![]() |
‘আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ’-এ সত্য সমাজের বেশিরভাগ মানুষই উপলব্ধি করতে পারেন। কিন্তু একটি শিশুকে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে তার মানসিক ও শারীরিক বৃদ্ধিসহ মেধা ও মননের বিকাশের ক্ষেত্রে পিতা-মাতা, পরিবার বা সমাজের কি করণীয় সে বিষয়ে বোধকরি গোটা সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশই সচেতন নন।
এ ক্ষেত্রে অশিক্ষা, কুসংস্কার বা অজ্ঞতাই যে প্রতিবন্ধকতা তা নয়, এর সাথে যোগ হয়েছে পারিবারিক উদাসীনতা, ব্যক্তির জানার অনাগ্রহ এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সম্মিলিত ইচ্ছার অভাব। কিন্তু শারীরিক সুস্থতার পরিপূর্ণ এবং মেধা, মনন ও প্রজ্ঞায় সমৃদ্ধ একটি আগামী প্রজন্ম নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই যা প্রয়োজন তা হলো শিশুর নিরাপদে বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করা।
শিশুর বেড়ে ওঠার বিষয়টিকে আমরা দু’টি স্তরে বিভক্ত করতে পারি। প্রথমত শিশুর জন্মপূর্ব অবস্থায় মাতৃগর্ভে ভ্রণ আকারে বেড়ে ওঠা। দ্বিতীয়ত শিশু ভূমিষ্ট হওয়ার পর এ সুন্দর পৃথিবীতে নির্মল আলো-বাতাসে শারীরিক ও মানসিকভাবে বেড়ে ওঠা। মানুষের কর্ম জগতের বিশালতায় মাতৃগর্ভে শিশু বেড়ে ওঠা আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় খুব গৌণ এবং কম গুরুত্বপূর্ণ বলেই বিবেচিত হয়।
কিন্তু আমরা ভুলে যাই, একটি ভাল বীজই নিশ্চিত করতে পারে একটি সবল বৃক্ষ। সুস্থ মা, সুস্থ সন্তান যোগসূত্রের দিক থেকে এ দু’টির সম্পর্ক এবং অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মা সন্তানসম্ভবা হলে সঙ্গত কারণেই তার প্রতি যথাযথভাবে যতœশীল হতে হবে। মা সুস্থ হলেই তো একটি সুস্থ শিশু ধীরে ধীরে মাতৃগর্ভে বেড়ে উঠতে পারে। সুতরাং শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ একটি শিশুর জন্য অনুকূল শর্ত হলো শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ একজন মা। মায়ের সুস্থতার জন্য মাকে গর্ভাবস্থায় একটু ভালো খাবার যেমন দিতে হবে তেমনি একটু বেশি বিশ্রামের ব্যবস্থা করতে হবে।
কমপক্ষে চারবার ডাক্তারের কাছে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য নিতে যেতে হবে। এছাড়া মায়ের ওজন যেন স্বাভাবিক অবস্থার তুলনায় কমপক্ষে ৭ কেজি বাড়ে সেদিক লক্ষ্য রাখতে হবে।
এছাড়া মানসিকভাবে গর্ভবর্তীকে সব সময়ই হাসি-খুশি রাখা দরকার। এক্ষেত্রে একথাটি অবশ্যই মনে রাখতে হবে গর্ভধারণের ক্ষেত্রে ২টি সন্তান ধারণের সময়ের ব্যবধান যাতে ২ বছরের কম না হয় সেদিকে অবশ্যই দৃষ্টি রাখতে হবে।
সন্তান প্রসবের জন্য স্বাস্থ্যকর্মী বা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দাইয়ের সেবা নেওয়া সন্তান ও মা উভয়ের জন্য মঙ্গলজনক। ভূমিষ্ট হওয়ার পর শিশুর যথাযথ পরিচর্যাসহ প্রয়োজনীয় খাদ্য খাওয়ানো জরুরি। মনে রাখতে হবে মায়ের দুধ শিশুর জন্মগত অধিকার। যে সকল শিশু গুড়া দুধ, গরুর দুধ বা অন্যান্য খাবার গ্রহণ করে তারা তুলনামূলকভাবে বেশি রোগব্যাধি ও অপুষ্টিতে ভোগে। সুতরাং শিশুর বয়স ৬ মাস না হওয়া পর্যন্ত মায়ের বুকের দুধই হবে শিশুর একমাত্র খাবার।
সুস্থভাবে শিশু বেড়ে উঠছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য পিতামাতাকে কতগুলো বিশেষ বিষয়ের উপর নজর দিতে হবে। প্রতিমাসে নিয়মিতভাবে শিশুর ওজন বাড়লে বুঝতে হবে শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি সঠিক আছে। তবে ৬ মাস পর থেকে শিশুকে বাড়তি খাবার দেয়ার ক্ষেত্রে সর্তক দৃষ্টি রাখতে হবে। কারণ, বাড়তি খাবার দেওয়া শুরু করলে শিশুর রোগব্যাধির ঝুঁকি বেড়ে যায়।
পরপর দু’মাস যদি শিশুর ওজন না বাড়ে তবে বুঝতে হবে শিশুর কোন শারীরিক সমস্যা রয়েছে। এক্ষেত্রে অবশ্যই শিশুর সমস্যার বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
৬টি মারাত্মক রোগ থেকে শিশুকে পরিপূর্ণ সুরক্ষার জন্য সঠিক সময়ে সবগুলো টিকা দিতে হবে। এজন্য মা-বাবার জানা দরকার কেন, কখন, কোথায় ও কতবার শিশুকে টিকা দিতে হবে। শিশুর বয়স ৬ সপ্তাহ হলে ৪ সপ্তাহের ব্যবধানে ৩ ডোজ ডিপথেরিয়া, হুপিংকাশি, ধনুষ্টংকার ও পোলিও-র টিকা দেওয়া শেষ করতে হবে।
অর্থাৎ ১০ সপ্তাহের পরে ২য় ডোজ এবং ১৪ সপ্তাহের পরে ৩য় ডোজ সম্পন্ন করতে হবে। ৯ মাস পূর্ণ হওয়ার পরে হাম ও পুণরায় পোলিও’র টিকা দিতে হবে এবং জন্মের পর থেকে ১ বছরের মধ্যে অবশ্যই যক্ষ্মা রোগের টিকা দিতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে পোলিও, ধনুষ্টংকার, হাম, ডিপথেরিয়া, হুপিংকাশি এবং যক্ষ্মা শৈশবের ৬টি মারাত্মক রোগ। টিকা রোগগুলো থেকে শিশুকে রক্ষা করে। পোলিও হলে শিশু জীবনের তরে পঙ্গু হয়ে যায় কিংবা মারা যায়। ধনুষ্টংকারে আক্রান্ত প্রায় প্রতিটি নবজাত শিশু মারা যায়। হাম হলে শিশুর মৃত্যু ঘটতে পারে। সুতরাং এক বছরের মধ্যে শিশুকে সবগুলো টিকা দিতে হবে।
এছাড়া সকল গর্ভবতী মাকে টিটেনাস রোগ প্রতিরোধের জন্য ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ৫ম ও ৬ষ্ট মাসে দুডোজ টিটি টিকা নিতে হবে। প্রসূতি যদি টিটি টিকা না নেয় তবে তার শরীরে ধনুষ্টংকারের জীবাণু ঢুকলে সন্তানসহ জীবনের ঝুঁকি দেখা দিতে পারে।
শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য ৬ মাস বয়স পূর্ণ হলে খিচুড়ি বা জাউয়ের সাথে দিনে অন্তত একবার খোসা ছাড়ানো, সিদ্ধ করা এবং গলানো তরাকরি মিশিয়ে শিশুকে খাওয়াতে হবে। অন্যান্য খাবার দেওয়ার আগে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। শিশুকে মিশ্র ধরনের খাবার খাওয়ানো উচিত যাতে সব ধরনের ভিটামিনের চাহিদা পূরণ হয়। শিশুর পুষ্টির জন্য প্রচুর ভিটামিন ‘এ’ প্রয়োজন।
যে সব খাবারে ভিটামিন ‘এ’ আছে সেগুলো হচ্ছে মায়ের দুধ, গাঢ় সবুজ এবং রঙ্গিন শাক সবজি ও ফলমূল। তাছাড়া ডিম, কলিজা হলুদ ফল-মূলে ভিটামিন ‘এ’ রয়েছে।
মোট কথা হচ্ছে শিশুর শরীর যাতে ঠিকমত বাড়ে, তার মানসিক বিকাশ যাথে যথাযথ হয় এবং সে যাতে হাসিখুশি থাকে সে জন্য মা-বাবার বিশেষ যতœ এবং মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। শিশুদের কৌতুহল অপরিসীম। ফলে বিভিন্ন বিষয়ে তাদের জানার আগ্রহও প্রচুর। অধিক প্রশ্ন করাই শিশুদের ধর্ম।
শিশুর যে কোন প্রশ্নেরই অবিরত ইতিবাচক সাড়া দিতে হবে। তাদের প্রশ্নে বিরক্ত হয়ে ধমক না দেয়াই শ্রেয়। শিশুর কাজের প্রশংসা করে উৎসাহ দিতে হবে, যাতে শিশুরা মানসিকভাবে প্রফুল্ল থাকে। শিশুদের সাথে সময়মতো খেলাধুলা করতে হবে।
শিশুরাই আগামীর ভবিষ্যৎ। একটি অনুকূল পরিবেশে যোগ্য নাগরিক হিসেবে শিশুদের গড়ে তোলা আমাদের নৈতিক ও নাগরিক দায়িত্ব। শিশুর জন্য চাই কবি সুকান্তের ‘শিশুর বাসযোগ্য পৃথিবী’ বা শিল্পী এম সুলতানের কল্পনার শিশু স্বর্গ। এ আবেগ মাখা সেøাগানকে সামনে রেখে এগিয়ে গেলে আমাদের সকল শিশুর নিরাপদে বেড়ে ওঠা অবশ্যই নিশ্চিত হবে।
* পিআইডি-শিশু ও নারী উন্নয়নে যোগাযোগ কার্যক্রম ফিচার
বাংলাদেশ সময়: ১৫৪৫ঘণ্টা, মার্চ ০৪, ২০১২