banglanews24.com Logo

মুরাদুল ইসলাম-এর গল্প

রাস্তার পাশের বিশাল ছবিটিকে কেন্দ্র করে একটি গল্প

13 Oct 2012   06:39:36 PM   Saturday BdST

মুরাদুল ইসলাম
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

শহরের মূল রাস্তার সাথে গইলাপাড়া ঢোকার গলি যেখানে মিলেছে তার কিছুটা সামনে যেখানে ছড়াটি ছিলো, কয়দিন আগে যে ছড়ায় একটি মরা হাঁস পঁচে দুর্গন্ধ ছড়িয়েছিলো, বার্ড ফ্লু এবং ভয়ানক দুর্গন্ধ থেকে বাঁচতে নগরবাসী তখন নাকে কাপড় চেপে আসা যাওয়া করতো সেখানটায়, একটু বা দিকে রাস্তার পাশে মোটা লোহার পিলারের উপরে একদিন সরকারী লোকেরা দেশের এক বিশিষ্ট ব্যক্তির বিশাল ছবি ঝুলিয়ে দিলো।

মানুষজন ক্ষুব্ধ হল; বিস্মিত হলো, তারা কেউ কেউ বললো, এটা হতে পারে না, অসম্ভব, একজন সম্মানিত ব্যক্তির অসম্মান আমরা হতে দিতে পারি না এবং এদের মধ্যে কেউ কেউ বললো, এটা সরকারের কূটচাল, সরকার আমাদের দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরাতেই এই বিশাল ছবি ঝুলিয়ে দিয়েছে, যাতে আমরা রাস্তার খানাখন্দ, ফুটপাত কিংবা ম্যানহোলের গর্ত এসব কিছু দেখতে না পারি এবং পড়ে গিয়ে হাত পা ভেঙে বসে থাকি। কেউ কেউ এদের কথায় সায় দিলো এবং অপেক্ষাকৃত বয়সে যারা তরুণ তারা বললো তারা এই ছবি খুলে ফেলবে, দরকার হলে আগুন দেবে, পুড়িয়ে ফেলবে,  সরকারের এই অন্যায় তারা মানবে না, তারা প্রতিবাদ করবে এবং বিপ্লবের গণজোয়ার বইবে দেবে।

কিন্তু আসলে তারা কেউই কিছু করতে পারলো না এবং ছবিটি দাঁড়িয়ে রইলো স্বগর্বেই। মানুষজন আস্তে আস্তে জিনিসটাকে মেনে নিচ্ছিল কিন্তু একজন বিশেষজ্ঞ লোক আঞ্চলিক একটি পত্রিকায় এক গবেষণামূলক প্রবন্ধ লিখে সমগ্র ঘটনাকে আবার জীবিত করে তুললেন। তিনি তার গবেষণামূলক প্রবন্ধে বললেন, তিনি এতদিন গবেষণা করে দেখেছেন এই ছবি রাস্তায় বসানোর পরে এই রাস্তায় দুর্ঘটনার পরিমাণ হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে, তিনি তথ্য প্রমাণ উপাত্ত হাজির করলেন এবং বার বার ঘোষনা দিলেন তার এই গবেষণা রিপোর্ট অকাট্য।
মানুষের মধ্যে আবার চাঞ্চল্য দেখা দিলো, মানুষজন এক হলো— কী করা যায় ঠিক করতে। সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা আলোচনায় যখন মগ্ন ছিলেন তখন রিকশাওয়ালা দবিরুদ্দিন, যার বাপের নাম চৌধুরী সবুরউদ্দিন, গ্রাম বারহাতি, সে হাত তুলে বেয়াদবের মত প্রশ্ন করলো, আমি একখান প্রশ্ন করবার চাই— এই লুকটা কিডা?

সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা মাঝারি বিশিষ্ট ও অবিশিষ্টরা একে অন্যের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলেন এবং তখনই তারা বুঝতে পারলেন এই লোকটি কে— তা তারা নিজেরাই জানেন না। অনেকে বললেন এই লোক সরকারের লোক, কেউ কেউ বললেন দেশের প্রধান কবি, কেউ কেউ বললেন গায়ক নায়ক, কিন্তু সবার উত্তরই ছিল ধারণাকে কেন্দ্র করে তাই কারো উত্তরই আসলে গ্রহণযোগ্য হলো না।

এর মাঝে কেউ কেউ দবিরুদ্দিনের দিকে কড়া চোখে তাকাতে লাগলেন কারণ দবিরুদ্দিন এক সমস্যার মধ্যে থাকা অবস্থায় তাদের উপর আরেক সমস্যার বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে দবিরুদ্দিনের বউ তাকে খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়ে শেষ পর্যন্ত রাস্তায় বেড়িয়েছে।

আজ যে রাস্তার ছবি নিয়ে মিটিং হচ্ছে তা দবিরুদ্দিনের বউ জানে, শুধু দবিরুদ্দিনের বউ না— শহরের সবাই প্রায় জানে, মাইক দিয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে জানানো হয়েছে সাতদিন ধরে, মাইক দিয়ে যখন বলে যাচ্ছিলো, মিটিং মিটিং মিটিং... আপনারা সকলে আসিবেন...তখন দবিরুদ্দিনের বউ দবিরুদ্দিনকে বলেছিলো, আপনে মিটিংয়ে যাইয়েন না, এইসব বড়লোকের কাম, আপনে রিকশা নিয়ে বাইর হইবেন, পোলার পেট নামছে।

দবিরুদ্দিন তার বউয়ের কথা শোনে নি;  সে মিটিংয়ে চলে এসেছে। দবিরুদ্দিনের বউ রিকশা বাড়িতে দেখেই তার খোঁজে বেড়িয়েছি এবং সভাস্থালের দিকে পা বাড়িয়েছে। সে দবিরুদ্দিনের বাপ দাদা চৌদ্দগোষ্ঠীকে নির্মম ভাষায় স্মরণ করতে করতে, পেট অসুখে আক্রান্ত ছোট ছেলেকে কোলে নিয়ে হাঁটছে। হেঁটে হেঁটে সে যখন ছড়ার ধারে আসল তখন দবিরুদ্দিনের ছোট ছেলে, যে পেট অসুখে আক্রান্ত, মায়ের কোল থেকে নেমে রাস্তার পাশে পায়খানা করে বসলো।

দবিরুদ্দিনের বউয়ের এমনিতেই মেজাজ খারাপ ছিলো, তার উপর ছেলের এই কর্ম তার রাগ আরো বাড়িয়ে দিলো, সে ঠগবগ করে ফুটে উঠলো যেন, ছেলের গালে ঠাস ঠাস করে দুইটা চড় দিয়ে দূরে সরিয়ে দিয়ে দেশের সর্বোচ্চ প্রচারিত দৈনিকের এক টুকরো কাগজ কুড়িয়ে নিয়ে ছেলের পায়খানা পরিস্কার করতে লাগলো।

দবিরুদ্দিনের ছোট ছেলে তখন বাপের মতই আহাম্মকী এক কাজ করে বসলো, দুটো চড় খেয়ে দূরে সরে না গিয়ে সে তার মাকে উদ্দেশ্য করে এবং রাস্তার পাশের সেই বিশিষ্টজনের ছবিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলো, মা এই লোকটা কিডা?

দবিরুদ্দিনের বউ ছেলের প্রশ্নে ছবিটির দিকে তাকালো এবং তার মনে হলো এই ছবিই সব কিছুর মূল। সে কাগজমুড়ানো ছেলের পায়খানা ছুড়ে মারলো ছবিটির মুখে, আগেই বলা হয়েছে  দবিরুদ্দিনের ছোট ছেলের পেট অসুখ ছিল সুতরাং ছবির বেশ কিছু অংশে লেপ্টে রইলো হলুদ রঙ্গের বস্তু।

কাঠফাটা রোদের কারণে কয়েকদিনের মধ্যেই এই বস্তুগুলো বেশ ভালো রকমভাবে যখন ছবিটির গায়ে লেগে গেল তখন সবার নজরে এল বিষয়টি। এক কান দুই কান করে করে সরকারের বিশাল কান পর্যন্ত গেল এবং সরকার বিজ্ঞপ্তি জানালেন আশু ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এলাকার লোকজন আতঙ্কিত হলো কারণ এহেন দুষ্কর্ম কল্পনাও করা যায় না। কিন্তু তারা আবার কিছুটা আশান্বিতও হলো কারণ আকাশে তখন মেঘেরা আনাগোনা করা শুরু করেছে,  দেখতে দেখতে আকাশ কালো হয়ে গেল এবং তুমুল বৃষ্টি নামল। অধিকাংশ মানুষই ধারণা করতে লাগল ঈশ্বর সম্মানী লোকের মান বাঁচাতে এগিয়ে এসেছেন, তিনি চান না এই ছবিতে গু লেগে থাকুক এবং ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া ঘোরাফেরা করুক।

একদিন, দুইদিন, তিনদিন প্রবল বৃষ্টি হলো। লাগামহীন বৃষ্টিতে এলাকার ড্রেইনেজ সিস্টেম ভেঙে পড়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হলো এবং শহরের মূল নদীটিও কূল কিনারা ছাঁপিয়ে বইতে লাগলো। সৃষ্টি হলো বন্যার। তবুও বৃষ্টি বন্ধ হলো না। চলতেই থাকলো, চলতেই থাকলো।

বাংলাদেশ সময় : ১৮২০ ঘণ্টা, ১৩ অক্টোবর, ২০১২
সম্পাদনা : তানিম কবির, tanimkabir@gmail.com


বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন
মিডিয়া হাউজ, প্লট#৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক#ডি, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ
নিউজরুম মোবাইল ফোন: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯, ০১৭২৯০৭৭৩৩০, ০১৭২৯০৭৬৯৫৪ ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১-২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, news@banglanews24.com (সেন্ট্রালডেস্ক) corr.bn24@gmail.com (কান্ট্রিডেস্ক), editor@banglanews24.com (এডিটর-ইন-চিফ)
বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন       একটি ইডব্লিউএমজিএল প্রতিষ্ঠান       কপিরাইট © 2013 banglanews24.com সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত