Alexa
ঢাকা, সোমবার, ১১ বৈশাখ ১৪২৪, ২৪ এপ্রিল ২০১৭
bangla news
symphony mobile

জঙ্গিবাদ দমনে করণীয়

মেজর (অব.) রেজাউল করিম | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১৭-০৪-০৮ ৭:২১:২৭ পিএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

বাংলাদেশ একটি শান্তি ও সম্প্রীতির দেশ। আমাদের জাতীয়তাবাদ সুসংহত। আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা আর জনগণের দায়িত্বশীলতায় এদেশে কোনোদিন উগ্র ধর্মান্ধ জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে পারেনি।

কিন্তু বিগত বছরগুলোতে আমাদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু কার্যক্রমের জন্য আমজনতার ভ্রু কুঁচকে গেছে, মনে জেগেছে এমন কিছু প্রশ্ন যা জিজ্ঞেস করতেও আমরা বিব্রত ও ভীত সন্ত্রস্ত বোধ করি। দিনে দিনে বিভিন্ন অপঘটনার মধ্য দিয়ে আমাদের সঙ্গে সরকার এবং তাদের আইনি ব্যবস্থার মধ্যে দূরত্ব শুধু বেড়েই চলেছে। আমি কিছু ঘটনা এবং আলোচনার আঙ্গিকে আমার মতামতগুলো তুলে ধরতে চাচ্ছি-

জঙ্গি নির্মূল অভিযান: একের পর এক জঙ্গি নির্মূল অভিযানে বিগত বছরগুলোতে যাদের ধরা হলো তাদের প্রচলিত আইনে আদালতের কাঠগড়ায় দাড় করানোর যে চিরাচরিত রীতি, তার চর্চা খুব কম সময়েই দেখেছি আমরা। আমরা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং মিডিয়ার মাধ্যমে দেখেছি, গ্রেফতার করা আসামিকে নিয়ে পুলিশি অভিযানে গিয়ে তথাকথিত ক্রসফায়ারে সেই আসামিই নিহত হচ্ছেন। একই ঘটনা যখন বার বার ঘটছে তখন স্বাভাবিকভাবেই জনমনে প্রশ্ন ওঠে, আমাদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বন্দি নিরাপত্তা দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে। আইনি প্রক্রিয়ায় সাজা না হওয়া পর্যন্ত জনগণ প্রকৃত আসামিদের সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাবে না।

বর্তমানে বিভিন্ন জঙ্গি আস্তানা ঘেরাও করার পর আত্মসমর্পণের সুযোগ দেওয়া সত্ত্বেও জঙ্গিরা নিশ্চিত মৃত্যুর পথ বেছে নিচ্ছে যা বাংলাদেশের ইতিহাসে আমরা আগে কখনও দেখিনি। আমরা মনে করি, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে স্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে বিচার প্রক্রিয়ায় এগোলে বিপথগামী অনেক জঙ্গিরা তাদের ভুল বুঝতে পেরে স্বেচ্ছায় আইনের হাতে নিজেদের সোপর্দ করবে।

আমরা বিশ্বাস করি, ৭১ এর বর্বরতম মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার যখন আমরা আমাদের আইন ব্যবস্থার প্রতি সম্মান রেখে নিয়মতান্ত্রিকভাবে অপরাধীদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিয়ে সম্পন্ন করতে পেরেছি, জঙ্গিবাদের বিচারও একইভাবে করা সম্ভব।

জঙ্গি কারা, কী তাদের উদ্দেশ্য: অন্যান্য দেশের জঙ্গিদের কর্ম তৎপরতার সঙ্গে আমাদের দেশের জঙ্গিদের আক্রমণের গতি-প্রকৃতির কিছু অমিল রয়েছে। সাধারণত ইসলামী জঙ্গিবাদের যে মতবাদ বিভিন্ন দেশে প্রচলিত রয়েছে সেখানে সরকার বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে তাদের মুখোমুখি অবস্থানের পিছনে কিছু মৌলিক দাবি থাকে। তাদের দাবির প্রেক্ষিতে সরকারের দমন ও নিপীড়নের ফলাফল স্বরূপ তারা সহিংসতার পথ বেছে নেন। তারা প্রথমদিকে চোরাগুপ্তা হামলার পথ বেছে নেন, যখন তারা সংখ্যায় খুবই কমে যায় এবং পরাজয় নিশ্চিত বুঝতে পারে শুধু তখনই তারা আত্মঘাতী হামলার মতো চরম পন্থা অবলম্বন করে। ৯০ শতাংশেরও বেশি মুসলমানের দেশ বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় বিধিনিষেধ পালন করতে যেমন কোথাও বাধা নেই, তেমনি আমাদের দেশের মতো মিলেমিশে শিয়া ও সুন্নিরাও বিশ্বের খুব কম দেশে শান্তিতে বসবাস করে। এ প্রেক্ষিতে, জঙ্গিদের উদ্দেশ্য ও কাজের মধ্যে কোনো মিল দেখতে পাই না আমরা, তাদের সুনির্দিষ্ট দাবি-দাওয়াও কোথাও পেশ করেননি তারা।
গুলশান হলি আর্টিজানের পর থেকে ঘটে যাওয়া ঘটনা প্রবাহের আপাত বিশ্লেষণে মনে হচ্ছে, তাদের প্রধান লক্ষ্য এ ধরনের হামলা চালিয়ে বিদেশি মিডিয়ায় ঝড় তুলে প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করা। বিশ্বে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল। বাংলাদেশ যখন বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি সামনে রেখে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পথে ধাবমান, ঠিক তখনই এই উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করতে, বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল ও ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করতে একটি কুচক্রী মহল সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

এখন কথা হলো, সাধারণ জনগণ এতো জটিল হিসাব বুঝতে চায় না, তারা আশ্বস্ত হতে চায়, তারা জানতে চায় পর্দার পিছনে আসলে কারা রয়েছে, কী তাদের উদ্দেশ্য, কাকে ফাঁসিয়ে কে সেভ হচ্ছে, জনমনে ভীতির সঞ্চার করে পর্দার আড়ালে কোনো গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করছে কিনা, আমরা যে দিনের পর দিন জঙ্গি পরিচয়ে বিভিন্ন গ্রেফতারের ঘটনা শুনছি তারা আসলেই কোনো পর্যায়ের জঙ্গি কিনা, তাদের মদতদাতা কারা, এই বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলা-বারুদের মজুদ আর এতো উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ কোথায় পেলেন তারা। তদন্তের স্বার্থে তাৎক্ষণিকভাবে না হোক, কিছুদিন পরে হলেও বিভিন্ন অপঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মুখোশ জনসম্মুখে উন্মুক্ত করা উচিত বলে আমি মনে করি।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এবং তাদের তৎপরতা: এবার আলোচনায় আসা যাক আমাদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে কি আসলেই সম্ভব জঙ্গিবাদ সমূলে উৎখাত করা, সেটা নিয়ে। আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ড কিছুটা ‘চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে’ গোছের। আমরা ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর জড়িতদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করি, কিন্তু সম্ভাব্য ঘটনার জন্য নিজে থেকে উদ্যোগ নিয়ে তা অঙ্কুরেই ধ্বংস করার মতো সক্ষমতার দিক দিয়ে পিছিয়ে রয়েছি আমরা। আমাদের ইন্টেলিজেন্স কমিউনিটি রিয়্যাকটিভ, যেটা হওয়ার কথা ছিলো প্রোয়্যাকটিভ ইন্টেলিজেন্স।

অন্যদিকে, আমাদের ইন্টেলিজেন্স এজেন্সিগুলো এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে যে শুধু সমন্বয়হীনতা রয়েছে তাই না, বিভিন্ন বহুল প্রচারিত সংবাদমাধ্যমে আমরা তাদের মধ্যে পরস্পরবিরোধী অবস্থানের কথা শুনতে পাই। দেশের সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স এজেন্সিগুলোর নির্দেশনা অনুযায়ী আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা, কিন্তু বাস্তবে আসলেই তা ঘটছে কি? যেখানে আমাদের নিজেদের মধ্যে সমন্বয় ও সহযোগী মনোভাবের অভাব রয়েছে সেখানে আমরা কীভাবে এই জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে পারবো? জঙ্গি হামলা শুরু হওয়ার এতোদিন পরেও কীভাবে একটা রেড এলার্ট জোনে একজন পুলিশ সদস্য সন্দেহজনক কোনো ব্যাগ লাঠি দিয়ে নাড়াচাড়া করতে যান? জঙ্গি সংশ্লিষ্ট একটা ক্রাইম জোনে এগুলো তো খুবই বেসিক স্ট্যান্ডার্ড প্রসিডিউর যে, সন্দেহজনক যেকোনো বস্তু দেখা মাত্র প্রথম কাজ, সেখান থেকে সাবধানে নিরাপদ দূরত্বে সরে গিয়ে বোমা নিষ্ক্রিয়করণ বিশেষজ্ঞ দলের সদস্যদের সেখানে এসে তা পরীক্ষার সুযোগ করে দেওয়া। এই সামান্য ভুলের জন্য আমাদের কতো বড় মাশুল দিতে হলো চিন্তা করা যায়?
এখন সময় আমাদের সব ধরনের সক্ষমতা একীভূত করে শক্ত হাতে এই জঙ্গিবাদ নির্মূলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা। আমাদের আজকের দৃঢ় পদক্ষেপই পারে আগামীতে আমাদের সন্তানদের জন্য এক প্রগতিশীল ও নিরাপদ বাংলাদেশ রেখে যেতে।

মেজর (অব.) রেজাউল করিম
বর্তমানে নিরাপত্তা বিশ্লেষক হিসেবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে পরামর্শক হিসেবে কর্মরত

বাংলাদেশ সময়: ১৯১৯ ঘণ্টা, এপ্রিল ০৮, ২০১৭
এসএনএস


 

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

You May Like..