[x]
[x]
ঢাকা, সোমবার, ৭ ফাল্গুন ১৪২৪, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

bangla news
মিশর থেকে জাহিদুর রহমান

ভিন্ন আবহে বেড়ে উঠছে প্রবাসীদের সন্তানরা

জাহিদুর রহমান, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১৭-০১-২৯ ২:১২:০৭ এএম
মিশরে শিশু বয়স থেকে বেড়ে ওঠা ইব্রাহিম দুলাল মোল্লা

মিশরে শিশু বয়স থেকে বেড়ে ওঠা ইব্রাহিম দুলাল মোল্লা

ইসমাইলিয়া (মিশর) থেকে: বয়স কতোই বা। বড়জোড় সতের। সাজ পোশাকে পুরোদস্তুর বাঙালি। চোখে-মুখে দূরন্ত কৈশোর। তবে মুখে ছোটে অ্যারাবিক বুলি। শব্দের পিঠে শব্দের ‘ধাক্কাধাক্কি’ করে নয়। অনর্গল। মিশরীয় গাড়ি চালককে সে ভাষাতেই অনর্গল পথ নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছিলো ওই কিশোর।

পুরো নাম ইব্রাহিম দুলাল মোল্লা। মাত্র তিন বছর বয়সে বাবা-মায়ের হাত ধরে সে এই দেশে আসে। মা-বাবার দেশ বাংলাদেশ। আর জন্মস্থান যে বরিশাল তা কণ্ঠস্বরে স্পষ্ট। তবে বরিশালের ঠিক কোথায় বাড়ি তা জানা নেই এই কিশোরের।

মিশরের ইসমাইলিয়া এলাকায় হাতেগোনা প্রবাসীদের বাস। তাদের বেশির ভাগই সাধারণ তৈরি পোশাক শ্রমিক। কেউবা মেকানিক্স। সেখানে কেমন আছেন প্রবাসীরা, তাদের সমস্যা আর সম্ভবনার খোঁজ-খবর নিতে সূচনাতেই বিপত্তি। সবাই যে যার কর্মস্থলে ব্যস্ত।
যা-ও দু’একজনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয়। তাদের বক্তব্য একটাই। ‘ভাই অফিস কামাই দিয়া আসা যাইবো না। মিশরীয় গো ফাঁকি দেওয়া কঠিন। সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকলে দেখা পাইবেন’।

জানিয়ে দেই, ফাঁকি দেবার কোনো প্রয়োজন নেই। সততা আর নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করুন।

মিশরে অ্যারাবিক ভাষার চলই বেশি। চালক ইংরেজি বোঝেন এমন ট্যাক্সি ক্যাব পাওয়া-ও বেশ 
কঠিন। আর অ্যারাবিক উচ্চারণের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে চালককে গন্তব্যের ঠিকানা বোঝানোটা আরো বেশি কষ্টকর।

এখানো উবার, কারিমসহ নানা সংস্থার ট্যাক্সি স্মার্ট সেবা হাতের নাগালে। তবে এর সুবিধ‍া পেতে নিদেন পক্ষে জানতে হবে সঠিক স্থানের নাম আর থাকতে হবে অ্যাপস পরিচালনার অ্যাপ্লিকেশন।
তেলের দাম কম হওয়ায় দেশের তুলনায় ভাড়াও অনেক কম। যদিও তেলের দাম বাড়ায় দিন দিন এর প্রভাবটাও জনজীবনে বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

এর বাইরে সুপ্রশস্ত পথঘাট, দীর্ঘতম উড়াল সেতুর বাইরে মেট্রোরেল, দ্রতগতির রেলসহ গণ পরিবহণ ব্যবস্থাও বেশ উন্নত।

রাজধানী কায়রো থেকে প্রায় আড়াই শ’ কি.মি. দূরে ইসমাইলিয়া পৌঁছে যখন প্রবাসীদের নাগাল পাচ্ছি না। এ-ওর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছি। তখনই সেই 
ফোনালাপের মধ্যে হাজির ইব্রাহিম দুলাল মোল্লা। চেহারা আর চাহনি দেখে নিশ্চিত হই- কিশোর অবশ্যই দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশ থেকে আসা অভিবাসী। ইংরেজিতে প্রশ্ন করতেই সটান উত্তর, আমারে বাংলায় জিগান। কারে খুঁজেতেছেন? কার কাছে যাইবেন?

যেনো মেঘ না চাইতেই জল! এভাবেই পরিচয় পর্বের সূচনা হয় দুরন্ত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই কিশোরের সঙ্গে।

প্রবাসে বাংলাদেশের শিশু কিশোররা কোন সাংস্কৃতিতে ঠিক কিভাবে বেড়ে উঠছে, দেশ সম্পর্কে তাদের চেতনাটাই বা কেমন- এমন সব নানা কৌতুহলের তৃষ্ণাটা মেটানোর সব চেষ্টাই তখন এই কিশোরকে ঘিরে।

‘বাংলাদেশের বাংলানিউজের সাংবাদিক’- এই পরিচয়টাও যেনো তাকে বেশ আগ্রহী করে তোলে।

তারপর বলতে থাকেন প্রবাসে বেড়ে ওঠা আর নিজের শৈশব ছেড়ে কৈশোরে আসার কথা। মুখে অনর্গল অ্যারাবিক শুনে প্রথমেই আসি বাংলার প্রসঙ্গে।
ভাষাডা আমি ছোডকাল থাইক্যাই জানতাম। আমার যেসুমকা (যে সময়) তিন বছর বয়স। তহন 
আমরা ইজিপ্টে আয়া পড়ছি। আমি মা-বাবার লগে বাংলায় কতা (কথা) কইত্তেয়ারি (বলতে 
পারি) তয় লিকতে পারি না’।

দুই ভাই এক বোনের মধ্যে দ্বিতীয় ইব্রাহিম। দুলাল মোল্লার বাবার নাম দুলাল মোল্লা। এখানকার নিয়ম অনুযায়ী নামের শেষে বাবা বা দাদার নাম-ও যুক্ত হয়। তাই ইব্রাহিম নামটির পেছনে দীর্ঘ লেজটা নিজেই যুক্ত করেছেন- জানালেন। এখানেই যেনো সংস্কৃতি আর কৃষ্টির নতুনত্ব।

বাবা স্থানীয় একটি তৈরি পোশাক কারখানার মেকানিক। বড় ভাইও শ্রমিক হিসেবে একটি কারখানায় কাজ করে।

‘আমগো বাড়ি বরিশাল। খালি এদ্দুরাই জানি। হেইয়া কোন হানে তা কইত্তে পারুম না। তয় হুনছি বাংলাদেশ নামের দ্যাশডায় বলে খালি খুন খারাবি অয়। আব্বায় যখন দ্যাশে ফোন করে তহন কয় দেশে বলে খালি খুনাখুনি হয়’।

নেতিবাচক শোনা কথায় দেশের একটি ছবি এঁকে মিশরের সঙ্গে তুলনা দিয়ে কিশোরটি জানায়, এ দেশটিই ভালো। রাতে-বিরাতে এখানে কোনো নারী হেঁটে গেলেও কেউ তাকে বিরক্ত করে না। কেউ পথ হারালে বরং পুলিশ বাড়ি পৌঁছে দেয়। এখানে তার অনেক 
বন্ধু, বান্ধবী। তাদের ছাড়া একটি ম‍ুহুর্তও কল্পনা করতে পারে না সে।

আচ্ছা যদি কাল তোমার বাবা-মা দেশে ফিরে যান, তুমি সঙ্গে যাবে তো?

‘আমারে টাইন্যা হেঁচড়াইয়া নিলেও যামু না। আমি পলায়া এ দেশেই থাকমু’।

ছোডবেলা থাইক্যা এই দ্যাশটারে দেখছি। এখন এইডাই আমার দ্যাশ’- বেশ দৃঢ়ভাবে অবস্থান জানান দেয় এই কিশোর।

দীর্ঘ সময় থাকলেও ইউরোপ বা আমেরিকার মতো পিরামিডের দেশ মিশর অভিবাসী ইস্যুতে 
উদার নয়। নাগরিকত্ব তো নয়ই, বড়জোড় দেশটিতে স্থায়ীভাবে থাকার অনুমতি মেলে কর্মজীবী প্রবাসী বা তাদের পরিবারের সদস্যদের। বছর বছর আবার তা নবায়ণ করতে হয়। এ নিয়েও শেষ নেই ঝুট-ঝামেলার।

পৃথিবীর সপ্তম আশ্চার্যের দেশে ১৪টি বসন্ত পার কর‍া ইব্রাহিম দুলাল মোল্লার শেকড় বাংলাদেশ হলেও সে চেনে না ‘অ আ ক খ’। জানে না বাংলাদেশের কথা। জানে না ভাষার জন্যে বাংলাদেশের মানুষের আত্মত্যাগের কথা। লাখো প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার কথা।

সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা ইব্রাহিম দুলাল মোল্লার আঞ্চলিক ভাষাটাই যেনো বাংলাদেশের সীমানা। এর বাইরে সবকিছুই অন্ধকার, অচেনা, অজানা তার।

এখানে শিশু বয়স থেকেই এ্যারাবিক মাধ্যমে লেখাপড়া শিখেছে সে। বেড়ে উঠেছে এখানকার রীতি ও সাংস্কৃতিতে। তাই স্থানীয় ভাষাতেও দখল বেশ। এখন তার ইচ্ছ‍া এখানকার প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আল-আজাহারের কোনো ইনস্টিটিউটে ভর্তি হওয়া। তারপর 
এখানেই জীবন-জীবিকা অবলম্বন খুঁজে নেওয়া।

‘বাংলাদেশে গেলে তো এই বয়সে আর বাংলা অক্ষর শিখতে পারুম না। কাজও করতে পারুম 
না। তাই এ দ্যাশেই আমার কাছে সব’।

তাই বলে কি বাংলাদেশের জন্যে হৃদয়ে কোনো স্থানই নেই? উত্তরটা আসে আমাদের অবাক করে দিয়ে এ্যারাবিক ভাষাতেই।

‘আনা বাহেব বাগ বাংলাদেশ’।

অর্থ কি, জানতে চাইলে বলে, আমি বাংলাদেশকে ভালোবাসি। বাংলাতেই চটপটে উত্তর ইব্রাহিম দুলাল মোল্লার।

আরও পড়ুন
** জাল ভিসার জালে আটকে মিশরের কারাগারে বাংলাদেশিরা​
** মিশরের শিক্ষার দিগন্তে বাংলাদেশের উজ্জ্বল এক ঝাঁক নক্ষত্র
**জাল ভিসা চক্রে বিপন্ন দেশের ইমেজ

**সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রয়োজন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন​
**মিশরে মানবতার ফেরিওয়ালা ডা.আরিফুল হক
**
গার্মেন্টস শ্রমিক সুলতান আজ অনারারি কনসাল জেনারেল
** মিশরের ধূসর মরুভূমিতে প্রবাসীদের চিকিৎসায় শাফায়েত উল্লাহরা
** ঢাকা-কায়রো সম্পর্ক এখন অনন্য উচ্চতায়
** কায়রোয় ৫ মাস ধরে রাষ্ট্রদূতের চেয়ার শূন্য
** আমির হোসেনের নির্বাসনের জীবনই যেন ফুরোয় না!

** ‘ইজ্জত’ রক্ষায় ঢাকায় মাহমুদ ইজ্জাত

বাংলাদেশ সময়: ০২১০ ঘণ্টা, জানুয়ারি ২৯, ২০১৭
এটি

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

প্রবাসে বাংলাদেশ বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত

Alexa