English
সব খবর      অর্থনীতি     আন্তর্জাতিক     ইচ্ছেঘুড়ি     কপ-১৭     খেলা     জাতীয়     জীববৈচিত্র্য     তথ্যপ্রযুক্তি     পিআইডি পরিক্রমা     প্রবাসের চিঠি     ফিচার     বাংলানিউজ স্পেশাল     বাংলানিউজএক্সক্লুসিভ     বিদ্যুৎ ও জ্বালানি     বিনোদন     মনোকথা     মুক্তমত     রাজনীতি     শিল্প-সাহিত্য     সত‌্যি বিচিত্র!     স্বপ্নযাত্রা     স্বাস্থ্য     

শিশুশ্রম বন্ধে প্রয়োজন সম্মিলিত প্রয়াস


শিপলু জামান
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম/পিআইডি
শিশুশ্রম বন্ধে প্রয়োজন সম্মিলিত প্রয়াস

বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষা ঢাকার সংযুক্ত কামরাঙ্গীচর এলাকা। অপরিকল্পিতভাবে হলেও ধীরে ধীরে নগরায়ণ হচ্ছে জনবহুল এই এলাকাটির। চর এলাকার সাথে মূল ঢাকার সংযোগ করতে প্রথমে একটি লোহার পাকা সেতু তৈরি করা হয়। মূল ঢাকাকে বন্যা থেকে বাঁচাতে গড়ে তোলা হয় সুউচ্চ  বাঁধ। তাই দু’ধারের সংযোগ অংশগুলো ঢালু। ইঞ্জিনের গাড়ি অশ্বক্ষমতার সাহায্যে অনায়াসে চলাচল করলেও, রিক্সা ও মানুষ টানা গাড়ি চলাচল করতে খুব কষ্ট হয়। আর তখনই অমানবিক কার্যক্রম শুরু হয়। ছোট ছোট কোমলমতি শিশুরা রিক্সাগুলো ঠেলে উঠাতে সাহায্য করে মাত্র দুটি টাকার আশায়। রিক্সা চালক ভালভাবে হাল ধরে রাখতে না পারলে, যে কোন সময় রিক্সা পিছনের দিকে চলে বা উল্টে গিয়ে জীবনক্ষয়িষ্ণু দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

হাজারীবাগ থেকে শহীদনগর, কেল্লার মোড় থেকে সোয়ারী ঘাট কিংবা সদরঘাটের পুরো বাঁধ জুড়েই দেখা মিলে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের বাস্তব দৃশ্যপট। কেউ অব্যবহৃত চামড়ার টুকরা কুড়াচ্ছে বা শুকাচ্ছে যা অত্যন্ত বিষাক্ত, আবার কেউ ডাস্টবিন থেকে বিক্রি করা যায়, এমন কিছু খুঁজছে। অনেককে দেখা যাবে ঝুলে ঝুলে টেম্পু কিংবা বাসের হেলপার হিসেবে কাজ করতে। এখানেই শেষ নয়। ইসলামবাগ, কামালবাগসহ পুরোনো ঢাকার অনেক এলাকায় গড়ে উঠা বিভিন্ন কলকারখানাগুলোতে শিশু শ্রম অবাধে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ঝুঁকিপূর্ণ এসব কারখানার মধ্যে রয়েছে মোটর ওয়ার্কশপ, লেদ মেশিন, বেলুন তৈরি কারখানা, গ্লাস ফ্যাক্টরি, ব্যাটারি কারখানা, ট্যানারি, ভাঙ্গারি আর এসব জায়গায় ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুরা আবার কখনো বা এসব শিশুরাই নির্মাণ শ্রমিক, কুলি বা অন্যান্য দিনমজুর এর ভূমিকায়।

জীবনের তাগিদে পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিতে কোমলমতি এসব শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে হচ্ছে। ফলে তারা নানা রকম শারীরিক ও মানসিক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে- এমনকি মৃত্যুবরণও করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে রাজধানীতে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় সাত লাখ আট হাজার যার মধ্যে তিন লাখ সাতাশি হাজার শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত (বাংলাবাজার পত্রিকা-১৭/০১/২০১২)। জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ ২০০২-২০০৩ অনুযায়ী সারাদেশে ৩১লাখ ৭৯,০০০ শিশু শ্রমিক রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বিগত আট বছরে আর কোনো শিশুশ্রম জরিপ সংগঠিত হয়নি।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং ইউনিসেফ পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী দেশের শহরাঞ্চলে প্রায় ৩০০ ধরনের অর্থনৈতিক কাজে শিশুরা শ্রম দিচ্ছে। এক সমীক্ষায় ৭০৯টি ফ্যাক্টরির মধ্যে জরিপ চালিয়ে দেখা যায়, মোট ৯হাজার ১৯৪ শ্রমিকের মধ্যে ৪১.৫ শতাংশ অর্থাৎ ৩ হাজার ৮২০ জন শিশু যাদের বয়স ১০ থেকে ১২ বছরের মধ্যে (বাংলাবাজার পত্রিকা), ১৭/০১/২০১২)।

দৈনিক ইত্তেফাক -০১/১২/২০১১) অনুযায়ী দেখা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন দোকান ও ১৭টি আবাসিক হলে প্রায় তিনশত শিশু শ্রমিক কাজ করছে।

শিশু শ্রম হলো সামাজিক শোষণের দীর্ঘস্থায়ী এক হাতিয়ার। যে কোন দেশে শিশু শ্রমকে, সেদেশ উন্নয়নে কতটা পিছিয়ে দেয় তার নির্দেশক হিসেবে ধরা হয়। তাই শিশু অধিকার নিশ্চিত ও শিশু শ্রম বন্ধ করতে আমাদের সবাইকে একত্রে কাজ করতে হবে। এজন্য মিডিয়া, সুশীল সমাজ, শিক্ষাবিদসহ সমাজের সকল স্তরের নাগরিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।
এছাড়া জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ, জাতীয় শিশুনীতি-২০১১, জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি-২০১০ সহ শিশুদের স্বার্থ রক্ষায় সকল আইন ও নীতিমালার বাস্তবসম্মত সমন্বয়, বাস্তবায়ন ও প্রয়োগ করা খুবই প্রয়োজন।
 
শিশুশ্রম নিরসনে সর্বপ্রথম আমাদের শিশুর সঠিক সংজ্ঞা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ ও জাতীয় শিশুনীতি-২০১১ মোতাবেক ১৮ বছরের কম বয়সী সকল ব্যক্তিকে শিশু বলা হবে। কিন্তু বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬ এ ‘শিশু’ ও ‘কিশোর’ এর সংজ্ঞা বয়স ভিত্তিক। এই আইন অনুযায়ী যে ব্যক্তি ১৪ বছর পূর্ণ করে নাই তিনি ‘শিশু’, আর যিনি ১৪ বছর পূর্ণ করেছেন অথচ ১৮ বছর পূর্ণ করেন নাই তিনি ‘কিশোর’।

তবে শিশু শ্রমিক এর কোন সংজ্ঞা দেয়া হয়নি আইনটিতে। এ সংজ্ঞা মোতাবেক ‘শিশু শ্রমিক’ বলে কোন ব্যক্তি বা শ্রমিক থাকা বাঞ্ছনীয় নয়, তদস্থলে ‘শ্রমে নিয়োজিত শিশু’ বা ‘শ্রমজীবী শিশু’ ব্যবহার করতে হবে।

যে নামই ব্যবহার করা হোক না কেন, সকল আইন ও নীতিমালায় শিশুশ্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের অনুচ্ছেদ ৩২ মোতাবেক এই সনদ স্বাক্ষরকারী দেশসমূহ অর্থনৈতিক শোষণ থেকে শিশুর অধিকারকে রক্ষা করবে এবং শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ অথবা শিশুর শিক্ষায় ব্যাঘাত সৃষ্টিকারী, কিংবা তার স্বাস্থ্য অথবা শারীরিক, মানসিক, আত্মিক, নৈতিক বা সামাজিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর কোনো কাজ যেন না করানো হয়, সে ব্যবস্থা করবে।
প্রয়োজনে এ সংক্রান্ত আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে; কর্মে নিয়োগের বয়স, কর্ম ঘণ্টা ও কাজের শর্তাবলী নির্ধারণ করবে। জাতীয় শিশুনীতি-২০১১ এ পর্যায়ক্রমে শিশুশ্রম নিরসনের কথা বলা হয়েছে।

এছাড়া আরো বলা হয়েছে, ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুকে সার্বক্ষণিককর্মী হিসেবে নিয়োগ হতে বিরত থাকতে হবে। শিশুর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অনুকূল কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, দৈনিক কর্মঘণ্টা, কর্মবিরতি এবং বিনিময় মজুরী নিশ্চিত করতে হবে এবং কর্মী শিশুর লেখা পড়া, আনন্দ-বিনোদন, ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে বিরত রাখা ও যে কোন রকম নির্যাতন থেকে রক্ষা করা নিশ্চিত করতে হবে।
জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি ২০১০-এ, জাতীয় শিশুনীতি ২০১১ এর শিশুশ্রম বিষয়ক অংশগুলোর বিস্তারিত উল্লেখ আছে।

এছাড়া শিশুশ্রম নিরসনে বাস্তবিক কর্মকৌশল, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য, কার্যক্রম ইত্যাদি নির্ধারণসহ; শিশুশ্রম ইউনিট ও জাতীয় শিশুশ্রম কল্যাণ কাউন্সিল গঠন এবং বেসরকারি সংস্থাসমূহের অংশগ্রহণ সম্পর্কে বলা হয়েছে। কিন্তু শিশুর উপর নির্যাতন কিংবা তাদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করা ইত্যাদি বিষয়ে শাস্তি ও দ-প্রদানের ধরন বা পরিমাণ সম্পর্কে উপরোক্ত নীতি বা সনদে কিছু উল্লেখ করা হয়নি।

আজকের শিশুরাই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের কর্ণধার। কোমলমতি অথচ নির্যাতিত, নিপীড়িত, শোষিত শিশুদের মানবাধিকার সুরক্ষায় ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত সচেতনতা বৃ্িদ্ধ, কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ণ এবং আইনের সুষ্ঠু ও সুষম প্রয়োগ অপরিহার্য।
যে সকল ব্যক্তি শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে বাধ্য করে কিংবা বিভিন্নভাবে নির্যাতন করে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে হবে। শিশুশ্রমে বাধ্য করার শাস্তিগুলো প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে। এ ক্ষেত্রে মিডিয়াগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য।

যে সকল নিবেদিত প্রাণ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান শিশুদের জন্য অক্লান্ত কাজ করে যাচ্ছেন, তাদেরকে বিভিন্ন ফোরাম ও অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সংবর্ধনা দিয়ে অন্যদেরও এ কাজে অনুপ্রাণিত করতে হবে। সর্বোপরি ছিন্নমূল এ সকল শিশু, যারা ফুলের মতো কোমল ও সৌরভময় তাদের সুযোগ দিতে হবে সুগন্ধী ছড়িয়ে বিকাশ লাভের। তাদের মনের কথা আমাদের সকলকে শুনতে হবে, অনুধাবন করতে হবে এবং তাদের অধিকার রক্ষায় সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে। তবেই আমরা নিশ্চিত করতে পারবো আগামীর সুন্দর বাংলাদেশ।    

* পিআইডি-শিশু ও নারী উন্নয়নে যোগাযোগ কার্যক্রম ফিচার।

বাংলাদেশ সময়: ১৬২০ঘণ্টা, এপ্রিল ০৯, ২০১২

জামান/মোতাহের/বিপু/ সম্পাদনা: নূরনবী সিদ্দিক সুইন, সিনিয়র নিউজরুম এডিটর

আগের পৃষ্ঠা
যোগাযোগ: বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, মিডিয়া হাউজ, প্লট # ৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক # ডি, বসুন্ধরা রোড, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ
ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন
কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত
একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান