![]() |
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তার সরকারের সমালোচনা না করলে আমাদের পেটের ভাত হজম হয় না। তার এ কথাটি নিয়ে হয়তো অনেক মজার মন্তব্য হবে। খাবার ঠিকমতো হজম হওয়াটা যে কারও ভালো স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশিরা এর জন্য খাবারের তালিকায় নানান ফলফলারি রাখেন। নানান ড্রিঙ্কসকেও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে মনে করা হয়। আমাদের দেশে হজমের সমস্যা দেখে অনেকে ওষুধপথ্যও খান। এক্ষেত্রে যেন আরেক সহজ পদ্ধতি বাতলে দিয়েছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী! অর্থাৎ তার সরকারের সমালোচনা করলেই হজম হয়ে যায় পেটের খাবার! আগের বিএনপি-জামায়াতের সরকার থাকতে মিডিয়ায় এত সমালোচনা হতো না, তার সরকারের হচ্ছে এমন অনুযোগও করেছেন প্রধানমন্ত্রী! কিন্তু তার তো এটা ‘ডিজিটাল সরকার’।
আইজ্যাক নিউটনের গতির তৃতীয় সূত্র তথা ‘প্রত্যেক ক্রিয়ারই সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া হয়’, এটিও তো তাকে মনে রাখতে হবে! ইন্টারনেটের আজকের যে বিপ্লব-পরিস্থিতি তা এই ক’বছর আগেও ছিল অকল্পনীয়! আগে আমরা নিউজপ্রিন্টের প্যাডে বল পয়েন্ট কলমে লিখতাম। এখন কম্পিউটারে বাংলায় লিখি! ইরাক যুদ্ধে যাবার আগেও আমি ইন্টারনেট ব্যবহার করা জানতাম না। আমার তখনও কোন ই-মেইল একাউন্টও ছিল না। ঢাকা থেকে রওয়ানা হবার আগে অফিসের নিউজ ডেস্কের এক সহকর্মী আমাকে একটি ই-মেইল একাউন্ট করে দেন, কম্পোজকৃত ফাইল কীভাবে অ্যাটাচ-সেন্ড করতে হয় তা দেখিয়ে দেন, এভাবেই তো আমরা শিখেছি, এগিয়েছি! এখনতো কম্পিউটার আমাদের জীবনের অংশ। হাতে না লিখতে লিখতে বহুদিনের সাধনার সুন্দর হস্তাক্ষরও বিশ্রি হয়ে গেছে! কিন্তু জীবনের গতির প্রয়োজনে আমাদের তো আবার কম্পিউটার ফেলে পুরনো ‘ঐতিহ্যের’ হাতে লেখার জীবনে ফেরত যাওয়া সম্ভব নয়।
এখন ঘটনা ঘটছে আর তা ইন্টারনেটের কারণে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে সবখানে! দশ বছর আগেও দেশের মিডিয়ায় কম্পিউটার ব্যবহার করা জানতেন হাতে গোনা কয়েকজন! ফটো সাংবাদিকদের খুব কমসংখ্যক ইন্টারনেট-ফটোশপের কাজসহ নানাকিছু জানতেন। আগে বিভিন্ন বিদেশি বার্তা সংস্থার সাংবাদিকরা ঘটনাস্থল থেকে স্যাটফোনের মাধ্যমে খবর পাঠাতেন। এখনতো সঙ্গে একটি ল্যাপটপ আর ইন্টারনেট কানেকশন থাকলে প্রায় সব সাংবাদিকই পাঠাচ্ছেন। এত মিডিয়া টিভি চ্যানেলও আগে ছিল না। দেশের খবরের জন্যে কী এখন আর কেউ রাতের বিবিসি-ভয়েস অব আমেরিকার খবরের জন্য অপেক্ষা করে? বাংলানিউজের মতো অনলাইন নিউজমিডিয়ার সৃষ্টি ও বিকাশের কারণে তথ্যের কাঙ্গাল স্মার্ট মানুষেরা কী আর পরের দিনের পত্রিকার জন্যে অপেক্ষা করে? না পরের দিনের পত্রিকায় আলাদা বিশেষ কিছু সব সময় পাওয়া যায়? নতুন নতুন মিডিয়া আর প্রযুক্তি বিপ্লবের কারণে তুখোড় নতুন একদল স্মার্ট তরুণ তরুণীর হাতে মিডিয়ায় নতুন এক বিপ্লবের জাগরণ হয়েছে! এখন খোদ প্রধানমন্ত্রীও যে মন্ত্রিসভার বৈঠকে কম্পিউটার সামনে নিয়ে বসেন, তা কী তার আগের বারের ক্ষমতার সময়ও এভাবে বসতেন? না তখনও এমন অনেক কিছু এতটা সহজ ভাবা গেছে?
গত ১/১১’র তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ঢাকার শাহবাগে আজিজ সুপার মার্কেটের সামনে ছাত্রদের সঙ্গে সেনা সদস্যদের হাতাহাতি-সংঘাতের ঘটনা ঘটে। অনেক ফটো সাংবাদিক সে ছবি তুললেও তা তাদের মিডিয়ায় ছাপা বা প্রকাশের সাহস করেননি। দেশে অগণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় থাকলে নানা কারণে তা ভাবাও যায় না। কিন্তু এটিতো একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার। গণতান্ত্রিক সরকারের সময় যে মিডিয়া স্বাধীন থাকে তা কোনো দয়ার বিষয় নয়। এটিই একটি গণতান্ত্রিক সরকারের শপথ-দায়িত্ব। একই সঙ্গে বিনীতভাবে বলি, আজ দেশে যে স্বাধীন মিডিয়ার সৃষ্টি হয়েছে, যতটুকু হয়েছে, এটি কিন্তু হাসিনা-খালেদা নয়, বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের কারণে হয়েছে। এসবে আজকাল আর হাত দেয়া যায় না, হাত দিতে গেলে যে হাত পোড়ে অথবা বিদেশি মুরব্বিরাও ক্ষুব্ধ হন, এটিও ওয়াকিবহালরা জানেন। মিডিয়ার স্বাধীনতার কিছু কছু অপব্যবহারও যে হচ্ছে না, তাও নয়। এটি মালিকরা করছে। মিডিয়ার অপব্যবহার এক শ্রেণির অদক্ষ-স্বার্থান্বেষীরা করছে, সরকার করছে। সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টনের ক্ষেত্রে আজ পর্যন্ত কোনো সততার দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কী? প্রচার সংখ্যা নয়, সরকারি আনুগত্য অথবা ঘুষ আজ পর্যন্ত সরকারি বিজ্ঞাপন পাবার হাতিয়ার! এটি আগের বিএনপি সরকারের আমলে হয়েছে, এখনও হচ্ছে।
১/১১’র সময়কার সে ছবিগুলো দেশের মিডিয়ায় ছাপা-প্রকাশ না হলেও কিন্তু লুকিয়ে রাখা যায়নি। ইন্টারনেটের বদৌলতে তা ছড়িয়ে গেছে সবখানে। বিডিআরের ঘটনার পর সেনানিবাসে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিক্ষুব্ধ সেনা সদস্যদের বাহাস একটি নিয়মতান্ত্রিক বাহিনীর মাধ্যমেই কী ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া হয়নি? ওখানে তো প্রধানমন্ত্রী তার উপদেষ্টা, সেনা কর্মকর্তা-জওয়ানদের বাইরে আর কেউ ছিলেন না। ছোট একটি মোবাইল ফোনের সেটে ধারণ করা সাদ্দাম হোসেনের ফাঁসির ভিডিওটি অনলাইনে ছড়িয়ে পড়েছে, এর জন্যে কী মিডিয়ার দরকার পড়েছে? আরব বসন্ত কীভাবে ঘটে গেছে মরুর দেশে দেশে? বা এখনও ঘটে চলেছে?
শুধু প্রিন্ট বা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া না ফেসবুক, টুইটার, ব্লগসহ সামাজিক যোগাযোগের নেটওয়ার্কগুলো জনপ্রিয় হবার পর নতুন যে ধারা-জেনারশনের সৃষ্টি হয়েছে, এমনটা গত পাঁচ-সাত বছর আগেও ভাবা যায়নি। বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের খুব কম সংখ্যকের হাতে এখন পর্যন্ত আইফোন-স্মার্ট ফোন উঠেছে। থ্রিজি দুনিয়াতে সেকেলে হয়ে গিয়ে ফোরজি এসে গেছে, কিন্তু ডিজিটাল বাংলাদেশে থ্রিজি এখনও স্বপ্ন! কিন্তু সেই দেশেই সাধারণ মানের সব মোবাইল ফোনের সেটের মাধ্যমে নতুন একটি স্মার্ট জেনারেশন অভ্রতে বাংলা লিখছে, ছবি তুলছে, ডাউনলোড করে ফেসবুক-টুইটার-ব্লগসহ সামাজিক যোগাযোগের জনপ্রিয় নানা মাধ্যমে তা যেভাবে মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছে অনলাইনে, মিডিয়ায় প্রকাশিত রিপোর্টের নিচে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করছে, সে সরকার বা বিরোধী দলের কাছে কী চায়, কী চায় না এসব সাফ সাফ বলে দিচ্ছে, এসব কী গত বিএনপি-জামায়াত আমলেও কী ভাবা গেছে? না আগামীতে সরকার বদল হলেও তা বন্ধ থাকবে? এই তরুণ প্রজন্মের সিংহভাগ কী গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোটার ছিল না? তাদের ভোট ছাড়া কী এত বিপুল ভোটে এ সরকার ক্ষমতায় এসেছিল? কী কী কারণে এ সরকারের ওপর তাদের বেশিরভাগ এরই মাঝে আশাহত-বিক্ষুব্ধ তা জানার বিন্দুমাত্র চেষ্টা কোথাও আছে কী?
কাজেই এ সমস্ত বিষয় দেখেশুনে-মূল্যায়ন মন্তব্য করার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করবো। কারণ তিনিই দেশের শীর্ষ কর্তৃপক্ষ। তার বক্তব্যে সরকারি দলের নেতাকর্মী-মন্ত্রী-পুলিশ সবাই প্রভাবিত হয়। ক্ষমতার প্রথম দিকে প্রধানমন্ত্রী বলতেন ক্ষমতা থাকলে চামড়া মোটা রাখতে হয়, অনেক কিছু হজম করতে হয়। আর এখন অন্যদের হজম নিয়ে তিনি কথা বলছেন। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ডও জনপ্রিয়তার তলানিতে থাকা অবস্থায় দেশ শাসন করছেন। কিন্তু তিনিও কীভাবে প্রতিদিন মিডিয়াকে ফেস করেন, মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলেন তার রেকর্ড জোগাড় করে প্রধানমন্ত্রীকে দেখার অনুরোধ করবো। মিডিয়াকে হার্ট করে কোনোদিন একটি শব্দও কোনদিন জুলিয়া গিলার্ড বা বারাক ওবামার মুখে শুনিনি। কারণ তারা মিডিয়াকে জনতার আদালত হিসাবে দেখেন-মূল্যায়ন করেন। তারা জানেন ক্ষমতায় ভালোভাবে থাকতে ভবিষ্যতে ক্ষমতায় যেতে মিডিয়ার সাপোর্ট লাগবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী-সরকারি দলের নেতারা যেন তা ভুলে না যান। এখন যারা প্রতিদিন সারা সময় ‘হ্যাঁ আপা’, ‘জি আপা’ করেন’ সময় গেলে এরা যে কেউ থাকবে না এই সাধারণ বোধ আছে বলেই তো তারা দেশ শাসনের দায়িত্ব পেয়েছেন। ‘সময় গেলে সাধন হবে না’
ফজলুল বারীঃ সিডনি প্রবাসী সাংবাদিক
বাংলাদেশ সময়: ০৯৪৬ ঘণ্টা, জুন ০৩, ২০১২
সম্পাদনা: রানা রায়হান, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর;