banglanews24.com Logo

নিরাপত্তা জোরদার

শংকার মধ্যেও দুর্গাপূজার জোর প্রস্তুতি চট্টগ্রামে

13 Oct 2012   06:50:00 PM   Saturday BdST

রমেন দাশগুপ্ত, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

চট্টগ্রাম: রামু এবং পটিয়ায় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় মনের মধ্যে শংকা থাকলেও সেই শংকা নিয়েই নিজেদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার জোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন চট্টগ্রামের হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। মন্ডপে মন্ডপে এখন চলছে উৎসবের শেষ মুহুর্তের প্রস্তুতি। তুলির আঁচরে প্রাণ পাচ্ছে দুর্গাপ্রতিমা।  

এদিকে শংকা থাকলেও জনবল সংকটের কারণে তেমন বাড়তি কোন নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে পারেনি পুলিশ। তবে তুচ্ছ অজুহাতে, পরিকল্পিতভাবে ইস্যু বানিয়ে পূজামন্ডপে হামলার আশংকায় দুর্গাপূজা শুরুর আগের দিন থেকে এক সপ্তাহ বিশেষভাবে সতর্ক থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পুলিশ।

বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে না পারার কথা স্বীকার করে নগর পুলিশ কমিশনার মো.শফিকুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, ‘নিরাপত্তার ব্যবস্থা গতবার যেমন ছিল এবারও তেমন। জনবল সংকটের কারণে আমরা ফোর্স বাড়াতে পারিনি। তবে যেহেতু আমাদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য আছে পরিকল্পিকতভাবে সংঘাতের সৃষ্টি হতে পারে, তাই আমাদের সব অফিসার এবং থানার ওসিদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উত্তর) ফরিদ উদ্দিন বাংলানিউজকে বলেন, ‘রামু-পটিয়ার অনাকাঙ্খিত ঘটনার পর দুর্গাপূজায়ও এ ধরনের কিছু ঘটার আশংকা করা অমূলক নয়। তবে আমাদের ইচ্ছা থাকলেও প্রত্যেক পূজামন্ডপে আমরা পুলিশ ফোর্স দিতে পারছিনা। তবে পুলিশী টহল গতবারের চেয়েও জোরদার থাকবে।’

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নগরীতে এবার ৭০টি পূজামন্ডপ এবং জেলায় শতাধিক পূজামন্ডপকে নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সাধারণত মসজিদের পাশের মন্ডপ, কয়েক লাখ টাকা বাজেরটর মন্ডপ, গ্রামাঞ্চলে দুর্গম এলাকার মন্ডপগুলোকে পুলিশ নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) মোস্তাক আহমেদ বাংলানিউজকে জানান, নগরীর প্রতিটি পূজামন্ডপে দু’জন করে পুলিশ সদস্য এবং ৫ থেকে ৭ জন করে আনসার সদস্য মোতয়েন থাকবে। ঝুঁকিপূর্ণ মন্ডপগুলোতে সর্বোচ্চ চারজন পর্যন্ত পুলিশ ফোর্স দেয়া হবে। পূজামন্ডপের আশপাশে সার্বণিকভাবে মোবাইল টিম থাকবে।

স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বাড়তি নিরাপত্তা দিতেও অতিরিক্ত প্রায় আড়াই হাজার ফোর্স মোতায়েন করতে হচ্ছে সিএমপিকে। আর অতিরিক্ত এসব ফোর্স আনা হচ্ছে এপিবিএন এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ থেকে।

অন্যদিকে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) রবিউল ইসলাম বাংলানিউজকে জানান, থানা এবং ফাঁড়ির স্বাভাবিক পুলিশের বাইরে অতিরিক্ত প্রায় দু’হাজার পুলিশ এবার পূজায় নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে। আর সব অতিরিক্ত পুলিশই জেলার বিভিন্ন স্থানে, গ্রামেগঞ্জে টহলের দায়িত্বে থাকবেন বলে তিনি জানান।

পুলিশ ও পূজা উদযাপন পরিষদের নেতাদের সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামে এবার এক হাজার ৬৭৩টি মন্ডপে দুর্গাপূজা হবে। এর মধ্যে নগরীর ১২টি থানার অধীনে পূজা হবে ২৩৫টি। আর চট্টগ্রামের ১৪ উপজেলায় পূজা হবে এক হাজার ৪৩৮টি।

আগামী সোমবার মহালয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হচ্ছে দেবীপক্ষ। এরপর ২০ অক্টোবর শনিবার হবে দেবীর বোধন। ২৪ অক্টোবর হবে দেবীর বিসর্জন।  

নগরীর সদরঘাট, দেওয়ানজী পুকুর পাড় ও গোয়ালপাড়ায় কয়েকজন কারিগরের কারখানায় ঘুরে দেখা গেছে, পূজার জন্য গড়া মায়ের মূর্তি সাজাতে এখন চট্টগ্রামের মৃৎশিল্পীদের চোখে ঘুম নেই। নগরীর বিভিন্ন মৃৎশিল্পী পাড়ায় রংতুলির আঁচড়ে প্রাণ পাচ্ছে মায়ের প্রতিমা। পরানো হচ্ছে শাড়ী, গয়নাগাটি। মাটির তৈরি নির্জীব মূর্তি এবার মৃৎশিল্পীদের রংতুলির ছোঁয়ায় জীবন্ত হয়ে উঠছে।

সাধারণত কারিগররা এবার বানিয়েছেন দু’ধরনের মূর্তি। এর মধ্যে আছে অজন্তা ধাঁচের মূর্তি যেগুলো ওরিয়েন্টাল প্রতিমা হিসেবে পরিচিত। আবার চিরায়ত বাঙালী নারীর রূপের প্রতিমাও আছে।

সদরঘাটের মৃৎশিল্পী মহাদেব পাল জানালেন, অজন্তা ধাঁচের মূর্তির চাহিদা এখন বেশি। এ ধরণের মূর্তিতে শাড়ি, অলংকার ও অঙ্গসজ্জা সবই করা হয় মাটি ও রঙ দিয়ে।

বাংলা প্রতিমায় শাড়ি, অলংকার, সাজসজ্জার উপকরণ আলাদাভাবে কিনে নিতে হয় বলে অজন্তার চাহিদা বেশি বলে তিনি জানান।

নগরীর দেওয়ানজী পুকুর পাড়ে বিখ্যাত প্রতিমা কারিগর রাধাশ্যাম পালের ‘রূপশ্রী’ কারখানায় তৈরি হয় চট্টগ্রামের সব বড় মন্ডপের প্রতিমা। তার ছেলে রতন পালই এ কারখানার মূল কারিগর।

রতন পাল জানালেন, এবছর তারা মোট ৩৩টি প্রতিমা তৈরি করেছেন। তাদের তৈরি প্রতিমার মধ্যে মূল আদলের বাইরে ভিন্ন ধাঁচের প্রতিমাও আছে। মূলত আয়োজকদের চাহিদার কথা মাথায় রেখেই মূল আদলের বাইরে প্রতিমা তৈরি করতে হয় বলে তিনি জানালেন।

এদিকে নগরী ও জেলার বিভিন্ন স্থানের পূজামন্ডপগুলোতেও এখন চলছে আয়োজনের শেষ মুহুর্তের প্রস্তুতি। বানানো হচ্ছে মন্ডপ, তোরণ। বিভিন্ন জায়গার পাকা মন্দিরগুলো রং আর কাপড়ের বাহারি সাজে সাজছে। গান, নাচ, আরতি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটকের মধ্য দিয়ে বর্ণিলভাবে উৎসব পালনের জন্য চলছে বিরামহীন প্রস্তুতি।

প্রতি বছরের মত এবারও ভিন্ন ধরনের চমক নিয়ে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে নগরীর হাজারী লেইনে। ‘মহাকাশে মায়ের আবির্ভাব’ এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে তারা পূজার আয়োজন করেছে।

হাজারী লেইন পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি ও কাউন্সিলর জহরলাল হাজারী বিশেষ আয়োজনের কিছু বর্ণনা দিয়েছেন বাংলানিউজের কাছে। তার বর্ণনায়, মহাকাশে ঘুরছে নানা গ্রহ-উপগ্রহ, চারপাশে মহাজাগতিক আলো। মাঝে মাঝে উড়ে যাচ্ছে মহাকাশযান। এমন আবহেই ভূমিকম্প হবে আর আর্বিভূত হবেন দেবী দূর্গা।  

তিনি জানান, এবার হাজারী লেইনে পূজার জন্য মোট বাজেট ধরা হয়েছে ১৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৮ লাখ টাকা খরচ হবে শুধু মায়ের প্যান্ডেল তৈরিতেই। এবার হাজারী গলির প্রতিমা তৈরি করেছেন জীবন পাল। আলোকসজ্জা করছেন কাজল দাশ। আলোক ও অঙ্গসজ্জার সরঞ্জাম আনা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ থেকে। শিশুদের জন্য মূল ফটকের বাইরে থাকবে কার্টুন চরিত্র ডরিমনের প্রতিমূর্তি।

নগরের ঘাটফরহাদবেগ এলাকায় এবার পূজার ৫৬তম পূর্তি উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। উৎসব কমিটির আহ্বায়ক চন্দ্রনাথ বিশ্বাস বলেন, ‘সাবেকিয়ানার সঙ্গে আধুনিকতার মেল বন্ধনে এবারের আয়োজন। শত ফুট দীর্ঘ দেয়াল চিত্রে থাকবে মায়ের বিভিন্ন রূপ। ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হবে সপ্তাহব্যাপী শারদোৎসবের অনুষ্ঠানমালা। এখানকার প্রতিমা হবে শাশ্বত বাঙলা প্রতিমা।’

নগরীর বাইরে অন্যতম বড় পূজার আয়োজন করা হয়েছে বোয়ালখালী উপজেলার সারোয়াতলী গ্রামের ভবানীভবন মাতৃমন্দিরে। সেখানে দোতলা রাজবাড়ির মন্দিরের আদলে বানানো হয়েছে পূজামন্ডপ। প্রতিমা বানানো হয়েছে শ্বাশ্বত বাঙালী নারীর আদলে চিরন্তন মায়াময় রূপ দিয়ে।

ভবানীভবন মাতৃমন্দির পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি ডা.তপন কান্তি দাশগুপ্ত বাংলানিউজকে বলেন, ‘পূজার পাশাপাশি আমাদের মন্ডপে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক ও শেষদিন বিজয়া সম্মেলন হবে। এজন্য আমরা পুলিশ প্রশাসনের কাছে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা চেয়েছি।’

মহানগর পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি তিমির বরণ চৌধুরী বলেন, ‘এবার নগরে ২৪৬টি মন্ডপে পূজা হবে। সব প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গেও বৈঠক হয়েছে। তারা সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়ে আমাদের আশ্বস্ত করেছেন। সকলের সহযোগিতায় সর্বাঙ্গীন সুন্দরভাবে পূজা অনুষ্ঠিত হবে বলেই আশা করছি।’  

নগর পুলিশ কমিশনার মো.শফিকুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, ‘হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা কেউ কেউ আমাদের কাছে কিছুটা শংকা প্রকাশ করেছেন। এ পর্যন্ত আমাদের কাছে যেসব তথ্য আছে, তাতে চট্টগ্রাম নগরীতে কোথাও অপ্রীতিকর কোন পরিস্থিতির সম্ভাবনা তেমন নেই। তবে ঘটার সম্ভাবনা আমরা একেবারে মাথা থেকে ফেলে দিচ্ছি তা-ও নয়।’

অন্যদিকে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) রবিউল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, ‘রামু, পটিয়ায় যে ঘটনা ঘটেছে তাতে আমরা এমনিতেই সতর্ক আছি। ফোর্স তেমন বেশি দিতে না পারলেও আমরা এখন পর্যন্ত যে নিরাপত্তা পরিকল্পনা করছি তা ওই ঘটনাকে মাথায় রেখেই করছি।’

বাংলাদেশ সময় : ১৮ ৩১ ঘণ্টা, অক্টোবর ১৩,  ২০১২
আরডিজি, সম্পাদনা : টিসি

 
 
 





 



 


বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন
মিডিয়া হাউজ, প্লট#৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক#ডি, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ
নিউজরুম মোবাইল ফোন: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯, ০১৭২৯০৭৭৩৩০, ০১৭২৯০৭৬৯৫৪ ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১-২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, news@banglanews24.com (সেন্ট্রালডেস্ক) corr.bn24@gmail.com (কান্ট্রিডেস্ক), editor@banglanews24.com (এডিটর-ইন-চিফ)
বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন       একটি ইডব্লিউএমজিএল প্রতিষ্ঠান       কপিরাইট © 2013 banglanews24.com সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত