banglanews24.com Logo

শফিক হাসান-এর গল্প

প্রতিকূল মোহনায়

13 Oct 2012   05:42:46 PM   Saturday BdST

শফিক হাসান
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

কি যে জ্যাম!
এ জ্যাম ইহজিন্দেগিতে ছুটবে বলে মনে হয় না।
এ এক জটিল সমস্যা ঢাকা শহরের— প্রতিদিন জ্যাম বেড়েই চলেছে। কোটি, অর্ধ-কোটিপতি বাড়ছে— পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গাড়ির সংখ্যাও। প্রাইভেট গাড়ি তো প্রতিদিনই নামছে রাস্তায়। স্ট্যাটাস ফলানো, ঠাঁটবাট দেখানোর জন্য গাড়ি হয়ে উঠেছে অনিবার্য অনুষঙ্গ। ব্যাংকগুলোও গাড়ি কিননেওয়ালাদের পাশে— দিচ্ছে কার লোন। প্রান্তিক মানুষ তথা কৃষকদের কৃষিঋণ দূরে থাক, তারা দিনকে দিন ব্যাংকের চৌহদ্দি মাড়ানোর যোগ্যতাও হারিয়ে ফেলছে। যদিও কৃষির জন্য সরকার স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছে কিন্তু সে ব্যাংকের কার্যকারিতা কতটুকু তা প্রশ্নসাপেক্ষ। এ প্রহসনমূলক ব্যাংকের আদৌ কোনো দরকার আছে কিনা তাও ভেবে দেখার বিষয়।
চারদিকে যখন নব্য কোটিপতিদের মচ্ছব তখন নিত্য নতুন গাড়ি কেনা তো হবেই। উপুর্যুপরি সে গাড়ি রাস্তায় বাড়িয়ে তুলছে যানজট, জনজট। বিরাট প্যাঁজগি।
এসব ভেবে মনে মনে বিরক্ত হচ্ছিলো ইলিয়াস। খারাপ একটা গালি উচ্চারণ করতে গিয়ে সে নিজেকে সামলালো। একা থাকলে কিংবা সাথে কোনো পুরুষ থাকলে হয়তো মনের ঝাল মিটিয়ে গালিটা সে দিতে পারতো। কষ্টে-সৃষ্টে নিজেকে নিবৃত্ত করে সে ফিরলো সহযাত্রী মণিকার দিকে— ‘তুমি কি জানো ঢাকা শহরে কোটিপতির সংখ্যা কত?’
‘হঠাৎ এ প্রশ্ন?’ মণিকার কণ্ঠ থেকে বিস্ময় ঝরে পড়ে।
‘জানো কিনা তাই বলো।’
‘না।’
‘কয়েক হাজার। আগামী কয়েক বছরে কোটিপতি হবে আরো অনেকেই। বৈধ নাকি অবৈধভাবে কোটিপতি হয়েছে এবং হবে সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। মোদ্দা হিসাব, কোটিপতিদের স্ট্যাটাস বাড়াতে গাড়ির উপর, রাস্তার উপর ধকল বাড়বে।’
‘কোটিপতি হলে আপনিও কি গাড়ি কিনবেন না?’
মণিকার এ প্রশ্নে কেমন যেন থমকে যায় ইলিয়াস। ধাতস্থ হয়ে বলে— ‘সমস্যায় ফেলে দিলে। এভাবে তো ভেবে দেখিনি!’
‘কোটিপতি হলে আপনিও গাড়ি কিনবেন এবং এ যানজট বাড়াতে ভূমিকা রাখবেন। এখন যেমন সরকার এবং কোটিপতিদের কষে গালি দিচ্ছেন তখন শুধু সরকারকে গালি দেবেন, অসভ্য দেশ বলে দেশকে গালি দেবেন। এখনকার এবং তখনকার এই কোটিপতিরাই হবে আপনার বান্ধব।’

এসব কথায় ইলিয়াস কেমন যেন বিভ্রান্তিতে পড়ে যায়। কথা বেরোয় না মুখ দিয়ে, পাল্টা কোনো যুক্তিও খুঁজে পায় না। কিন্তু আত্মপক্ষ সমর্থন জরুরি। হয়তো মণিকা যা বলেছে সেটাই সত্য। তার এই হঠাৎ ক্ষেপে যাওয়া অক্ষমের মনোজ্বালা প্রশমন ছাড়া আর কিছুই নয়। ব্যর্থ মানুষের আঙুর ফল টক-জাতীয় ব্যাপার।
ইলিয়াসের কাছ থেকে প্রত্যাশিত উত্তর না পেয়ে মণিকা থমকায়। তবু সে উত্তরের অপেক্ষায় থাকে। যখন পুরোপুরি নিশ্চিত হয় এ-সংক্রান্ত আর কোনো উত্তর কিংবা প্রশ্ন— কোনোটাই আসবে না তখন সে মৃদু খোঁচা মারে— ‘আজকের জন্য কি যুক্তিবাদী সাহেবের মুখে অর্গল পড়ে গেল!’
সামনের গাড়িগুলো কিছুটা নড়ে ওঠে। সেই নড়ে ওঠা অনুসরণ করে ইলিয়াসদের লাক্সারি কোচটাও। কিন্তু হাতদুয়েক গিয়ে আবার থেমে যায়। যথা পূর্র্বং তথা পরং! থেমে যাওয়া গাড়িগুলো থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সে এবার মণিকার দিকে তাকাতে চেষ্টা করে। কিন্তু পরিপূর্ণভাবে তাকাতে পারে না। পাশাপাশি বসার এই এক অসুবিধা। যদিও সিট দুটি যথেষ্ট প্রশস্ত কিন্তু স্বাস্থ্যবান এবং মোটামুটি স্বাস্থ্যবতী পাশাপাশি বসায় এ পরিসরটুকু ঢাকাই পড়ে যায়। তবু ইলিয়াস চেষ্টা করে মণিকার সুন্দর মুখের ততোধিক সুন্দর দুটি চোখের দিকে সরাসরি তাকানোর। বামদিকে একটু সরে চেষ্টা করায় তা অনেকাংশেই সফল হয়। ঠোঁটে হাসির রেখা ফুটিয়ে তোলে ইলিয়াস— ‘প্রকৃত যুক্তিবাদী তো তুমি। যেভাবে আমাকে বোল্ড আউট করে দিলে। তোমার কথা অযৌক্তিক নয়, যথেষ্ট যৌক্তিক। তবু কথা থেকে যায়। তুমি কি ভেবে দেখেছো এসব গাড়ির যাত্রী মোটামুটি একজনই? একাধিক কমই হয়। ফি-দিন সকালবেলা আমরা যখন তথাকথিত সিটিং সার্ভিস বাসগুলোর কাউন্টারের সামনে এতিম শিশুর মতো বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকি তখন এ প্রাইভেট কারগুলোই চোখের সামনে দিয়ে হুশহাশ করে চলে যায়। অনেক ক্ষেত্রেই জ্যাম বাধিয়ে দিতে ভূমিকা রাখে। আরোহীদের ডানে-বামে তাকানোর ফুরসৎ নেই যেন। কোনো গাড়িঅলা কি আজ পর্যন্ত কোনো অপেক্ষমাণ যাত্রীকে লিফট দিয়েছেন? তুমি হয়তো নিরাপত্তার কথা বলবে। কিন্তু এমন কি হয় না, অপেক্ষমাণ যাত্রীদের মধ্যে এদের আত্মীয়স্বজন কিংবা দুই-একজন পাড়াপ্রতিবেশী বা মুখচেনা মানুষও থাকে? আলবৎ থাকবে, গাড়িঅলা মানুষগুলো তো আর আকাশ ফুঁড়ে নামেনি। কিন্তু সহযোগিতা হয়নি, হয় না। গাড়ি নাই এমন কারো সাথে কথা বলাই হয়তো লজ্জার ব্যাপার! প্রেস্টিজ ইস্যু। চেনা-অচেনা, পরিচয়-অপরিচয়ের গণ্ডির সীমারেখার কথা চিন্তা করা বাতুলতা মাত্র।’
‘ইন্টারমিডিয়েট ফাইনালের সময় আমাকে একজন লিফট দিয়েছিলো। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরও যখন গাড়ি পাচ্ছিলাম না...।’
‘সেটা হয়তো তুমি মেয়ে বলেই পেয়েছো। তোমার জায়গায় আমি হলে কি লিফট পেতাম?’
মণিকা কেমন যেন চুপসে যায়। কোনো তিক্ত স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠেছে কিনা কে জানে! ইলিয়াসও আর এ-নিয়ে উচ্চবাচ্য করে না। মিনিট পাঁচেক পর আবার সরব হয় সে— ‘তুমি হয়তো এও জানো না, এ-দেশে এমনও ফ্যামিলি আছে যাদের কিনা ফ্যামিলি সদস্য যতজন গাড়িও ঠিক ততগুলো। ততজন ড্রাইভার পোষেন তারা। পাঁচ বছরের সদস্য হোক কিংবা আশি বছরের। আর যারা একটু বেশি ‘উদার’ তারা তো আয়া, মালি, পিয়নদের জন্যও একটা করে গাড়ি বরাদ্দ।’
‘দুই একটা নজির আমার চোখের সামনেই আছে।’
‘তাহলে বোঝো অবস্থা!’
এবার মণিকা আর কোনো কথা বলে না। হয়তো এ-বিষয়ে কথা বলতে তার আর ভালো লাগছে না। ইলিয়াসও চুপসে যায়। ঘাটায় না ওকে।

প্রথমে কক্সবাজার তারপর সেন্টমার্টিন যাচ্ছে ওরা। দুই জায়গায় তিনদিন তিনদিন করে ছয়দিন। মোটামুটি সপ্তাহের ট্যুর।
অনেকদিন থেকেই ইলিয়াসের লক্ষ্য— লম্বা একটা ট্যুর দেয়ার। কিন্তু এদ্দিন সময় ও সুযোগ হচ্ছিলো না। এবার ভাগ্য সুপ্রসন্ন, দীর্ঘদিন পর মিলে গেল সে সুযোগ। শুধু সুযোগ বললে ভুল হবে, এ-ভ্রমণ সোনায় সোহাগা। উপরি হিসেবে পাওয়া গেছে মণিকার মতো হিট অ্যান্ড হট ভ্রমণসঙ্গী। কথায় বলে না, বীরভোগ্যা বসুন্ধরা— সাহসীদের সুন্দরীভাগ্য ভালো। সেটাই ফলেছে এবার। শুধু সংকোচ ঝেড়ে, একটু সাহসী হতে হয়েছে। সাহসটুকু দেখাতে হয়েছে ভদ্রলোক-ইমেজ ক্ষুণ্নের তোয়াক্কা না করে।
মণিকা হচ্ছে বিশেষ শ্রেণীর মেয়ে। ঢাকা শহরে এসে ‘সুযোগ’ পেয়ে অনেকেই বিলাসী জীবনযাপনে গা ভাসিয়ে দেয়। বিনিময়ে যদি একটু ‘স্যাক্রিফাইস’ করতে হয় তাতেও পিছু হটে না। এ-ধরনের সুযোগ মেয়েদেরই বেশি। তাই সুযোগ পেলে কেউ কেউ রাখঢাকের তোয়াক্কা না করে ভোগবিলাসে মত্ত হয়ে ওঠে। এ-শ্রেণীর মেয়েরা রাজধানীতে আসে পড়াশোনা বা চাকরির সুবাদে। কেউবা পরিবার বা আত্মীয়-বাসার বাসিন্দা। যাদের এ সুযোগ নেই তারা থাকে হল, হোস্টেল, মেস ইত্যাদিতে। মণিকা এসেছিলো পড়াশোনা করতে। কিন্তু বাড়ি থেকে পর্যাপ্ত টাকা যোগান দিতে পারতো না। টিউশনি করে নিজের খরচ নিজে জুগিয়ে চলতে হতো। আটপৌরে জীবনে টানাপোড়েনের কমতি নেই। দুঃসহ জীবনযাপনের নানা বাঁক পেরিয়ে সে যখন দেখলো-বুঝলো একটু-আধটু ছলাকলা, অভিনয় কিংবা প্রয়োজনীয় মুহূর্তে কাপড় খসাতে পারলেই টাকা; তাও ভালো পরিমাণের—তারপর থেকে নমনীয় হতে শুরু করলো মণিকা। প্রথমদিকে দ্বিধা-সংকোচ, পাপবোধ, লৌকিকতা ইত্যাদি ভেতরে ভেতরে খচখচ করলেও বেশিদিন তা স্থায়ী হয়নি। তদ্দিনে সে মজা বুঝে গেছে, পেয়ে গেছে জীবনের রংধনু-স্বাদ।

মণিকার সাথে ইলিয়াসের বন্ধু সুমনের হট রিলেশন। সে সুবাদে এসব ইলিয়াসের জানা। তাছাড়া আড্ডায়ও কখনো-সখনো সুমনের সাথে আসতো মণিকা। হাই হ্যালো বাই পর্যন্ত ছিলো সম্পর্কের পরিধি। গায়ে পড়ে আলাপ করতে রুচিতে বাধতো। এ-যাত্রারম্ভের কয়েকদিন আগে মণিকার সাথে আচানক ইস্টার্ন প্লাজায় দেখা। শপিং করতে কিংবা নিছক বেড়াতে এসেছিলো সে। চোখে চোখ পড়ায় প্রথমে ইলিয়াস ভেবেছিল, এড়িয়ে যাবে। পরক্ষণে কী মনে করে বললো— ‘কেমন আছো?’
‘এই তো ভালো। আপনি?’
‘ভালোই বলা যায়। শপিং করতে এসেছো বুঝি?’
‘হ্যাঁ।’
‘চলো, আমার সাথে কফি খাবে।’
কফি খেতে খেতেই ইলিয়াসের মাথায় দুষ্টু বুদ্ধিটা খেলে যায়। সে বলে— ‘আগামী সপ্তায় আমি কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন যাচ্ছি বেড়াতে। তুমি কি আমার সাথে যাবে?’
‘দেখি।’
‘দেখি বললে তো হবে না। তুমি শিওর করে বললে আমি সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেবো।’
‘কী পদক্ষেপ?’
‘টিকেট-ফিকেট, হোটেল-সংক্রান্ত ঝামেলা আছে বোঝো না?’
‘আচ্ছা, ঠিক আছে। যাবো।’
‘সত্যি বলছো তো?’
‘একশ ভাগ।’
ইলিয়াস ভাবেনি মণিকা এতো সহজে রাজি হয়ে যাবে। সুমন জানলে আবার মাইন্ড করবে না তো! করলে করুক, ওর কেনা জিনিস তো না। এটা মুক্তবাজার অর্থনীতির বিশ্ব। লেনদেনটাই বড় কথা। কার সাথে হলো সেটা বড় কথা না।
মণিকা রাজি হলেও শেষপর্যন্ত যে আসবে কি না— এটা নিয়ে একটু সন্দেহ ছিলো ইলিয়াসের। যদিও বাসের দুটো টিকেটই কেটেছে সে। হোটেলে রুম বুক দেয়ার ঝামেলায় যায়নি। শেষপর্যন্ত যদি না আসে তখন তো অনেকগুলো টাকা গচ্ছা।
নির্ধারিত দিনে বাস ছাড়ার প্রায় আধঘণ্টা আগে কাউন্টারে পৌঁছালো ইলিয়াস। কি আশ্চর্য, পনেরো মিনিট পরেই মণিকা হাজির। নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস হলো না। চোখ দুটো বন্ধ করে আবার তাকালো সে। ওই তো মণিকা— হাস্যোজ্জ্বল মুখে তার দিকে এগিয়ে আসছে। আঁটোসাটো জিন্স প্যান্টের সাথে স্কিন টাইট টি শার্ট, গলায় প্যাঁচানো ওড়না। ওড়নার এক প্রান্ত মিঠুন চক্রবর্তীর গামছা পরা স্টাইলের মতো ঝুলছে বুকের বাম দিকটায়। ওটাও ফ্যাশনেরই অংশ।

ভ্রমণসঙ্গীর বেশবাসের অবস্থা দেখে ভেতরে-ভেতরে ঢোক গিললো ইলিয়াস। মণিকা এগিয়ে এসে হাত বাড়ালো— ‘হাই ইলিয়াস ভাই!’
উষ্ণ হাতের মধুর স্পর্শ নিতে নিতে ইলিয়াসও বললো— ‘হাই!’
তারপর তো যাত্রা শুরু হতে না হতেই জ্যাম। এ-রকম নজরকাড়া সুন্দরীর সাথে পাশাপাশি সিটে বসে কোথায় একটু পুলকবোধ করবে তা-না উল্টো মাথা গরম! সাতসকালে রাস্তাঘাটের এমন বেহাল অবস্থা দেখে মাথা গরম হওয়াই স্বাভাবিক। মণিকা সম্ভবত ইচ্ছা করেই বেশ কয়েকবার ইলিয়াসের গায়ে-হাতে স্তনের স্পর্শ দিয়েছে কিন্তু তাতে এতোটুকু উদ্দীপ্ত হয়নি সে। মেজাজ ঠিক থাকলে এটাই হতো বিশাল ব্যাপার। এখন স্বয়ং বিপাশা বসু এসেও যদি সামনে দিগম্বরনৃত্য করে মেজাজের হেরফের হবে বলে মনে হয় না।
দুঃসহ সময় গড়িয়ে যায়। পাথর সময় স্থির হয়ে থাকে...।
জ্যামে আটকাবস্থায় তিল তিল করে বাস এগোয়। ঘণ্টাখানেক পর পৌঁছায় কাচপুর ব্রিজে। তারপর পালে লাগে নতুন হাওয়া। তুফানগতিতে গাড়ি এগিয়ে চলে। জানালা দিয়ে বয়ে আসা বাতাস ধাক্কা মারে। চুল এলোমেলো করা সে বাতাস মনে বুলিয়ে দেয় প্রশান্তির ছোঁয়া।
জানালার পাশে বসেছে মণিকা। তার দৃষ্টি বাইরে নিমগ্ন। কখনো দূর আকাশে, সবুজ ধানক্ষেতে, কখনো বা অসীম নীলিমায়। হঠাৎ কী মনে করে বাইরে থেকে মন ফেরায় সে। মুখটা সোজা করে বসে। ডান হাতটা রাখে ইলিয়াসের হাতের উপর— ‘ইলিয়াস ভাই, কিছু বলছেন না যে!’
‘কী বলবো, বলো?’
‘বারে, কতকিছুই তো বলা যায়। আর আপনি কী বলবেন সেটা কি আমি জানি!’
‘আসলে আমি দেখছি।’
‘কী?’
‘তোমাকে।’
‘আমাকে আবার দেখার কী আছে?’
‘তুমি খুব সুন্দর।’
এ-কথায় মণিকা যেন কিঞ্চিত লজ্জা পায়। লাজরাঙা মুখে বলে— ‘যাহ!’
‘সত্যি বলছি।’
হাতের উপর রাখা মণিকার পেলব হাতটা নাড়াচাড়া করতে থাকে সে। কী তুলতুলে!
আবার নিঃসীম নৈঃশব্দ্য। ইলিয়াস ভেবে পায় না, কথারা আজ কোথায় হারালো। এই প্রথম কোনো আগুনসুন্দরীকে নিয়ে সে দূরপাল্লার ভ্রমণে যাচ্ছে, তার তো এখন চাঙ্গা থাকার কথা। সুন্দরী মেয়েদের সাথে নাকি কথা বলার বিষয়ের অভাব হয় না। এর অন্যতম কারণ, মেয়েরা গভীর করে কোনো কিছু ভাবে না। গৃহস্থালির টুকিটাকি, রূপচর্চা, পরচর্চার মধ্যেই তাদের জগৎ সীমিত। কোনো সিনেমা তারকা নিয়েও দীর্ঘক্ষণ আলাপচারিতা চালিয়ে যাওয়া যায়। একটু ন্যাকা ন্যাকা, সস্তা মনোভাব নিয়ে বলতে হবে— এই যা। সবচেয়ে ভালো হয় এভাবে আলাপ শুরু করলে— ‘তোমাকে তো আজকে বেশ সুন্দর লাগছে। এই সৌন্দর্যের গোপন রহস্য কী? ...এটা কোন ব্র্যান্ডের লিপস্টিক, কোন কোম্পানির পারফিউম?’
কেন যেন তেমন কিছুই হচ্ছে না। যাত্রারম্ভে মেজাজ বিগড়ে গিয়েছিলো, সেই বিগড়ানো ভাবের প্রভাব তবে কি এখনো চলছে? হবে হয়তো। অথবা অন্যকিছু। যদিও ইলিয়াস কিছুই ভেবে পায় না। নীরবে নিস্তব্ধতায় কেটে যায় প্রহর। ভাগ্যও অনুকূলে, কঠিন কোনো জ্যামে পড়তে হয়নি।

বাস এসে থামে কুমিল্লা বিশ্বরোডের একটি হোটেলের সামনে। ক্ষণিক যাত্রা বিরতি। যাত্রী এবং বাসের লোকজন খাবারদাবার এবং আনুষঙ্গিক কাজ সেরে নেবে এ-সময়টুকুতে। অন্য যাত্রীদের সাথে নামে ইলিয়াস-মণিকাও। ইলিয়াসের বাথরুম সারা জরুরি, সেই কখন থেকে তলপেট জলভারে ভারী হয়ে আছে। তড়িঘড়ি করে চাপমুক্ত হয় সে। হোটেলের টেবিলে এসে বসে। ততক্ষণে চলে এসেছে মণিকাও। মেয়েরা ফ্রেশ হতে একটু বেশিই সময় নেয়। মণিকা এতো তাড়াতাড়ি কিভাবে সারলো কে জানে!
ফ্রেশ হওয়া ছাড়া এ-এলাকার হোটেলুগলোর সাথে ইলিয়াসের সম্পর্ক নেই বললেই চলে। এ-রকম প্রায় প্রতিটা ‘বিলাসবহুল’ হোটেলের প্রবেশমুখে কিংবা রাস্তার অপর পাড়ে এক বা একাধিক টং দোকান থাকে। এগুলোতেই বেছে বেছে যায় সে। চা এবং নাস্তাপানির দাম নিজেদের এলাকার মতোই। ধরাছোঁয়ার মধ্যে। অথচ কয়েক কদম ভিতরেই বড় পরিসরের আধুনিক হোটেলে, যেগুলোর আবার চটকদার নাম। দামও গলাকাটা। চার টুকরা মাংস খাইয়ে পুরো গরুর দামটাই কেটে রাখে! এক কাপ চা খাইয়ে পুরো এক কেজি চা পাতার দাম তো নেয়ই, যাতায়াত ভাড়াটুকুও কেটে রাখে। এই হচ্ছে অবস্থা। ধারালো ছুরি দিয়ে খদ্দেরের গলা কাটবে না, কাটবে ভোঁতা ছুরি দিয়ে— যা শালা, ছটফট করে কষ্ট পেয়ে মর!
বাস কর্তৃপক্ষও বদের হাড্ডি, বেছে বেছে এ হোটেলগুলোর সামনেই থামবে। একাধিক জনের কাছে শুনেছে ইলিয়াস— এখানে গাড়ি পার্কিং করলে পরিবহন শ্রমিকদের খাওয়া ফ্রি। বেশ কয়েকবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখেও সে কোনো পরিবহনের লোককে বিল দিতে দেখেনি। এতে করে শোনা কথাটাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অব্যবস্থাপনা দেখার বা কিছু করার কেউ যেন নেই। যার যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই চলবে। ‘পবিত্র’ ব্যবসায় বাধা দিয়ে কে আর ‘মুরতাদ’ হতে চায়! একাধিকবার অদৃশ্য ছুরির ঘাই খাওয়ার পর শরীরে বিপ্লব টগবগিয়ে উঠলে বেশ ক’বার পরিকল্পনা করেছে সে— সব কটা গলাকাটা হোটেলের বিরুদ্ধে মামলা করে দেবে। গ্রাহক হয়রানির মামলা। কিন্তু টিপিক্যাল বাংলাদেশির রক্ত— খুব বেশিক্ষণ টগবগানি থাকে না। ঘরের খেয়ে কেইবা উটকো ঝামেলায় পড়তে চায়। আজ সাথে মণিকা না থাকলে যথারীতি ঝুপড়ি দোকানেই যেতো ইলিয়াস। কিন্তু মণিকাকে নিয়ে ও-সব দোকানে কিভাবে যায়; কেমন করে ‘ছোটলোকিপনা’ করে! তাছাড়া সুন্দরী মেয়েদের সামনে উদার, দিলদরিয়া, খরুচে স্বভাব দেখাতে হয়— এটা অলিখিত আইন! অন্যথা হলেই সমস্যা।

০২.
বাস কক্সবাজার পৌঁছালে বিকালে, ঘড়ির কাঁটা যখন চারের ঘরে যাওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টা করছে। সৈকত এলাকা উপচে পড়ছে মানুষে। নানান কিসিমের মানুষ। দেশের সব মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়েছে যেন এখানটায়। এতো বেশি গাড়ি এসেছে যে, পার্কিং প্লেসে জায়গা না হওয়ায়ই বোধহয় সেগুলো সারিবদ্ধভাবে রাস্তার উপর দাঁড় করানো। চারদিক গিজগিজ করছে পর্যটক।
কালো মানুষ।
ফর্সা মানুষ।
শ্যামলা মানুষ।
শিশু কিশোর তরুণ বৃদ্ধ।
কেউবা সপরিবারে, কেউ সবান্ধব।
প্রেমিক-প্রেমিকা।
নবদম্পতি।
স্বদেশি-বিদেশি।
নানা বয়সের, নানা কিসিমের মানুষ।
রঙের মানুষ।
ঢঙের মানুষ।
শুধু মানুষ আর মানুষ।
অবস্থা দেখে ইলিয়াস ঘাবড়ে গেল। হোটেলে সিট-টিট পাওয়া যাবে তো? আগাম বুকিং না দিয়ে তাহলে তো ভুলই হয়ে গেল। এখন সিট পাওয়া না গেলে সমূহ বিপদ। বিপদের উপর মহাবিপদ। এমনিতে ভেতরে ভেতরে তেতে আছে সে।
কপাল ভালো বলতেই হবে, প্রথম দানে রুম পেয়ে গেল। ডাবল বেড, সিঙ্গেল রুম। রিসেপশনে নাম লেখালো স্বামী-স্ত্রী হিসেবে। রুমে ব্যাগ-ট্যাগ রেখে, ফ্রেশ হয়ে বেরুলো ইলিয়াস। সাথে মণিকাসুন্দরী।
সৈকতে যেতে হবে। সূর্যাস্তের বোধহয় আর বেশি বাকি নেই। যদিও আজ সৈকতে যাওয়ার কিংবা সূর্যাস্ত উপভোগের কোনো তাড়া অনুভব করছে না সে। অবচেতন মন হয়তো বলছে, এ-সময় বাইরে না গিয়ে হোটেলেই অবস্থান করতে। সাথে নিয়ে আসা টসটসে একটি নারীদেহ— তার বস্ত্রোন্মোচন এবং রহস্যোন্মোচন...। সবটুকুর দখল নিতে হবে, একত্রে। দেরি করলে কেবলই দেরি হয়ে যায়!

মণিকার হাত ধরে সৈকতের উদ্দেশে রওনা হয় ইলিয়াস। এতো লোক যে স্বস্তিতে হাঁটাও যায় না। কেবলি বাধা-বিপত্তি। থেমে-থেমে চলা। এ জন-অরণ্যেই মণিকার ঠোঁটে গাঢ় চুমু খায় ইলিয়াস।
মণিকা নাকিসুরে বলে— ‘ওহ্ ই-লি-য়া-স ভা-ই, আপনি যে একটা কী?!’
ইলিয়াস হাসে— ‘কী, বলো তো?’
‘অধৈর্য মানুষ। ধৈর্য-সহ্য নাই!’
‘আচ্ছা, আর দেবো না।’
‘না না দিতে না করিনি। এতো মানুষ চারপাশে, কে দেখে ফেলে মাইন্ড করে বসে...।’
‘এতোকিছু কেউ দেখে না, দেখলেও গায়ে মাখে না।’
‘এসব বিষয়ে আপনার অভিজ্ঞতা কি অনেক?’
‘নাহ্। আজই প্রথম অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের পথে নামলাম।’
সূর্যাস্তের এখনো বাকি আছে। ইলিয়াস জলবিহারে নামে, মণিকাকে বগলদাবা করে। যদিও মণিকা নামতে চায়নি। আগামীকালের দোহাই দিয়েছে। কিন্তু ইলিয়াস সে অজুহাত মানবে কেন? সমুদ্র এবং যৌবনবতী নারী— একটি আরেকটির পরিপূরক। দুয়ের মিলনেই যেন পরিপূর্ণ একটি ধারা তৈরি হয়।
ইলিয়াস জলকেলি করে, মণিকা জলকেলি করে। ইলিয়াস-মণিকা জলকেলি করে। ডুবসাঁতার কাটে। জলকেলির ছলে ইলিয়াস ছুঁয়ে দেয় মণিকার ওষ্ঠ, কপাল, চুল, বুকসহ নানা গলি উপগলি। কিছুটা ইচ্ছায়, কিছুটা অনিচ্ছায়। সাগরে ঢেউয়ের দাপাদাপি। শুরুতে নামতে অনিচ্ছা প্রকাশ করলেও মণিকা উচ্ছ্বল হয়ে ওঠে। উচ্ছ্বল থেকে উচ্ছ্বলতর। ওর বালিকাসুলভ আচরণে মজা পায় ইলিয়াস। ভালোও লাগে। এমন আনন্দ-উচ্ছ্বাসমাখা মুখ দেখে ভালো না লেগেই বা উপায় কী!
সমুদ্রস্নানরত অবস্থায়ই তারা সূর্যাস্ত উপভোগ করে। এক সময় সূর্য ডুবে যায়। পশ্চিমাকাশে থেকে যায় লালিমা। সে লালিমায়, দূর দিগন্তপানে তাকিয়ে মন ভালো হয়ে যায়। সাধুসন্ত কিংবা বিবাগী হয়ে যেতে ইচ্ছে করে।
একটু পরেই অন্ধকার নেমে আসবে। বেশিক্ষণ সাগরে থাকা নিরাপদ না। উপরে উঠে আসে ওরা। বেশি দাপাদাপির জন্যই কিনা কে জানে, মণিকা কেমন যেন নেতিয়ে পড়েছে। সে মাথা এলিয়ে দিয়েছে ইলিয়াসের বুকে। হাঁটছে ঠিকই, কিন্তু শরীরের অধিকাংশ ভার ইলিয়াসের উপরই। দেখে ওর প্রতি ইলিয়াসের মন কোমল ভালোবাসায় ভরে যায়। আহা, বেচারীর কী অসহায় আত্মসমর্পণ। কী পরম নির্ভরশীলতা স্বল্প পরিচিত একজনের প্রতি।

হোটেলে ফিরে ফ্রেশ একটা গোসল দেয়। ব্যাস, নিমেষেই চাঙ্গা। মণিকার মধ্যেও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। ডিনার করার উদ্দেশে বেরোয় ওরা। ভালোই ক্ষুধা পেয়েছে।
মণিকা কেন যেন তেমন কিছুই খায় না। প্লেটে ভাত-তরকারি মিশিয়ে নাড়াচাড়া করে কেবল। দেখে ইলিয়াস মন্তব্য করে—‘কোনো সমস্যা?’
মণিকা না-সূচক মাথা নাড়ে।
‘তাহলে খাচ্ছো না যে?’
‘ইচ্ছে করছে না।’
‘ঠিক আছে, আমি খাইয়ে দিচ্ছি।’
ইলিয়াস লোকমা ধরে খাইয়ে দেয়। মণিকাও কোনো আপত্তি ছাড়াই লক্ষ্মী মেয়ের মতো খেয়ে চলে। তা দেখে পাশের টেবিলের দুই একজন হয়তো মজা পায়। কিছুক্ষণ পরপর ওদের এদিকে তাকানো, কৌতূহলী মনোভাব দেখে তাই মনে হয়। ওরা হয়তো ধরে নিয়েছে— নবদম্পতি। মধুচন্দ্রিমায় এসেছে। ওয়েটার নির্বিকার। এসব দেখে দেখে সম্ভবত সে অভ্যস্ত। তাছাড়া একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়ে নজর দেয়া তাদের বিজনেস রুলেও পড়ার কথা না।

হোটেল থেকে বেরিয়ে মণিকা বায়না ধরে— ‘ইলিয়াস ভাই, চলুন বার্মিজ মার্কেটে যাই।’
‘কাল যাবো। আজ চলো, রেস্ট নিই।’
‘চলুন না, আমি রূপচর্চার জন্য কিছু চন্দনমাটি কিনবো।’
‘বললাম তো কাল হবে।’
‘ওহ্ ইলিয়াস ভাই...।’
সে ইলিয়াসের হাত ধরে টানতে থাকে। অবুঝ কিশোরী যেন, ওর কথা না শুনলে অভিমানে গাল ফুলিয়ে থাকবে।
শেষমেষ ইলিয়াস বিরক্ত হয়ে বলে— ‘যেতে হলে তুমি একলা যাও। আমার ভালো লাগছে না। এখন ধুমসে ঘুম দেব।’
এ-কথায় মণিকা কেমন যেন মিইয়ে যায়। বায়না ধরার সাহস হারিয়ে ফেলে।
নিঃশব্দে অনুসরণ করে সে ইলিয়াসাকে।
হোটেলে ফিরেই পোশাক ছাড়ে ইলিয়াস। যুগপৎ বিছানা ও মণিকা টানছে তাকে।
এমনও হতে পারে, মণিকাই টানছে, বিছানা উপলক্ষ মাত্র।
মণিকাও পোশাক ছাড়ে। উন্মোচিত হয় তার অঙ্গসৌষ্ঠব। স্বল্পবসনা মণিকার দিকে বুভুক্ষু চোখে তাকিয়ে থাকে ইলিয়াস। সেটা লক্ষ করে মণিকা বলে— ‘কী দেখছেন অমন করে?’
‘তোমাকে।’
‘আবারো সেই পুরোনো সংলাপ?’
‘আসলে তুমি খুব... তুমি খুব... থাক, বলবো না!’
মণিকা এসে বসে ইলিয়াসের পাশে— ‘বলেন না ইলিয়াস ভাই?’
ইলিয়াস ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে যেন বলে। শুনে মণিকা কটাক্ষ করে— ‘আপনি না খুব অসভ্য!’
‘অসভ্যতার কতটুকু দেখেছো তুমি?’
ইলিয়াসের যেন আর তর সয় না। উঠে গিয়ে চুমু খায় মণিকার ঠোঁটে গালে কপালে পীনোন্নত পয়োধরে। অবশিষ্ট বস্ত্র হরণ করতে তৎপর হয় ওর হাত। মণিকা সুড়ুৎ করে সরে যায়— ‘ইলিয়াস ভাই, আজ না।’
‘কেন আজ কী হয়েছে?’
‘একটা সমস্যা আছে।’
মণিকার ঠোঁটে ঝলমলে হাসি। সে হাসি অনেকটা রহস্যময়।
‘দৈনিক সাপ্তাহিক পাক্ষিক মাসিক দ্বিমাসিক-জাতীয় কোনো সমস্যা?’
‘সে-রকম কিছু না।’
‘এতো ছিনালি করো না তো!’
ইলিয়াস মণিকার হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দেয়। নিজেকে সামলাতে না পেরে মণিকা আছড়ে পড়ে ইলিয়াসের বুকে। শুরু হয় ইলিয়াসের দক্ষ হাতের নিপুণ কাজ। মণিকাও জোরালোভাবে বাধা দেয় না। নিজেকে সমর্পণই করে...।

০৩.
পরদিন ইলিয়াসের ঘুম ভাঙে সকাল এগারোটা নাগাদ। পাশের সিটটা খালি। মণিকা নেই। প্রথমে ভাবে, বাথরুমে গেছে। কিন্তু বাথরুমও খালি আবিষ্কার করে। ওর উঠতে দেরি দেখে বোধহয় মণিকা একাই সৈকতে চলে গেছে। অবশ্য দেরি হবে না-ই বা কেন, গতরাত ব্যস্ততা তো আর কম যায়নি! মোট কতবার উপগত হয়েছে সে— একবার দুইবার তিনবার...? সঠিক হিসাব খুঁজে পায় না। উন্মত্ত মানুষ কি আর হিসাবনিকাশ রাখতে পারে! রাতের কথা স্মরণ করে ওর ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে ওঠে।
ক্ষুধা পেয়েছে, মণিকাকে ছাড়া কিভাবে খায়। রওনা হয় সৈকতমুখো। হাঁটতে হাঁটতে হয়তো মণিকার দেখা পেয়ে যাবে।
সৈকতে পা রেখেই একটু থমকায় ইলিয়াস। এক জায়গায় অনেক মানুষের জটলা। যদিও কালকের মতো অত মানুষজন নেই। সৈকত অনেকটা ফাঁকা-ফাঁকা। কিন্তু জটলাটা কিসের? সে এগিয়ে যায়। হুজুগে বাঙাল বলে কথা। নইলে যে মন শান্ত হবে না। ভিড় ঠেলে ঠেলে এগোয় জটলার দিকে। একটা মৃতদেহ পড়ে আছে।
কোনো এক হতভাগিনীর।
আরেকটু এগিয়ে যায় ইলিয়াস।
আরো একটু।
মৃতদেহের ঠিক কাছাকাছি।
সে চমকায়।
এবং চমকায়।
ক্রমশ চমকিত হতে থাকে।
মণিকা!
মণিকার লাশ পড়ে আছে!
কিন্তু এ কী করে সম্ভব?
কিভাবে...?
ওই তো ওর পরনে কালরাতের পোশাকটাই।
গোলাপিরঙ থ্রি পিস।
গলার কাছটা কালচে হয়ে ফুলে আছে।
ইঞ্চি দুয়েক জায়গাজুড়ে ফুলে ওঠা দাগ।
সম্ভবত পরিকল্পিতভাবে কেউ ওকে খুন করেছে।
ওড়না কিংবা মাফলার-জাতীয় কিছু গলায় পেঁচিয়ে।
শ্বাসরোধ করে।
কিন্তু কে মণিকাকে খুন করবে, কার সাথে ওর শত্রুতা?
আর ভাবতে পারে না সে।
সবকিছু যুক্তির বাইরে চলে যাচ্ছে।
হিসাবে গরমিল হচ্ছে।
ওর ভিতর থেকে কেউ একজন সতর্কবাণী দেয়— পালাও!
বাঁচতে চাইলে পালাও।
পালাতে হবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়তো জানাজানি হয়ে যাবে।
থানা থেকে পুলিশ আসবে।
কেলেঙ্কারি, মহা কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।
এসব কিসের আলামত, এ মুসিবত কোত্থেকে এসে ঘাড়ে পড়লো।
লাইফটা যে কোন দিকে মোড় নেবে। ছত্রখান হয়ে যাবে কিনা কে জানে।
ভাবনাচিন্তা কিংবা যুক্তি খোঁজার সময় নয় এখন। পালাতে হবে।
পালাও যুবক।
পালাও কামুকপুরুষ।
পালাও। দ্রুত।
পালাও...।
জলদি।

০৪.
হোটেলে ফিরে সে নিজের জিনিসপত্র তো নেয়ই, মণিকার জিনিসপাতিও ভরে নেয় ব্যাগে।
কোনো প্রমাণ রাখা যাবে না।
মোটেই না।
হিমালয়-ভার বুকে নিয়ে, নিজেকে প্রাণপণ স্বাভাবিক রেখে হোটেল থেকে বেরোয় সে।
ভিতরে চিন্তাঝড় থামে না— কী হলো, কেন হলো, কে ঘটালো এমন অকাণ্ড?
ছিঃ দুর্বৃত্ত, ছিঃ। ধিক।
ভিতর থেকে আবার সতর্কবাণী আসে— পালাও পতিতপুরুষ। বেঁচে থাকলে ভাবনার বিস্তর সময় পাবে।
কোন ফাঁকে যে বাস কাউন্টারে আসে, টের পায় না। টিকেট কেটে বাসে প্রবেশ করে। মিনিট পনেরো পরেই বাস ছাড়বে।
টিকেটের সাথে মিলিয়ে আসন খোঁজে সে। সিট নম্বর— এফ ফোর।
জানালার পাশে।
ওর নির্ধারিত সিটেই একজন তরুণী বসে।
দৃষ্টি বাইরে বলে মুখ দেখা যাচ্ছে না।
ইলিয়াস ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করে— ‘এক্সকিউজ মি, ঐ সিটটা আমার।’
তরুণী মাথা ঘুরিয়ে তাকায়।
এটুকুই।
কোনো ভ্রূক্ষেপ না করে আবার বাইরে দৃষ্টি রাখে সে।
আগের মতো, যেন কিছুই শোনেনি।
সামান্য চাহনি, একটু মুখদর্শনেই পিলে চমকানোর দশা ইলিয়াসের।
মণিকা!
মণিকা এখানে কিভাবে এলো?
তাহলে সৈকতে কার মৃতদেহ দেখে এলো!
তরুণীর পাশের সিটেই ধপাস করে বসে পড়ে ইলিয়াস।
থমকে যায় ভাবনাপ্রবাহ।
কী হচ্ছে এসব, কেন হচ্ছে, কীভাবে হচ্ছে?
পাশের এই তরুণী কি আসলেই মণিকা, নাকি মণিকার মতো দেখতে কেউ?
ভাবনা আড়ষ্ট হয়ে যায়।
ইলিয়াসের শরীরও কেমন যেন আড়ষ্ট।
বাতাসও বোধহয় থমকে আছে।
কী অদ্ভুতুড়ে কাণ্ডরে বাবা!
মাথা কাজ করছে পারছে না বলে ইলিয়াস স্মরণ করতে পারে না, কাল সমুদ্রস্নান শেষে সে স্থানীয় এক ফটোগ্রাফারকে দিয়ে ছবি তুলিয়েছিলো। আজ ডেলিভারি আনার কথা। এই ছবিগুলোর সন্ধান বেরিয়ে পড়লে বড় কোনো অঘটনে জড়িয়ে পড়া বিচিত্র নয়।
তার আগে জানা দরকার, পাশে বসা এ-কে? এ-কোন মানবী।
মণিকা নাকি অন্য কেউ...।

বাংলাদেশ সময় : ১৭৩০ ঘণ্টা, ১৩ অক্টোবর, ২০১২
সম্পাদনা : তানিম কবির, tanimkabir@gmail.com


বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন
মিডিয়া হাউজ, প্লট#৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক#ডি, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ
নিউজরুম মোবাইল ফোন: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯, ০১৭২৯০৭৭৩৩০, ০১৭২৯০৭৬৯৫৪ ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১-২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, news@banglanews24.com (সেন্ট্রালডেস্ক) corr.bn24@gmail.com (কান্ট্রিডেস্ক), editor@banglanews24.com (এডিটর-ইন-চিফ)
বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন       একটি ইডব্লিউএমজিএল প্রতিষ্ঠান       কপিরাইট © 2013 banglanews24.com সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত