|

শ্রীপুরের ২০ ক্লিনিকে লাগামহীন চিকিৎসা বাণিজ্য
26 Aug 2012 12:47:56 AM Sunday BdST
আহমেদ মিলন, শ্রীপুর প্রতিনিধি বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
শ্রীপুর (গাজীপুর): ঢাকা ময়মনসিংহ মহাসড়কের শ্রীপুর পৌরসভার মাওনা চৌরাস্তা এলাকার আধাকিলোমিটারের মধ্যে গড়ে উঠেছে অন্তত ২০টি ক্লিনিক। ব্যক্তিমালিকানার এসব ক্লিনিকে চিকিৎসার নামে রোগীদের পকেট কাটার প্রতিযোগিতা চলছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
নানা চটকদার নামের ক্লিনিকগুলোর আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পড়ে প্রতারণার শিকার হচ্ছে অসংখ্য মানুষ। কমিশনের ভিত্তিতে নিয়োগ করা দালালরা প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে রোগী ধরে আনে এসব ক্লিনিকে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রত্যেক ক্লিনিকেই ময়মনসিংহ বা ঢাকা থেকে চুক্তিভিত্তিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আসেন। বিশেষ করে প্রতি শুক্রবার। প্রচারপত্রে ওই সব ডাক্তারের নামের আগে পরে নানা পদবি এবং ডিগ্রির উল্লেখ থাকলেও তাদের অনেকের ব্যাপারে রয়েছে নানা প্রশ্ন।
এসব ক্লিনিকে গিয়ে প্রতারণার শিকার একাধিক রোগীর কাছ থেকে জানা গেছে, ৫০০ বা ৩০০ টাকা ফি দিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর প্রয়োজন হোক আর না হোক প্রথমেই রোগীকে দেওয়া হয় ১০-১২ টি পরীক্ষা। বাধ্য হয়ে পরীক্ষাগুলো করতে হয় রোগীদের।
এসব পরীক্ষার ক্ষেত্রেও আবার বাধ্যবাধকতা থাকে। সংশ্লিষ্ট ক্লিনিক ছাড়া অন্য কোথাও পরীক্ষা করানো যাবে না। অনেক সময় সেসব পরীক্ষার রির্পোট ভুল আসার কারণে আবারও পরীক্ষা করতে দেওয়া হয়। কিন্তু ভুলের মাশুল গুণতে হয় রোগীদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্যাথলজিস্ট জানিয়েছেন, রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করতে সর্বোচ্চ খরচ হয় ৫ টাকা ৬০ পয়সা। কিন্তু মাওনার ওই হাসপাতালগুলোতে নেওয়া হয় ১৫০ টাকা। শতভাগ বেশি টাকা নেওয়া হচ্ছে শুধু রক্ত পরীক্ষার ক্ষেত্রে। আর অন্যান্য অসংখ্য পরীক্ষাতো আছেই।
রক্তের গ্রুপ পরীক্ষার ব্যাপারে ওই হাসপাতালের ব্যবস্থাপক হাসান বলেন, প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন গাজীপুর জেলা শাখার ধার্য করা মূল্যেই তারা রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করেন।
তবে এ ব্যাপরে গাজীপুর জেলা সিভিল সার্জন ডা. হাবিবুল্লাহ বাংলানিউজকে জানান, রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করতে ৫০ টাকার কম খরচ হওয়ার কথা নয়।
মোরশেদা আক্তার নামে এক স্বামী পরিত্যক্তা পাইলসের সমস্যায় ভুগছেন দীর্ঘদিন ধরে। টাকার অভাবে তিনি চিকিৎসকের কাছে যেতে পারেননি। শ্রীপুরের আক্তাপাড়া গ্রামের হতদরিদ্র মোরশেদার অবস্থা দেখে এলাকাবাসী সহযোগিতা করে তাকে মাওনার আল হেরা হাসপাতালে ভর্তি করে।
ভর্তির পর ওই ক্লিনিকের পরিচালক বলেন, ‘এটা কোনো ব্যাপারই নয়। আজই অস্ত্রোপচার করা হবে’।
প্রথমেই তাকে ১০-১২ টি পরীক্ষা করাতে বলা হয় ওই হাসপাতালেই। প্রায় ৬ হাজার টাকার পরীক্ষা শেষে দুদিন পর মোরশেদাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে বলা হয় তার ক্যানসার হয়েছে। এরপর ঢাকায় তাদের পছন্দের এক হাসপাতালে আরও ৪-৫ টি পরীক্ষা করাতে বলা হয়।
চারদিন যাওয়া-আসাসহ খরচ হয় আরও ৩০ হাজার টাকা। তার ক্যানসার হয়নি বলে ঢাকার হাসপাতাল থেকে রির্পোট দেওয়া হয়। পরে আল হেরা হাসাপতালে নিয়ে দুদিন রাখার পর কৃর্তপক্ষ জানায়, এই অপারেশন তাদের দ্বারা সম্ভব নয়।
এরই ফাঁকে মোরশেদার খরচ হয়ে যায় প্রায় ৫০ হাজার টাকা। আর এ খরচের অর্ধেকের বেশি টাকা (ঢাকার হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি মতো) আল হেরা হাসপাতালে চলে এসেছে বলে জানায় হাসপাতালের বিশ্বস্ত একটি সূত্র।
এ তো গেল হতভাগ্য এক মোরশেদার কথা। মাওনার ওই ক্লিনিকগুলোতে এসে এ রকম নানা প্রতারণার শিকার হচ্ছে শত শত রোগী ।
আল হেরা হাসপাতালের পরিচালক ডা. আবুল হোসাইন বলেন ‘অসহায় নারী মোরশেদার বিষয়ে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সফল হতে পারেননি। অন্যান্য ক্লিনিক যে ভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছে, তার হাসপাতালও সেভাবেই চলছে বলে তিনি দাবি করেন।
এদিকে তিনি সাধারণ একজন এমবিবিএস চিকিৎসক হয়ে ৩০০ টাকা ফি নিয়ে সব রোগের ব্যবস্থাপত্র দিয়ে সমালোচনায় পড়েছেন একাধিকবার। এ অভিযোগ অবশ্য তার একার বিরুদ্ধে নয়, এখানকার অনেক চিকিৎসকই এমন অর্থবাণিজ্যে লিপ্ত।
অন্যদিকে অদক্ষ টেকনিশিয়ান দ্বারা এক্স-রে, ইসিজি, আলট্রাসনো, অপরিচ্ছন্ন কেবিন ও নানা অনিয়মের কারণে সম্প্রতি আল হেরা হাসপাতালকে ভ্রম্যমাণ আদালত ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন।
মাত্র এক দশক আগে যে সব ক্লিনিক টিনশেড ঘরে যাত্রা শুরু করেছিল সেই সব প্রতিষ্ঠানের কোনো কোনোটা এখন বহুতল ভবন। এ সবই মানুষকে প্রতারিত করে অর্জিত টাকায় তৈরি বলে অভিযোগ করেন রিয়াজ নামে এক সাধারণ রোগী। কোনো কোনো সময় ডাক্তারের চেম্বারের সামনে বিভিন্ন কোম্পানির প্রতিনিধিদের স্যাম্পল ওষুধ নিয়ে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। যে কোম্পানি বেশি স্যাম্পল দেয়, চিকিৎসকরা ব্যবস্থাপত্রে সেই কোম্পানির ওষুধের নামই লেখেন।
স্যাম্পলের ওইসব ওষুধ দিয়ে চলে ক্লিনিকের নিজস্ব ফার্মেসি। ভর্তিকৃত রোগীরা সাধারণত বাকিতে ওষুধ নেন। রোগী ছাড়া পাওয়ার সময় টাকা পরিশোধ করা হয়। আর তখন ইচ্ছামতো দাম আদায় করা হয় রোগীদের কাছ থেকে। এতো অর্থ গচ্চা দিয়েও চিকিৎসক-নার্সদের অবহেলার শিকার হন ভুক্তভোগী মানুষ।
শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দেবাশীষ নাগ বাংলানিউজকে জানান, ক্লিনিকগুলোর বিরুদ্ধে এমন অসংখ্য অভিযোগ তিনি পেয়েছেন। খুব শিগগরিই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচলিত হবে।
অন্যদিকে ক্লিনিকের মালিকরা একে অন্যের ওপর দোষ চাপনোর চেষ্টা করেছেন। তবে এসব অভিযোগের কথা কেউ অস্বীকার করতে পারেননি।
বাংলাদেশ সময়: ১০৩৯ ঘণ্টা, আগস্ট ২৬, ২০১২ সম্পাদনা: রোকনুল ইসলাম কাফী, নিউজরুম এডিটর
মিডিয়া হাউজ, প্লট#৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক#ডি, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ
নিউজরুম মোবাইল ফোন: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯, ০১৭২৯০৭৭৩৩০, ০১৭২৯০৭৬৯৫৪
ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১-২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, news@banglanews24.com (সেন্ট্রালডেস্ক)
corr.bn24@gmail.com (কান্ট্রিডেস্ক), editor@banglanews24.com (এডিটর-ইন-চিফ)
বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন একটি ইডব্লিউএমজিএল প্রতিষ্ঠান কপিরাইট © 2013 banglanews24.com সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত
|
|