[x]
[x]
ঢাকা, রবিবার, ৬ ফাল্গুন ১৪২৪, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

bangla news
মস্কো মেট্রোতে দু’ঘণ্টা

‘নট মার্টিন, দিস ইজ মতিন’

সেরাজুল ইসলাম সিরাজ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১৬-০৬-০৭ ৭:৩৮:৫৬ পিএম
ছবি: বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি: বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

মস্কো মেট্রো ঘুরে দেখানোর দায়িত্বে ছিলেন ভেরা। ট্যাবে একটি ছবি দেখিয়ে বললেন, এই স্টেশনটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আশ্রয়শিবির হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

মস্কো (রাশিয়া) থেকে ফিরে: মস্কো মেট্রো ঘুরে দেখানোর দায়িত্বে ছিলেন ভেরা। ট্যাবে একটি ছবি দেখিয়ে বললেন, এই স্টেশনটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আশ্রয়শিবির হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

কথাটা শুনতেই রোমাঞ্চকর অনুভূতি ছড়িয়ে গেলো ভেতরে ভেতরে। ছবিটিতে হাজার হাজার নারী-পুরুষ লাইন ও প্লার্টফমে শুয়ে আছে। রুশ নেতা যোসেফ স্তালিন আশ্রয়শিবির পরিদর্শন করছেন। একটিতে শরণার্থীদের খাবার সরবরাহ করতে দেখা যাচ্ছে।

রুশ কবি ভ্লাদিমির মায়াকোভ্‌স্কির নামানুসারে স্টেশনটির নামকরণ করা হয়েছে মায়াকোভ্‌স্কায়া। ছবির স্টেশনের বর্তমান অবস্থা মেলানোর চেষ্টা করছিলাম।সবই হুবহু মিলে যাচ্ছে, সেই প্রাচীর, সেই নকশা সবই এখনও জ্বলজ্বল করছে। মাথার ওপরে ছাদটি অনেকটা রেলের কামরার ওপরের অংশ অর্থাৎ ধনুকের মতো বাঁকানো। খাঁজ কেটে ডিজাইন করা।

ভেরা বললেন, শুধু ওপরে স্তালিনের প্রতিকৃতি সরিয়ে লেনিনের ছবি স্থাপন করা হয়েছে। রুশরা মনে করে, স্তালিন জাতির সঙ্গে বেঈমানি করেছেন। তাই তার ছবি সরিয়ে ফেলা হয়েছে পরে।

‘এতোদিন আগে নির্মিত হওয়ার পরও সংস্কারের প্রয়োজন পড়েনি’-- শুনেই একে অপরের দিকে তাকাচ্ছিলেন। ঠিক যেন তার কথাকে বিশ্বাস করতে ভরসা পাচ্ছিলেন না কেউ।

কিন্তু ভেরা দেখিয়ে বললেন, দেখেন আমরা এই পিলারের কাছে দাঁড়িয়ে আছি। ছবিতে দেখলাম সেখানে এক মহিলা তার শিশুকে হাতের উপর উঁচিয়ে ধরে আছে। যেখানটায় আমরা দাঁড়িয়ে ছিলাম। তখনকার সেই ডিজাইন পুরোপুরি অবিকৃত, অটুট। এবার বিশ্বাস করতেই হলো।

বেশ অবাকেই হতো হলো, এখনও জ্বলজ্বল করছে ঐতিহাসিক মায়াকোভ্‌স্কায়া। মাটির সাঁইত্রিশ মিটার নীচে স্টেশনটির অবস্থান। চমৎকার নির্মাণশৈলী ঘরের দুই দিকে বারান্দা দিলে যেমন দেখায় অনেকটা তেমন। মাঝে বিশাল অংশ টার্মিনাল হিসেবে ব্যবহৃত। আর টার্মিনালের ‍দুই দিকের পিলারের বাইরে দিয়ে গেছে লাইন। একটি যাওয়া, একটি আসার রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

স্টেশনটির নকশা এঁকেছিলেন বিখ্যাত রুশ স্থপতি আলেকসান্দর সের্গেই সেরগেইভিচ দুশকিন। এই স্টেশনটি ছাড়াও অরও বেশ কয়েকটি স্টেশনের নকশা এঁকেছেন এই স্থপতি। বেশ কয়েকটি স্টেশনে লেনিনের ম্যুরাল দেখা গেছে। আবার অনেক স্টেশনের দেওয়ালে খাঁজ কেটে বেলারুশ কাপের্টকে তুলে ধরা হয়েছে। রয়েছে হরেক রকমের পেইন্টিং।

নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিলাম, আমাদের দেশে নব্বইয়ের দশকে নির্মিত অনেক ভবন এরই মধ্যে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। আর এখানে আশি বছর আগের রেল স্টেশনটির সবই অবিকৃত রয়েছে। তারা কি নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করেছেন আর আমরা কি সামগ্রী ব্যবহার করি।

তাদের স্থাপনা আশি বছর টিকলে আমাদের ত্রিশ বছর কেন স্থায়ী হয় না। আমাদের নির্মাণের সময়েই ফ্লাইওভারের গার্ডার ভেঙে পড়ে। নব্বইয়ের দশকে নির্মিত বনবিভাগের ভবনগুলো এখন পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। আমরা আসলে কোন দিকে যাচ্ছি।

মস্কো মেট্রো গোটা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে সেরা। ১৯৩৫ সালে ১১ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ লাইন নিয়ে এর পথচলা শুরু। তখন এর স্টেশন সংখ্যা ছিল ১৩টি।
আর এখন ৩২৬ কিলোমিটার লাইনে স্টেশন রয়েছে দুই শতাধিক। মোট রুট রয়েছে ১২টি। যেগুলো বিভিন্ন রং দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছ। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন এলাকা যুক্ত হচ্ছে মস্কো মেট্রোতে।

২০১৫ সালে ১৫ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন রুবল রাজস্ব আয় করেছে মস্কো মেট্রো। এই পরিসংখ্যানেই বলে দেয় তাদের শক্তিশালী অবস্থানের কথা। দৈনিক সাড়ে ৯ মিলিয়ন অর্থাৎ ৯৫ লাখ যাত্রী বহনে সক্ষম মস্কো মেট্রো। একদিনে ৮৯ লাখ ৫২ হাজার যাত্রী পরিবহনের রেকর্ড করেছে।

নিচে মাকড়সার জালের মতো ছড়িয়ে থাকা এই বিশাল নেটওয়ার্কে গড়ে ৯০ সেকেন্ডে একটি করে ট্রেন চলাচল করে। তবে অফিস আওয়ারে ৪৫ সেকেন্ড পরপর ট্রেনের দেখা মেলে এই বিশাল নেটওয়ার্কে।

একেকটি স্টেশনে ২০ থেকে ২৫ সেকেন্ড অবস্থান করেই হুসহুস করে ছুটে চলছে ট্রেনগুলো। মস্কোবাসী এই বিশাল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করায় উপরের সড়কে চাপ অনেক কম। যদিও অফিস আওয়ারে অনেক সময় যানজট দেখা যায়। সিগন্যাল পার হওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে।

ছুটির দিন শনি ও রোববারে শহরে বের হলে মনে হবে এই সিটিতে খুব একটা লোকেই বাস করে না। কিন্তু মেট্রো স্টেশনে গেলে বুঝতে পারবেন মানুষের রাশ। কারো যেনো অন্যের দিকে নজর দেওয়ার সুযোগ নেই। ঠিক ট্রেনগুলোর মতোই সবাই প্রাণপণ গতিতে ছুটছে যে যার গন্তব্যে।

টার্মিনালের কোল ঘেঁষে সারি সারি চেয়ার পাতা। কিছু জুটিকে দেখা গেলো মন দেয়া-নেয়ায় ব্যস্ত। ট্রেনেও অনেক জুটির দেখা মিলবে, যারা একে অন্যের ঠোঁটে ঠোঁট লাগিয়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে যাচ্ছে। ঠিক পাশেই কে আছে সেদিকে তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই।

সবক’টি স্টেশন কিন্তু একই গভীরতায় নয়, তেমনি দৈর্ঘ্যও সমান নয়।সবচেয়ে গভীর স্টেশন পার্ক পবেদি মাটির ৮৪ মিটার মাটির নিচে। সবচেয়ে দীর্ঘ স্টেশন হচ্ছে ভরোভায়োবি। স্টেশনটির দৈঘ্য ২৮২ মিটার।

স্বয়ংক্রিয় প্রবেশপথ রয়েছে ২ হাজার ৩৭৪টি।যেখানে স্মার্ট কার্ড পাঞ্চ করে হুমহুম করে ঢুকে পড়ছে লোকজন। নেই টিকেট কাউন্টারে জটলা। প্রত্যেকটি স্টেশনে পর্যাপ্ত সংখ্যক স্বয়ংক্রিয় দরজা থাকায় প্রবেশপথেও কোন জট লেগে থাকতে দেখা গেলো না।

স্বয়ংক্রিয় দরজা থেকে মাটি নিচে স্টেশনে যাওয়ার জন্য রয়েছে চলন্ত সিঁড়ি।যেখানে পা রাখলে নিচে স্টেশনে আবার ঊর্ধ্বমুখী সিঁড়িতে পা দিলে সোজা উপর তলায় পৌঁছে দিচ্ছে হরদম।

যাত্রীদের দুর্ভোগ কত কমানো যায় সে দিকে মনোযোগের কমতি নেই মস্কো মেট্রোর। প্রি-পেইড কার্ড অথবা তাৎক্ষণিক টিকেট কিনে চলাচল করা যায়। প্রি-পেইড কার্ডে ছুঁয়ে প্রবেশ করলে চার্জ কম রাখা হয়। প্রতি টিকেটের মূল্য ৩৫ রুবল। কোনো স্টেশন দিয়ে বাইরে বের হলে আবার নতুন করে চার্জ করতে হবে।  

কেউ যদি মনে করে একটি টিকেট কেটে সারাদিন মেট্রোতে ঘুরপাক খাবে তাতেও আপত্তি করবে না কেউ। তবে সেখানে খাবার ও স্যানিটেশনের কোনো ব্যবস্থা নেই। এমনকি ব্যাগে করে খাবার নিয়েও প্রবেশ করার কোনো সুযোগ নেই। তাই পেটের ব্যথা অথবা নাভির নীচের ব্যথা আপনাকে টেনে উপরে তুলে আনবে।

মেট্রোর টিকেট দিয়ে সিটি বাসেও চলাচল করা যায়। এ ছাড়া এক ধরনের স্মার্ট কার্ড রয়েছে যেগুলো সিটি বাসে ব্যবহার করা যায়। স্মার্ট কার্ডের ব্যবহার বাড়াতে নানামুখী ছাড় রয়েছে। স্মার্ট কার্ড ব্যবহার করে মেট্রোতে ভ্রমণের দেড় ঘণ্টার মধ্যে সিটি বাসে উঠলে ৫০ শতাংশ কম ভাড়া চার্জ করা হয়।
প্রত্যেকটি রুটের আলাদা আলাদা রং ও নম্বর রয়েছে। স্টেশনের প্রবেশদ্বার ও বিভিন্ন পয়েন্টে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে নকশা। কোন পথ কোথায় গেছে। কোথায় কোথায় স্টেশন রয়েছে। বেশ কয়েক দফায় ট্রেন বদল করে ঐতিহাসিক (sokolniki, novokuzhetskaya, belorusskaya, opyshko, komsomolskaya, vorobyouy gory, kurskaya, manezhaya স্টেশন ভ্রমণ করালেন ভেরা।

হাস্যোজ্জ্বল চটপটে স্বভাবের মেয়েটি যে যাই জানতে চেয়েছে সুন্দর করে জানিয়ে দিয়েছে। স্টেশনগুলোতে কোথাও ইংরেজির বালাই নেই। সব রুশ ভাষায় লেখা। অনেক সময় স্টেশনের নাম বুঝতে কষ্ট হচ্ছিল। আবার ভেরার ইংরেজি উচ্চারণও বোঝা অনেক সময় দুষ্কর ছিল। তাই ইংরেজিতে স্টেশনের নাম লিখে দেওয়া শুরু করেন।

কিন্তু সমস্যা দেখা দিল বাপা-র ড. এমএ মতিন (পরিবেশবাদী) ভাইকে নিয়ে। রাশিয়ান গাইড ভেরা কিছুতেই তার নাম মতিন বলতে পারছিলেন না। বার বার বলছিলেন মিস্টার মার্টিন।

আর সংবাদের ফয়েজ আহমেদ খান তুষার বারবারই তাকে সংশোধন করে দিচ্ছিলেন (মজা করে)। ‘ও নো নো, দিজ ইজ নট মার্টিন, দিস ইজ মতিন।’
লাজুক হাসি দিয়ে প্রসঙ্গ পাল্টানোর চেষ্টা করছিলেন ভেরা।

আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম ভেরা যেহেতু মতিন ভাইয়ের নাম বিকৃত করছে, আমরাও তাহলে তাকে ‘ভেরা’  না বলে ‘ব্রা’ বলে ডাকব। কাটাকুটি হয়ে যাবে। দু’চার বার মিনমিনে গলায় বললেও তাতে প্রতিবাদ বা আপত্তি কোনোটাই করলেন না ভেরা।

মেট্রো থেকে বের হয়ে রেড স্কয়ারের পাশে একটি ট্রাডিশনাল খাবারের দোকানে দুপুরের খাবারের আয়োজন ছিল। সেখানে খাওয়া দাওয়া শেষে বিনীতভাবে সালাম জানিয়ে বিদায় নিলেন ভেরা। যুক্ত হলেন নতুন একজন গাইড যিনি আমাদের ট্যুরিস্ট জোন ঘুরিয়ে দেখালেন।

বাংলাদেশ সময়: ১৯৩৭ ঘণ্টা, জুন ০৭, ২০১৬
এসআই/জেএম

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

প্রবাসে বাংলাদেশ বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত

Alexa