banglanews24.com Logo

মাজহার মিথুন-এর মুক্তগদ্য

শিস কাটা বাতাস ও অন্যান্য নিঃশ্বাস...

27 Sep 2012   04:10:04 PM   Thursday BdST

মাজহার মিথুন
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

চিঠি

বিরতিহীন আচঞ্চল বাতাসের শরীর বেয়ে, জানলা গলে ফক করে ঢুকে গেলো, ঢিল ভাবা দ্রুত পাখির মতো একবিন্দু হলুদ রঙ, নাম-ঠিকানা-গন্তব্য নেই, কেমন এক! হলুদ খাম। এ অবেলায় চেনা কারো মৃত্যু সংবাদ আসেনিতো? অচেনা কারো জন্ম সংবাদ? পাওনাদার টাকা চাইতে তো বাড়ি পর্যন্ত আসে— বিচিত্র হাসিমুখ, অভ্যন্তরীণ উৎসাহ , ভয়ঙ্কর বিক্রমে। কেউ কুশলাদি জানতে চাইলে সেলফোন আছে, সরাসরি বলে দিলে হয়— ভালো আছি বা নেই। কারই বা এতো প্রয়োজন জানতে চায় অপ্রয়োজনীয় সব। খাম খুলে দেখলে হয়, সুগন্ধ, প্রেম, সুন্দর এযাবতীয় সুখবন্দী খবরে ভেতরটা হয়তো ভরে গেছে। অশ্রুজলে লেপ্টানো যত্নের কাজল টুপ করে মেশা লেখার মাঝে সুখ আছে। আনন্দে আছি তোমাকে ছাড়াই আমি, সে, আমরা লেখার মাঝেও সুখ আছে একপ্রকার। কী দরকার! একবিন্দু হলুদ রঙ নিয়ে এত রহস্য, এত প্রেম, এত বিপদগ্রস্ত হয়ে যাবার কারণ আবিষ্কার। অকারণের শত যুক্তি দিয়ে খামটা ঠেসে ধরি, দেয়ালে। কোনও এক কালে অসম্ভবরকম হলুদের ছড়াছড়ি ছিলো এ দেয়ালে। বাষ্প, বয়স, মানুষ, আসবাবের অত্যাচারে ফ্যাকাশে দেখায়, প্রাচীন দেখায় আজ। প্রাচীনতম হয়ে উঠবার কালে খামখানার দেহ শুষে নেবে বিবর্ণ অতীতের রস। স্মৃতিময় না পড়া চিঠি, আদতে চিঠি ছিল কিনা— অযথা জানতে চেয়ে না পারার মাঝেও তেষ্টামাখা সুখ আছে বোধহয়...

নটরাজ

বৃথা যবনিকা উঠিয়ে দাও নটরাজ, মঞ্চে ধুলো, দেয়ালে মাকড়শাশিল্প, গ্যালারির সবকটা অপেক্ষার চেয়ার সাজিয়ে উপযুক্ত করো। কম্পিটিশনের যুগ, এদিকে তুমি গুটিয়ে পাকিয়ে নষ্ট করছো দর্শক সমর্থন। হাতেগোনা অন্ধভক্তের দল হালকা হয়েছে, টিকিটবুথের আধবুড়ো কর্মচারীর চোয়ালের ভাঁজসংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ। ধ্রুপদী, শিল্পগুণ বিশিষ্ট নাট্যকলাসমূহের পোস্টারে আরো অনেক রঙ ঢেলে দাও, আরো অনেক সস্তা করে দাও নামধাম— চরিত্রসব। মঞ্চমালিকের চাহিদা বেড়েছে, কমাতে হবে নিজস্ব ইচ্ছেমূল্য। ধার করে আনা গল্পের বুকে চালিয়ে দাও অভিনয়ের চাকা, ভাঙ্গনের ডাক ক’জন শুনতে আসবে? চাকার মরচে কজন শুধরাতে আসবে? চালিয়ে যাও হাততালি, শব্দবৃদ্ধির লোকদেখানো কাজ। দিনশেষে ব্যস্ত থিয়েটারে ফেলে যাওয়া তরুণীর দীর্ঘশ্বাস কুড়িয়ে নিও, তুমি জানো সে কে, কী চেয়েছিলো। চিরচেনা তার অশ্রুফোঁটার দাগ মুছে যায়নি বেখেয়ালি জুতোসমূহের ছাপে। তবে মেনে নিতে শেখো, চাইলেই দিতে পারো না আশ্বাস। নতমুখ ঢেকে, কণ্ঠের দুর্বলতা লুকিয়ে তুমি চাইলেই বলতে পারো না— আমি সবসময় সত্য ছিলাম; সফল হতে চাইতাম, এখন না হয় মিথ্যের দাপটে হেরে গেছে ব্যর্থতার ইতিহাস...

স্টেশন চত্বর

আধখাওয়া সিগারেট খেয়ে নিলো আগুনে। এ সুযোগে তিন নং প্লাটফর্ম ঢেকে দিলো নগরগামী ট্রেনের নিঃশ্বাস। ভদ্র স্যুটকেস ঠাসা বাসি কাপড় মেয়েলিগন্ধ বোঝাই। স্টেশন চত্বর অতি হলুদ আলোয় মাখমাখি। যারা যেতে চায়, অথবা যেতে হয় যাদের, অপ্রয়োজনীয় শব্দ তুলে ভুলেছে শেখানো সভ্যতার বুলি। কুলির বহু ব্যবহৃত শার্ট পরিশ্রমী দেহ জাপটে ছুটোছুটি এপ্রান্ত-ওপ্রান্ত। বিনে পয়সার যাত্রীবৃন্দ, উঠে পড়ুন খোলা ছাদে, বিপদজনক স্বাধীনতায়। লাল বাতি সবুজ, সিগন্যাল গেট আটকালো শহর। মহারাজ ট্রেন! আপনি এবার দীর্ঘশ্বাস রেখে, পাল তুলুন চেনা লৌহ পাথর নদী বুকে। ওভারব্রিজ কাঁপানো বি দারুণ শক্তি, ছন্দ, স্পর্শ, সুরে— গড়িয়ে চাকা...

আয়নার মানুষ

আয়না ঘষে-মেজে চকচকে অবয়ব। কাচে দাগ কেটে তুলে আনো ভুল ছবি। বামে ডান, ডানে বাম, কি অদ্ভুত! আশ্চর্য মানুষ চোখ হারিয়ে— অন্ধ ছবি সাথে ফিরে যায় , ফিরে আসে। তবু তারা ব্যথা পেলে খুঁজে পায়— কোন চোখ? কতটা? লাল। কোন পাশে? মোচর মারে ভেতর। কোন রাস্তার? বাম গলি বেয়ে ডানদিকে ঠিকানা। কোন পাশে প্রিয়জন? কোন পাশে দুঃখ সুখ। কোন হাত ছুঁয়েছিল জল? কোন হাত মেখেছে ঘাম। আয়নার দেহ, চামড়ার দেহ, দু’জন মিলে বাঁচে ঠিকঠাক। অন্যদু’জন খুঁজে নেয় তাকে— সঙ্গসঙ্গী প্রয়োজন। একারা একাদের দরকারি ভীষণ, একাদের একারা ভীষণ দরকার...

ধ্রুব-স্বচ্ছ-সত্য

পৃথিবীতে প্রথম দিন, সেদিন আমি কোন হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ চিনতাম না। চিনতাম অজস্র চোখ, হাত, কণ্ঠ, ছুঁতে চায়; স্পর্শ করে দেখতে চায় আমায় । এরপর বিস্তৃত হলো উঠোন। রোদ, বৃষ্টি, ঘাসফড়িং, পাখি, উঠোনে এসে-বসে-উড়ে চলে যেত। তাদের শব্দের ভেতর অর্থ আমারটার মতো দুর্বোধ্য , দূর্ভেদ্য। এরপর, আমাকে মানুষ চেনানো হলো, বিবিধ ধর্মের মানুষ, বিবিধ নিয়মের মানুষ। স্কুলে আলাদা হয়ে গেলাম সহপাঠীরা, মাসুম-আলামিন-আমি একরুমে। দেয়ালের ওধারে উজ্জল-হিমাংশু-সুদীপেরা। একঘণ্টা বাদে; গোল্লাছুটে, স্কুলগেটে, ভাঙ্গা কাঠ— বল হাতে মাঠে! পূজোতে দূর্গা, সরস্বতী, কালী মূর্তি দর্শনে ভয়ঙ্কর পাপ, খুব ভয় পেতাম। ঈদের দিন; সেমাই, ফুলপিঠা চাখতে সুদীপরা রাজি হতো না কেমন! দুপেয়ে মানুষ হেলেদুলে-এলেবেলে হাঁটে, গান গায়, গল্প করে, অভিনয় করে, ভালোবাসে, কাঁদে-হাসে, কী কী করে! পৃথিবীর প্রথম দিনটার মতো ধ্রুব, স্বচ্ছ, সত্য কিছু মনের ভেতর শিস কেটে ছুটে যায় না। শিস কাটা বাতাসটা প্রত্যেকদিন আমাকে ঘিরে ঘুরে-ফিরে আপন। একদম আপন— ঠিক কোনও এক চিরস্থায়ী ছায়ার মতন...

বাংলাদেশ সময়: ১৫৩৫ ঘণ্টা, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১২
সম্পাদনা : তানিম কবির, tanimkabir@gmail.com


বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন
মিডিয়া হাউজ, প্লট#৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক#ডি, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ
নিউজরুম মোবাইল ফোন: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯, ০১৭২৯০৭৭৩৩০, ০১৭২৯০৭৬৯৫৪ ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১-২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, news@banglanews24.com (সেন্ট্রালডেস্ক) corr.bn24@gmail.com (কান্ট্রিডেস্ক), editor@banglanews24.com (এডিটর-ইন-চিফ)
বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন       একটি ইডব্লিউএমজিএল প্রতিষ্ঠান       কপিরাইট © 2013 banglanews24.com সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত