banglanews24.com Logo

যক্ষ্মার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

24 Mar 2012   03:06:49 AM   Saturday BdST

আদিত্য আরাফাত, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ঢাকা: যক্ষ্মা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় টিউবার্কিউলোসিস্ বা টিবিরোগ। একটি সংক্রামক রোগ, যার কারণ মাইকোব্যাক্টেরিয়াম টিউবারকিউলিস (Mycobacterium tuberculosis) নামের জীবাণু থেকে।

বাংলা উইকিপিডিয়া সূত্রে জানা যায়, ‘যক্ষ্মা’ শব্দটা এসেছে ‘রাজক্ষয়’ থেকে। ক্ষয় বলার কারণ এতে রোগীরা খুব শীর্ণ (রোগা) হয়ে পড়েন।

প্রতিবছরই যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হচ্ছে অসংখ্য মানুষ। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে যক্ষ্মার ঝুঁকি বাড়ছে। বাংলাদেশও ঝুঁকির বাইরে নয়।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বে যক্ষ্মা ঝুঁকিপূর্ণ ২২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ। বাংলাদেশের আগে আছে ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়া, নাইজেরিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকা। কার্যকর পর্যবেক্ষণের অভাবে দেশের অনেক যক্ষ্মারোগী চিকিৎসাসেবার বাইরে থেকে যাচ্ছে। গত বছর জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির মাধ্যমে এক লাখ ৫৫ হাজার ৫৬৪ নতুন যক্ষ্মারোগী সনাক্ত হয়েছে। কফে যক্ষ্মা জীবাণুযুক্ত রোগী সনাক্তকরণের হার প্রতি লাখে ৬৫।

যক্ষ্মারোগীর সংখ্যা ক্রমবৃদ্ধিতে বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি (এনটিপি) বাস্তবায়নে ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা বা এমডিআর টিবি এখন চ্যালেঞ্জ।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ তথ্য মতে, দেশে ১৫ থেকে ৫৪ বছর বয়সী মানুষই যক্ষ্মায় বেশি আক্রান্ত হয়। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার এক জরিপে বলা হয়েছে, যক্ষ্মা উন্নয়নশীল বাংলাদেশের অন্যতম জনস্বাস্থ্য সমস্যা এবং দ্বিতীয় ঘাতক ব্যাধি।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের যক্ষ্মা ও কুষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর মো. আশেক হোসেন বলেন, এমডিআর যক্ষ্মা এখন চ্যালেঞ্জ। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনে অবশ্যই এমডিআর’র হার শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে।

তবে যক্ষ্মায় বাংলাদেশের অগ্রগতি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করায় জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চিঠি দিয়ে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। দেশে বর্তমানে যক্ষ্মা সনাক্তকরণের হার ৭০ শতাংশের ওপরে।’

তিনি জানান, এমডিআর টিবি ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই আছে। দেশে এ সংক্রান্ত একটি জরিপের কাজ (অপ্রকাশিত) শেষ হয়েছে। সে জরিপ অনুযায়ী দেশে নতুন রোগীদের মধ্যে এমডিআরটিবির হার দুই শতাংশের কম।

যক্ষ্মারোগীর সঠিক পরিসংখ্যান নেই
যক্ষ্মা ও কুষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর মো. আশেক হোসেন বলেন, ‘এমডিআর টিবি রোগীদের সঠিক কোনো পরিসংখ্যান এখনো আমাদের দেশে নেই। তবে সারাদেশে প্রায় ১০ হাজার এমডিআর টিবি রোগী রয়েছে। ইতোমধ্যেই এ রোগীর সঠিক সংখ্যা নির্ণয়ে একটি জরিপ কার্যক্রম শুরু হয়েছে।’

তবে তিনি যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সঠিক পথেই এগোচ্ছে বলে জানান। যে চ্যালেঞ্জগুলো আছে তা মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের সমন্বিত উদ্যোগ আরো বাড়ানোর সুপারিশ করেন তিনি।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ লোকে ২২৫ জন যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত। সরকারের মতে, জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির মাধ্যমে ২০১০ সালে দেশে এক লাখ ৫৮ হাজার ২৩৭ যক্ষ্মারোগী সনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। কফে যক্ষ্মা জীবাণুযুক্ত রোগী সনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে এক লাখ ৫ হাজার ২২৩ জন। এক্ষেত্রে সনাক্তকরণের হার মাত্র ৭০ শতাংশ। অর্থাৎ বাকি প্রায় ৩০ শতাংশ রোগীর মাধ্যমে যক্ষ্মা ছড়িয়ে পড়তে পারে রোগী এবং রোগীর আত্মীয়দের অজ্ঞাতে।

জাতীয় বাজেটে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে যক্ষ্মা
‘যক্ষ্মা হলে রক্ষা নাই, এ কথার আর ভিত্তি নাই’- যক্ষ্মা রোগ নিরাময়ে সরকারের এ স্লোগান বহু পুরনো হলেও আন্তরিকতার অভাবে যক্ষ্মা এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধুমাত্র যক্ষ্মা দিবস কেন্দ্রিক কর্মসূচি আর সভা সেমিনারে আলোচনার মাধ্যমেই যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। যক্ষ্মা নির্মূলের জন্য এবং কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানোর জন্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে।

গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর টিবি ড্রাগ ডেভেলপমেন্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী এইচআইভি/এইডসের মতোই যক্ষ্মা প্রাণঘাতী। বিশ্বে ১৫ থেকে ৪৪ বছরের মধ্যে যেসব রোগী মারা যায়, তাদের এক-তৃতীয়াংশই এ রোগের কারণে। তৃতীয় বিশ্বের জন্য যক্ষ্মা আগামী দশ বছরে এমন মৃত্যু হুমকি নিয়ে আসবে যা ওইসব দেশের জাতীয় বাজেটেও বিরূপ প্রভাব ফেলবে। তাদের আশঙ্কা, মোট জিডিপির ৭ শতাংশ অর্থ এ খাতে ব্যয় করতে হবে।

ডটস পদ্ধতিতে অনীহা
ডটস- ডাইরেক্টলি অবজারভড ট্রিটমেন্ট শর্টকোর্স অর্থাৎ সেবাদানকারীর সামনে বসে ওষুধ খাওয়া। বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত এই পদ্ধতি। এ পদ্ধতি বাংলাদেশে চালু হয়েছে ১৯৯৩ সাল থেকে। দেশজুড়ে এনজিওকর্মীরা প্রাথমিকভাবে রোগী বাছাই করে স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছে পাঠান। সেখানে রোগ নির্ণয়ে পরীক্ষা হয়। যাদের রোগ ধরা পড়ে তাদের দেওয়া হয় সরাসরি চিকিৎসা। ছয় মাস ধরে স্বাস্থ্যকর্মীদের সহযোগিতায় একটানা ওষুধ সেবন করতে হয়। যাতে চিকিৎসা সম্পূর্ণভাবে শেষ করা হয় সে জন্যই এ ব্যবস্থা। নচেৎ কিছুদিন ওষুধ খাওয়ার পর যখন রোগী ভালোবোধ করেন তখন ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেন। ফলে ওষুধের কার্যকারিতা কমে যায়। পুনরায় যক্ষ্মা দেখা দেয়। পরের বারের চিকিৎসায় ওই ওষুধগুলো ঠিকভাবে কাজ করে না।

ব্র্যাকের স্বাস্থ্য কর্মসূচির সহকারী পরিচালক মো. আকরামুল ইসলাম বলেন, ‘সনাক্ত হওয়ার পর ওষুধ শুরু করে কয়েক দিন পর একটু ভালো লাগলেই রোগী ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেয়। ফলে যক্ষ্মা নিরাময় সম্ভব হয় না।’

স্থানীয় সরকার বিভাগের দ্বিতীয় আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ার প্রোজেক্টের প্রোগ্রাম কনসালট্যান্ট এম লুৎফুর রহমান বলেন, ‘শহরের ভাসমান জনগোষ্ঠীকে সনাক্ত করা সম্ভব হলেও ছয় মাস নিয়মিত ওষুধ খাওয়ানোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে না। একইভাবে শহরের উচ্চবিত্ত রোগীদের পরিসংখ্যানই জানা সম্ভব হচ্ছে না। কেননা জানাজানির ভয়ে তারা এ কর্মসূচির আওতায় আসছে না। অনেকেই চলে যাচ্ছেন প্রাইভেট ক্লিনিকে ডাক্তারের কাছে। সেখানে রোগীরা নিয়মিত ওষুধ না খেলেও নজরদারির কোনো উপায় নেই। ফলে এমডিআর টিবির ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে।’

বেসরকারি একাধিক উন্নয়ন সংস্থার তথ্য মতে, গার্মেন্টস শ্রমিকদের মধ্যে যক্ষ্মায় আক্রান্তের হার বেশি।
রাজধানীর এক গার্মেন্টস শ্রমিক বলেন, ‘ওষুধ বিনমূল্যে দেয়া হলেও চিকিৎসার জন্য ছয় মাস গিয়ে সামনাসামনি বসে ওষুধ খেতে বিরক্ত লাগে। এছাড়া গার্মেন্টসে অনেকের যক্ষ্মা থাকলেও তারা প্রকাশ করতে চান না। কারণ যক্ষ্মা রোগী জানলে কর্তৃপক্ষ ছাঁটাই করতে পারে।

রোগের লক্ষণ ও উপসর্গ
স্বাস্থ্য অধিদফতর, জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি ও বেসরকারি সহযোগী উন্নয়ন সংস্থা সূত্রে জানা যায়, ফুসফুসে যক্ষ্মা হলে হাল্কা  জ্বর ও কাশি হতে পারে। কাশির সঙ্গে গলার ভিতর থেকে থুতুতে রক্তও বেরোতে পারে। মুখ না ঢেকে কাশলে যক্ষ্মা সংক্রমিত থুতুর ফোঁটা বাতাসে ছড়ায়। আলো-বাতাসহীন অস্বাস্থ্যকর বদ্ধ পরিবেশে মাইকোব্যাক্টেরিয়াম অনেকক্ষণ বেঁচে থাকে।

সাধারণত তিন সপ্তাহের বেশি কাশি হলে যক্ষ্মার উপসর্গ আছে বলে ধারণা করা হয়। এ জন্য চিকিৎসকরা যক্ষ্মা আছে কি-না তা পরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া কাশির সঙ্গে জ্বর, কফ এবং মাঝে মাঝে রক্ত বের হওয়া, ওজন কমে যাওয়া, বুকে ব্যথা, দুর্বলতা ও ক্ষুধামন্দা

ইত্যাদি ফুসফুসে যক্ষার প্রধান উপসর্গ।

যক্ষা ফুসফুস থেকে অন্যান্য অঙ্গেও ছড়িয়ে পরতে পারে বিশেষ করে যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল তাদের এবং বাচ্চাদের ক্ষেত্রে। তখন একে ‘অশ্বাসতন্ত্রীয় যক্ষা’ (Extrapulmonary Tuberculosis) বলা হয়, যেমন কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে, প্রজনন তন্ত্রে ও পরিপাক তন্ত্রে ছড়িয়ে পড়তে পারে। জীবাণু শরীরে ঢুকলেই সবার যক্ষ্মা হয় না। যাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তাদের ক্ষেত্রেই বেশি হয়।

যতদিন বাঁচব যক্ষ্মাকে রুখব
২৪ মার্চ বিশ্ব যক্ষ্মা দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয়- ‘যত দিন বাঁচব যক্ষ্মাকে রুখব’ (স্টপ টিবি ইন মাই লাইফ)। এক সময় বলা হতো যক্ষ্মা হলে রক্ষা নেই। যক্ষ্মা হলে এখন রক্ষা আছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি পাল্টেছে। আধুনিক চিকিৎসায় ছয় মাস নিয়মিত ওষুধ সেবন করলেই যক্ষ্মা সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যায়। এটা প্রমাণীত।

যক্ষ্মা রোগীদের নিয়মিত চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য দেশজুড়ে সরকারিভাবে রয়েছে বিনামূল্যে সম্পূর্ণ চিকিৎসা ব্যবস্থা। এক হাজারেরও বেশি স্থানীয় ল্যাবরেটরি রয়েছে বিনামূল্যে রোগনির্ণয়ের জন্য, আর চিকিৎসার জন্য রয়েছে ডটস কর্নার।

যক্ষ্মা নিরাময়ের জন্য ডটস্ পদ্ধতিতে অনেকের অনীহা থাকলেও চিকিৎসকদের মতে এটাই কার্যকরী পদ্ধতি। এ পদ্ধতি যেসব রোগী মেনেছেন তারা যক্ষ্মা থেকে রক্ষা পেয়েছেন। তাই সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। তিন সাপ্তাহের বেশি কাশি হলে কফ পরীক্ষা করতে হবে। যক্ষ্মার জীবাণু পাওয়া গেলে ডটস্ পদ্ধতিতে চিকিৎসা নিতে হবে। সঠিক পদ্ধতিতে যক্ষ্মার ওষুধ সেবন করলে যক্ষ্মা সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য।

বাংলাদেশ সময় : ০২৫০ ঘণ্টা, মার্চ ২৪, ২০১২

এডিএ/
সম্পাদনা : এইচ এম রাজীব


বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন
মিডিয়া হাউজ, প্লট#৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক#ডি, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ
নিউজরুম মোবাইল ফোন: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯, ০১৭২৯০৭৭৩৩০, ০১৭২৯০৭৬৯৫৪ ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১-২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, news@banglanews24.com (সেন্ট্রালডেস্ক) corr.bn24@gmail.com (কান্ট্রিডেস্ক), editor@banglanews24.com (এডিটর-ইন-চিফ)
বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন       একটি ইডব্লিউএমজিএল প্রতিষ্ঠান       কপিরাইট © 2013 banglanews24.com সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত