Alexa
ঢাকা, সোমবার, ৫ চৈত্র ১৪২৩, ২০ মার্চ ২০১৭
bangla news
symphony mobile

ইসলামী জাদুঘরে মুসলিম মালাক্কা

জাকারিয়া মন্ডল, সিনিয়র আউটপুট এডিটর | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১৬-০৫-২৩ ১১:১৪:২৬ পিএম

মুসল্লিদের নামাজের জন্য ডাকা হতো আজদাহা এই ড্রামটিতে বাড়ি দিয়ে। বিরল প্রজাতির গাছের গুঁড়ি দিয়ে এই ড্রাম বানাতো মালয় মুসলিমরা।

মালাক্কা থেকে: মুসল্লিদের নামাজের জন্য ডাকা হতো আজদাহা এই ড্রামটিতে বাড়ি দিয়ে। বিরল প্রজাতির গাছের গুঁড়ি দিয়ে এই ড্রাম বানাতো মালয় মুসলিমরা। এর এক পাশ ঢোল বা মাদলের মতো চামড়ায় মোড়া, অপরপাশ উন্মুক্ত। দৈর্ঘ্য ও ব্যস এমন অনুপাতে তৈরি করা হতো যে, আওয়াজ ছড়িয়ে পড়তো বহু দূরে। রমজান মাসে সেহরি ও ইফতারের সময় জানাতে ব্যবহৃত হতো এই ড্রাম। চুরি, অগ্নিকাণ্ড আর মৃত্যুর খবর দিতেও বাড়ি পড়তো প্রাচীন মালয়ের এই ড্রামে। কামপাঙ কেলিঙ নাসে এক মসজিদ থেকে এনে এই ড্রামটি সাজিয়ে রাখা হয়েছে মালাক্কার ইসলামী জাদুঘরের দোতলায়, সিঁড়ির গোড়ায়। বিশালাকার এই ড্রামের মতো আরো অনেক নির্দশন সাজিয়ে রাখা গোটা জাদুঘর জুড়ে।

মালাক্কা পাহাড়ের দক্ষিণ পাদদেশে ফুটপাত থেকে পা বাড়ালেই এই জাদুঘরে ওঠার সিঁড়ি। জাদুঘরটি মূলত পাকা ভিতের ওপরে কাঠের দোতলা। সিঁড়িগুলোও কাঠের। উভয়তলার দু’পাশের বারান্দাতেও ইসলামের বিভিন্ন নিদর্শন। মূল ভবনের উভয় পাশে উন্মুক্ত প্রদর্শনীও আছে। সব ক’টি গ্যালারি, এমনকি ছাদের সিলিং আর ঝাড় বাতিতেও ইসলামী শিল্পকলার ছাপ স্পষ্ট।

২ রিঙ্গিতে (১ রিঙ্গিতে ৪০ টাকা) টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকলেই প্রথম যে গ্যালারিটি পড়বে সেটা ইসলামের পরিচিতি কক্ষ। নিচতলার প্রধান গ্যালারি এটা। এতে ইসলাম কি ও কেনো, কিভাবে এলো ইত্যাদির বিষদ বিবরণ কাঁচঘেরা নানা আকৃতির বাক্সে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। প্রধান প্রদর্শনী কক্ষ থেকে বাঁয়ের কক্ষটিতে ঢুকতেই মালাক্কা তথা মালয়েশিয়ায় ইসলামের আগমন, প্রসার ও মসজিদ তৈরির ইতিহাস খোলা বইয়ের মতো উঠে আসে চোখের সামনে।

দরোজার গোড়াতেই ১৭২৮ সালে মালাক্কায় প্রতিষ্ঠিত মালয়েশিয়ার প্রথম মসজিদ কামপাঙ হুলু’র রেপ্লিকা। তার পাশে একই বছর প্রতিষ্ঠিত মালয়েশিয়ার দ্বিতীয় মসজিদ তেনঘেরা’র রেপ্লিকা। সঙ্গে ১৮৫০ সালে গণচাঁদায় তৈরি কামপাং দুয়ুঙ মসজিদের রেপ্লিকাও সাজানো।

এর পরের গ্যালারিতে ইসলামী জীবন বিধানের বিবরণ। ইসলামী পোশাকের কিছু নমুনাও প্রদর্শিত হচ্ছে কাঁচের আড়ালে। তাতে ফতুয়া, লুঙ্গি, চাদর, পাঞ্জাবি আর রুমালের প্রাধান্য।

এরপর পড়লো বিভিন্ন সময়ের হাতে লেখা ও মুদ্রিত কোরআন শরীফের প্রদর্শনী। ইসলামী আসবাব, তৈজসপত্র আর ছড়ির প্রদর্শনী পরের গ্যালারিতে।
কাঠ আর সোনা-রূপার কোরআদানির প্রদর্শনীও আছে একটি কক্ষে। আছে নকশাখচিত পানির পাত্র, থালা-বাটি, এমনকি বিয়ের পালকিও।

মালাক্কা সালতানাতের সময়ে ইসলামের প্রসার-প্রসার সে সময়কার বিভিন্ন উপকরণসহ প্রদর্শন করা হয়েছে পৃথক এক গ্যালারিতে। মালাক্কায় কি করে ইসলাম এলো তার বিষদ বিবরণও মেলে রাখা হয়েছে এখানে। ইসলামের আগে কি করে দাসী পত্নি আর দাস রাখা হতো, ইসলাম এলে তাদের কি শাস্তির ব্যবস্থা ছিলো সেসবেরও সচিত্র বর্ণনা একটি গ্যালারিতে তুলে ধরা।

আর ইসলামী সালতানাতের সময়ে ব্যবহৃত বিভিন্ন অস্ত্রের প্রদর্শনী তো আলাদা করেই নজর কাড়ে।

নিচতলার মেঝে পাকা হলেও দোতলার মেঝে কাঠের। প্রতি পদক্ষেপেই এমনভাবে নড়ে উঠছে যে গোটা ভবনই কাঁপছে বলে মনে হলো।
এখানে পান দানি, মধ্যপ্রাচ্য থেকে আনা নানা আকৃতির খাপসহ তরবারি সাজিয়ে রাখা।

একটি গ্যালারিতে মালয়েশিয়ার স্বাধীনতার সময়কার থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের ইসলামের পরিস্থিতি প্রদর্শন করা হয়েছে নানা উপকরণ ও পেপার কাটিং দিয়ে। মালয় মুসলিমদের পোশাক সংস্কৃতির বিবর্তনের ধারাও প্রদর্শিত একটি গ্যালারিতে। আছে মালয়েশিয়ার মুসলিম নেতাদের পরিচিতি।
কার্যত ১৫১১ সালে পর্তুগিজদের হাত ধরে ইউরোপীয় উপনিবেশের পত্তন ঘটলেও বহু আগে থেকেই চীনা, ভারতীয় ও আরব নাবিকদের আনাগোনায় মিশ্র সংস্কৃতির শহর গড়ে উঠে মালাক্কায়। তবে চীনা বণিকদের পরেই আসে আরব বণিকরা। তারপর ভারতীয় ও পারসিয়ানরা।

মূলত নয় দরবেশের হাত ধরে মালাক্কা সালতানাত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অনেক আগেই ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে মালাক্কা থেকে পুরো মালয়েশিয়ায়। তারা স্থানীয় প্রথা ও সংস্কৃতির সঙ্গে ইসলামি রীতির মিশ্রণ ঘটান।

যদিও মালাক্কা সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা রাজা পরমেশ্বর ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন কি না তা স্পষ্ট নয়, তবে ইসকান্দার শাহ নামে মুসলিম নাম নিয়ে  রাজ্য শাসন করেন। তার ছেলে মেগাত ইসকান্দার শাহ ৭২ বছর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেন।

সে সময়কার মালয় লেখকদের মতে, মালাক্কা সালতানাতের তৃতীয় রাজা মুহাম্মদ শাহ ইসলাম গ্রহণ করলে শাসক শ্রেণি ও প্রজারাও ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে। মুজাফফর শাহ এর সময়ে আরো ছড়িয়ে পড়তে থাকে ইসলাম। তার প্রভাবে সুমাত্রার পূর্ব উপকূলের কামরপুর ও ইন্দ্রগিরির শাসক ইসলাম গ্রহণ করেন।

মালাক্কা নদীর উত্তর তীরের উপেহ শহরকে কেন্দ্র করে গোটা মালয় উপদ্বীপ চলে আসে ইসলামের আওতায়। একসময় মালয় উপদ্বীপ থেকে সুমাত্রা, জাভা ও ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত পৌছে যায় ইসলামের দাওয়াত। আর ইসলামি যুগে প্রবেশ করে মালাক্কার উন্নতি হতে থাকে দ্রুত। প্রসার ঘটে ইসলামি শিক্ষার। উন্নয়ন হয় মালয় ভাষা, সাহিত্য ও শিল্পকলার। এভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মালাক্কা থাকে মুসলিম সভ্যতার আদর্শে। এক সময় মালাক্কা হয়ে উঠে গ্রেট মালয় সাম্রাজ্যের রাজধানী। প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয় ভারতীয় কাপড়, চীনের চীনামাটির বাসন ও রেমশ এবং মালয় মসলা বাণিজ্যের। মালয় দ্বীপপুঞ্জে মুসলিম তৎপরতার সদর দপ্তর হয়ে উঠে মালাক্কা।

মালাক্কাই আঞ্চলিক সমুদ্র শক্তির মর্যাদা পাওয়া প্রথম মালয় মুসলিম রাজ্য। স্থানীয় ও বৌদ্ধ-হিন্দু মুল্যবোধ নিয়েই ইসলামি বোধের ওপর তৈরি হয় সাধারণ মালাক্কা সংস্কৃতি।  আইন ও রাজকীয় রীতি ও প্রথায় মালাক্কার আদালত আর সব মুসলিম সালতানাতের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
বস্তুত গোটা মালয় উপদ্বীপে একক মুসলিম সাম্রাজ্য গড়ার যে নজির গড়ে মালাক্কা, তার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠে আধুনিক মালয়েশিয়া।

বাংলাদেশ সময়: ২৩১৩ ঘণ্টা, মে ২৩, ২০১৬
জেডএম/

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

You May Like..