![]() |
একটি কবিতা, নাম ‘আমি গণিত-আবিষ্কর্তা, বেশ সাদাসিধেভাবেই আমাদের জানিয়ে দেয় বিনয় মজুমদারের অতীত-বর্তমান
"ব্রহ্মদেশে জন্মলাভ করে শেষে পূর্ববঙ্গে আজ পাড়াগাঁয়ে
একটি বিলের মধ্যে বাস করে, তারপরে কলকাতা এসে
শিবপুর থেকে আমি ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে
এখন গণিতচর্চা এবং সাহিত্যচর্চা করি।
আমার ছেলের নাম কেলো, বৌ রাধা।"
এভাবেই নিজের পরিচয় প্রকাশ করেন বিনয় মজুমদার, যার কাছে গণিত ও সাহিত্য কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় ছিল না, কিন্তু সাহিত্যে আনতে চেয়েছেন গাণিতিক যুক্তিশীলতা-পরিমিতিবোধ। বিনয় বিচ্ছিন্নতা পছন্দ করতেন না, নিজেকে সবসময় মনে করেছেন সমগ্রের অংশ, অনেকের মধ্যে একজন। এই সমগ্রতার বোধ পাওয়া যায় তাঁর কবিতায়, তিনি যখন প্রকৃতি নিয়ে লিখেছেন তখন তার মাঝে নিয়ে এসেছেন রাজনীতি; কবিতায় তিনি জীবনানন্দ দাশ ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-কে বিশ্লেষণ/মূল্যায়ন করতে চেয়েছেন কোনো তথাকথিত ‘বিমূর্ত’ বা ‘নিরপেক্ষ’ অবস্থান থেকে নয় বরং মূর্ত সমাজবাস্তবতার প্রেক্ষাপটে; অত্যন্ত সাবলীলভাবে তিনি যৌনতার বর্ণিল বর্ণনা দিয়েছেন কয়েকটি কবিতায়, গণিতের প্রতি ভালবাসা প্রকাশ পেয়েছে তার সব কবিতার কাঠামোতেই এবং বিশিষ্টভাবে কিছু কবিতায়, বিজ্ঞানের বিভিন্ন সত্য আশ্চর্য সারল্যের সাথে প্রকাশিত হয়েছে তার কবিতাসমূহের এখানে সেখানে।
এখানে অবধারিতভাবে এসে যায় রাজনৈতিক অর্থনীতি। বলছি বিশেষত পুঁজিবাদের কথা। পুঁজিবাদের মূল সংকট এই নয় যে এটি একটি শোষণমূলক ব্যবস্থা, শোষণ প্রাচীন গ্রিসের দাসসমাজ বা মধ্যযুগের ইউরোপের সামন্ত সমাজেও ছিল বিদ্যমান। (ইউরোপের বাইরে আমাদের এলাকাসমূহে, বিশেষত ভারতবর্ষে, কোনোদিনও দাসসমাজ-সামন্তসমাজ-পুঁজিবাদী সমাজ কার্ল মার্ক্সের এই আপাতসরল সূত্রে সমাজের বিকাশ ঘটেছে কিনা সে নিয়ে সন্দেহ আছে। তবে, নিঃসন্দেহে বলা যায় এ কথা- শ্রেণীসংগ্রাম এই অঞ্চলেও ছিল, তবে একটু ভিন্ন রূপে, কিন্তু ছিল তা অবশ্যই। মনে রাখা দরকার, মার্ক্স যেই ভূখণ্ডকে সামনে রেখে তার গবেষণা-বিশ্লেষণ চালিয়েছিলেন সেটা ছিল একটা স্বাধীন সমাজ; বিপরীতে আমরা সেই আর্যদের আগমনের সময় থেকেই পরাধীনতার শক্ত শেকলে আবদ্ধ। আর স্বাধীন সমাজ যেভাবে বিবর্তিত হয়, পরাধীন সমাজ সম্ভবত সেভাবে বিকশিত হয় না।) পুঁজিবাদের মূল সংকট হল এটা মানুষকে বিচ্ছিন্ন করতে পছন্দ করে, তথাকথিত ‘শ্রমবিভাজনের’ নামে মানুষকে একটি কাজ সামগ্রিকভাবে করার আনন্দ থেকে বঞ্চিত করে, মানুষকে তার মানবিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে নামমাত্র জীবিত যন্ত্রে পরিণত করে।
ইংরেজ আগমনের আগেও আমরা ছিলাম পরাধীন, তবে সেই পরাধীনতা সর্বনিয়ন্ত্রক চরিত্রের ছিল না। কৃষক-জেলে-তাঁতি কিভাবে কাজ করবে না করবে সে নিয়ে সম্রাট বা সুলতান বা রাজা বড়ো একটা মাথা ঘামাতেন না; প্রজার কাছ থেকে বিলাসিতা করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন থাকলেই সন্তুষ্ট থাকতেন। ইংরেজ আগমন এ ভূখণ্ডে নিয়ে আসে সর্বপ্রথম এক সর্বনিয়ন্ত্রক শাসকের মানে, শোষকের জাত।
সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদের হারেমে ঢুকে যায় ভারতবর্ষ, ধ্বংস হয়ে যায় সনাতন ভারতের উৎপাদনী কাঠামো, কিন্তু এর বিপরীতে শোষক দেশ ইংল্যাণ্ডের মত কোনো পুঁজিবাদী বিকাশের উদ্যোগই নেওয়া হয় না, কোনো শিল্প বিপ্লব হয় না ভারতবর্ষে, বরং অতুলনীয় মসলিন যাতে না বানাতে পারে সে-জন্য তাঁতিদের আঙুল কেটে নেওয়া হয় একদিকে এবং অন্যদিকে ম্যানচেস্টারের কাপড়ে ছেয়ে যায় ভারতবর্ষ (সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে আদমজী পাটকল ‘বন্ধ’ হওয়া আর শপিং মল, সুপারমার্কেট চালু হওয়ার সাথে কোমো মিল পাওয়া যাচ্ছে? ‘হিস্ট্রি রিপিটস ইটসেলফ। ফার্স্ট অ্যাজ ট্রাজেডি, সেকেণ্ড অ্যাজ ফার্স’!), এবং বেনিয়া পুঁজির ব্যাপক বিকাশ ঘটতে থাকে সময়ের সাথে। এই সবকিছুর সাথে মিল রেখে শিক্ষায় ‘আধুনিকতা’ আমদানি করা হয়, সোজা বাংলায় কেরানি তৈরির শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করা হয়।
বিনয় সম্পূর্ণ সচেতনভাবে অবস্থান নিতে চেয়েছেন এই পুরো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। তবে, কাজী নজরুল ইসলামের মত উচ্চকণ্ঠ ছিলেন না বিনয়, আবার ‘এবার ফিরাও মোরে’ ধরনের রাবীন্দ্রিক রোমান্টিক অবাস্তব অভিলাষও বিনয়ের ছিল না; বরং জীবনানন্দ দাশের সাথেই সাদৃশ্য পাই আমরা বিনয়ের, হেলাল হাফিজের উপমা ধার করে জীবন ও বিনয়কে বলতে পারি দুইজন ‘বিনীত বিদ্রোহী’ আর জীবনানন্দের মতই বিনয়ও খুব ভালো করেই জানতেন- মেকি আধুনিকতার বিকল্প কখনো অতীতে ফিরে যাওয়া হতে পারে না; মেকি আধুনিকতার একমাত্র বিকল্প হতে পারে আসল আধুনিকতা; যা উঠে আসে জনগণের ভেতর থেকে মানবতার বার্তা হাতে নিয়ে (মানিক একবার একটা বই ডেডিকেট করেছিলেন জনসাধারণকে কারণ, ‘জনসাধারণই মানবতার প্রতীক’।) বিনয় সেই সত্যিকার আধুনিকতারই সন্ধান করেছেন। কবিতায়। জীবনেও কি? হয়তো!
বিনয় জানতেন পুঁজির পীড়নে শুধু মেহনতি মানুষেরই নয়, এমনকি, ‘রাজকুমারী’দের মৌলিক অনুভূতিগুলোও মূল্যহীন হয়ে পড়ছে ক্রমশ। তাই তো তিনি সহজেই লিখে ফেলেনঃ
‘জঠরের ক্ষুধা তৃষ্ণা, অট্টালিকা, সচ্ছলতা আছে
সফল মালার জন্য; হৃদয় পাহাড়ে ফেলে রাখো।’ (কেন এই অবিশ্বাস)
পুঁজির যুগে ভালোবাসার মতন শাশ্বতানুভূতিও বাজারে বিকোয়, কার্ড-ফুল-চকোলেট নানারূপ ধরে; অর্থের অভাবে অর্থহীন হয়ে যায় ‘হাসি, জ্যোৎস্না, ব্যথা, স্মৃতি’। একারণেই হয়তো বিনয় দারুণ অভিমানে লেখেনঃ
‘ভালোবাসা দিতে পারি, তোমরা কি গ্রহণে সক্ষম?
লীলাময়ী করপুটে তোমাদের সবই ঝরে যায়-
হাসি, জ্যোৎস্না, ব্যথা, স্মৃতি, অবশিষ্ট কিছুই থাকে না।’ (ভালোবাসা দিতে পারি)
গরীব কবি’র (ও অকবি’র) কাছে থাকে না এমনকি প্রেমিকাও; ‘স্বচ্ছ ডানা’ মেলা ফড়িঙ হয়ে ‘উড়ে যায়’, ‘শ্বাস ফেলে যুবকের প্রাণের উপরে’।
কিন্তু বিনয়ের কাছে ‘অর্থ নয়, বিত্ত নয়, সচ্ছলতা নয় (আট বছর আগের একদিন/জীবনানন্দ দাশ)’, মূল্যবান সবচেয়ে মনুষ্যজীবন। তাই তিনি লেখেন:
‘পৃথিবীতে বাঁচা এক-আশ্চর্য ব্যাপার।
বেঁচে আছি এই কথা ভাবতেই খুব ভালো লাগে।
তদুপরি পৃথিবীতে নানাবিধ আনন্দ রয়েছে।’ (আমার পিতার নাম)
কিন্তু সেই আনন্দ কোথায়? আনন্দ খুঁজতে প্রকৃতির কাছে যান বিনয়, কিন্তু পর্যটকের শৌখিনতা নয়, নিয়ে আত্মীয়ের রক্তময় আবেগ। ‘এ জীবন’ কবিতায় লেখেন যে ‘ঘাস, মাটি, মানুষ, পশু ও পাখি’ এদের জীবনী লেখা হলেই হয়ে যাবে তার নিজের জীবনী লেখা, তার সব ‘ব্যথা প্রস্তাব প্রয়াস’ লিপিবদ্ধ হয়ে যাবে, কারণ ‘মানুষের, বস্তুদের, প্রাণীদের জীবন প্রকৃতপক্ষে পৃথক পৃথক অসংখ্য জীবন নয়, সব একত্রিত হয়ে একটি জীবন মোটে’; ফলত তিনি যে ‘আলেখ্য’ আঁকেন ‘তা বিশ্বের সকলের যৌথ সৃষ্টি’, অহংকার করার কিছুই নেই কোনো কবির, তার কবিতার পেছনে রয়েছে অবদান জগতের সবার! তবে বিনয় বাস্তবকে কখনোই এড়ান না, প্রকৃত সাহসীর মতই মুখোমুখি হন বাস্তবের; দেখেন মানুষের সমাজের মতই ‘প্রকৃতিতে ব্যক্তি আছে, ব্যক্তিপূজা আছে। বিনয়ের সংগ্রাম এই তথাকথিত ব্যক্তিবাদের বিরুদ্ধে, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস-কথিত ‘ব্যক্তি সাতন্ত্র্যের নামে ব্যক্তি সর্বস্বতার’ বিরুদ্ধে। নিছক ‘প্রকৃতির কবিতা’ নয় ‘এ জীবন’, মানুষের নিজেকে সমগ্রের অংশ হিসেবে অনেকের মধ্যে একজন দেখার সে রাজনীতি, যে রাজনীতি মানুষকে দেখেনা শ্রেণী-লিঙ্গ-ধর্মের বানানো বিভাজনে, ‘এ জীবন’ সেই রাজনীতিকেই রূপকে প্রকাশ করে প্রকৃতির।
বিনয় গ্রাম পছন্দ করেন, তবে তাঁর কাছে গ্রাম কোনো ‘ছায়াঢাকা পাখিডাকা’ এলাকামাত্র নয়। ‘মাঝে মাঝে’ কবিতায় বিনয় জানেন ও জানান আমাদের যে ‘মানুষের প্রয়োজন যা যা সেইসব আছে (...) গ্রামময়’। কী সেইসব জিনিস?
১ পথ
২ গাছ
৩ ধানক্ষেত
৪ লতা
৫ হাঁস
৬ কবুতর
৭ মুরগী
৮ ছাগল
এ কবিতাটিতে বিনয় মজুমদার আরও নির্দেশ করেন মানুষের সাথে প্রকৃতির সম্পর্কসূত্র, দেখান ‘কালক্রমে পৃথিবীর সবই মাটি হয়ে যায়, তবুও মাটির থেকে রসাত্মক উদ্ভিদ গজায়, মানুষ মাটির সঙ্গে লেগে থাকে সর্বত্রই ধানক্ষেত, গ্রন্থাগারে ও লোকসভায়’।
‘ভাত’ মানুষের বেঁচে থাকার প্রধান উপায়। একটি কবিতা লিখেছেন বিনয় ভাত খাওয়া নিয়ে (‘এক সঙ্গে একাধিক চিন্তা করি’), সুধীন্দ্র কথিত ‘আভিজাত্য ল`য়ে’ থাকা ‘রুচিগ্রস্ত সিদ্ধ কবি’ হয়তো হাসতে হাসতে মরে যেতেন এই কবিতাটি তার চোখে পড়লে। কিন্তু ভাত অত্যন্ত মূল্যবান, ভাতের রয়েছে রাজনৈতিক অর্থনীতি, শ্রেণীবিভেদ, শ্রেণী ঠিক করে দেয় একটি দেশে উচ্চবিত্তের সন্তান প্লেটে অর্ধেক ভাত ফেলে টেবিল থেকে উঠে যাবে এবং সেই একই দেশে একটি দশ বছরের মেয়ে দুদিন ধরে ভাত না খেতে পারার কষ্টে-যন্ত্রণায় আত্মহত্যা করবে।
গণিতপ্রিয়তা ও বিজ্ঞানমনস্কতা এত বেশি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিনয় মজুমদারের বিভিন্ন কবিতায় যে এখানে এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে সে-সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এটি এই প্রবন্ধের একটা বড় দুর্বলতা ধরা যেতে পারে।
যৌনতার এরকম বর্ণিল বর্ণনা বাংলাসাহিত্যে আর কারো কবিতায় এসেছে কিনা আমার জানা নেই। ‘আমার ভুট্টার তেল’, ‘বসা শুরু করতেই’ এবং ‘আমি ঝুঁকে পড়ি আরো’ এই তিনটি সম্ভবত-ধারাবাহিক কবিতায় একটি যৌনমিলনের সম্পূর্ণ বর্ণনা দিয়েছেন বিনয়। ব্যবহার করছেন দারুণ কিছু শিল্পীত রূপকঃ শিশ্নের জন্য ‘ভুট্টা’, যোনির জন্য ‘গুহা’, স্তনের জন্য ‘কমলালেবু’, যৌনক্রিয়ার জন্য ‘ধাক্কা দেওয়া’ এবং বীর্যপাতের জন্য ‘জল’। যৌনতা নিয়ে বাংলা সাহিত্যে নিশ্চয় লেখা হয়েছে অসংখ্য কবিতা, আমি যতটুকু পড়েছি তাতে আমার মনে হয় বেশিরভাগ সময়েই পুরুষ কবি নারীকে কবিতার মাধ্যমে যৌনপীড়ন করে সুখ পান। ফরহাদ মজহারের একটি বিখ্যাত কবিতায় কবি যদিও নারীর কিছু প্রশংসা করেছেন, তবু তিনি নারীকে নানান ভোগ্যপণ্যের সাথে তুলনা করার লোভটা সামলাতে পারেননি। এই ধরনের কবিতা পুরুষ পাঠককে বেশ তৃপ্ত করলেও নারী পাঠককে এক ধরনের মন:তাত্ত্বিক যন্ত্রণার ভেতরে ফেলে দেয়, আমার ধারণা। এ-ক্ষেত্রে বিনয় আশ্চর্য রকমের সমতা-প্রবণতা দেখিয়েছেন, নারী ও পুরুষ উভয়ের শরীরকেই যৌনবস্তুতে পরিণত করেছেন এই কবিতাগুলোতে, ঠিক যেমনটা হওয়া উচিত। আমার ধারণা, বিনয়ের এই কবিতাত্রয়ী পাঠে নারী পাঠক ও পুরুষ পাঠক সমান তৃপ্তি পাবে।
সামগ্রিকভাবে, আমার বিনয়-পাঠের অভিজ্ঞতা থেকে যতটা অনুভব করি, বিনয় মজুমদার কবিতাকে করে তুলতে চেয়েছেন জীবনের বিশ্বস্ত মিরর ইমেজ, যতটা সম্ভব সহজ ভাষায়। তার কবিতায় কোনো দুর্বোধ্য শব্দ তিনি ব্যবহার করেন নি, অন্তত আমার চোখে পড়েনি, প্রচলিত শব্দ ব্যবহার করেই তিনি তৈরি করেছেন কিছু হৃদয়কাঁপানো পঙক্তি।
কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা তিনি জীবন থেকে পালাতে চাননি, জীবনের কাছে বারবার ফিরে আসতে চেয়েছেন।
জীবনই ছিল বিনয় মজুমদারের কবিতার প্রধান প্রসঙ্গ, তাহলে বলা যায়!
বাংলাদেশ সময়: ১৯৪৫ ঘণ্টা, ১২ জুলাই, ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস