[x]
[x]
ঢাকা, রবিবার, ৮ বৈশাখ ১৪২৫, ২২ এপ্রিল ২০১৮

bangla news

মুরতি নদীর তীরে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ

ইকরাম-উদ দৌলা, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১৬-১২-২৮ ৭:০৩:১০ পিএম
ভারতের মেটলি থানাধীন ভুটান সীমান্তবর্তী মুরতি নদীর উপর এই সেই অবজারবেশন টাওয়ার যেখান থেকে মুক্তিবাহীনির প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের উপর নজর রাখা হতো। ছবি: কাশেম হারুণ

ভারতের মেটলি থানাধীন ভুটান সীমান্তবর্তী মুরতি নদীর উপর এই সেই অবজারবেশন টাওয়ার যেখান থেকে মুক্তিবাহীনির প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের উপর নজর রাখা হতো। ছবি: কাশেম হারুণ

সামসিং (Samsing) চা বাগানটা একদম ছিমছাম। নিরিবিলি শান্ত, ছায়া সুনিবিড়। তবে দুর্গম পাহাড়ি এলাকা। এই চা বাগানের পূর্ব পাশ দিয়েই দক্ষিণ দিকে গিরিখাদের মতো করে এঁকেবেঁকে নেমে গেছে মুরতি (Murti) নদী।

জলপাইগুড়ি, পশ্চিমবঙ্গ: সামসিং (Samsing) চা বাগানটা একদম ছিমছাম। নিরিবিলি শান্ত, ছায়া সুনিবিড়। তবে দুর্গম পাহাড়ি এলাকা। এই চা বাগানের পূর্ব পাশ দিয়েই দক্ষিণ দিকে গিরিখাদের মতো করে এঁকেবেঁকে নেমে গেছে মুরতি (Murti) নদী।
 
নদীটির পশ্চিম তীরে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে সমতল ও পাহাড়ি ভূমি। এ বিস্ময়ই বটে। পাহাড়ের ঢালে এমন বিশাল সমতল এলাকা মেলা ভার। এই সমতল এলাকাতেই তৈরি করা হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ শিবির ‘মুজিব ক্যাম্প’। যদিও এটা প্রকৃতপক্ষে মুরতি ক্যাম্প ছিল। যে ক্যাম্পটি ভারতীয় সেনাবাহিনী ইন্দো-চীন যুদ্ধের সময় তৈরি করেছিল।
ভারতের মেটলি থানাধীন ভুটান সীমান্ত সংলগ্ন মুরতি নদীর এই তীরেই গড়ে উঠেছিল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। ছবি: কাশেম হারুন মুরতি নদীর তীরে হওয়ায় নদীর নামে ক্যাম্পের নামকরণ করা হয়। এর ঠিক উত্তর ও উত্তর-পূর্বে ভুটান সীমান্ত। পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমে দার্জিলিংয়ের সামসিং পাহাড়। আর দক্ষিণে জলপাইগুড়ির মেটলি থানা।

সামসিং পাহাড়ের ঢালেই ওই চাবাগান, যা মেটলি থানার অন্তর্গত। আর মূল পাহাড়টি দার্জিলিংয়ের ভেতরে অবস্থিত। দার্জিলিংয়ের পাহাড়ি মো বনাঞ্চল (Mo Forest) থেকে উৎপন্ন হয়ে মেটলির থানার কূল ঘেঁষে নিচে নেমে গেছে নদীটি। যা জলপাইগুড়ি সদরের কাছকাছি এসে মিলেছে জলঢাকা নদীর সাথে। এরপর সেটি আরো নিচে নেমে গিয়ে মিশেছে তিস্তা নদীর সঙ্গে। যা লালমনিরহাট হয়ে বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করে ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে মিশেছে।
এই সেই ভারতের মেটলি থানাধীন ভুটান সীমান্তবর্তী মুরতি নদী। যা বন্যার সময় ভয়ঙ্কর রূপ ধারন করে। ছবি: কাশেম হারুন 
১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় রংপুর, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ অঞ্চলের কিছু অংশের মুক্তিযোদ্ধারা এই মুরতি ক্যাম্পে গেরিলাযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। বর্তমানে এখানে আর্মি ক্যাম্প নেই। তবে কিছু স্থাপনা এখনো রয়ে গেছে। আর ক্যাম্প না থাকলেও ভারতীয় আর্মির শীতকালীন মহড়া এখনো এখানেই হয়।
 
স্থানীয়দের কাছে মুক্তি ফৌজদের প্রশিক্ষণ শিবির হিসেবে ‘মুরতি ফিল্ড’ নামেই পরিচতি এই ক্যাম্পটি। জলপাইগুড়ির মেটলি থানার প্রায় সবাই বাংলাদেশের যুদ্ধ সম্পর্কে খুব ভাল করেই জানেন। এখানেই প্রশিক্ষণ নিয়ে কমিশনিং পেয়েছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম ব্যাচ। যাদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছেলে শেখ কামালও ছিলেন। সে খবরটিও জানতেন এলাকাবাসী। তাই তারা শেখ কামালকে দেখতেও যেতেন।
মিলন মজুমদার। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ের প্রত্যক্ষ্ স্বাক্ষী। ছবি: কাশেম হারুন মিলন মজুমদারের বয়স তখন ২০ বছর। উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছেন মেটলি হাইস্কুল থেকেই। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার স্কুলেই গড়ে তোলা হয়েছিল শরণার্থী শিবির। যেখানে তিনি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছেন। তার দায়িত্ব ছিল রেশন বিতরণের। অনেক সময় খাবারের সংকট হতো। তখন বন্ধুদের নিয়ে স্থানীয় বাজার থেকে টাকা তুলে শরণার্থী বাঙালিদের খাবারের সংস্থান করতেন।

ক্যাম্প স্থাপিত হওয়ার ভারতীয় আর্মির লোকজন মেটলি থানাসদরে যাওয়া-আসা করতেন। নিজের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী ক্রয় করতে এখানে আসতেন তারা। সেই সুবাদে আর্মির লোকজনের সঙ্গে স্থানীদের বেশ ভাব জমে উঠেছিল। তাদের কয়েকজনের মাধ্যমে স্থানীয়রা জানতে পারেন শেখ কামালও এখানে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। সে খবর জেনেই তারা শেখ কামালের সঙ্গে দেখা করতে যেতেন। তবে খুব কাছে যাওয়া গেলেও কথা বলার সুযোগ মিলত না তাদের। কেননা, মুক্তিফৌজদের প্রশিক্ষণের সময় মুরতি ক্যাম্পে কড়াকড়ি আরোপ করেছিল ভারতীয় আর্মি। 
মেটলি স্কুল। মুক্তিযুদ্ধের সময় এখানেই ছিল শরণার্থী শিবির। ছবি: কাশেম হারুন
জলাপাইগুড়ি থেকে চালসা পর্যন্ত সমতলভূমি হলেও এরপর থেকেই উপরের দিকে উঠতে হয়। মূলত সেখান থেকেই মেটলির থানার শুরু। আর শেষ সামসিং পাহাড়ের মূল টিলায় গিয়ে। এ পথে মুক্তি ফৌজদের ট্রাকে করে সারাদিনই আনা হতো বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্ত থেকে। স্থানীয়দের দেখলেই তারা ‘জয় বাংলা, জয় ভারত’ বলে স্লোগান দিতেন। স্থানীয়রাও হাত নেড়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন।
 
যেদিন তাদের নিয়ে যাওয়া হতো তার ১৫ থেকে ২০ দিন পরই আবার দিয়ে আসা হতো বিভিন্ন বর্ডারে। আর প্রতিটি ব্যাচের প্রশিক্ষণ শেষে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতেন শেখ কামাল। দিনরাত সব সময়ই ভারতীয় আর্মির ট্রাকে করে মুক্তিফৌজদের আনা-নেওয়া হতো।
ভারতের মেটলি থানাদিন মুরতি নদীর উপর ব্রীজ সংলগ্ন অবজারবেশন টাওয়ার। ছবি: কাশেম হারুন
রোববার সাপ্তাহিক ছুটি বলে অনেকেই মেটলিতে আসতেন এটা-সেটা কেনার জন্য। সে সময় মুক্তিবাহিনীর গেরিলা প্রশিক্ষণার্খীদের কাছে দুঃখ-দুর্দশা আর পাকসেনাদের অত্যাচারের গল্প শুনতেন স্থানীয়রা। সেইসব কাহিনি এখনও মেটলির বয়োজ্যেষ্ঠদের স্মৃতিতে অম্লান।
 
যারা শরণার্থী ছিলেন, তাদের কাছে টাকা ছিল না। বাড়ি থেকে শেষ সম্বল হিসেবে নিয়ে আসা পেতল-কাঁসার বাসন কোসন বিক্রি করতে চাইতেন অনেকে। কিন্তু স্থানীয়রা এসব কিনতে চাইতেন না। বরং না কিনেই অনেককে টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করতেন তারা।
 
মুরতি ক্যাম্প বা মুজিব ক্যাম্পে ভারতের সেনাবাহিনীর কর্নেল দাশগুপ্ত, ক্যাপ্টেন যোশী, ক্যাপ্টেন মুখার্জী, ক্যাপ্টেন ব্রেভো ও একমাত্র বাঙালি হাবিলদার নিমাইচন্দ্র বাগ গেরিলা যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিতেন।
মুক্তিযুদ্ধের আরেক প্রত্যক্ষ স্বাক্ষী বিরেন রায়। তিনি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার কয়েক বছর পরেই ভারত চলে আসেন। ছবি: কাশেম হারুন যারা ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন:
মেটলি থানার ব্যবসায়ী মিলন মজুমদার, অরুণ চৌধুরী, বীরেণ রায় ও মন্টু ঘোষাল।


সহযোগিতায়:

আরও পড়ুন...
** 
তিন ঘণ্টার আক্রমণেই বিজয়পুর ক্যাম্প ছাড়ে পাকবাহিনী
** ইন্দিরা গান্ধী নিজেই ছিলেন প্রেরণা​
** সন্ধ্যা হলেই আতঙ্কে বাংকারে ঢুকে পড়তেন সাহেবগঞ্জবাসী
** মুক্তিযোদ্ধা হয়েও দেশ থেকে ‘বিতাড়িত’ শ্রীবরদীর খলিল
** লক্ষ্মীপূজার রাতে শুরু হয় তুমুল হামলা
** খাওয়া-ঘুম-মলত্যাগ সব একই তাঁবুতে
** ভারতে আতর আলীর আশ্রয়ে যুদ্ধশিশু ‘খুদেজা পাগলী’
** হিলির দুর্গ ভাঙ্গতে ভুল সমরকৌশল
** ক্যান্টনমেন্টের সহায়তায় খুন, ধর্ষণে লিপ্ত হয় বিহারীরা
** অমরখানা: ৬নং সেক্টরের বড় এক যুদ্ধক্ষেত্র
** পাটগ্রামের ত্রিমুখী ডিফেন্স ছিল পাকসেনাদের কাছে ‘চীনের প্রাচীর’
** তেলডালার রসদে রৌমারীতে পূর্ণাঙ্গ রণ-প্রশিক্ষণ ক্যাম্প
** বাবাজী বললেন, ‘এক ইঞ্চ আন্দার আন্দার বোম্বিং কারো’
** ভোগাই নদীর ওপাড় থেকে তেলিখালী, চেলাখালী

** আমীর ডাকাতের বাড়িতে থেকে চরাঞ্চলে গেরিলা আক্রমণ
** তোরা, তেলডালা থেকে মুজিব ক্যাম্প
** পাকবাহিনীর ওপর গারো-হাজংদের প্রতিশোধের আগুন

বাংলাদেশ সময়: ০৮০০ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ২৯, ২০১৬
ইইউডি/জেএম/এসআরএস

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

একাত্তর বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত

Alexa