English
সব খবর      অর্থনীতি     আন্তর্জাতিক     ইচ্ছেঘুড়ি     কপ-১৭     খেলা     জাতীয়     জীববৈচিত্র্য     তথ্যপ্রযুক্তি     পিআইডি পরিক্রমা     প্রবাসের চিঠি     ফিচার     বাংলানিউজ স্পেশাল     বাংলানিউজএক্সক্লুসিভ     বিদ্যুৎ ও জ্বালানি     বিনোদন     মনোকথা     মুক্তমত     রাজনীতি     শিল্প-সাহিত্য     সত‌্যি বিচিত্র!     স্বপ্নযাত্রা     স্বাস্থ্য     

শামীম হোসেনের কবিতা

পরম্পরাহীন দৃশ্যের পর দৃশ্য...


এম জে ফেরদৌস
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
পরম্পরাহীন দৃশ্যের পর দৃশ্য...

‘আলোর মশাল জ্বেলে যে কৃষক বসেছিল মাঠে
তার কাছে শুনেছি অন্ধ ধীবরের কাহিনি....
ততটুকুই জেনেছি—যতটুকু জানার আগ্রহ ছিল
এর বেশি কিছুই জানিনি...’ (ভিন্নপট)

শামীম হোসেনের কবিতা ছত্রে ছত্রে পাল্টায় দৃশ্যপট। আলোর মশাল জ্বেলে বসে থাকা কৃষকের প্রতি তৈরি হওয়া আগ্রহ পাঠক মুহূর্তেই হারিয়ে ফেলে। পরের লাইনেই কবি পাঠককে জানান সেই কৃষকের কাহিনি থেকে ‘ততটুকুই জেনেছি—/ যতটুকু জানার আগ্রহ ছিল/ এর বেশি কিছুই জানিনি।’ অর্থাৎ কবির কাছে আর খুব গুরুত্ববহ নয় সেই মশাল জ্বালা কৃষক অথবা অন্ধ ধীবর। আর কবিতার অধিপতি কবির সঙ্গে সঙ্গে পাঠকেরও বদলায় আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। কবি; কবিতায় একচ্ছত্র কর্তা। কবির তৈরি করা নতুন চিত্রকল্পে পুরনো ছবি হারিয়ে যায়। অথবা হারিয়ে ফেলে পুরনো মূল্যায়ন।

কৃষকের প্রজ্বলিত আলোর মশালে তৈরি হয় যে মোহমুগ্ধতা, তার থেক উত্তরিত হয়ে কবি ছুটে চলেন নতুন চিত্রকল্পের সন্ধানে। উপরোক্ত লাইনগুলির রেশ না ফুরাতেই কবি দৃশ্যপটে আনেন নতুন ব্যঞ্জনা! কী সেই নতুন দৃশ্য?

মোরগের লালঝুঁটি থেকে রঙ নিয়ে
খড়ের ক্যানভাস এঁকেছিল যে চিত্রকর—
সে গেছে বুধবারে— ভূগোলের বোঝাপড়ায়
আজো ফিরে আসেনি... (ভিন্নপট)

মোরগের লালঝুঁটি থেকে রঙ নিয়ে ছবি আঁকে যে যাদুকরী চিত্রকর ত‍ার প্রতি এক অপার কৌতূহল জেগে ওঠে পাঠকের মনে। এখানে চিরতরেই হারিয়ে যায় সেই কৃষক আর তার গল্পের অন্ধ ধীবর। পাঠকের ভাবনায় এখন শুধুই রহস্যময় চিত্রকর। কিন্তু কবি এখানেও দাঁড়াতে দেয় না। এই রহস্য উদঘাটনে কবির নেই কোন আগ্রহ। কবি তাড়িয়ে বেড়ান নিজের তৈরি রহস্যের জালে বুদ হয়ে যাওয়া পাঠককে। তাই চিত্রকরকে ছবিটা আর আঁকতে না দিয়েই কবি তাকে তকমা জুড়ে দেন ভূগোল ক্লাশের মনোযোগী ছাত্র হিসেবে। কোথায় যেন ভীষণ এক তাড়া রয়ে গেছে কবির। আর সেই ব্যস্ততায় কোন চিত্রকর্মেই পড়ে না তুলির শেষ আঁচড়। পরিণতি পায় না কোন দৃশ্য। আমরা জানি কবিতা চলচ্চিত্র নয়। কবি দায়বদ্ধ নয় শেষ দৃশ্যের মিলন ঘটাতে। অথবা গ্রহণযোগ্য কোন বার্তা পৌঁছানোর দায়িত্বও নেই তার।কিন্তু তা সত্ত্বেও অভিযোগ তোলা যায়; পাঠক খেই হারিয়ে ফেলে তার কবিতার চরণে চরণে। তাই কবিতা পড়ার সময়কার আমেজ কোন অতলে যেন তলিয়ে দেন কবি নিজেই। কোথায় যেন লেগে থাকে মায়া, অথচ পায় না তার ভাষা।     

চিত্রকরকে ভুগোল পাঠে মনোযোগী করেই শেষ নয়। এই দৃশ্যের বাতাবরণ তৈরি করেই কবি শামীম হোসেন তার কবিতা ‘ভিন্নপট’-এর শেষে এসে পুনরুক্তি করেন প্রথম চরণের:
ফুর্তি জেগেছে মনে—
গাছের পাতা, পাখিরা কি জানে...?

কবিতাটির শুরু এই অজানা ‘ফুর্তি’র ইঙ্গিত দিয়ে। আর শেষেও তাই। কী ফুর্তি শুধু পাঠক জানে না, জানে কবি। কিন্তু কবি সেই ফুর্তির ভাগ দেয় না একটুও। যে কারণে কবি ও পাঠকের মাঝে হয়তো তৈরি হয় কোন দূরত্ব। যে দূরত্বের পরিণাম, কবিতা পাঠ শেষে পাঠকের মনে থাকে না কবিতায় প্রাপ্ত আমেজ, যা কবিতা পাঠ করার সময় পাঠককে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছিল।

আরো আরো উদাহরণ দেয়া যায়, যেমন: ‘জানুয়ারি আসার এক মাস আগে বইছে ঠাণ্ডা বাতাস’ আর হিম হিম কুয়াশার রেণু...’ এখানে কবি ও পাঠকের ‘ব্যলকনিজুড়ে ফুটে আছে হলুদগাঁদা’। আর ঠিক এই কুয়াশা চাদর জড়ানো শীতের ‘রাত ও রাত্রির যুগ্নক্ষণে পেন্সিলের ভাঙা নিবের মতো/ মেয়েটি ঝুলেছিল টিনের চালে’। আর তার পরেই হারিয়ে যায় সেই ঝুলে থাকা আততায়ী মেয়ে। কেননা  তখন আমাদের ‘চোখের দোকানে’ কবি ফুটিয়েছেন ‘তারার ফুল’।

ব্যতিক্রমও আছে। যেমন ‘ভূমির চাতাল’। এ কবিতায় চিত্রিত প্রতিটি দৃশ্যের বর্ণনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং কবিতার বক্তব্যকে করে তুলেছে ‌ঋজু ও স্পষ্ট। এরকম কবিতা ‘উপমাংসের শোভা’য় অত্যন্ত বিরল। ‘শিড়দাঁড়া সোজা করে দাঁড়ান কবিগণ’ এই আহবান করে কবি দারুণ প্রেরণা যোগান  ইলা মিত্রের প্রসঙ্গ অতি প্রাসঙ্গিক ভাবে এনে। ‘এবার তবে ধরুন মহুয়ার ডাল—/ রক্তজবার কালিতে/ লেখা আছে ইলা মিত্রের নাম’। এরপরই কবি দৃশ্যকল্প ফের বদলান ‘তেঁদড় ইঁদুরের যদি বাড়ে উৎপাত/ প্রস্তুতি নিয়ে আছে কোঁচবিদ্ধ হাত!’ কিন্তু এবার দৃশ্য বদলালেই পটভূমি বদলায় না। বরঞ্চ পূর্বের আহবান শক্ত জমিন পায় পায়ের তলায়। কবিতা শেষ হয় দীর্ঘ দাগ রেখে শেষ দু’লাইনের আরো তীব্র আঘাতে—

এবার তবে সোজা হয়ে দাঁড়ান কবিগণ—
জোছনার আলোয় কেটে যাবে কবিতার রাত।
 
‘ভূমির চাতাল’ ব্যতিত অন্য যে কবিতাতে বক্তব্যের সাজুয্য বা দৃশ্যকল্পের পরম্পরা লক্ষ করা যায় তা নিতান্তই ছোট আকৃতির কবিতাগুলিতে। যদিও উদ্ধৃত কবিতাগুলিও ছোট আকৃতির। ‘উপমাংসের শোভা’ কাব্যগ্রন্থটির প্রায় সকল কবিতাই ১৫/১৬ লাইনে আবদ্ধ। তাই যেসব কবিতায় সম্পূর্ণ বক্তব্য প্রকাশ পেয়েছে অথবা দৃশ্যের পরম্পরা রক্ষিত হয়েছে। সেগুলি কতটা কবির কবিতার বক্তব্যের কারণে আর কতটা বা কবিতার আকৃতির কারণে তা সন্দেহের উদ্রেক করে।

‘চোখের দোকানে’ বা ‘তারার ফুল’ অথবা ‘মেছোবাঘ’ এরকম নতুন ধরণের শব্দ ব্যবহারের পটুত্ব লক্ষ্য করা যায় শামীমের কবিতায়। দৃশ্যকল্পের মোহমুগ্ধতাও ছড়ান বর্ণিল রঙের যাদুতে। তার কবিতা চিত্রময়। অল্প শব্দ প্রয়োগেই নিখুঁত দৃশ্যকল্প তৈরিতে সিদ্ধহস্ত কবি শামীম হোসেন। তবে সেই চিত্রের রঙ পাঠকের চোখে মুহূর্তেই মিলিয়ে যায় দৃশ্যকল্পকে ন্যূনতম পরিণতি না দেবার জন্য। পরাম্পরাহীন দৃশ্যগুলি পাঠককে মোহাচ্ছন্ন করেও হারিয়ে ফেলে তার আবেদন। যে রঙ ছড়িয়ে থাকতে পারতো পাঠকের চোখে চোখে তা পড়েই থাকল শব্দের খেলায় বন্দী হয়ে। যে সুর মনে ভীষণ দ্যোতনা তৈরি করল তা যেন আর গান হতে পারল না!

২০১২ এর ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত শামীম হোসেনের কাব্যগ্রন্থ ‘উপমাংসের শোভা’ প্রকাশ করেছে টোঙ, প্রচ্ছদ করেছে খালিদ আহসান। মূল্য ৮০ টাকা।

বাংলাদেশ সময় ১৯৫১, জুন ২৮, ২০১২
সম্পাদনা : ফেরদৌস মাহমুদ, শিল্প-সাহিত্য সম্পাদক

আগের পৃষ্ঠা
যোগাযোগ: বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, মিডিয়া হাউজ, প্লট # ৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক # ডি, বসুন্ধরা রোড, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ
ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন
কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত
একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান