ঝুড়িতে নামার অপেক্ষায় রাজশাহীর আম
[x]
[x]
ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৪ আগস্ট ২০১৮
bangla news

ঝুড়িতে নামার অপেক্ষায় রাজশাহীর আম

শরীফ সুমন, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১৮-০৫-১৬ ৭:৪৭:৪৯ এএম
এবার রাজশাহীতে আমের ফলন ভালো হয়েছে। ছবি: বাংলানিউজ

এবার রাজশাহীতে আমের ফলন ভালো হয়েছে। ছবি: বাংলানিউজ

রাজশাহী: ‘আম’ এমনিতেই বাঙালির পছন্দের সেরা ফল। আর সেটি যদি হয় রাজশাহীর তাহলে তো কথাই নেই! কারণ রাজশাহীর আম স্বমহিমায় উদ্ভাসিত। নামেই যার খ্যাতি দেশজুড়ে।

মধুর মতো মিষ্টি, আর টসটসে রসে ভরা আম। হাতে নিয়ে খেতে গেলে নিস্তার নেই, খেতে হবে কনুই ভিজিয়েই।

তাই মৌসুমে একবার খেলেও এমন আমের স্বাদ বছরজুড়েই লেগে থাকে রসনাবিলাসীদের জিভে। কেবল দেশেই নয়; যায় বহির্বিশ্বেও। এজন্য বছরজুড়েই চলে অপেক্ষা। চলে বিশাল কর্মযজ্ঞ। মধুমাস পড়েছে মাত্রই। 

কিন্তু বাহারি নাম ও স্বাদের রসালো আম ছাড়া কি আর মধুমাস জ্যৈষ্ঠ জমে! বছর ঘুরে প্রতীক্ষার ইতি টেনে আগামী সপ্তাহেই পরিপক্ক হয়েই গাছ থেকে বাজারের ঝুড়িতে নামছে ‘রাজশাহীর আম’।

দেশবাসীকে বিষমুক্ত ফল দিতে গত দু’বছর ধরে গাছ থেকে আম পাড়ার জন্য সময় বেঁধে দিচ্ছে জেলা প্রশাসন। কিন্তু তীব্র তাপদাহে সময়ের আগে অনেক আম পেকে গাছেই নষ্ট হয়ে যায়। অন্যদিকে রাজশাহীর আমের ওপর দিয়ে এবার ঝড়-বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টির ধকলও যাচ্ছে।

প্রথম দিকে গাছে যখন মুকুল আসা শুরু হয় তখন তীব্র শীত ছিল। আবার শেষের দিকে গরমও পড়তে শুরু করেছিল। তাই গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার গাছে সবচেয়ে বেশি মুকুল এসেছিল। 

ফলন ভালো হয়েছ আমের, কিছুদিনের মধ্যেই বাজারে আসবে রাজশাহীর আম। ছবি: বাংলানিউজকিন্তু দফায় দফায় কালবৈশাখী আর শিলাবৃষ্টিতে আমের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এর পরও যা অবশিষ্ট আছে তা দিয়েই দেশের চাহিদাপূরণ করা সম্ভব বলে মনে করছেন আমচাষি ও ব্যবসায়ীরা।

রাজশাহীর বাঘা উপজেলার মণিগ্রামের আমচাষি ও ব্যবসায়ী জিল্লুর রহমান বাংলানিউজকে বলেন, সাধারণত মধুমাস জ্যৈষ্ঠ শুরুর পর রাজশাহীতে আম পাকতে শুরু করে। কোনো আম আগে পেকে যায় কোনোটা পরে। 

তাই বিভিন্ন জাত ও নামের আম পর্যায়ক্রমে উঠতে থাকে বাজারে। কিন্তু গতবছর নিষেধাজ্ঞা মেনে আম পাড়ায় বাজারে প্রায় এক সঙ্গেই তোলা হয়েছিল সব জাতের আম। তবে এবার তেমনটি হবে না। এবার পর্যায়ক্রমেই বাজারে উঠবে বিভিন্ন জাতের আম।

এবার আম পাড়ার নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়ার পর থেকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি মনিটরিংও করা হচ্ছে। আর সময় বেঁধে দেওয়ায় আম পাড়ার বিষয়ে সতর্ক রয়েছেন এ অঞ্চলের আমচাষিরা। তারা বছরজুড়ে পরিশ্রমের এ ফসল গাছ থেকে নামাতে চান পরিপক্ক করেই। 

তাই মূলত আগামী ২১ মে থেকে রাজশাহী জেলার সব উপজেলায় পুরোদমে আম পাড়া শুরু হবে। এজন্য বাঘার মত রাজশাহীর প্রতিটি উপজেলাতেই নির্বাহী কর্মকর্তা খোঁজ রাখছেন বলেও জানান বাঘার মণিগ্রামের এ আম ব্যবসায়ী।

আমচাষি জসিম উদ্দিন বলেন, গাছে পরিপক্ক করে আম পাড়লে আর কেমিক্যাল দিয়ে আম পাকাতে হয় না। এজন্য তার মত সব চাষিই এখন গাছ থেকে পরিপক্ক আম পাড়েন। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটছে না। এরই মধ্যে প্রায় সব গাছের আমেই পূর্ণতা এসে গেছে। সোমবার (১৩ মে) থেকে অনেকেই গুটি জাতের আম পাড়তে শুরু করেছেন। 

তাই সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী সপ্তাহেই তার বাগানে পুরোদমে আম ভাঙা শুরু করবেন। প্রথমেই জাত আম খ্যাত গোপালভোগ রাজশাহীর বাজারে তোলা হবে বলেও জানান এ আমচাষি।

রাজশাহী ফল গবেষণাকেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আলিম উদ্দিন বলেন, গুটি আম প্রতিবছরই একটু আগে পাকে। এবারও ব্যতিক্রম হয়নি। তাই অনেকে এখন গুটি আম পাড়তে শুরু করেছেন। তবে আমের রাজধানী হিসেবে খ্যাত রাজশাহীর আম পাড়ার কর্মযজ্ঞ শুরু হবে আগামী সপ্তাহেই। প্রথমেই গোপালভোগ ও গুটি জাতের আম পাড়তে শুরু করেবেন রাজশাহীর বাগানমালিকরা।

বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আলিম উদ্দিনের হিসাব অনুযায়ী বিভিন্ন জাতের জনপ্রিয় আমের পরিপক্বতা আসার সময়কালের মধ্যে মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে উঠবে গোপালভোগ আম। অত্যন্ত সুস্বাদু, আঁশহীন, আঁটি-ছোট আম। সাইজ মাঝারি, কেজিতে ৫ থেকে ৬টা ধরবে। এর পর পাকা শুরু হবে ল্যাংড়া আম। 

তাই রাজশাহীতে জুনের প্রথম ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে উঠবে ল্যাংড়া আম। নাম ল্যাংড়া হলেও এর স্বাদ অসাধারণ। আঁটি ছোট ও পাতলা, খোসা খুব পাতলা, রসালো, গায়ে শুধুই শাঁস। এভাবে পর্যায়ক্রমে সব আম উঠতে শুরু করবে।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক দেব দুলাল ঢালি বলেন, চাষিরা এখন আমগাছের নিয়মিত পরিচর্যা করেন এবং যত্ন নেন। তাই প্রতিবছরই ভালো ফলন হয়। রাজশাহীতে প্রায় ১৭ হাজার হেক্টর জমিতে আমবাগান রয়েছে। প্রতি হেক্টর জমির বাগান থেকে ১০ থেকে ১২ মেট্রিক টন আম উৎপাদন হয়। 

সে হিসাবে প্রতিমৌসুমে কমপক্ষে এক লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদন হয়। কিন্তু এবার দফায় দফায় কালবৈশাখীর কারণে আমের উৎপাদন কিছুটা কম হবে। তবে এতেও চাহিদা পূরণ হবে এবং কৃষকরা লাভবান হবেন।

রাজশাহী জেলা প্রশাসক (ডিসি) এসএম আবদুল কাদের বলেন, কোনোভাবেই ২০ মে’র আগে রাজশাহীতে গাছ থেকে আম পাড়া এবং বাজারজাত করা যাবে না।

গাছ থেকে আম পাড়া প্রসঙ্গে বুধবার (০৯ মে) দুপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ নির্দেশনা দেন।

জেলা প্রশাসক এসএম আবদুল কাদের বলেন, কেবল গাছে পাকলেই গুটি আম পাড়তে পারবেন চাষিরা। তবে গোপালভোগ কোনোভাবেই ২০ মে’র আগে গাছ থেকে পাড়া যাবে না। পর্যায়ক্রমে ১ জুনের আগে হিমসাগর, খিরসাপাত ও লক্ষণভোগ পাড়া যাবে না। 

জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী এবার ল্যাংড়া পাড়া যাবে ৬ জুন থেকে। এছাড়া চলতি মৌসুমের আম্রপালী ও ফজলি ১৬ জুন এবং আশ্বিনা জাতের আম ১ জুলাইয়ের আগে গাছ পাড়তে পারবেন না রাজশাহীর চাষিরা। 

কারণ রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে আশ্বিনা আম পাকা শুরু করবে জুনের শেষ সপ্তাহে। তাই এবার চলতি মে মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত রাজশাহীর সুস্বাদু আমের ভরা মৌসুম চলবে।

বাংলাদেশ সময়: ০৭৪০ ঘণ্টা, মে ১৬, ২০১৮
এসএস/ওএইচ/

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Alexa