![]() |
কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত নন্দিত সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ আর নেই। বিগত প্রায় ১০ মাস ক্যান্সারের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকলেও কোলন ক্যান্সারের অপারেশনের পর অতিমাত্রায় ইনফেকশন বা জীবাণু সংক্রমণ তার জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দিয়েছে। আর অপারেশনের পর ইনফেকশনজনিত কারণে তার এই মৃত্যু বাংলাদেশ বা তৃতীয় বিশ্বের কোনো দেশ বা এশিয়ার কোনো হাসপাতালে ঘটেনি। তার মৃত্যু হয়েছে বিশ্বের অন্যতম সেরা চিকিত্সাকেন্দ্র যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতালের অনকোলজি বিভাগে। আর এই মৃত্যু হুমায়ূন আহমেদের দেশ-বিদেশের কোটি কোটি ভক্ত-অনুরাগী কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। অপারেশনের পর ইনফেকশন হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি উন্নত দেশে কোনো রোগী মারা যাবে এটা মানুষের ভাবনারও অতীত। যদিও নিউইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এখনও পর্যন্ত হুমায়ূন আহমেদ-এর মৃত্যুর বিস্তারিত কারণ উল্লেখ করেনি।
তবে কোলন ক্যান্সারের অপারেশনের পর ইনফেকশন কেন হয় এব্যাপারে আমরা জানতে চেয়েছিলাম বাংলাদেশের বিশিষ্ট কোলোরেকটাল সার্জন অধ্যাপক এ কে এম ফজলুল হকের কাছে। তিনি জানান, তিনি এ পর্যন্ত ছয় শত বাংলাদেশি রোগীর কোলন ক্যান্সারের অপারেশন করেছেন এবং শুধু ২০১১ সালে অপারেশন করেছেন ৮৫ জন কোলন ক্যান্সার রোগীকে। তন্মধ্যে একজন রোগীও অপারেশনের সময় অথবা ইনফেকশনজনিত কারণে মারা যায়নি।
খ্যাতিমান এই কোলোরেকটাল সার্জনের মতে, কোলন ক্যান্সার আক্রান্ত অংশ অপারেশনের মাধ্যমে কেটে ফেলার পর খাদ্যনালী বা কোলন সূক্ষ্মভাবে সেলাই করে জোড়া দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় এনাস্টোমোসিস। কোনো কারণে এ জোড়া লাগানো নালী খুলে গেলে অথবা অপারেশনের সময় সংলগ্ন খাদ্যনালী ফুটো হয়ে গেলে অন্ত্রনালীতে জমা ফেকাল মেটার খুলে যাওয়া জোড়া অথবা ইনজুরির কারণে অন্যকোনো ছিদ্র হওয়া অন্ত্রনালী দিয়ে বের হয়ে পেটের মধ্যে জমা হয় এবং সেখান থেকে তীব্র ধরনের ইনফেকশন হতে পারে। পরবর্তীতে পুনরায় অপারেশনের মাধ্যমে খুলে যাওয়া খাদ্য নালী পুনরায় জোড়া লাগানো হয়। এতে অনেক ক্ষেত্রে রোগীর অবস্থার উন্নতি হতে পারে। তবে অনেক ক্ষেত্রে অবনতি ঘটে এবং ইনফেকশন নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়। পাশাপাশি রক্তক্ষরণজনিত কারণে রোগী শকে যেতে পারে অথবা রক্তচাপ দ্রুত হ্রাস পায়। এসব ক্ষেত্রে লাইফ সাপোর্ট দিয়ে রাখা হয় রোগীকে। এছাড়া অপারেশনের আগে কেমোথেরাপি দেওয়া হলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগীর ইম্যিউনিটি (রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা) কমে যায়। তবে হুমায়ূন আহমেদের ক্ষেত্রে কি ঘটেছে তা কেবল নিউইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট সার্জনরাই বলতে পারবেন বলে অধ্যাপক ফজলুল হকের অভিমত। তবে তিনি এটাও মনে করেন ইনফেকশনের কারণে রোগীর মৃত্যু অনভিপ্রেত।
এদিকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে নিউইয়র্কের মেমোরিয়াল স্লোয়ান-ক্যাটারিং ক্যান্সার সেন্টারে ভর্তি হন এবং দু’ দফায় ১২টি কেমোথেরাপি দেওয়া হয়। কেমো শেষে বেশ খানিকটা সুস্থ হয়ে দেশে আসেন এবং গত জুন মাসে আবার নিউইয়র্কে ফিরে যান এবং ১২ জুন নিউইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতলে তার সফল অপারেশন হয়। তিনি ৮ দিন হাসপাতালে থেকে বাসায় ফিরে যান এবং তার সফল অপারেশন ও সুস্থতার খবরে তখন দেশবাসী অত্যন্ত খুশি হয়। বাসায় ফেরার একদিন পর হুমায়ূন আহমেদের পেটে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভূত হলে প্রথমে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে তাকে পুনরায় বেলভিউ হাসপাতালে নেওয়ার পর ২২ জুন পুনরায় তার শরীরে দ্বিতীয় দফা অপারেশন করা হয় এবং তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ ইউনিটে রাখা হয়। কিন্তু অত্যন্ত বেদনাদায়ক ঘটনা যে, চিকিত্সকদের হাজারও চেষ্টা ও আধুনিক চিকিত্সা বিজ্ঞানের ব্যবহার সত্ত্বেও তাকে আর সুস্থ করা যায়নি। বরং অন্ত্রনালীর পুনরায় সংযোজনের স্থানে ইনফেকশন তীব্রতর হয় এবং পেটে বাতাস ঢুকে যায়। কোনোভাবেই আর ইনফেকশন নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। কোনো এন্টিবায়োটিকও কাজে আসেনি। শেষ পর্যন্ত চিকিত্সকদের শত চেষ্টার পরও এ পৃথিবীর মায়া ছেড়ে লেখক হুমায়ূন আহমেদ গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় রাত ১১টা ২০ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
এদিকে এই জনপ্রিয় লেখকের মৃত্যু ও তার কর্ম নিয়ে হয়তবা হাজারো লেখা হবে। তবে আজীবন একটা প্রশ্ন থেকেই যাবে যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি আধুনিক হাসপাতালে কেমন করে অপারেশনের পর ইনফেকশন হলো?
ইত্তেফাকের সৌজন্যে
বাংলাদেশ সময়: ১৫৩৪ ঘণ্টা, জুলাই ২১, ২০১২
সম্পাদনা: রানা রায়হান, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর;জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটরjewel_mazhar@yahoo.com