[x]
[x]
ঢাকা, রবিবার, ৯ বৈশাখ ১৪২৫, ২২ এপ্রিল ২০১৮

bangla news

শরণার্থী ক্যাম্পের স্বেচ্ছাসেবক অমর সিং

মাজেদুল নয়ন, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১৬-১২-২৮ ৬:১৪:০৬ পিএম
বৃহত্তর সিলেট ও ময়মনসিংহের উত্তর দিকের মানুষের জীবন বাঁচাতে আাশ্রয় নেন মেঘালয়ের পাহাড়গুলোতে। ছবি: দীপু মালাকার

বৃহত্তর সিলেট ও ময়মনসিংহের উত্তর দিকের মানুষের জীবন বাঁচাতে আাশ্রয় নেন মেঘালয়ের পাহাড়গুলোতে। ছবি: দীপু মালাকার

বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ভারতের মেঘালয়ের। বৃহত্তর সিলেট ও ময়মনসিংহের উত্তর দিকের মানুষের জীবন বাঁচাতে আাশ্রয় নেন মেঘালয়ের পাহাড়গুলোতে। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠে শরণার্থী ক্যাম্প।

শিলং, মেঘালয়: বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ভারতের মেঘালয়ের। বৃহত্তর সিলেট ও ময়মনসিংহের উত্তর দিকের মানুষের জীবন বাঁচাতে আাশ্রয় নেন মেঘালয়ের পাহাড়গুলোতে। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠে শরণার্থী ক্যাম্প।
 
বাংলাদেশকে ঘিরে রাখা ভারতের অন্য প্রদেশগুলো থেকে কিছুটা ভিন্ন মেঘালয়। এটা খাসিয়াদের রাজ্য, যার সঙ্গে বাঙালিদের ভাষা ও আচরণগত ফারাক অনেক। এরপরও বাস্তুহারা মানুষের প্রতি সহমর্মিতার হাত বাড়িয়েছেন স্থানীয় খাসিয়ারা।
 
ষাটের দশকের দিকে শিলং শহরে আসেন অমর সিংয়ের পরিবার। ১৯৭১ সালে টগবগে তরুণ। প্রায় ৬ ফুট লম্বা সুঠাম দেহের অধিকারী ছিলেন অমর সিং।
শিলং-এর  পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠে শরণার্থী ক্যাম্প। ছবি: দীপু মালাকার শিলংয়ের একটি মানি চেঞ্জার অফিসে পরিচয় হয় অমর সিংয়ের সঙ্গে। মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতেই চোখ তুলে তাকালেন। নিজেই আগ্রহ দেখালেন। বললেন, আমরাতো সেই সময় ভলেন্টিয়ারের কাজ করেছি। মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে ঘুরেছি। ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঘুরে মানুষের যন্ত্রণা দেখেছি। কষ্ট দেখে চোখে পানি চলে আসতো।
 
সিলেটের সত্যজীবন দাসের সন্তান কার্তিক দাস ছিলেন অমর সিংয়ের বন্ধু। তারা সেই সময় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অনেক কাজ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের কথা, মুক্তিযোদ্ধাদের কথা, স্বাধীনতাকামী জনতার কথা রোমাঞ্চিত করতো অমরকে। তিনি কার্তিকের সঙ্গে ছুটে যেতেন সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে। 
শিলংয়ে এক বাঙালিকে বিয়ে করে সেখানেই থেকে গিয়েছিলেন এক সুইডিশ নারী। তিনি অক্সফাম জিবির ফান্ড নিয়ে সাহায্য করতেন শরণার্থী ক্যাম্পে। অমর সিং ছিলেন এই টিমের ভলান্টিয়ার।

তিনি বলেন, ‘শুধু বাঙালিরা নয়, অনেক অবাঙালি ভারতীয়রাও সাহায্য করেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে। শীতের সময় ট্রাকে করে কম্বল নিয়ে ক্যাম্পগুলোতে বিলাতাম।’
মেঘালয়ের রাজধানী শিলং-এর পুলিশ বাজার। ছবি: দীপু মালাকার আগস্ট মাসের দিকে একজন নেতৃত্বস্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা শিলং যান কার্তিকের সঙ্গে। অমর তার নিজ গাড়িতে করে তিনদিন তাদের নিয়ে বিভিন্ন ক্যাম্পে যান। সেই সময়ের একটি ছবি এখনো নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন অমর সিং। তিনি বলেন, ‘ওই মুক্তিযোদ্ধার পিঠের ব্যথা ছিল।’

মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই বালাট ও ডাউকি সীমান্ত দিয়ে মেঘালয়ে প্রবেশ করতে শুরু করেন বাংলাদেশিরা। পাহাড়ি এলাকায় শুধুই খাসিয়ারা ছিলেন। আর দেশভাগের পূর্বে সিলেটের বাঙালিরা থাকতো শিলং শহরে, বিশেষ করে ওয়াংইডো এলাকায়। তাই বাঙালিরা শিলং শহরে পৌঁছাতে পারলে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতো, পাহাড়ে খুব বেশি নয়। তবে সেই সময়ে সময়ে শিলং শহর পর্যন্ত পৌঁছানো ছিল খুবই কঠিন।
 
বালাট থেকে শিলং শহরে যেতে হলে খাসিয়া ও জৈন্তা পাহাড় পাড়ি দিতে হতো। আর পাহাড়ে ওঠার গেট দিনে দুইবার খোলা হতো। তৎকালীন সময়ে শিলংয়ে পুলিশ অফিসারদের ৫৪ শতাংশই ছিলেন বাঙালি। কিরণশঙ্কর ভট্টাচার্যের মতো পুলিশ অফিসাররা মুক্তিযুদ্ধে অনেক সহায়তা করেছেন।
 
শিলংয়ের চিফ মিনিস্টার উইলিয়ামসন এ. সাংমা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক। তিনি এপ্রিল মাসেই আব্দুস সামাদ আজাদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, মতিয়া চৌধুরী, পীর হাবিবুর রহমান, বরুণ রায়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। নিজে সবসময় খোঁজ খবর রাখতেন। নিজেই খাসিয়া সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান, বাস্তুচ্যুত বাঙালিদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক টিকিয়ে রেখে সাহায্য করার জন্যে।
মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই বালাট ও ডাউকি সীমান্ত দিয়ে মেঘালয়ে প্রবেশ করতে শুরু করেন বাংলাদেশিরা। ছবি: দীপু মালাকার তার স্ত্রী ত্রিগুণা সেনও খুব আন্তরিক ছিলেন। বাংলাদেশ থেকে আসা মুক্তিযোদ্ধাদের নিজে আপ্যায়ন করতেন। মেঘালয়ের বর্তমান মূখ্যমন্ত্রী মুকুল সাংমার বাবা ছিলেন উইলিয়ামসন এ. সাংমা।
 
সেই সময় শিলংয়ের আইজিপি ছিলেন মিস্টার লালা। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ে খুবই আন্তরিক ছিলেন। নিজে খোঁজ রাখতেন বাংলাদেশ থেকে আসা মানুষ যেনো কোথাও হয়রানির শিকার না হন। শিলং অবজারভারের সম্পাদক রঞ্জিত চৌধুরীও মুক্তিযুদ্ধে বড় অবদান রেখেছিলেন।
 
বেশিরভাগ বাঙালি শরণার্থী ও মুক্তিযোদ্ধা ভাবতেন পুরো ভারতেই বুঝি গরুর মাংস খাওয়া যায় না। তবে মেঘালয়ে গরুর মাংস খেতে পেয়ে খুশি ছিল তারা। 
শিলংয়ের বাসিন্দা ও শরণার্থী ক্যাম্পের ভলান্টিয়ার অমর সিং। ছবি: দীপু মালাকার
শিলংয়ে তিনজন বাংলাদেশির খুব প্রভাব ছিলো। এখানকার বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিকদের সঙ্গে তাদের ভাল যোগাযোগ ছিল। আব্দুস সামাদ আজাদ ছিলেন ইস্টার্ন ইন্ডিয়ান অল মুসলিম স্টুডেন্ট ফেডারেশনের সভাপতি। তাকে বেশ সমীহ করতেন বড় বড় ভারতীয় রাজনীতিকরাও। এছাড়াও পীর হাবিবুর রহমান এবং বরুণ রায়ের খুব প্রভাব ছিল। এছাড়া ইকবাল আহমেদ চৌধুরীও ছিলেন শিলংয়ে বেশ জনপ্রিয়।

যারা বর্ণনা দিয়েছেন:
শিলংয়ের বাসিন্দা ও শরণার্থী ক্যাম্পের ভলান্টিয়ার অমর সিং, শিলংয়ের ট্যাক্সিচালক গৌতম ও সিলেট মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার সুব্রত ভট্টাচার্য।


সহযোগিতায়:

আরও পড়ুন:
** আখাউড়ার যুদ্ধ ও ত্রিপুরার মানুষের বিরল ত্যাগ!
** ‘ভাই, মেরে লাশকো ভারতমে ভেজ দেনা!’
** অমরখানা: ৬নং সেক্টরের বড় এক যুদ্ধক্ষেত্র
** পাটগ্রামের ত্রিমুখী ডিফেন্স ছিল পাকসেনাদের কাছে ‘চীনের প্রাচীর’
** তেলডালার রসদে রৌমারীতে পূর্ণাঙ্গ রণ-প্রশিক্ষণ ক্যাম্প
** বাবাজী বললেন, ‘এক ইঞ্চ আন্দার আন্দার বোম্বিং কারো’
** ভোগাই নদীর ওপাড় থেকে তেলিখালী, চেলাখালী

** আমীর ডাকাতের বাড়িতে থেকে চরাঞ্চলে গেরিলা আক্রমণ
** তোরা, তেলডালা থেকে মুজিব ক্যাম্প
** পাকবাহিনীর ওপর গারো-হাজংদের প্রতিশোধের আগুন

বাংলাদেশ সময়: ০৮০০ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ২৯, ২০১৬
এমএন/জেএম/এসআরএস

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

একাত্তর বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত

Alexa