ঢাকা, মঙ্গলবার, ২ কার্তিক ১৪২৪, ১৭ অক্টোবর ২০১৭

bangla news

তবু যদি কিছু মেলে

জাকারিয়া মন্ডল, সিনিয়র আউটপুট এডিটর | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১৭-০৪-২১ ১০:৫৩:০০ এএম
নাতীকে নিয়ে ধান চালছেন সুজাতা। ছবি: অনিক খান

নাতীকে নিয়ে ধান চালছেন সুজাতা। ছবি: অনিক খান

ইটনা (কিশোরগঞ্জ) থেকে: সুজাতা রাণীর সঙ্গে হাত চালাচ্ছে বছর ৬ বয়সের রিমনও। কিন্তু এই ছোট্ট শিশুর ওপর কতোটাইবা আর ভরসা করা চলে! পোড়খাওয়া সুজাতা তাই অতি উৎসাহী নাতির হাত থেকে চালুনি টেনে নিচ্ছেন বারবার। চালুনির ফাঁক গলে বালু ঝরে যাওয়ার পর ধান টিকছে অল্পই। যেটুকু টিকছে তাতেও বেজায় দাপট চিটা বা পাতানের। এ চিটা কুলায় তুলে বাতাসে ওড়ালেই যদি ধান মেলে কিছু!  

কিন্তু সুজাতা জানালেন, শুধু ওড়ালেই হবে না। ধুতেও হবে। ঘণ্টা তিনেকের টানা পরিশ্রমে জমানো আধা ডালা ধান দেখিয়ে বললেন, এগুলা ফের উড়ামু। তারপর ধুমু। উড়াইলে চিটা যাইবো। ধুইলে বালু-মাটি।
ইটনা উপজেলা শহরের প্রধান সড়ক যেনো ধানের চাতাল। ছবি: অনিক খানএকটু দূরে নৃপেন্দ্র নাথও একইভাবে ধান চালছেন। সুজাতার কথার রেশই বুঝি বাজলো তার কথায়। নজর আর মনোযোগ ধানের চালুনিতে রেখেই বললেন, যা পাই তাই লাভ। বইসা থাকলে তো কেউ কিছু দিবো না। আকাশ থাইকা গজবের বৃষ্টি পড়ছে। সামলাই কেমনে!

আধা পাকা ধানের আঁটি মাথায় বয়ে নিয়ে আসা আমজাদ হোসেন তো বলেই বসলেন, ছবি তুইলা কি হইবো ভাই? যার যার খোরাকির চিন্তা তার তারই করা লাগবো।

সহকারী ভূমি অফিসার সুসেন কুমার সাহা এতোক্ষণ দূর থেকে পরিস্থিতি পর‌্যবেক্ষণ করছিলেন। কাছে এসে বললেন, ঢলটা আর দিন দশেক পর এলেই এরা সব ধান উঠিয়ে ফেলতে পারতো। এ পরিমাণ বৃষ্টি হবে কে জানতো?
পড়ে খাকা খড়ে ধানের খোঁজ নৃপেন্দ্রে’র। ছবি: অনিক খানজেলা পরিষদ ডাক বাংলোর পেছনের পুকুরে তখন এক ঝাঁক হাস জলকেলিতে মত্ত। অপরিপক্ক ধানে মন নেই তাদের। কিন্তু সুজাতা, নৃপেন্দ্র আর আমজাদদের অবস্থা আজ হাসের চেয়েও খারাপ। স্বাভাবিক মৌসুমে যে ধানে কেউ হাতও দিতো না, এখন সেই ধান সংগ্রহেই কি একাগ্রতা তাদের! এখানে জীবনের পলকা সুতোটা যে ওই ধানের সঙ্গেই বাধা পড়ে আছে।

হাত দশেক দূরেই ধনু নদী। পাড়ে গড়া অস্থায়ী বাজারটা গতরাতেই দখলে নিয়েছে দু’কূল ছাপানো ধনুর জল। গত দু’রাতের বৃষ্টি যেনো ধানক্ষেতের সঙ্গে সঙ্গে হাওরজীবীদের জীবনটাও ডুবিয়ে দিতে শুরু করেছে। রাতভর বেয়াড়া বাতাস সাঁই সাঁই শব্দ তুলে আরো বিপদের বার্তা পৌছে দিয়ে গেছে এখানে। ঘড়ির কাঁটা রাত ৮টার ঘর ছোঁয়ার আগেই দোকানের ঝাঁপ নামিয়ে দোকানিরা সেঁধিয়ে গেছে ঘরে।   

বৃষ্টিরাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ অডিটরিয়াম কাম কমিউনিটি সেন্টার আর ধনুর মাঝ দিয়ে এগিয়ে যাওয়া শহরে প্রধান রাস্তাটায় কাঁচা আর আধা পাকা ধানগাছ বিছিয়ে রাখা। যানবাহনের চাকায় পিষ্ট হয়ে যদি ধান মেলে দু’এক কাড়ি।
পচা ধানে জীবন খুঁজছে চাষী। ছবি: অনিক খানবৃষ্টি মাথায় নিয়েই রাস্তার ওপর ধান জমাচ্ছিলেন নারয়ণ ঘোষ। রাস্তা জুড়ে বিছিয়ে রাখা ধানের গাদা দেখিয়ে বললেন, এ ধান কিন্তু পাকে নাই। এর মধ্যে ১২ আনাই চিটা।

যতোই চিটা হোক না কেনো, ইটনা উপজেলা শহরের প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিত-গলিত আর ভিটে-বাড়িতে এখন এমনই বিছিয়ে রাখা ধানগাছ। জমি, মাঠ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় রাস্তাগুলোকেই ধান শুকানোর খলা করে নিয়েছে অসহায় কৃষক।

প্রত্যন্ত এই ছোট্ট শহরের বাতাসে তাই এখন কাঁচা ধানগাছের গন্ধ। যেনো হাওরের ধান শুকানোর অসংখ্য কান্দা (ধান শুকানোর চাতাল) তুলে এনে মফস্বল শহরের রাস্তাগুলোতে বিছিয়ে দিয়েছে কেউ। বাড়িঘরের উঠোন আর আশপাশের প্রায় সব উন্মুক্ত প্রাঙ্গণই এমন খণ্ড খণ্ড কান্দায় রূপ নিয়েছে হাওর উপজেলা ইটনায়।
 
ফসল হারানো রফিকুল ইসলামের ভাষায়, কোনো জায়গা নাই রে ভাই। সব ডুইবা গেছে অকাল বন্যায়।

সালাম আর মোস্তফার ভাষায়, কিছু নাই। এবার ভাই ইটনা নাই। ধান তো গেছেই। সঙ্গে গেছে লাউ, বেগুন, মূলা, বাদাম, আলু।
পচা ধানের সারি সারি গাদা। ছবি: অনিক খান
আগাম বন্যায় ফসল হারানো কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো, বিরি ২৮, বিরি ২৯ আর হাই ব্রিড জাতের হিরা ধান তারা বুনেছিলো হাওরের এক ফসলী জমিতে। এগুলোর মধ্যে ৯০ দিনে ফসল ওঠে বলে বিরি ২৮ জাতের ধানটাই যা একটু কাটতে পেরেছে তারা। তাও ঢল শুরুর পর মাত্র এক দিনেই সব তলিয়ে যাওয়ায় পুরোটা তুলতে পারেনি। আর বিরি ২৮ আর হিরা পাকতে সময় লাগে প্রায় সাড়ে তিন মাস। কিন্তু মধ্য চৈত্রে শুরু হওয়া বর্ষায় ধানের দানা শক্ত হওয়ার আগেই ক্ষেত তলিয়ে গেছে ঢলের পানিতে। হাওরের কৃষক তাই এবার প্রকৃত অর্থেই নি:স্ব।

ইটনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মসিউর রহমান খানের দেওয়া হিসেবে, এ উপজেলার ২৭ হাজার ৬৬৫ একর জমির মধ্যে ডুবে গেছে ১৬ হাজার ৯৩০ একর। মাত্র ৪ হাজার ৯৭৯ একর ধান কাটতে পেরেছে কৃষক।

কিন্তু কৃষকদের দাবি, এর চেয়েও অনেক বেশী ক্ষতি হয়েছে এবার। ক্ষতির পরিমাণ কিছুতেই ৯০ শতাংশের কম নয়।

আরও পড়ুন
** গরু মরবে ঘাসে

** সামনে এবার মরার বছর
** মাছ নাই রে ভাই
** ধুঁকতে থাকা স্বপ্নও শেষ বৃষ্টিতে

বাংলাদেশ সময়: ১০৪৮ ঘণ্টা, এপ্রিল ২১, ২০১৭
জেডএম/

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

FROM AROUND THE WEB
Loading...
Alexa