[x]
[x]
ঢাকা, শনিবার, ৭ বৈশাখ ১৪২৫, ২১ এপ্রিল ২০১৮

bangla news

মুক্তিযোদ্ধা হয়েও দেশ থেকে ‘বিতাড়িত’ শ্রীবরদীর খলিল

ইকরাম-উদ দৌলা, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১৬-১২-২৫ ১০:১৪:৪১ পিএম
১৫ বছর বয়সে সশস্ত্র স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়‍া জামালপুর জেলার শ্রীবরদীর তেঁতুলিয়া গ্রামের মোহাম্মদ খলিল- ছবি: কাশেম হারুণ

১৫ বছর বয়সে সশস্ত্র স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়‍া জামালপুর জেলার শ্রীবরদীর তেঁতুলিয়া গ্রামের মোহাম্মদ খলিল- ছবি: কাশেম হারুণ

মাইনকাচর, আসাম: মাত্র ১৫ বছর বয়সে সশস্ত্র স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন মোহাম্মদ খলিল। স্বাধীনতার পর অস্ত্র জমা দিয়ে আবার সপ্তম শ্রেণীর ক্লাসও শুরু করেছিলেন শেরপুর নালীতাবাড়ীর হীরণ্ময়ী হাইস্কুলে। কিন্তু ভাগ্য তার বড়ই বিড়ম্বনাময়! স্বাধীনতার সুফল ভোগ করা তো দূরের কথা, বরং স্বাধীনতার ছয় বছরের মাথায় মাতৃভূমি থেকেই তাকে একপ্রকার ‘বিতাড়িত’ হতে হলো!

মোহাম্মদ খলিলের বাড়ি জামালপুর জেলার শ্রীবরদীর তেঁতুলিয়া গ্রামে। ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময় শ্রীবরদীর ভাইডাঙ্গার আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ হায়াত আলীর নেতৃত্বে উব্দুদ্ধ হন এ কিশোর। সিদ্ধান্ত নেন মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার। সে অনুযায়ী যুদ্ধে ঝাঁপিয়েও পড়েন।

স্বপ্ন ছিল, দেশ স্বাধীন হলে লেখাপড়া করে ভাল চাকরি পাবেন। জীবনমানের উন্নয়ন হবে। একটি উন্নত স্বাধীন জীবন পাওয়ার আশায় স্বাধীনতার পর পড়াশোনা শুরু করেন খলিল। ব্যবসায় শিক্ষা শাখার মেধাবী ছাত্র ছিলেন। স্কুল, পাড়ায় ভদ্র ও মেধাবী বলে নামডাকও ছিল তার। কিন্তু স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় বাংলাদেশের আকাশে আবার নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। ধূলিসাৎ হয় খলিলেরও যত স্বপ্ন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হলে মেনে নিতে পারেননি খলিল ও তার সহযোদ্ধারা। তাই আবারও সংগ্রামের জন্য সংগঠিত হতে থাকেন তারা। ততদিনে তার মেট্রিক পরীক্ষার সময় চলে এসেছে। কিন্তু সবকিছু তুচ্ছ করেও অস্ত্র হাতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
যুদ্ধের সময় খলিলের বাবা মমতাজ আলী শরণার্থী শিবিরে থাকা অবস্থায় মেঘালয়ের আমপাতিতে (বর্তমানে এটি জেলা সদর) মারা যান। বাবার সাথে থাকা তিন ভাই এক বোন আর মা-ও ছিলেন। বাবা মারা যাওয়ায় স্বাধীনতার পর তারা আর দেশে ফেরেননি। তবে বড় ভাই শ্রীবরদীর ভাইডাঙ্গা ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া গ্রামেই ছিলেন। তার সাথে ছিলেন খলিলের দাদী আর বড় ভাইয়ের স্ত্রী। যুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে তারাও আমপাতি চলে যান।
মাইনকাচর, আসাম / ছবি: কাশেম হারুণ
যুদ্ধ শেষে ময়মনসিংহের খাগডহরে তৎকালীন বিডিআর (বাংলাদেশে রাইফেলস) ক্যাম্পে অস্ত্র জমা দেন খলিল। এরপর চলে আসেন শ্রীবরদীতে। বড় ভাই ভারত চলে গেলেও দেশের মায়া তাকে ধরে রাখে। নালীতাবাড়ীর খালভাঙ্গা গ্রামে আব্দুল মুন্নাফদের বাড়িতে লজিং থেকে আবার শুরু করেন পড়াশোনা।
সব মিলিয়ে অনেকটা স্বাধীনভাবেই সিদ্ধান্ত নিতেন তিনি। তবে খলিল ও তার সহযোদ্ধারা বুঝতে পারছিলেন না কী করবেন। কোথা থেকে কিভাবে শুরু করবেন। অস্ত্র জমা দিয়েছেন দেশ স্বাধীন হলেই। কাজেই লড়াইয়ের জন্য পর্যাপ্ত হাতিয়ারও নেই তাদের। এসব ভেবেই তারা কোনো কূল পাচ্ছিলেন না।
খলিলরা যখন আরেকবার সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে চাচ্ছেন, তখনই খবর আসে কাদের সিদ্দিকী ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট থানা আক্রমণ করে অস্ত্র নিয়ে নিয়েছেন। তারা আশার আলো দেখতে পান। তবে এই আশার আলো দেখতে পাওয়াই যে তার জন্য অন্ধকার ছিল, সেটা বুঝতে পেরেছেন অনেক দেরিতে। যখন তিনি অসহায়।
কাদের সিদ্দিকী তার দলবল নিয়ে হালুয়াঘাট থানা আক্রমণ করে চলে আসেন মেঘালয়ের বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী পাহাড়ে। খলিলরা একদিন খবর নিতে নিতে তাদের সাথে যোগ দেন ’৭৫ সালের শেষের দিকে। তারা বেশ কিছুদিন পাহাড়েই প্রশিক্ষণ নেন। এরপর আবারও গেরিলা হামলা শুরু করেন সীমান্তে অবস্থিত তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলস বা বিডিআর এর বিওপিগুলোতে (বর্ডার অবজারবেশন পোস্ট)। ততদিনে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ক্ষমতার কেন্দ্রে।

১৯৭৬ সালের শেষের দিকে একদিন খলিলকে পাঠানো হয় শেরপুরের সীমান্তে রেকি করতে। কিন্তু মেঘালয়ের পোড়াখাশিয়া সীমান্ত হয়ে শ্রবরদীর বালিঝুরি নেমেই তিনি ধরা পড়েন বিডিআর জোয়ানদের হাতে। তার পকেটে ছিল ভারতের পরিচয়পত্র। আর এটা নির্বিঘ্নে যাতায়াতের জন্য ভারত সরকারই দিয়েছিল, যাতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী কোনো সমস্যা না করে।

পকেটে ভারতের পরিচয়পত্র পেয়ে খলিলকে আটক করে যথারীতি পুলিশের কাছে সোপর্দ করে বিডিআর। অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে মামলা ঠুকে দেওয়া হয় তার নামে। ফলে প্রথমে জামালপুর জেলখানা এরপর তার ঠাঁই হয় ময়মনসিংহ জেলে।

১৯৭৭ সালের এপ্রিলে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হওয়ার কিছুদিন পরেই তার মামলার শুনানি শুরু হয়। রায় হওয়ার বেশ কিছুদিন আগে জামালপুর জেলখানাতেই এক সহযোদ্ধা তাকে পত্রিকা সরবরাহ করেন। সেটা পড়েই জানতে পারেন, তাকে অবৈধ অণুপ্রবেশকারী এবং ভারতীয় নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ খবর পড়ে তার নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারেন না। বারবার পড়েন সে খবর। সে খবরে অনেক কেঁদেছিলেন খলিল।
১৫ বছর বয়সে সশস্ত্র স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়‍া জামালপুর জেলার শ্রীবরদীর তেঁতুলিয়া গ্রামের মোহাম্মদ খলিল- ছবি: কাশেম হারুণ
সেই থেকে রাগে, অভিমানে, অপমানে নির্লিপ্ত হয়ে যান তিনি। বন্ধু মুক্তিযোদ্ধারা তাকে ছাড়ানো চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত পারেননি। খলিলও তাদের সহায়তা করেননি। এভাবেই একদিন তার মামলায় রায় হয়। এতে এক বছরের মত জেলও হয়ে যায় খলিলের। এরপর ১৯৭৮ সালে তাকে শিয়ালদহ বর্ডার দিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

সেখান থেকে প্রথমে চলে আসেন আসামের মাইনকারচর। যার পশ্চিমে বাংলাদেশের রৌমারী। এখানেই অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করেন। কখনও বা সবজি বিক্রি করে জীবন নির্বাহ করেন।

খুব সহজ সরল আর অভিমানী খলিল এক সময় অভ্যস্ত হয়ে যান এখানে। বিয়ে করেন মাইনকার চরেই। জন্ম হয় তার ৫ ছেলে দুই মেয়ের। অতি সাধারণ আর সৎ জীবন যাপনে তেমন সম্পদ তার হয়নি। কিছু টাকা জমিয়ে একটি ঘর তোলেন মাইনকার চরের ঝুরডাঙ্গা গ্রামের পার্ট-১ এ। যেখানে এখন বসবাস করেন বড় মেয়ে তার স্বামীকে নিয়ে।

প্রবীণ বয়সে এসেও জীবনের সাথে লড়াই করে টিকে রয়েছেন এই মুক্তিযোদ্ধা। মূলত: সারাটি জীবন উদ্বাস্তুর মতই কাটিয়ে দিলেন। বর্তমানে আশ্রয় নিয়েছেন মেঘালয়ের বাঘমারা বাজারের পাশে। সেখানে পাহাড়ের গায়ে এক ছোট্ট ঘর ভাড়া নিয়ে বসবাস করছেন। সাথে রয়েছে তিন ছেলে আর ছোট মেয়ে। বাঘমারা বাজারের এক কোণায় প্রতিদিন কিছু সবজি নিয়ে বসেন। সেসব বিক্রি করে যা আয় হয়, তা দিয়ে চলছে তার সংসার।
বাংলানিউজকে ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছেন মুক্তিযোদ্ধারা
খলিল একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। তার ডান পায়ের পাতায় এখনো গুলির চিহ্ন রয়েছে। একাত্তর সালে শ্রীবরদীর ভাইডাঙ্গা এলাকার হায়েত আলীর নেতৃত্বে উদ্বুদ্ধ হয়ে যুদ্ধে গিয়েছিলেন। যুদ্ধ করেছেন রুহুল আমিন কোম্পানিতে। মেঘালয়ের তোরা পাহাড়ে এক মাসের ট্রেনিং শেষে প্রথমে পোড়াখাশিয়া সীমান্তে এরপর পাবনার বিভিন্ন অঞ্চলে গেরিলা হামলা চালিয়েছেন। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরের পর সেখান থেকে ফিরে এসে দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত মহেন্দ্রগঞ্জ ক্যাম্পে অবস্থান নিয়েছিলেন। সেখানে থেকে ধানুয়া কামালপুর আর পোড়াখাশিয়ায় গেরিলা অপারেশন করেছেন। এখানে অবস্থান নেওয়ার সময় একদিন অপারেশনে গেলে পাকবাহিনীর অ্যামবুশে পড়েন। মুখোমুখি গুলি ছুড়তে গিয়ে বিলম্ব হওয়ায় পাকসেনার একটি গুলি এসে তার পায়ে বিদ্ধ হয়। অল্পের জন্য সেদিন বেঁচে গিয়েছিলেন।
খলিল বসবাস করেন মেঘালয়ের পাহাড়ের পাদদেশে, অথচ তার মন পড়ে থাকে বাংলাদেশে। আজও তিনি মনেপ্রাণে ধারণ করেন বাংলাদেশকে। বাংলাদেশের মাটির ঘ্রাণ পেতে আজও তার প্রাণ ছটফট করে।

বাংলানিউজকে তিনি বলেন, ‘সৃষ্টিকর্তার কাছে একটাই চাওয়া যেন বাংলাদেশেই মৃত্যু হয়। এ দেহটা যেন বাংলাদেশের মাটিতেই মিশে যায়। খুব কষ্ট লাগে। অসহায় লাগে যখন ভাবি-আজ কত বছর দেশে যাই না। কেননা, বাংলাদেশই আমার মা। ‘মা’ শব্দটাই যে বাংলার। এই বাংলার দেশ ছেড়ে কিভাবে অন্য দেশে পড়ে আছি, তা শুধু সৃষ্টিকর্তাই জানে।’ এসব বলতে বলতেই তার গলা ধরে আসে। জলে ছলছল করে ওঠে চোখ।

সহযোগিতায়: 

ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন:
মহেন্দ্রগঞ্জের বাসিন্দা আতর আলী ও মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ খলিল।


বাংলাদেশ সময়: ০৮০০ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ২৬, ২০১৬
ইইউডি/জেএম

আরও পড়ুন
** লক্ষ্মীপূজার রাতে শুরু হয় তুমুল হামলা
** খাওয়া-ঘুম-মলত্যাগ সব একই তাঁবুতে
** ভারতে আতর আলীর আশ্রয়ে যুদ্ধশিশু ‘খুদেজা পাগলী’
** হিলির দুর্গ ভাঙ্গতে ভুল সমরকৌশল
** ক্যান্টনমেন্টের সহায়তায় খুন, ধর্ষণে লিপ্ত হয় বিহারীরা

** অমরখানা: ৬নং সেক্টরের বড় এক যুদ্ধক্ষেত্র
** পাটগ্রামের ত্রিমুখী ডিফেন্স ছিল পাকসেনাদের কাছে ‘চীনের প্রাচীর’
** তেলডালার রসদে রৌমারীতে পূর্ণাঙ্গ রণ-প্রশিক্ষণ ক্যাম্প
** বাবাজী বললেন, ‘এক ইঞ্চ আন্দার আন্দার বোম্বিং কারো’
** ভোগাই নদীর ওপাড় থেকে তেলিখালী, চেলাখালী

** আমীর ডাকাতের বাড়িতে থেকে চরাঞ্চলে গেরিলা আক্রমণ
** তোরা, তেলডালা থেকে মুজিব ক্যাম্প
** পাকবাহিনীর ওপর গারো-হাজংদের প্রতিশোধের আগুন

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

একাত্তর বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত

Alexa