মি ও ওপারে পাক সেনাদের শক্ত ঘাঁটি। বশিরহাট সীমান্তঘাঁটি থেকেই ভারতীয় আর্মি মর্টার শেল ছুঁড়তো। ফলে এ সীমান্ত থেকে মার্চের দিকেই সরে যেতে হয় পাকসেনাদের।

এ অঞ্চলে মুক্তিবাহিনীর একটি বড় সুবিধা ছিল নদী। পানিকে পাকসেনারা সব সময় ভয় পেত। তাই তারা কাছাকাছি এমনিতেই আসতে চাইতো না। এছাড়া রাতের বেলাতেও তারা বের হতো না। দিনের বেলায় যেমন তারা অসীম সাহসী যোদ্ধা, রাতের বেলায় তেমনি ভীতু। এই বিষয়গুলোই সুবিধা দেয় মুক্তিবাহিনীকে। ফলে খুব সহজেই তারা নদীর ওপারে ক্যাম্পগুলোতে গেরিলা হামলা চালিয়ে চলে আসতেন।

বশিরহাট, টাকি, হাসনাবাদের বিভিন্ন এলাকায় ছিল শত শত শরণার্থী শিবির। এসব শিবিরে লাখ লাখ মানুষ আশ্রয় নেন মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই। মানুষের এতো আধিক্য ছিল যে, শিবিরগুলো জায়গা হতো না। ফলে কিছু দিন পেরুতে না পেরুতেই দেখা দেয় ভয়াবহ ডায়েরিয়া। এতে প্রচুর মানুষ মারা যায়।
ভারতের উত্তর ২৪পরগনার ইছামতি নদীর তীরে টাকি রাজবাড়ী ঘাট। এপারেই ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্যাম্প-ছবি: কাশেম হারুণ
সাতক্ষীরার শ্যামনগর থেকে যুদ্ধের সময় পুরো পরিবারের সাথেই টাকিতে চলে এসেছিলেন স্বপন দাস। তারা প্রথমে শরণার্থী শিবিরে, পরে বাড়ি ভাড়া করে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেই থেকেই তারা টাকিতেই আছেন।

সে সময় এমন কোনো বাড়ি ছিল না, যেখানে ওপার থেকে বাঙালিরা আশ্রয় নেননি। কত শত মানুষ ওখানে রাজার হালে থাকতেন, কিন্তু এখানে এসে অনেকে অনাহারে অর্ধাহারে মারা গেছেন। কারণ যখন পাকসেনারা আক্রমণ শুরু করে, হত্যাযজ্ঞ শুরু করে, তখন বেশিভাগই কেবল শুধু জীবন হাতে নিয়েই নদী পাড়ি দিয়েছেন। সঙ্গে করে থালা-বাটি ছাড়া কিছু আনতে পারেননি।

বশিরহাটের রমজান দফাদারের বয়স ছিল তখন ১৬ বছর। হঠাৎ মার্চের দিকে প্রচুর মানুষে এপারে আসতে থাকে। এতে ব্যাপক সমস্যায় পড়ে যায় এপারের সাধারণ মানুষ। তাদের বাড়ির আশেপাশেও অনেকে আশ্রয় নেন। শরণার্থীদের আধিক্যের কারণে দুষিত হয় পরিবেশ। এতো মানুষ এসেছিলেন, যা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।
ভারতের উত্তর ২৪ পরগনার হাসনাবাদের ‍টাকি। এখানের এই রাস্তার দুইধারে মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী শিবির ছিল-ছবি: কাশেম হারুণ
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় স্থানীয় লোকজনের চেয়ে শরণার্থীর সংখ্যা বেশি হয়ে গিয়েছিল পুরো পশ্চিমবঙ্গে। তবে স্থানীয়রা এতেও নাখোশ হননি। বরং তাদের দুঃখ, দুর্দশার কথা বিবেচনায় নিয়ে খুব সহায়তা করেছেন।

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা প্রায়ই এখানে আসতেন। সাধারণ নাগরিকদের উদ্বুদ্ধ করতেন, কোনো রকম সমস্যা যেন শরণার্থীদের না হয়, সে বিষয়ে সহায়তা করতে। তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মানুষ খুব সহায়তা করতেন। কেউ টাকা দিয়ে, কেউ আশ্রয় দিয়ে, যে যেভাবে পেরেছেন সেভাবেই সহায়তা করেছেন।

যারা ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন: টাকির স্বপন দাস ও বশিরহাটের স্থানীয় বাসিন্দা রমজান দফাদার।

সহযোগিতায়:
আরও পড়ুন...
** মুরতি নদীর তীরে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ
** তিন ঘণ্টার আক্রমণেই বিজয়পুর ক্যাম্প ছাড়ে পাকবাহিনী
** ইন্দিরা গান্ধী নিজেই ছিলেন প্রেরণা​
** সন্ধ্যা হলেই আতঙ্কে বাংকারে ঢুকে পড়তেন সাহেবগঞ্জবাসী
** মুক্তিযোদ্ধা হয়েও দেশ থেকে ‘বিতাড়িত’ শ্রীবরদীর খলিল
** লক্ষ্মীপূজার রাতে শুরু হয় তুমুল হামলা
** খাওয়া-ঘুম-মলত্যাগ সব একই তাঁবুতে
** ভারতে আতর আলীর আশ্রয়ে যুদ্ধশিশু ‘খুদেজা পাগলী’
** হিলির দুর্গ ভাঙ্গতে ভুল সমরকৌশল
** ক্যান্টনমেন্টের সহায়তায় খুন, ধর্ষণে লিপ্ত হয় বিহারীরা
** অমরখানা: ৬নং সেক্টরের বড় এক যুদ্ধক্ষেত্র
** পাটগ্রামের ত্রিমুখী ডিফেন্স ছিল পাকসেনাদের কাছে ‘চীনের প্রাচীর’
** তেলডালার রসদে রৌমারীতে পূর্ণাঙ্গ রণ-প্রশিক্ষণ ক্যাম্প
** বাবাজী বললেন, ‘এক ইঞ্চ আন্দার আন্দার বোম্বিং কারো’
** ভোগাই নদীর ওপাড় থেকে তেলিখালী, চেলাখালী

** আমীর ডাকাতের বাড়িতে থেকে চরাঞ্চলে গেরিলা আক্রমণ
** তোরা, তেলডালা থেকে মুজিব ক্যাম্প
** পাকবাহিনীর ওপর গারো-হাজংদের প্রতিশোধের আগুন

বাংলাদেশ সময়: ০৮০০ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ৩০, ২০১৬
ইইউডি/জেএম

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

একাত্তর বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত

Alexa