![]() |
ঢাকা: মার্জিন ঋণ নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত, এমন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণ না দিতে নতুন নাটকের অবতারণা করছে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো। আর এ উদ্দেশ্যে সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে সরকার ঘোষিত ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণ স্কিম বাস্তবায়নে শর্ত জুড়ে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো।
শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে ১০ শতাংশ সুদে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোকে ৯০০ কোটি টাকার পুনঃতফসিলিকরণ ঋণ প্রদান। আর ক্ষতিপূরণ বাবদ ব্যয়কৃত অর্থ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অনুমোদনযোগ্য ব্যয় হিসেবে দেখানোর নির্দেশনাও চেয়েছে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো।
গত বছরের নভেম্বরে শেয়ারবাজারে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি পোষাতে বিশেষ স্কিম প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। এরপর ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন সময় মার্চেন্ট ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ স্কিম বাস্তবায়নের আশ্বাস দেওয়া হয়।
কিন্তু ৩১ জুলাই হঠাৎ করেই বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ) সংবাদ সম্মেলন করে সুদ মওকুফে শর্ত জুড়ে দেয়। এতে সুদ মওকুফ আবারো প্রশ্নের মুখে পড়ে। আর ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ঋণ থেকে পরিত্রাণের দীর্ঘদিনের আশা ফের হতাশায় পরিণত হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
মার্জিণ ঋণ বিষয়ে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর এমন ঘোষণার পর টানা ৩ কার্যদিবস পুঁজিবাজার ছিল নিম্নমুখী। আর এ সময়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাধারণ সূচক কমে প্রায় দেড় শ’ পয়েন্ট।
এদিকে বিভিন্ন মার্চেন্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্কিম প্রণয়নের আগেই অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠক শেষে বিএমবিএ-এর সভাপতি মোহাম্মদ এ হাফিজ স্কিম বাস্তবায়ন করা হবে বলে সাংবাদিকদের জানান।
অপরদিকে এ স্কিম বাস্তবায়নে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) নির্দেশ দেওয়ার আগে এ বিষয়ে বার বার মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে স্কিম বাস্তবায়ন করা হবে। কখনই স্কিম বাস্তবায়ন করতে সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজন বলে দাবি করেনি প্রতিষ্ঠানগুলো।
৩১ জুলাই অনুষ্ঠিত ওই সংবাদ সম্মেলনে বিএমবিএ সহ-সভাপতি তানজিল চৌধুরী বলেন, ‘আমরা বলছি না ঋণের সুদ মওকুফ করবো না। তবে কোনো ধরনের সহায়তা ছাড়া মার্জিন ঋণের সুদ মওকুফ করা হলে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো নিজেরাই আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।’
এ বিষয়ে মার্চেন্ট ব্যাংকারদের সঙ্গে কথা বললে তারা বলেন, ‘মার্জিন ঋণ হিসেবে যে অর্থ গ্রাহকদের দেওয়া হয়েছে। একই পরিমাণ পুরোটাই মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর মূল প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ হিসেবে নেওয়া। এখন যে অবস্থা তাতে গ্রাহকদের টাকাও পাওয়া যাচ্ছে না। আবার মার্চেন্ট ব্যাংকের মূল ব্যাংকের ঋণ ও সুদের বোঝা দুটোই বহন করতে হচ্ছে। এমন অবস্থায় মূল ব্যাংকের সুদের টাকাই ঠিকমত দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অপর এক মার্চেন্ট ব্যাংকার বলেন, ‘আমাদের নিজেদের পোর্টফলিওর যে অবস্থাতে তাতে মূল ব্যাংক আর কতদিন এ বোঝা বইবে তা বুঝে উঠতে পারছি না। যে ক্ষতি হয়েছে তা কতদিনে উঠে আসবে তাও ধারণা করতে পারছি না। এমন অবস্থায় মার্জিন ঋণের সুদে মওকুফের টাকা মরার ঘাড়ে খুড়ের ঘাঁয়ের মত।’
বিএমবিএ’র ওই সংবাদ সম্মেলনে মোহাম্মদ এ হাফিজ বলেন, পুঁজিবাজারে মার্চেন্ট ব্যাংক প্রদত্ত মার্জিন ঋণের পরিমাণ সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে সর্বোমোট ৪১ হাজার ৯৯২ জন বিনিয়োগকারীর ক্ষতিপূরণের জন্য সুদ মওকুফ করতে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর ৬৫ কোটি ১১ লাখ টাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ৬৫ কোটি ১৬ লাখ টাকার সুদ পুনঃতফসিলিকরণ এবং ৯১৩ কোটি ৯০ লাখ টাকার ঋণ পুনঃতফসিলিকরণ করতে হবে। সব মিলিয়ে প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোকে ৩৪০ কোটি ৭৫ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে।
কিন্তু, স্কিম বাস্তবায়ন করলে ক্ষতি হতে পারে এ ধরনের কোনো কথা এসইসি নির্দেশ দেওয়ার আগে বলেনি মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো। তাহলে কি ক্ষতিপূরণ না দেওয়ার জন্যই এসইসি’র নির্দেশনার আগে একবারও মার্চেন্ট ব্যাংকারদের পক্ষ থেকে সুযোগ-সুবিধা চাওয়া হয়নি, এমন প্রশ্ন এখন ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে?
এদিকে হঠাৎ করেই মার্চেন্ট ব্যাংকের পক্ষ থেকে এমন ঘোষণা দেওয়ার ফলে হতাশ হয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। আর আদৌ মার্চেন্ট ব্যাংকের শর্ত বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআর মেনে নেব কি-না এবং স্কিম বাস্তবায়ন হবে কি-না এ নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে শঙ্কা!
প্রসঙ্গত, এসইসির ৮৩৮তম কমিশন সভায় মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোকে স্কিম কমিটির সুপারিশ পরিপালনে নির্দেশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ডিএসই’র ২০৯টি স্টক ব্রোকার ও সিএসই’র ৭৯টি স্টক ব্রোকার এবং ২৮টি মার্চেন্ট ব্যাংককে বিশেষ স্কিম কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের চূড়ান্ত তালিকা অনুসারে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আদেশ দেওয়া হয়।
সেই সঙ্গে একটি সমন্বিত প্রতিবেদন ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে এসইসিতে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
বিশেষ স্কিম কমিটি যেসব সুপারিশ করেছে এর মধ্যে রয়েছে মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউস থেকে নেওয়া ঋণ আগামী তিন বছরে পরিশোধ করতে পারবেন ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীরা। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের এক বছরের মার্জিন ঋণের ৫০ শতাংশ সুদ মওকুফ এবং মার্জিন ও নন-মার্জিন ঋণে ক্ষতিগ্রস্ত উভয় শ্রেণীর ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য ২০১৪ সালের জুন পর্যন্ত সব প্রাথমিক গণপ্রস্তাবে (আইপিও) ২০ শতাংশ কোটা বরাদ্দ থাকবে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, স্কিম কমিটির প্রতিবেদনে মার্জিন ও নন-মার্জিন (বিও) হিসেবে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নিজস্ব অর্থ জমাকারীকে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ স্কিমে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারী বলতে ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে উল্লিখিত মার্জিন এবং নন-মার্জিন ঋণে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের বোঝানো হয়েছে।
স্কিমের আওতায় প্রায় সাড়ে ৯ লাখ বিনিয়োগকারী ক্ষতিপূরণ পাবেন। মার্জিন ঋণের আওতায় থাকা ১ লাখ ৩৭ হাজার ১৭৩ জনের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত সুদ মওকুফ এবং ৭ লাখ ৯৬ হাজার ১০৭ জন আইপিওতে কোটা বরাদ্দ পাবেন। আইসিবি ও এর তিনটি সাব-সিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীর সংখ্যা মোট ২০ হাজার ৮৬৫ এবং তাদের সুদ মওকুফে মোট ২৫ কোটি ৪৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে মূল আইসিবির ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ৯ হাজার ৯২৯, যাদের সুদ মওকুফের পরিমাণ মোট ১২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। আইসিবি মার্চেন্ট ব্যাংকের ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ১০ হাজার ৬৫৭, যাদের সুদ মওকুফের পরিমাণ মোট ১০ কোটি ৭২ লাখ টাকা এবং আইসিবি সিকিউরিটিজ অ্যান্ড ট্রেডিং কোম্পানি লিমিটেডের (আইএসটিসিএল) ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ২৭৯, যাদের সুদ মওকুফের পরিমাণ ১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ সময় : ০৯০০ ঘণ্টা, ০৭ আগস্ট, ২০১২
এইচএমএম/এআর/সম্পাদনা : নজরুল ইসলাম, নিউজরুম এডিটর