banglanews24.com Logo

গল্প

বদলোক

09 Sep 2012   05:17:54 PM   Sunday BdST

মহি মুহাম্মদ
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

লোকটার চিৎকারে সোনাকান্দি দুলে ওঠে। সুস্থ-সবল মানুষের চোখ তোলা হচ্ছে। তাও আবার গরুর খুঁটা দিয়ে। এই কাজে নিবেদিত প্রাণ মেম্বারের সহযোগী হাসান। তাগড়া যুবক হাসান। ধরাশায়ী লোকটার বুকের ওপর বসে আছে। তার হাতে গরুর খুঁটা। বাঁশের খুঁটার অগ্রভাগ সরু। লোকজন ভয়ে কাঁপছে। কারো কারো উল্লাস হচ্ছে। ভোরের বাতাস ভারী হয়ে উঠবে এখন।

‘এই বদরু তুমি নাকি বদলোক?’
বদরু হাসে। ‘হ, বেবাকতে কয়।’
‘তুমি কি কও?’
‘আমি আর কি কমু। চাল-চুলা নাই, ঠিক-ঠিকানা নাই। আমি কইলেই কি, না কইলেই কি।’
‘ধান ক্ষেতে বইসা কী করো?’
‘ধানের  গোড়া চিবাই।
‘ধানের গোড়া চিবাও!
‘হ, বহুত মজা। খাইবেন?’ বদরু ধানের গোড়া এগিয়ে  দেয় লোকটিকে।
‘বদের বদ। লোকটা গাল দেয়।  বদরু হাসে।’
‘ওই বেটা হাসবি না। তুই আসলেই বদ।’
‘হ, ভাইজান আমি বদ।’
‘আবার বল, আমি বদ।’
‘আমি বদ।’
‘এইবার হইছে।’
ইদ্রিস মেম্বার চলে যায়। কিছুদূর গিয়ে আবার ফিরে তাকায়। দেখে বদরু একমনে ধানের নাড়া চিবুচ্ছে। চিবাক, বেটা বদের বদ।
ঠিক সেই মুহূর্তে দুটি কিশোর বদরুর সামনে এসে দাঁড়ায়। কিশোর দুটির উদোম দেহ। পরনে হাফ প্যান্ট। পেট লেগে আছে। বুকের ওপর হাড় জেগে আছে। নাকে সিকনি ঝরছে। বদরুর খাওয়ার দিকে ওরা একমনে তাকিয়ে থাকে। বদরু জিজ্ঞেস করে, ‘তোমরার নাম কী?’
একজন বলে, ‘আমার নাম নান্টু।’
আরেকজনকে দেখিয়ে বদরু জিজ্ঞেস করে, ‘তোমার নাম?’
আমার নাম, ‘ছডু।’
‘হ, তোমরার খুব ভালা নাম।’
কিশোর দুটি তখনো মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে। এইবার বদরু বলে, ‘তোমরার খিদা লাগছে। ছেলে দুটি মুখ চাওয়া চাওয়ি করে।’
বদরু বলে,‘ আসো। আমার লগে ধানের নাড়া চিবাও। বহুত মিষ্টি। ধান পাকার আগে যেমন সোয়াদ, ঠিক সেইরকম।’
ছেলে দুটি বদরুর পাশে বসে। কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকে। তারপর আস্তে আস্তে ধানের নাড়া চিবুতে থাকে।

একটা ছেলে হঠাৎ প্রশ্ন করে। ‘আইচ্ছা আপনেরে হগলে বদলোক কয় ক্যান?’
‘আমারে ডরায়। আমারে ছুঁইলে অমঙ্গল হয়।’
ছেলে দুটি একটু দূরে সরে যায়। বদরু ওদেরকে ভয় লাগায়।
‘হ, তোমরার অমঙ্গল হইবো।’
ছেলে দুটো হাসে। যেন লোকটি ওদের সঙ্গে মজা করছে।
‘আপনের বাড়ি নাই?’
‘নাই।’
‘আপনে তাহেন কই?’
‘এইতো তোমরার আশে-পাশে। গোয়াল ঘরে।’
একটা ছেলে হেসে ওঠে। ‘গোয়াল ঘরে! গোয়াল গরে ত গরু থাহে। হেগ লগে কেমনে তাহেন?’
‘তাহি কুনরহমে।’
ততক্ষণে ওদের নাড়া চিবানো অনেকদূর এগিয়েছে। ঠিক সেই সময় চিৎকার, চেঁচামেচি ভেসে এলো।

ছেলে দুটো বিদ্যুৎ গতিতে শব্দের উৎসমুখে ছুটলো। পিছু পিছু বদরুও ছুটলো। একটা পুকুর পাড়ে সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দৃশ্য দেখছে। কী দৃশ্য? পুকুরের জলে একটা মেয়ে সাঁতার কাটছে। ঠিক সাঁতার নয়, মেয়েটা আসলে ডুবে যাচ্ছে। মেয়েটার বয়স বোঝা যাচ্ছে না। তবে তার মাথায় অনেক চুল। কাপড়ের লাল অংশ দৃশ্যমান। পুকুরের পাড়ে দাঁড়িয়ে ছেলেমেয়েরা চিৎকার চেঁচামেচি করছে। কিন্তু কেউ পুকুরে নামছে না। বদরু দুই হাতে বিলি কেটে এগোয়। ছেলে-মেয়েরা চিৎকার চেঁচামেচি করে।
‘আহা, করো কী? করো কী?’
কিন্তু বদরু কারো কথা শোনে না। সে এগিয়ে যায়। পানিতে ‘ঝপাৎ’ করে শব্দ হয়। মেয়েটাকে টেনে হিঁচড়ে পাড়ে তোলে। এবার উৎসাহী হয়ে কয়েকজন তাকে ধরে। পেট থেকে পানি বের করার চেষ্টা করে। আর বদরু  দূরে বসে সবার কীর্তিকলাপ দেখে। এবার জটলা থেকে শোরগোল ওঠে।
‘ঐ যে মেম্বার আইতাছে।’
মেম্বার এসে বদরুর গালে দুইটা চড় লাগায় । সবাই বেকুব, চুপ। কানাঘোষা শোনা যায়। কারণ গ্রামের মহিলা কয়েকজন তখন উপস্থিত সেখানে।
‘ছিঃ ছিঃ বদলোকের ছোঁয়া পাইছে। ইশ, ইশ মাইয়ার কী সর্বনাশ য্যান হয়।’
মেম্বার মেয়েকে নিয়ে বাড়ির দিকে রওয়ানা দেয়। আর জটলা  পেছনে পেছনে যায়। বদরু চুপচাপ বসে থাকে। তার গা থেকে তখনো পুকুরের পানি ঝরছে।
কথাটা গ্রামে চাউর হতে সময় নেয় না। বদরুর অর্থাৎ বদলোকের স্পর্শ ময়নার গায়ে। ময়নার কী জানি কী ক্ষতি হয়! গ্রামের মানুষ ময়নারেই দেখতে আসে। আর ‘আহা, ইশ- ইশ’ এই শব্দগুলো বলে যায়। ইদ্রিস মেম্বারের মাথা গরম। ইচ্ছা করে তার লাশ বানিয়ে ফেলে বদরুরে। কিন্তু মওকা পায় না। তবে ঠিকই মওকা মেলে- তবে সে ঘটনা আরো কয়েকদিন পর।

সেদিন সন্ধ্যারাত থেকে আকাশে কাঁসার থালার মতো একটা চাঁদ উঠেছে। চাঁদটা যেন মোমেনা মাস্টারনীর বাড়ির ওপরে। একটুপরেই আশ-পাশ থেকে চিৎকারের শব্দটা শোনা যায়। চিৎকার কোন ব্যাপার না। তবে নারী চিৎকার। লোকজন কারণ জানতে কিছুক্ষণের মধ্যে  ভিড় জমায়। সেদিন ছিলো হাটবার। হাট ফেরৎ মানুষের ভিড় লেগে যায় আস্তে আস্তে। আর গ্রামের উৎসাহী বালকের দল তো আছেই। ব্যাপার কী। আর কিছু না। মেম্বার একটা অনৈতিক কাজের বিঘ্ন ঘটাইছে। এখন মেম্বারের হাতের মধ্যে বকের ছাউয়ের মতো বদরু কম্পমান। উৎসুক জনতা রোষ ফলাচ্ছে।

‘বেটারে একটা উচিৎ শিক্ষা দেওন লাগে। এত্তোবড় সাহস, মাস্টারনীর দিকে চোখ দেয়।’
বদরুর কথা কেউ কানে তোলে না। বদরু অনেক কথা বলে। দু’ একজন কিল ঘুষি মারে। ঠোঁট কাটে, মুখ ফাটে। রক্ত গড়ায়। যারা ঢোড়া সাপ দেখে ভয়ে লাফ মেরে পালায়, তারাও এসে আস্ফালন করে। চড়, চাটি মারে।

মাস্টারনী বিধবা। গ্রামের স্কুলে পড়ায়। দশ-এগার বছরের একটা ছেলে আছে। জামাই ভিলেজ পলিটিক্সে খুন হয়েছে। তা বছর পার হয়ে গেছে। সবাই বলেছিল, ‘বয়স এমন আর কী হইছে, আরেকটা নেকা করো।’  
মোমেনা রাজি হয় নাই। বলেছে,‘পোলা আমার ডাঙ্গর হইছে আর কী লাগে।’ কিন্তু মোমেনার যৌবন দেখে কারো কারো চোখ টাঁটায়। মোমেনা খুব গোছালো মেয়ে। বাড়ি-ঘর সুন্দর করে সাজিয়েছে। সবাই মান্যি-গন্যিও করে। কারণ সবার সঙ্গে তার সুসম্পর্ক। তাকে ঘিরে এমন একটা কাজ হতে পারে, অবিশ্বাস্য!

বদরুকে ধরেছে মেম্বার। মেম্বার হাট থেকে তাড়াতাড়ি ফিরছিল। তবে তিনি তাড়াতাড়ি কখনোই ফেরেন না। এইদিন তিনি ফেরেস্তা হয়ে নাজিল হয়েছিলেন। আর তা নিয়ে কারো কোন সন্দেহের উদ্রেক হয় না। কেন হয় না- তা কারো মাথায় ঢোকে না। আর ভয়ে সিটিয়ে যাওয়া মোমেনা কাউকে কিছু বলে না। সবাই বলাবলি করে শিক্ষিত মাইয়া তো হতবাক হয়ে গেছে। ঐ যে কথায় বলে না- ‘মানুষ অধিক শোক পাইলে পাথর হইয়া যায়।’ মোমেনার ক্ষেত্রেও  তাই ঘটেছে।  মোমেনাকে লোকজন জিজ্ঞেস করেছে, কিন্তু সে কোন কথার জবাব দেয়নি। শুধু তার ছেলেরে জড়িয়ে ধরে নীরবে চোখের পানি ফেলেছে। এই ছেলের জন্য সে নেকা করেনি। আর আজ শরীরের জন্য আক্রান্ত হয়েছে। কাজেই  সে কোন কথার জবাব দিল না। যা বলার ইদ্রিস মেম্বারই বললেন। বদরুরে ধইরা নিয়ে আসলেন। নিজের কাছারি ঘরের উঠানে  বেঁধে রাখলেন। সমবেত লোকের সামনে বদরুর অপরাধ আরেকবার বয়ান করলেন। এ বিষয়ে তার মেয়ে ময়নার কথাও উঠে আসলো। ময়নারে বদরু ছুঁইছে। মেয়ে এখন ভয়ে কারো সঙ্গে মেলামেশা করে না। কাজেই বদরুর মেয়েদের ওপর বদ নজর আছে। আর কোন দিন যাতে সে বদ নজর দিতে না পারে, সেই ব্যবস্থা গ্রামবাসীর নেয়া দরকার। ব্যবস্থাটা কী?
‘যেই চোখ দিয়া সে এই বদ কাজ ঘটাইতাছে সেই চোখ উপরায়া ফেলতে হইব।’

সবাই সমস্বরে রাজি। ‘বেটা বদের বদ। গ্রামের বউ-ঝির দিকে চোখে দেয়।’ সারারাত বদরু নারকেল গাছের সঙ্গে বাঁধা থাকবে। সকালে সবার উপস্থিতে বদরুর চোখ উৎপাটন হবে। এ কাজ করবে কে? মেম্বারের সহযোগী হাসান।
হাসানের শরীরখান বেশ গাবদা-গোবদা। শক্তিও আছে। নিমেষেই কাঁবু করতে পারবে। পাহাড়ায় থাকবে হাসান। আরো দু’একজন থাকবে। বদরু নারকেল গাছে বাঁধা। তার কোন কথা নাই। আসলে তার কথা কেউ শুনবে না। কথা বললে আরো চটকানা খাবে সে। তাই বদরু কোন কথা বলে না।

রাতে চাঁদের জোছনা উপচে পড়ে। অনেকরাত অবধি মানুষজন জেগে থাকে। সোনাকান্দি গ্রামে কাল অদ্ভুত বিচার হবে। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে একটা মানুষের চোখ উৎপাটন হবে। চাঁদ যখন আরো উপরে উঠে এলো, যখন হাসান বলীর চোখে ঘুম নেমে এলো, তখন এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটলো। চাঁদের আলোয় দেখা গেল। একটা মেয়ে এসে বদরুর সামনে দাঁড়ালো। বদরুর দুই হাত বাঁধা। আর সে মেয়ে বদরুর মুখে ভাত তুলে দিচ্ছে। চাঁদের আলো নারকেল গাছে। তার ছায়ায় সেই মেয়ের চেহারা খুব স্পষ্ট হলো না। তবে যারা পাহাড়ায় ছিল, তারা জেগে থাকলে হয়ত দেখতে পেত মেয়েটাকে অশরীরী মনে হচ্ছিল। আর মনে হচ্ছিল- এ যেন এ বাড়িই মেয়ে।

সূর্য ওঠার আগে ছোটখাটো একটা ভিড় লেগে গেল মেম্বারে বাড়িতে। হাসান আর কিছু না পেয়ে গরুর খুঁটা দিয়ে বদরুর দু’চোখ উৎপাটন করলো। রাতের উত্তেজনা এখন স্থিমিত। গ্রামবাসীরা এখন অনেকটা শান্ত। বউ-ঝিরা কেউ কেউ নাকি তার জন্য নীরবে চেখের জল ফেলছে। আসলে গ্রামাবাসী নারীরা বড় সহজ সরল। পুরুষরা বলেছে উচিৎ শিক্ষা হইছে। আর কারো দিকে চোখ দিতে পারবে না। এখন তাদের  বউ-ঝিরা নিরাপদ। তবে বউ-ঝিরা বলছে ভিন্ন কথা। তারা কেউ কেউ বলছে, লোকটা কোনদিন চোখ তুলে তাকায়নি। পুরুষরা বলছে, বোকা মেয়ে মানুষ। এদের মতি-গতি বোঝা ভার।

নারী মহলে কে যেন খবর এনেছে। তার আত্মীয়ের আত্মীয়। বলেছে, বদরু ভালো লোক। তার ভাইয়েরা সম্পত্তির লোভে মাইরা ভাগাইয়া দিছে। শুধু তাই নয়, বদরুর সহায় সম্পত্তি সব তারা ভোগ দখলে নিয়েছে। বদরু বিদেশে ছিল। টাকা পয়সা যা পাঠাইছে ভাই বেরাদাররা লোপাট করেছে। শুধু তাই নয়, বুড়ো বাবাটাকেও নাকি ছেলের বউরা  মেরে ফেলেছে। মৃত্যুর খবর পেয়ে বদরু বিদেশ থেকে চলে এসেছে। শোক কাটাতে না কাটাতে ভাইরা মিলে পিটিয়ে ঘর ছাড়া করেছে। বদরু সোজা শান্ত মানুষ। ভাইদেরকে কোন কিছুই বলল না। মহিলারা বলল, এইসব মানুষের ভাত নাই।

কিন্তু তারপরেও বদরুর জীবনাবসান হয় না। ঘটনার ঘনঘটা সোনাকান্দি মানুষের কানে আসবে। তবে, তা আরো বেশ কিছুদিন পর। যখন মাস্টারনী মোমেনা দূরের গাঁয়ের স্কুলে চলে যাবে। আর শোনা যায়, বদরু নাকি সেই গাঁয়েই থাকে। আর তার ভরণপোষণ নাকি মোমেনাই যোগায়। তখন নতুন করে মানুষের মনেই আরো নানান সন্দেহ দানা বাঁধবে হয়তো।

বাংলাদেশ সময়: ১৬৪১ ঘণ্টা, ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০১২
সম্পাদনা : তানিম কবির, tanimkabir@yahoo.com


বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন
মিডিয়া হাউজ, প্লট#৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক#ডি, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ
নিউজরুম মোবাইল ফোন: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯, ০১৭২৯০৭৭৩৩০, ০১৭২৯০৭৬৯৫৪ ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১-২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, news@banglanews24.com (সেন্ট্রালডেস্ক) corr.bn24@gmail.com (কান্ট্রিডেস্ক), editor@banglanews24.com (এডিটর-ইন-চিফ)
বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন       একটি ইডব্লিউএমজিএল প্রতিষ্ঠান       কপিরাইট © 2013 banglanews24.com সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত