ঢাকা, শনিবার, ৮ আশ্বিন ১৪২৪, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭

bangla news

স্থানীয়দের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে রোহিঙ্গারা

রহমান মাসুদ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১৭-০৯-১৪ ১২:০৮:৪৭ পিএম
লেদ‍া পশ্চিমপাড়ায় ঘর তোলা হচ্ছে রোহিঙ্গাদের কাছে ভাড়া দেওয়ার জন্য। ছবি: দীপু মালাকার

লেদ‍া পশ্চিমপাড়ায় ঘর তোলা হচ্ছে রোহিঙ্গাদের কাছে ভাড়া দেওয়ার জন্য। ছবি: দীপু মালাকার

টেকনাফ (কক্সবাজার) থেকে: লোভী মানুষের সহযোগিতা ও মদতে স্থানীয়দের সঙ্গে দ্রুতই মিশে যাচ্ছে মিয়ানমার থেকে জীবন বাঁচাতে পলিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। ক্যাম্পে না গিয়ে তাই তারা গ্রামে গ্রামে বাসা ও খালি জমি ভাড়া নিয়ে হাজার হাজার নতুন বসতি গড়ে তুলছে।

সরকারি কারো কাছেই এদের কোন হিসাব নেই। অল্প দিনেই এসব রোহিঙ্গা সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে স্থানীয়দের মতো করেই বাচঁতে শুরু করেছে। এখন খুঁজছে কর্মসংস্থানের সুযোগও। টেকনাফ ও উখিয়ার গ্রামগুলো ঘুরে এ চিত্রই চোখে পড়েছে সবখানে।

রোহিঙ্গাদের ঘর উঠছে। ছবি: দীপু মালাকার লেদা পশ্চিমপাড়া গ্রামে ছোট্ট একটি পুকুর পাড়ে ঘর তুলছে কালু মিয়া। দুজন মিস্ত্রী মনযোগ দিয়ে কাজ করছে। কালু মিয়া বাড়িতে নেই। তবে তার মেয়ে জানালো, রোহিঙ্গাদের (বর্মাইয়া) কাছে ভাড়া দেওয়ার জন্যই এ ঘর তোলা হচ্ছে। টেকনাফ ও উখিয়ার শত শত গ্রামেও এই এক চিত্র। কোথাও যেনো এক চিলতে জমি ফাকাঁ নেই। বাড়ির উঠোন, পুকুর পাড়, খাল পাড়, পতিত জমি এভাবেই ভাড়া দিয়েছে স্থানীয়রা। অপেক্ষাকৃত সচ্ছল রোহিঙ্গা পরিবারগুলোকে ক্যাম্পে না গিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘর ও জমি ভাড়া নিতে দেখা যাচ্ছে। আবার নিজ খরচেও ঘর তুলে ভাড়া দিচ্ছে মালিকরা।

টেকনাফে গড়ে ওঠা রোহিঙ্গা বসতি। ছবি: দীপু মালাকার তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা পরিবারই স্থানীয়দের কাছ থেকে জমি ভাড়া নিয়ে নিজেদের খরচেই ঘর তুলছে। বিনিময়ে জমির মালিক সেখান থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ ভাড়া পাবে। আবার ভাড়া নির্ধারনণ হবে নতুন ঘরের কক্ষের ওপর ভিত্তি করে। তবে এক ঘরে এক পরিবারই আছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে। আবার কয়েকটি পরিবার মিলে অনেকক্ষেত্রে একটি জমি ভাড়া নিচ্ছে।  সেখানে বাঁশ ও পলিথিন দিয়ে ঘর তুলে পরিবার নিয়ে বসবাস শুরু করেছে। এই গ্রামগুলো অনেক ক্ষেত্রে মূল সড়ক থেকে অনেক ভেতরে এবং পাহাড়ের পাশে। তাই বলে এমন নয় যে, সড়কের পাশে বা গ্রামের মধ্যে এমন চিত্র নেই। আসলে কক্সবাজারের টেকনাফ  ও উখিয়ার প্রায় সব গ্রামেরই এই একই চিত্র।

লেদা পশ্চিম পাড়াতেই পাহাড়ের পাশে কাজী আবুল কাশেমের বাড়ির আঙ্গিনায় গড়ে উঠেছে নতুন বড় দুই বসতি। এই বসতি দুটিতে আরাকানের মংডু পোয়াখালি (বালুখালি) গ্রামের ৩০টি পরিবার বসতি গড়েছে। এরা সবাই একই সঙ্গে ২ সেপ্টেম্বর (কোরবানির ঈদের দিন) বাংলাদেশে আসে শিলখালি ঘাট পার হয়ে। এসব পরিবার মোটামুটি সচ্ছল ছিলো। নিজেদের খরচেই আবুল কাশেমের জমিতে ঘর তুলেছে তারা। এজন্য জমির মালিককে প্রতি মাসে পরিবার প্রতি ভাড়া দিতে হবে ৫০০ টাকা করে। স্থানীয় পর্যায়ে পাওয়া বাঁশ ও লবণ ক্ষেতে ব্যবহৃত মোটা কালো পলিথিন দিয়ে ঘরগুলো বানানো হয়েছে।

টেকনাফের হিলটপ হোটেলে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করেন নুর বেগম। ১৩ বছর আগে মিয়ানমারের মংডু থেকে তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন। প্রথমেই তিনি আগে আসা আত্মীয়ের মাধ্যমে বাসা ভাড়া নেন টেকনাফ শহরের পৈলান পাড়া এলাকায়। সেখানে এসে কাজ শুরু করেন এই হোটেলে। এখানেই পরিচয় হয় হবিগঞ্জের ট্রাক চালক মোহাম্মদ আলমের সঙ্গে। পরে তারা বিয়েও করেন। তবে সে সংসার টেকেনি। এক সন্তান নিয়ে আগের বাসাতেই আছেন নুর বেগম। এরইমধ্যে তিনি পেয়েছেন বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয় পত্র। এবার তার বাসায় মিয়ানমার থেকে এসে উঠেছেন তার দুই বোন, এক চাচার পরিবার। ক্যাম্পে যাওয়ার কোন ইচ্ছাই নেই পরিবার তিনটির। টেকনাফেই নতুন বাসা দেখে নয় সন্তান নিয়ে আসা পরিবার তিনটি চলে যাবে বলে জানালেন নুর বেগম।

রোহিঙ্গা। ছবি: দীপু মালাকার রোহিঙ্গাদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেন টেকনাফের মোজাম্মেল হক। বাংলানিউজকে তিনি বলছিলেন, ওপার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের দ্রুতই একটি স্থানে নিয়ে নিবন্ধন করা উচিত। ফিঙ্গার প্রিন্ট ও আইরিশ নিয়ে ওদের পরিচয়পত্র ও ডাটাবেজ করা জরুরি। তা না হলে দ্রুতই এরা সাধারণের সঙ্গে মিশে গিয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে যাবে।

তিনি বলেন, আগেই টেকনাফ শহরের প্রায় অর্ধেকই গত ৫০ বছর ধরে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের দখলে চলে গেছে। তারা এদেশের পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে গিয়ে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। আবার জাতীয় পরিচয় পত্র নিয়ে জনপ্রতিনিধিও নির্বাচিত হয়েছে। কেবল বাদ ছিলো গ্রাম গুলো। এবার গ্রামগুলোতেও স্থানীয়দের তুলনায় বেশি রোহিঙ্গা বসতি গড়ে উঠেছে। এরইমধ্যে স্থানীয়রা সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছে।

সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিছে যাচ্ছে রোহিঙ্গারা। ছবি: দীপু মালাকারঅনেকেই বলছেন, গ্রামে গ্রামে এভাবে রোহিঙ্গাদের মিশে যাচ্ছে কিছু লোভী মানুষ ও দালালদের হাত ধরে। তাদের সামান্য লোভে বিরাট ঝুকিঁতে পড়ে যাচ্ছে এখানকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান। স্থানীয় খাদ্যচক্র, পরিবেশ ও প্রতিবেশেও এর বিরূপ প্রভাব পড়বে।

বাংলাদেশ সময়: ১২০০ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৭
আরএম/জেডএম

অন্তর্ভুক্ত বিষয়ঃ রোহিঙ্গা

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

FROM AROUND THE WEB
Alexa