![]() |
ঢাকা: অ-খাদ্য পণ্যের (নন ফুড) উচ্চ মূল্যস্ফীতির যাঁতাকল থেকে শিগগিরই রেহাই মিলছে না সাধারণ মানুষের। মাসওয়ারি (পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে) অ-খাদ্য পণ্যে দুই অংকের (১৩ দশমিক ৭৭ ভাগ) মূল্যস্ফীতি গত নভেম্বর থেকেই বাধ্য হয়ে হজম করছে দেশের মানুষ। বার্ষিক ভিত্তিতে এ মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৯৭ ভাগ, এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ।
অ-খাদ্য (নন ফুড) পণ্য বলতে পোশাক সামগ্রী, জ্বালানি, আসবাব সামগ্রী, স্বাস্থ্য সেবা সামগ্রী, পরিবহন ও যোগাযোগ ভাড়া, চিত্ত বিনোদনসহ অন্যান্য পণ্য এবং সেবাকে বোঝায়।
এর আগে বার্ষিক ভিত্তিতে অ-খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার কখনো এ সংখ্যায় সহ্য করতে হয়নি। আর সহসাই এই উচ্চ মূল্যস্ফীতি থেকে রেহাই মিলবে না। যদিও খাদ্য পণ্যের মূল্যস্ফীতির চেয়ে অ-খাদ্য পণ্যের মূল্যস্ফীতি জন জীবনের জন্য বেশি ক্ষতিকর।
এ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কোনো হাতিয়ার সরকারের কাছে নেই। সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর শর্ত মেনে জ্বালানি তেলের দামে ভর্তুকি কমালেও আবারো দাম বাড়াতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে আসছে বাজেটেও ভর্তুকি কিছুটা কমাতে পারে। ফলে সহসা দেশবাসী এ মূল্যস্ফতির হাত থেকে বাঁচতে পারছে না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, বার্ষিকভিত্তিতে গত বছরের (২০১১ সালের) এপ্রিল থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত নন ফুড পণ্যের মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৯৭ ভাগ। আর মাসওয়ারি মূল্যস্ফীতি ১৩ দশমিক ৭৭ ভাগ। তবে আশঙ্কা করা হচ্ছে, জ্বালানি তেলের ভর্তুকি সমন্বয় করতে গিয়ে সরকার যদি জ্বালানি তেলের দাম আবার বাড়ায়, তাহলে অখাদ্য পণ্যের মূল্যস্ফীতি আরো বাড়তে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ড. আতিউর রহমান সম্প্রতি অর্থনৈতিক রিপোর্টারদের সঙ্গে এক মত বিনিময় সভায় বলেন, ‘সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়ালে মূল্যস্ফীতি আবার বাড়বে।’
অর্থনীতিবিদের মতে, খাদ্য পণ্যের মূল্যস্ফীতির চেয়ে অ-খাদ্য পণ্যের মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জন্য বেশি ক্ষতিকর। তাদের মতে, খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি উৎপাদন ভালো হলে কমে যায়। আর মৌসুমের সময় উৎপাদন ভালো না হলেও তা কিছুটা কমে। কিন্তু অ-খাদ্য পণ্যের মূল্যস্ফীতি বাড়লে তা আর কোনো দিনই কমে না।
সাধারণ অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, পোশাক সামগ্রী, পাদুকা সামগ্রী, জ্বালানি, আসবান সামগ্রী, স্বাস্থ্য সেবা সামগ্রী, পরিবহন ও যোগাযোগ ভাড়া, চিত্ত বিনোদনসহ অন্য পণ্য এবং সেবাসহ যেসব পণ্য নন ফুড, সেগুলোর দাম একবার বাড়লে তা আর কোনো দিনই কমে না। কমার নজিরও নেই।
কিন্তু অ-খাদ্য পণ্যের মূল্যস্ফীতি লাগামহীন ঘোড়া। একে নিয়ন্ত্রণের কোনো হাতিয়ার সরকার কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে নেই। বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত মূদ্রানীতি। অথচ এই মুদ্রানীতি খাদ্য পণ্য ছাড়া অ-খাদ্য পণ্যের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক আল্লাহ মালিক কাজমি বাংলানিউজকে বলেন, ‘অ-খাদ্য পণ্যের মূল্যস্ফীতি হয় বেশকিছু কারণে। তার মধ্যে প্রধান ও অন্যতম কারণ জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক ছয়মাস ভিত্তিতে যে মুদ্রানীতি ঘোষণা করে, তাতে এ ব্যাপারে কিছু করণীয় থাকে না। এতে কোনো নির্দেশনাও দেওয়া থাকে না। তাই জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে অ-খাদ্য পণ্যের মূল্যস্ফীতি বাড়ে, এটাই স্বাভাবিক। সরকার যদি জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করতে দাম বাড়ায়, তবে অ-খাদ্য পণ্যে মূল্যস্ফীতি হবে। একই সঙ্গে খাদ্য পণ্যেও মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে।’
বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ১৯৯৫-৯৬ ভিত্তিবছর থেকে খাদ্য এবং অ-খাদ্য পণ্যের মূল্যস্ফীতি আলাদা করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে হিসাব করছে। বাৎসরিক ভিত্তিতে ওই বছর মূল্যস্ফীতি ছিলো মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ ভাগ।
তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ওই বছরের পর থেকে সর্বশেষ ২০১০-১১ অর্থ বছর পর্যন্ত কোনো বছরই বার্ষিক ভিত্তিতে কিংবা মাসওয়ারি মূল্যস্ফীতি দুই অংকে যায়নি। এ সময়ে বার্ষিক ভিত্তিতে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি হয় ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বলছে, চলতি অর্থ বছরই সর্বপ্রথম অ-খাদ্য পণ্যে মাসওয়ারি মূল্যস্ফীতি দুই ঘরে পৌঁছে। ২০১১ সালের নভেম্বর মাসে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ দশমিক ১৯ শতাংশ। ডিসেম্বর মাসে তা হয় ১১ দশমিক ৩৮ ভাগ। আর চলতি বছরের মার্চে মাসওয়ারি অ-খাদ্য মূল্যস্ফীতির রেকর্ড সংখ্যায় পৌঁছে, যার হার ১৩ দশমিক ৯৬ ভাগ। আর সর্বশেষ এপ্রিলে এ হার হয়েছে ১৩ দশমিক ৭৭ ভাগ।
বাংলাদেশ সময়: ১৫২৫ ঘণ্টা, মে ৩১, ২০১২
এসএআর/সম্পাদনা: আহমেদ জুয়েল, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর