[x]
[x]
ঢাকা, সোমবার, ১ আশ্বিন ১৪২৫, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮
bangla news

জাল ভিসা চক্রে বিপন্ন দেশের ইমেজ

জাহিদুর রহমান, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১৭-০১-২৬ ৪:৩৫:০১ পিএম
জাল ভিসা চক্রের মূল হোতা মামুন ও মনির (ডানে)।

জাল ভিসা চক্রের মূল হোতা মামুন ও মনির (ডানে)।

কায়রো (মিশর) থেকে: স্বপ্নভঙ্গ আর সর্বশান্ত হয়ে অসংখ্য বাংলাদেশির চোখের জলে ভাসার স্বাক্ষী পৃথিবীর প্রাচীন সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম পিরামিডের দেশ মিশর।

ভাগ্যান্বেষণে ধার-দেনা আর সুদে টাকা নিয়ে নীল নদের দেশে এসে অসহায় প্রবাসীরা হাবুডুবু খাচ্ছেন দুর্ভোগের গভীর জলে। মরুভূমির মতোই ধূসর জীবন নিয়ে তাদের অনেককেই ফিরতে হয়েছে স্বদেশে। কেউ কেউ আবার নিঃস্ব-রিক্ত হয়ে সামান্য কাজের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছেন পথে পথে।

এসব কিছুর নেপথ্যে ভুয়া আর জাল ভিসা বাণিজ্য। যে বাণিজ্যে জড়িত খোদ বাংলাদেশিরাই, যাদের অনেকে কথিত শিক্ষার্থী। দেশটির হাজার বছরের প্রাচীন আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর পরিচয়েও এ অপকর্ম করে বেড়াচ্ছেন অনেকেই- এমন তথ্যই জানাচ্ছে সরকারি নথি ও বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছে স্থানীয় দূতাবাসের মাধ্যমে পাঠানো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন।

ইতোমধ্যেই যথাযথ অভিযোগ ও প্রমাণের ভিত্তিতে ‘জাল ভিসা ব্যবসায়ীর’ তালিকায় নাম উঠেছে ৫ প্রবাসীর। যে তালিকা তৈরি করেছে খোদ কায়রোর বাংলাদেশ দূতাবাস।

প্রতিবেদন অনুসারে, তালিকাভূক্ত জাল ভিসা চক্রের মূল হোতা ময়মনসিংহের মনির। তিনি ফুলপুর উপজেলার চর আশারথ রামনাথপুরের আবু তালেবের ছেলে (পাসপোর্ট নম্বর BC0293303)।

তালিকায় থাকা অন্যরা হলেন, মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার হিজলবাড়ি গ্রামের মোহাম্মদ ওমর আলীর ছেলে মোহাম্মদ রিপন আলী (পাসপোর্ট নম্বর BA0831897) এবং বরিশালের গৌরনদী উপজেলার উত্তর সরিকল গ্রামের সিকান্দার আলী হাওলাদারের ছেলে আবদুল্লাহ আল মামুন (পাসপোর্ট নম্বর AD4021475)।

এ তিনজনের বিরুদ্ধে রয়েছে জাল স্টুডেন্ট ভিসা তৈরি, জাল ওর্য়াক পারমিট ইস্যু, ভিজিট ভিসায় মিশরে কর্মী আনা এবং লিবিয়ায় মানবপাচার করা।

তালিকার অন্য দু’জন হচ্ছেন, কুমিল্লার আব্দুর রাজ্জাক ওরফে মোজাম্মেল (পাসপোর্ট নম্বর Z0025424) এবং শরিয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার  মতিউর রহমান ফিরোজীর ছেলে শামীম হোসেন ফিরোজী ওরফে শরিফ (পাসপোর্ট নম্বর BE0242903)।

তাদের বিরুদ্ধে জাল স্টুডেন্ট ভিসা তৈরি, জাল ওয়ার্ক পারমিট ইস্যু, ভিজিট ভিসায় মিশরে কর্মী আনা ও লিবিয়ায় মানবপাচারের পাশাপাশি প্রবাসে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয় দূতাবাসের ওই প্রতিবেদনে।

জাল ভিসায় প্রতারিত হওয়া কায়রো প্রবাসী অনেকেই বাংলানিউজকে বলছেন, প্রকৃত ভিসা করাতে গিয়ে তাদের অনেকেই পাসপোর্ট খুইয়ে পরিচয়হীন জীবন যাপন করছেন এদেশে। না পারছেন জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে, না পারছেন দেশে ফিরে যেতে।

তাই দিশাহীনভাবে ঘুরছেন পথে পথে।
সূত্রমতে, এখানে বসবাসরত বাংলাদেশি অসাধু ভিসা চক্রটি বৈধ ভিসা এনে দেওয়ার কথা বলে নিরীহ প্রবাসীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয় মোটা অংকের অর্থ। প্রবাসীদের অনেকেই সরল বিশ্বাসে সংশ্লিষ্ট দফতরে যাচাই করতে গেলে তা নজরে আসে দেশটির ইন্টেরিয়র মিনিস্ট্রি ও ন্যাশনাল সিকিউরিটির।

বিষয়টি ভাবিয়ে তোলে দেশটির অভিবাসন কর্তৃপক্ষকে।

এভাবে নানা তথ্য-প্রমাণ হাতে নিয়ে গত বছরের অক্টোবরে প্রবাসী বাংলাদেশি জাল ভিসা চক্রের বিরুদ্ধে শুরু হয় অভিযান।

দুই সপ্তাহের অভিযানে কায়রোর আওয়াল গামাল এলাকা থেকে আটক করা হয় ২৮ বাংলাদেশিকে। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইমিগ্রেশন পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের যৌথ অভিযানে আটক করে দেশে ফেরত পাঠানো হয় চক্রের মূল হোতা মনিরকে। উদ্ধার করা হয় ৫০টি বাংলাদেশি পাসপোর্ট, ৪০ হাজার মার্কিন ডলারসহ বিভিন্ন দেশের মুদ্রা।

২০০৭ সাল থেকে মিশরে বসবাস করা মনির কায়রোর আওয়াল গামাল এলাকায় একটি গার্মেন্টসে প্রবাসী কর্মজীবন শুরু করলেও চাকরির আড়ালে জাল ভিসার কারবারে নামেন। প্রকৃত ভিসার নামে ভুয়া ভিসার বিনিময়ে অসংখ্য প্রবাসীর কাছ থেকে হাতিয়ে নেন কষ্টার্জিত মোটা অংকের অর্থ।

মনিরকে গ্রেফতার ও দেশে ফেরত পাঠানোয় দেশের ভাবমূর্তি সংকটে পড়ে গেছে। সহানূভূতির বদলে অসহায় অবৈধ বসবাসকারী বাংলাদেশিদের প্রতি কঠোর অবস্থানে যায় দেশটির সরকার।

তালিকায় থাকা বরিশালের আবদুল্লাহ আল মামুন এখনো অবস্থান করছেন কায়রোতে। তাকেও কালো তালিকাভূক্ত করেছে কায়রোর বাংলাদেশ দূতাবাস।
আল আজাহারের ছাত্র পরিচয়ে দেশটিতে অবস্থান করে জাল ভিসা ও স্টুডেন্ট ভিসায় কর্মী আনা ও মানবপাচার কাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন মামুন। এখন ছাত্রত্ব না থাকলেও সন্তানকে ভর্তি করিয়ে ডিপেন্ডেবল ভিসায় দেশটিতে থাকছেন তিনি।

অভিযোগের বিষয়ে আবদুল্লাহ আল মামুন বাংলানিউজকে বলেন, একটি সময়ে তিনি দেশ থেকে কর্মী আনা-নেওয়ার ব্যবসায় (দূতাবাসের ভাষায় আদম পাচার) জড়িত হয়েছিলেন, এটি সঠিক। তবে জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত নন, উল্টো শিকার বলে দাবি করেন।

নিজের নাম কালো তালিকাভূক্ত হওয়াকে ষড়যন্ত্র দাবি করে এ তালিকা থেকে নাম কাটানোর কোনো উপায় আছে কি-না, উল্টো জানতে চান বাংলানিউজের কাছে।

দূতাবাসের কাউন্সিলর (রাজনৈতিক) শফিকুর রহমান মিশরে জাল ভিসা চক্রের সঙ্গে প্রবাসীদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নিশ্চিত করে বাংলানিউজকে বলেন, ‘গুটিকয়েক মানুষের লোভের ফাঁদে অনেক প্রবাসী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। মিশরে তাদের কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের ইমেজকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে’।

‘প্রবাসীদের সতর্ক করতেই দূতাবাস জাল ভিসা চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তাদের আইনের আওতায় আনতে বিষয়টি বাংলাদেশের অভিবাসন (ইমিগ্রেশন) কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রবাসে যারা দেশের ইমেজ ক্ষুন্ন করছেন, তাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছে কায়রোর দূতাবাস’- যোগ করেন এই কূটনৈতিক।

বাংলাদেশ সময়: ০৩৩০ ঘণ্টা, জানুয়ারি ২৭, ২০১৭
জেডআর/এএসআর

**
মিশরের শিক্ষার দিগন্তে বাংলাদেশের উজ্জ্বল এক ঝাঁক নক্ষত্র
**জাল ভিসা চক্রে বিপন্ন দেশের ইমেজ

**সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রয়োজন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন​
**মিশরে মানবতার ফেরিওয়ালা ডা.আরিফুল হক
**
গার্মেন্টস শ্রমিক সুলতান আজ অনারারি কনসাল জেনারেল
** মিশরের ধূসর মরুভূমিতে প্রবাসীদের চিকিৎসায় শাফায়েত উল্লাহরা
** ঢাকা-কায়রো সম্পর্ক এখন অনন্য উচ্চতায়
** কায়রোয় ৫ মাস ধরে রাষ্ট্রদূতের চেয়ার শূন্য
** আমির হোসেনের নির্বাসনের জীবনই যেন ফুরোয় না!

** ‘ইজ্জত’ রক্ষায় ঢাকায় মাহমুদ ইজ্জাত

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

প্রবাসে বাংলাদেশ বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত

Alexa