banglanews24.com Logo

হিমু ও হুমায়ূন

21 Jul 2012   07:56:31 AM   Saturday BdST

এস এম আববাস, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ঢাকা: ‘হিমু’ ও ‘হুমায়ূন’ দু’টি নামের মধ্যে একটি মিল লক্ষ্য করলে বিশেষ কিছু চেখে পড়বে। দু’টি নামের মধ্যে একটি ছন্দ খুঁজে পাওয়া যায়।

হিমু চরিত্রের নাম বাছাইয়ে ব্যতিক্রম ছাড়াও তাঁর নিজের নামের সঙ্গেও বেশ মিল রয়েছে। তা ছাড়া পাঠক মাত্রই একবার হলেও মনে মনে ভেবেছেন হুমায়ূন আহমেদই কি হিমু?

বিষয়টির আর একটু গভীরে গেলে দেখা যাবে, হুমায়ূন আহমেদ নিজের চরিত্রের একটা বড় অংশ খুঁজে পাওয়া যায় হিমুর মধ্যে। তবে তিনি নিজে স্বীকার করেননি ‘নিজ চরিত্রের প্রকাশ হিমুর মধ্য দিয়ে’।

হিমুর বৃষ্টিতে ভেজা, জোছনা দেখা ও কল্পনার নদী ময়ূরাক্ষীসহ প্রকৃতি প্রেমে ডুবে যাওয়ার যে স্বপ্ন, তা যেন সবটুকুই হুমায়ূন আহমেদের স্বপ্ন-বাস্তবতা। ‘নূহাশ পল্লী’ তার প্রকৃতি প্রেমের এক বড় দৃষ্টান্ত।

হিমু নিজের মনের মধ্যে আপন ভূবন সৃষ্টি করে প্রচ- গরমে ময়ূরাক্ষী নদী তীরের বাতাস অনুভব করতে পারতেন। আর হুমায়ূন আহমেদ নিজের মনের মধ্যে আপন ভূবন সৃষ্টি করে শত হল্লাচিল্লাতেও তার লেখার ভূবনে প্রবেশ করে নির্বিঘেœ লিখতে পারতেন।

এ বিষয়টি কঠিন হলেও মানুষকে এ ক্ষমতায় গড়ে তোলার অনুপ্রেরণা দেওয়া হয়েছে হিমু চরিত্রে। হিমু চরিত্রের মধ্য দিয়ে হুমায়ূন আহমেদ এ প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। যেন কষ্ট হলেও সহজে মানুষ তা গ্রহণ করার ক্ষমতা অর্জন করে। এখানেও সফল হয়েছেন তিনি।

ব্যতিক্রমি ব্যক্তিত্ব নিয়ে নিজেকে আপন ভূবনে ডুবিয়ে রাখতে চান যে মানুষটি, তার ব্যক্তিত্বের সেই প্রকাশ হিমুর হলুদ পোশাকে আলাদাভাবে চিত্রিত হয়েছে। সব মানুষকে কৌতূহলী করেছে হিমুর দিকে। যেমনটি পাঠককে টেনেছেন হুমায়ূন আহমেদ তার যে কোনো লেখাতেই।

হিমু মহাপুরুষ হবে, এ স্বপ্ন হিমুর বাবার। তার বাবার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে হিমু নিজেকে গড়তে চেয়েছেন। হুমায়ূন আহমেদের এ চিত্রায়ন হিমুর মধ্য দিয়ে মহাপুরুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখাবার এবং মানুষকে সৎপথে টেনে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা।

আসলে সৃষ্টিশীল সব মানুষ মহাপুরুষের চরিত্র নিজের মধ্যে খোঁজেন; এটি সত্য হিসেবে ধরে না নেওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ মহানায়ক হওয়ার স্বপ্ন সৃজনশীল মানুষের না থাকলে, মানুষের কল্যাণে নিজেকে গোড়ে তোলা যায় না। হুমায়ূন আহমেদ মহানায়কের স্থান পেয়েছেন আমজনতার বিচারে, ঋদ্ধ মানুষের কাছেও। তার সৃষ্টিশীল কাজের জন্য।

তরুণ বয়সে যে অনুভূতি মানুষকে সত্যের পথে এগিয়ে নেয়, ছোট ছোট ভালো লাগাগুলোকে মূল্যায়ন করতে চায়। তার সমর্থন দিয়ে হুমায়ূন আহমেদ তার লেখা হিমুতে চরম সত্য প্রকাশে সাহসী করতে তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। শুধু তরুণ প্রজন্মকেই নয়; বড়দেরও প্রভাবিত করেছেন হিমুসহ তার অন্য সব লেখায়। হুমায়ূন আহমেদ হিমুর মধ্য দিয়ে স্বপ্নকে বাস্তবে রূপায়নের প্রভাব সৃষ্টির প্রয়াস খুঁজেছেন।

হিমু লিখতে গিয়ে সূচনাতেই অতি সাধারণ মানুষ তার কথায় আমজনতা স্থান পেয়েছে গুরুত্বের সঙ্গে। তাদের ‘সহনশীল’ বলে যেমন উদারতা তুলে ধরেছেন, তেমনি বলেছেন, ‘তারা আমজনতাকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা উপভোগ করেন। তাদের নিয়ে রঙ্গ-রসিকতা সহ্য করেন না।’

হুমায়ূন আহমেদের মধ্যে দেশ ও দেশের আমজনতার প্রতি শ্রদ্ধা আমাদের সিক্ত করেছে হিমুর নীল জ্যোৎ¯œা’ বইয়ের সূচনাতে। হুমায়ূন আহমেদের আমজনতার প্রতি যে শ্রদ্ধা, হিমুর মধ্যেও তা ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি।

বহুব্রীহি নাটকে হুমায়ূন আহমেদ দেশ বিারোধীদের জন্য তোতা পাখিকে ‘তুই রাজকার’ বলাবার যে ঘটনা ঘটিয়েছেন, তা তার চেতনারই বহিঃপ্রকাশ দেশের শত্রুদের বিরুদ্ধে।

এছাড়া বর্তমান সমাজে দায়িত্বশীল মানুষ, দায়িত্বশীল সংস্থার ভূমিকা নিয়ে হুমায়ূন আহমেদের যে কটাক্ষ, হিমুর মধ্য দিয়ে তার প্রকাশ ঘটাতে চেয়েছেন তিনি। ‘হিমু রিমান্ডে’সহ আরো কিছু বইতে তার প্রকাশ ঘটাতে সাহসী পদক্ষেপ দেখিয়েছেন।

সমাজ সংস্কারে হুমায়ূন আহমেদ যে বলিষ্ঠ ভূমিকা তার লেখায় তুলে ধরেছেন; হিমুতেও তার বিশাল অংশের দেখা মেলে। আমজনতা থেকে কবীগুরু রবীন্দ্রনাথ, গান্ধিজীর নাম ব্যবহার করেছেন নিপূণভাবে।

চরিত্র সৃষ্টিতে মানুষের কল্যাণে যেভাবে হিমুকে দেখানো হয়েছে, তা বিরল উদাহরণ। সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তুলতে আনন্দ-কৌশল ব্যবহার করে তাদের পাশে দাঁড়াতে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে হিমুকে উপস্থাপন করা হয়েছে। উপকারের পাশপাশি যেন মানুষকে শিক্ষিত করে তোলাও হিমুর একটি দায়িত্ব ছিল।

হুমায়ূন আহমেদ ব্যক্তি জীবনে নিজের অর্থ দিয়ে সাধারণ মানুষকে সহায়তার পাশিপাশি শিক্ষিত জনগৌষ্ঠী গড়ে তুলতে তার নিজ গ্রাম নেত্রকোনায় স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। তা পরিচালানা করেছেন নিজ অর্থে। বলতে গেলে হুমায়ূন আহমেদ তার ব্যক্তি জীবনে মানুষের কল্যাণে যা করেছেন; তার অনেকটাই চলে এসেছে হিমু চরিত্রে। তবে হিমু চরিত্রটি সব চেয়ে আলাদা একটি চরিত্র হিসেবে দেখানোর চেষ্টা মহান একটি শিল্পকর্ম। আর সেখানে লেখক হিসেবে তিনি সার্থক।

তাই হুমায়ুন আহমেদ স্বীকার না করলেও নিজের বিশাল মন ও মহত্ত প্রকাশ পেয়েছে হিমু চরিত্রে, তা আস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। হয়তো নিজেকে উদার ও মহৎ মানুষ হিসেবে তুলে ধরতে চাননি। তাই বিষয়টি এড়াতেই স্বীকার করতে চাননি তার চরিত্রের বেশ কিছু মহত্ত হিমু চরিত্রে প্রকাশ পেয়েছে।   

হুমায়ূন আহমেদ মানুষকে নিরন্তর কষ্ট থেকে বাঁচানোর জন্য ক্যান্সার রোগীদের জন্য আধুনিক ক্যান্সার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। এ উদারতা হিমু আর হুমায়ূনের জন্যই মানায়। এমন মহৎ আর ক’জন হতে পারে!

অথচ মরণব্যাধী ক্যান্সারে বৃহস্পতিবার রাতে বিশিষ্ট লেখক, নাট্যকার ও চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব হুমায়ূন আহমেদ নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার দুপুর ১টা ২২ মিনিটে বেলভিউ হাসপাতালে মারা যান। আর এই না ফেরার দেশে চলে যাওয়া আমাদের অপূরণীয় ক্ষতির মুখে ঠেলে দিল।

তবে আমরা যেন তার স্বপ্ন্-বাস্তবতা নিজের মধ্যে আত্মস্থ করতে পারি। মানুষ হতে পারি এবং সমাজের কল্যাণে যতো ক্ষুদ্রই হোকনা কেন অবদান রাখতে পারি।

তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর মধ্য দিয়ে আমরা যেন অঙ্গিকারাবদ্ধ হই দেশপ্রেমিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে।

বাংলাদেশ সময়: ০৭৪৯ ঘণ্টা, জুলাই ২১, ২০১২
সম্পাদনা: রোকনুল ইসলাম কাফী, নিউজরুম এডিটর


বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন
মিডিয়া হাউজ, প্লট#৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক#ডি, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ
নিউজরুম মোবাইল ফোন: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯, ০১৭২৯০৭৭৩৩০, ০১৭২৯০৭৬৯৫৪ ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১-২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, news@banglanews24.com (সেন্ট্রালডেস্ক) corr.bn24@gmail.com (কান্ট্রিডেস্ক), editor@banglanews24.com (এডিটর-ইন-চিফ)
বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন       একটি ইডব্লিউএমজিএল প্রতিষ্ঠান       কপিরাইট © 2013 banglanews24.com সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত