English
সব খবর      অর্থনীতি     আন্তর্জাতিক     ইচ্ছেঘুড়ি     কপ-১৭     খেলা     জাতীয়     জীববৈচিত্র্য     তথ্যপ্রযুক্তি     পিআইডি পরিক্রমা     প্রবাসের চিঠি     ফিচার     বাংলানিউজ স্পেশাল     বাংলানিউজএক্সক্লুসিভ     বিদ্যুৎ ও জ্বালানি     বিনোদন     মনোকথা     মুক্তমত     রাজনীতি     শিল্প-সাহিত্য     সত‌্যি বিচিত্র!     স্বপ্নযাত্রা     স্বাস্থ্য     

ফিলিস্তিনের সাম্যবাদী সাহিত্যিক এমিলি হাবিবি


সিয়াম সারোয়ার জামিল
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
ফিলিস্তিনের সাম্যবাদী সাহিত্যিক এমিলি হাবিবি

বাঙালি ও ফিলিস্তনিদের মাঝে একটা আত্মার সম্পর্ক রয়েছে। একাত্তরে বাঙালিরা মুক্তিযুদ্ধ করেছে, আর ফিলিস্তিনিরা এখনও তাদের ভূখণ্ডের স্বাধীনতা রক্ষায় যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে অবিরতভাবে। তারা সবসময়ই শুধু শোষিত হয়েছে। ইসরায়েলি হানাদার বাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে, যুদ্ধে বিধ্বস্ত হয়েছে। ভাঙা গড়ার খেলাই যেন তাদের জীবন। এই জীবনধারা বিপ্লবীদের কাছে আদর্শ হয়ে গেছে। জীবনের এ সংগ্রামী ধারার প্রভাব পড়েছে ফিলিস্তিনের সাহিত্যে। হয়তো সে কারণেই বাংলাদেশের সচেতন পাঠক মহলে ফিলিস্তিনি সাহিত্যের প্রতি ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়।

ফিলিস্তিনের ভাষা মূলত আরবি। দেশটির অসংখ্য সাম্যবাদী কবি সাহিত্যিক আরবি সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে গিয়েছেন। অনুবাদকদের কল্যাণে ফিলিস্তিনি কবি সাহিত্যিকদের লেখাপড়ার সুযোগ হয় বাঙালি পাঠকদের। ফিলিস্তিনের সাম্যবাদী জাতীয় কবি মাহমুদ দারবিশের খ্যাতি আজ বিশ্বজোড়া। আরবি সাহিত্যে তার অসামান্য অবদান চিরস্মরণীয়। কিন্তু তার সাথে আরও অনেকে রয়েছেন যারা আরবি সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন এক বিপ্লবী সাহিত্য হিসেবে, কথাসাহিত্যিক এমিলি হাবিবি তাদেরই একজন।

হাবিবির জন্ম ২৯ আগস্ট, ১৯২২। মৃত্যু ২ মে ১৯৯৬। তার পৈত্রিক আবাসস্থল ছিল ফিলিস্তিনের হায়ফাতে। এই এলাকাটি পরে ইসরায়েলি বাহিনী দখল করে নেই। জন্মস্থানের প্রতি প্রচণ্ড আবেগপ্রবণ ছিলেন তিনি। বর্ণাঢ্য জীবন ও সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে বিশ্বজোড়া খ্যাতিমান হয়ে ওঠলেও তিনি নিজ মাতৃভূমি ছেড়ে কখনও সরে যাননি। প্রতিকূল পরিস্থিত মোকাবেলা করে আমৃত্যু সংগ্রাম করেই সেখানে থেকে গেছেন।

এমিলি হাবিবির সাহিত্যচর্চার শুরু বিশ শতকের ষাটের দশকে। মূলত ছোটগল্প, উপন্যাস ও নাটক লিখেছেন। ১৯৬০ সালে তার প্রথম গল্প প্রকাশিত হয়। ১৯৬৯ সালে তার প্রথম গ্রন্থ সাদাসিয়াত `আল আয়াম আল সিতাহ` বইটি প্রকাশিত হয়। সে সময় ফিলিস্তিনে অস্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছিল। সে সময় গ্রন্থটি পাঠক মহলে তেমন সাড়া ফেলার সুযোগ পায়নি।

তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস `দি সিক্রেট লাইফ অব সাঈদ: দি পেসঅবটিমিস্ট` প্রকাশিত হলে বিশ্বব্যাপী তার খ্যাতি ছড়িয়ে যায়। একইসাথে তিনি আরবি সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কথাশিল্পীর মর্যাদায় অভিষিক্ত হন। বইটি ছিল একটি ধ্রুপদি আধুনিক আরবি উপন্যাস। ওই উপন্যাসটি মূলত সাঈদ নামের এক ইসরায়েলি আরবিভাষীর জীবনচিত্র। উপন্যাসে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে বাস করা আরবিভাষীদের সঙ্গে ইহুদিদের সহাবস্থান প্রাধান্য পেয়েছে। আরব রাইটার্স ইউনিয়ন বইটিকে বিংশ শতাব্দীর শেষ্ঠ বইয়ের তালিকায় স্থান দিয়েছিল।

১৯৭৬ সালে ‘কাফের কাসেম’ তার নামক আরেকটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ১৯৮০ সালে প্রকাশিত হয় তার বিখ্যাত নাট্যগ্রন্থ "লাক বিন লাক"। ১৯৯১ সালে তার `খুরাফিয়াত সারায়া বিন আল গুহি` উপন্যাসটি প্রকাশিত হলে আবারও তিনি পাঠক মহলের মাঝে আলোচনায় আসেন। ইংরেজিতে-`সারায়া, দ্য অগ`স ডটার` শিরোনামের এই উপন্যাসে যুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া এক বালিকার করুনচিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে চমৎকারভাবে। যা ওই সময় পাঠক মহলে ব্যপক সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়েছিল।

এমিলি হাবিবি নিজের কর্মজীবন সূচনা করেছিলেন একটি তেল শোধনাগারের কর্মী হিসেবে। পরে ইসরায়েলি ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনের অধীনে ১৯৪১ সাল থেকে ৪৩ সাল পর্যন্ত রেডিও উপস্থাপক হিসেবে চাকরি করেন। এরপরে তিনি দীর্ঘকাল সাম্যবাদী পত্রিকা আল ইত্তেহাদের সম্পাদক ছিলেন। ১৯৯৫ সাল থেকে তিনি মাসারিফ নামক একটি সাময়িকী সম্পাদনা করতেন।

এমিলি শুধু একজন কথাসাহিত্যিক ছিলেন না, একজন জাঁদরেল রাজনীতিবিদও ছিলেন। ফিলিস্তিনিদের শোষিত হতে দেখে সমাজ পরিবর্তনের সাম্যবাদী আদর্শ তার হৃদয় ছুঁয়ে ছিল। ১৯৪০ সালে যোগ দিয়েছিলেন ফিলিস্তিনের কমিউনিস্ট পার্টিতে। ১৯৪৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল লিবারেশন লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। পরে নিজগুণে ইসরায়েলি কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম সারির নেতা হয়ে ছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতি করেই তিনি পাঁচবার ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৯১ সালে বিভিন্ন কারণে তিনি রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সাম্যবাদের রাজনীতিতেই সক্রিয় থেকেছেন।

এমিলি হাবিবি ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ প্রণীত ফিলিস্তিনের সীমান্ত রূপরেখাকে সমর্থন করতেন। ইসরায়েলি পার্লামেন্টসহ সব জায়গায় ফিলিস্তিনবাসীর নায্য দাবির প্রতি সমর্থন জানাতেন। এজন্য তাকে সবসময়ই ইসরায়েল সরকারের বিরাগভাজন হতে হয়েছে, নানা সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু তিনি কখনও এতটুকুও দমে যাননি।

মাহমুদ দারবিশ ও এমিলি হাবিবি দুজনেই খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। দারবিশ লেবাননে নির্বাসিত হয়েছিলেন দীর্ঘকাল। তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পরপরই তিনি বন্ধু এমিলি হাবিবির বাসায় যান। এক সাক্ষাৎকারে এ সম্পর্কে তিনি বলেন, "আমি এমিলি হাবিবির সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। তার নিজ জীবন ও সৃষ্টিশীলতার ওপর নির্মিতব্য একটি চলচ্চিত্রের অংশ হিসেবে মাউন্ট কারমেলের পুরনো বাড়িতে সে একটা বৈঠকের আয়োজন করেছিল। একটা সময় ছিল যখন আমি ঐ বাড়িতে থাকতাম। এই বৈঠক আয়োজন করতে তাকে প্রচুর কাঠ-খড় পোড়াতে হয়েছে। আমাদের কথোপকথনের দৃশ্য যাতে ক্যামারাবন্দী করা যায় সে জন্য চলচ্চিত্রটি শেষ করতে আমার প্রত্যাবর্তনের সময় পর্যন্ত তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল। যদিও আমি তার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম, কিন্তু লক্ষ্য করলাম আমি মূলত তাকে বিদায় জানাচ্ছি এবং শোকাচ্ছন্ন করে তুলছি।"

সাহিত্যচর্চা স্বীকৃতি হিসেবে এমিলি অনেক সম্মাননা পেয়েছেন। তিনি ফিলিস্তিনের পিএলও সম্মাননায় ভূষিত হন। ১৯৯০ সালে তিনি আল কুদস্ পুরস্কারে ভূষিত হন। ১৯৯২ সালে পান ইসরায়েল পদক। যদিও সেসময় ইসরায়েলি পদক নেওয়ার পর আরবীয় বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ তার কঠোর সমালোচনা করেছিল। সমালোচকদের জবাবে তিনি বলেছিলেন, "ইসরায়েলি পাথর ও বুলেটের চেয়ে একটি পুরস্কার অনেক বেশি ভাল"। তিনি আরো বলেছিলেন. "এটা ইসরায়েলের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের পরোক্ষ একটি জাতি হিসেবে স্বীকৃতি। একইসাথে এটি একটি ফিলিস্তিনের জাতীয় সংস্কৃতির স্বীকৃতি। এটা আরব জনতাকে তাদের নায্য ভূমি ও অধিকার রক্ষার দাবিকে উদ্বুদ্ধ করবে।"

এমিলি হাবিবি শোষককে ঘৃণা করেছেন, একইসাথে নিজ দাবির প্রতি সচেতন থেকেছেন সবসময়ই। তিনি কখনও আপোষ করেননি, কৌশল অবলম্বন করেছেন। দেশকে ভালবাসতেন বলেই বারবার দেশের বিপদে কথা বলেছেন। যা বলতে পারেননি, তা লিখে প্রকাশ করেছেন। ফিলিস্তিনের সাহিত্যে তার সাম্যবাদী অসামান্য অবদান অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে যুগ যুগ ধরে। শোষকের থাবার নিচ থেকে যিনি তাঁর মাতৃভূমির আকাশ-মাটি-ঝরণা-জলপাই-শৈশব আর মুক্তির আশাকে ছিনিয়ে এনে ঢেকে রেখেছিলেন সাহিত্যের ভাঁজে ভাঁজে, তিনি চলে গিয়েছিলেন অনেকটা নিরবে, তার জন্মস্থান হায়ফাতে। কমরেড, ঘুমাও তুমি শান্তিতে।

সিয়াম সারোয়ার জামিল, ব্লগার।

বাংলাদেশ সময়: ১৫২১ ঘণ্টা, জুলাই ০২, ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস

আগের পৃষ্ঠা
যোগাযোগ: বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, মিডিয়া হাউজ, প্লট # ৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক # ডি, বসুন্ধরা রোড, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ
ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন
কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত
একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান