[x]
[x]
ঢাকা, বুধবার, ৬ আষাঢ় ১৪২৫, ২০ জুন ২০১৮

bangla news

ভারতে আতর আলীর আশ্রয়ে যুদ্ধশিশু ‘খুদেজা পাগলী’

ইকরাম-উদ দৌলা, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১৬-১২-২১ ৩:২৯:৪৯ এএম
ছবিতে খুদেজা পাগলী, তুলেছেন কাশেম হারুন

ছবিতে খুদেজা পাগলী, তুলেছেন কাশেম হারুন

কয়েক বছর আগে বাড়িটির পাশ দিয়েই পাকাপোক্ত করে কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে ভারত সরকার। যার দক্ষিণ ও পশ্চিমে জামালপুরের বকশীগঞ্জ। আর উত্তর ও পূর্ব দিকে পাড়ার অন্য বাড়িগুলো।
 

মহেন্দ্রগঞ্জ, মেঘালয়: কয়েক বছর আগে বাড়িটির পাশ দিয়েই পাকাপোক্ত করে কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে ভারত সরকার। যার দক্ষিণ ও পশ্চিমে জামালপুরের বকশীগঞ্জ। আর উত্তর ও পূর্ব দিকে পাড়ার অন্য বাড়িগুলো।
 
বকশীগঞ্জের ধানুয়া কামালপুর সীমান্তঘেঁষা মেঘালয়ের মহেন্দ্রগঞ্জে এ বাড়িটি আতর আলীর। গ্রামের নাম নন্দীর চর। আতর আলীর বাড়িতে দু’টি ঘরের মাঝখানে ছোট একটা উঠান। সেখানেই ঝাড়ু হাতে পরিচ্ছন্নতার কাজে মগ্ন ‘খুদেজা পাগলী’।
 
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় মহেন্দ্রগঞ্জ এলাকাতে ছিল বেশ কয়েকটি শরণার্থী শিবির। সে সময় এলাকার আমপাতি, কালাইপাড়া, মাগুরমারী প্রভৃতি স্থানে গড়ে তোলা শিবিরে লাখ লাখ বাঙালি অবস্থান নিয়েছিলেন।
 
যুদ্ধ শেষে শিবির উঠে গেলে মহেন্দ্রগঞ্জ বাজারের ভেতর একটি শিশুকে কান্নারত অবস্থায় দেখতে পান স্থানীয় মুরুব্বী সবেদ শেখ। অনেক চেষ্টা করেও পিতা-মাতার সন্ধান না পেয়ে স্থানীয়রা নিশ্চিত হন শিশুটি এ এলাকার নয়। তারা এ-ও নিশ্চিত হন যে, যেহেতু যুদ্ধের সময় শরণার্থী শিবিরে অনেক শরণার্থী এসেছিলেন এবং শিশুটি এ এলাকার নয়, তাই এর বাবা-মা কোনো শরণার্থীই হবে।
 
শিশুটির বয়স তখন তিন কিংবা খুব বেশি হলে চার বছর হবে। তেমন কথা বলতে পারে না। এতটুকু বয়সে শিশু কথা তেমন বলতে পারবে না, এটাই স্বাভাবিক। মায়া পড়ে যায় স্থানীয় মুরুব্বী সাবেদ শেখের। যতদিন বাবা-মার খোঁজ না পাওয়া যায়, শিশুটি তার কাছেই রাখবেন বলে ঘোষণা দেন সবেদ শেখ। এরই মধ্যে লোকজন শিশুটিকে ‘যুদ্ধশিশু’ নামে ডাকতে শুরু করে দিয়েছে।
 
সবেদ শেখ অবশেষে তাকে একটি ভালো নাম দেন। খুদেজা খাতুন। কিন্তু বড় হওয়ার সাথে সাথে খুদেজার কিছু অসংলগ্ন আচরণ ধরা পড়ে। তারা তখন খুদেজা খাতুনকে ‘খুদেজা পাগলী’ বলে ডাকা শুরু করেন।
 
বেশ কয়েক বছর পর মারা যান সবেদ শেখ। আশ্রয়হীন হযে পড়ে খুদেজা। মহেন্দ্রগঞ্জ বাজারে, কখনো বা স্কুলঘরে আশ্রয়হীন, নিরাপত্তাহীনভাবে কাটতে থাকে খুদেজার দিন। এ সুযোগে গ্রামের বখাটেরা নানা রকম দুষ্টুমি করতে শুরু করে। একদিন বিষয়টি লক্ষ্য করেন নন্দীর চরের আতর আলী। সেই থেকে খুদেজা খাতুনকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আশ্রয় দেন।
 ছবিতে আতর আলী
এখানে বেশ ভালই আছেন খুদেজা। বাড়ির মেয়ের মতই সব কাজ করেন। কোনো কিছু বলে দিতে হয় না। সব কিছু সুন্দর মতন গুছিয়েই করেন। সমস্যার মধ্যে কেবল অসংলগ্ন আচরণটাই। কিন্তু সবাই তাকে খুব পছন্দ করেন। আদর যত্নও করেন।
 
মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকেই বকশীগঞ্জের কামালপুরে আতর আলীর অনেক বন্ধুবান্ধব ছিলেন। তাদের মাধ্যমেও খুদেজার বাবা-মায়ের খোঁজ পাওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।
 
বাড়িটা একেবারে সীমান্তঘেঁষা হওয়ায় যুদ্ধটা অন্য আট দশ জনের চেয়ে বেশিই দেখেছেন আতর আলী। তাদের বাড়ির পাশ দিয়েই লাইন ধরে মুক্তিযোদ্ধারা বেরিয়ে যেতেন। মেজর সালাউদ্দীন তার বাড়িতেও আসতেন।
 
অনেক সময় আতরের মন খারাপ হতো, যখন কোনো মুক্তিফৌজের মরদেহ আনতে দেখতেন। অনেক সময় এমনও হয়েছে, নিজেদের মধ্যে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় নিজেদের গুলিতে নিজেরাই মারা পড়েছেন তারা। তবে দেশ স্বাধীন করার জন্য জীবনের মায়া ত্যাগ করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। তারা গুলি শেষ না হলে কখনো যুদ্ধের মাঠ থেকে ফিরতেন না।
 
মহেন্দ্রগঞ্জ-কামালপুরে প্রায় নয় মাস ধরেই ব্যাপক যুদ্ধ হয়েছে। এই যুদ্ধক্ষেত্রে ১১ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর তাহের পা হারিয়েছেন। শহীদ হয়েছেন মিত্রবাহিনীরও শতশত সদস্য।
 
বর্ডারের পাশেই বাড়ি হওয়ায় বেশ বিপত্তিতেও পড়তে হয়েছে তাদের। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে একদিন বিকেলে পাকসেনারা ঘেঘাপাড়া কাঠের ব্রিজ পার হয়ে ভারতের ভেতর ঢুকে পড়েছিল। পাকসেনারা সেদিন অনেক এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে থাকে। একটি গুলি এসে লাগে আতর আলীর ভাইয়ের স্ত্রী সবিলা বেগমের পেটে। ঘন্টাখানেকের মধ্যেই তিনি মারা যান।
ছবিতে কদু শেখ
 
ওইদিনই সীমান্ত এলাকা ছেড়ে স্থানীয়রাও শরণার্থী শিবিরে গিয়ে আশ্রয় নেন। ভারত সরকার তাদেরও রেশন দেয়।
 
মহেন্দ্রগঞ্জ বাজারের পূর্ব পাশেই টঙরুর চর গ্রামের নেতা মঞ্জুর রহমান। যিনি ১৯৮৯ সালে মেম্বার অব ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল (এমডিসি) বা জেলা পরিষদ মেম্বর হয়েছিলেন।
 
স্থানীয় ক্যাম্পে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ক্যাপ্টেন নিগি’র সঙ্গে ছিল তার পিতা ডা. মূসা মিয়ার ব্যাপক সখ্য। আশেপাশে অন্য কোনো ডাক্তার না থাকায় তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাও করতেন।
 
এ বর্ডারে বিএসএফ ক্যাম্প ছিল আমপাতিতে। সেখানেই মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর সদস্যরা অবস্থান নিতেন। এরপর পরিকল্পনা মাফিক ডিফেন্স থেকে হামলা চালাতেন।
 
মঞ্জুর রহমানদের বাড়ি থেকে ২শ মিটারের মত ক্ষেত পেরুলেই বর্ডার রোড। সেখানেই প্রতিরোধ  গড়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। ক্যাপ্টেন নিগির সাথে পিতার সখ্যর সুবাদে প্রায়ই সেখানে যেতেন মঞ্জুর রহমান। তখন তার বয়স ছিল চৌদ্দ অথবা পনের বছর।
 
বর্ডার রোডের এপারেই ডিফেন্স হওয়ায় নির্বিঘ্নে হাঁটা চলা করা যেত। তবে গোলাগুলি শুরু হলে পাকসেনাদের মর্টার শেল হয়ে উঠতো বড় আতঙ্কের কারণ। সে সময় যেতে পারতেন না মঞ্জুর রহমান। মূলত: গুলির খোসা কুড়াতে ডিফেন্সে যেতেন তিনি।
 
নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ের দিকে একদিন মেজর তাহের যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সেদিন ডিফেন্সেই ছিলেন আতর আলী। হঠাৎ মর্টারের শেলে তাহেরের পা উড়ে যায়। আর সেটি পাকসেনাদের নয়, ভারতীয় আর্মির আর্টিলারি বাহিনীর ছোড়া মর্টারের শেলই ছিল। এ রকম ভুলভ্রান্তিতে মিত্রপক্ষের অনেক সেনা অনেক সময় মারাও গেছেন। এদের মধ্যে মুক্তিফৌজের লোকজন যেমন ছিলেন, তেম্নিভাবে ভারতীয় আর্মির লোকজনও ছিলেন।
 
মেজর তাহের আহত হওয়ার পর যুদ্ধের তীব্রতা বেড়ে যায়। এমনও দিন গেছে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই গোলাগুলি হয়েছে। অবেশেষে ভারত সরাসরি যুদ্ধের ঘোষণা দিলে ডিসেম্বরেরই প্রথম সপ্তাহেই পাকসেনারা ধানুয়া কামালপুর ছেড়ে পিছু হটে।
 
যারা ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন:
মহেন্দ্রগঞ্জ এলাকার সাবেক এমডিসি মঞ্জুর রহমান ও  স্থানীয় কৃষক কুদু শেখ।

 সহযোগিতায়:

বাংলাদেশ সময়: ০৩১৬ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ২১, ২০১৬
ইইউডি/জেএম

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

একাত্তর বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত

Alexa