[x]
[x]
ঢাকা, শুক্রবার, ৭ বৈশাখ ১৪২৫, ২০ এপ্রিল ২০১৮

bangla news

‘বিষাদ ছুঁয়েছে আজ, মন ভালো নেই’

ড. মাহফুজ পারভেজ, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১৭-১০-১০ ৩:৫৫:০৯ পিএম
ছবি: প্রতীকী

ছবি: প্রতীকী

মন ভালো না থাকাটা একদা ছিল আকস্মিক। প্রেমে ব্যর্থ বা জীবনের অসফলতার জন্য ‘মন ভালো নেই’ বলে কেউ কেউ কিছুদিন চুপচাপ থাকতেন। আজকাল ‘মন ভালো নেই’ একটি সংক্রামক ব্যাধি হয়ে গেছে।

বিশেষত শিশু, কিশোর, তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ‘ভাল্লাগে না’ প্রবণতা ভয়ঙ্করভাবে বেড়েছে। খারাপ মন নিয়ে জীবন বিষিয়ে তুলছে তারা। কখনো মাদক বা আত্মঘাতী প্রবণতায় জড়াচ্ছে। বিষণ্নতায় আচ্ছন্ন হয়ে হতাশ জীবনের পথে চলে যাওয়া প্রজন্মের খোঁজ অনেক সময় বাবা-মা রাখতে পারে না নানা ব্যস্ততায়। চরম একাকিত্ব ও হতাশায় নিজের সন্তানের মনের অতলে যে গভীর কালো জগত তৈরি হয়েছে, সে খেয়ালও অনেক অভিভাবক রাখেন না। সন্তানটি (ছেলে বা মেয়ে) নীল জগতের উদভ্রান্ত সীমানায় হারিয়ে যেতে থাকলেই টনক নড়ে পিতা-মাতার। ততক্ষণে হয়ত অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে!

বিষয়টি একদিকে যেমন সামাজিক, পারিবারিক, অন্য দিক থেকে স্বাস্থ্যগত সমস্যাও বটে। কারণ, স্বাস্থ্য বলতে বোঝানো হয় শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা, উভয়টিকেই।

জন্ম ও মৃত্যুর মাঝে মানুষকে তার চারপাশের সামাজিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হয়। এই উভয় প্রকার পরিবেশ মানুষের শারীরিক ও মানসিক
স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে।

স্বাস্থ্য সচেতনতা হলো কিছু অভ্যাসের আচরণ, যার দ্বারা আমরা শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারি। সুস্বাস্থ্যের জন্য উভয় ক্ষেত্রেই সুস্থ্যতা অপরিহার্য। এ গুরুত্বের কারণেই ১০ অক্টোবর পৃথিবীর সবার মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা, সচেতনতার দিন। এটি ১৯৯২ সালে প্রথমবার পালন করা হয়েছিল।

কিছু দেশে একে মানসিক রোগ সচেতনতা সপ্তাহের অংশ হিসাবে পালন করা হয়। সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হয় সকলের সুস্থ মন ও সুস্থ শরীরের জন্য।
উনিশ শতকের আগে মন সম্পর্কীয় সকল অধ্যয়ন দর্শনের অন্তর্ভুক্ত ছিল, স্বাস্থ্য বা চিকিৎসার বিষয়ে পরিণত হয়নি। দার্শনিকরা মানসিক আচার-আচরণ বা ক্রিয়া-কলাপ সম্পর্কে কেবল অনুমান করেছিলেন। মন সম্পর্কে গ্রীক দার্শনিক প্লেটো সর্বপ্রথম ব্যাখ্যা করেন। তিনি মনকে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন সত্তা হিসাবে গণ্য করেন।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম আধুনিক যুগে স্নায়ুবিজ্ঞান ও প্রাণীবিজ্ঞানের বিকাশের সাথে সাথে মনোবিজ্ঞানেরও নব বিকাশ ঘটে এবং আধুনিক বিজ্ঞানের এক অন্যতম শাখা হিসাবে মনোবিজ্ঞানের বিকাশ আরম্ভ হয়।

স্নায়ুবিজ্ঞান ও প্রাণীবিজ্ঞানের মধ্যেই যে মনোবিজ্ঞানের প্রাথমিক ভিত্তি নিহিত হয়ে আছে সে কথা সর্বপ্রথম বলেন জার্মান শরীর বিজ্ঞানী জোহানেস পিটার মুলার। অবশ্য মনোবিজ্ঞানকে বিজ্ঞান হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য অন্যতম গুরুত্ত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারটি করেছিলেন আরেকজন জার্মান বিজ্ঞানী হারমেন ভন হেল্মল্টজ্। ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী টমাস ইয়ঙের প্রস্তাবিত রং সংক্রান্ত নীতি নিয়ে গবেষণা করে তিনি ইয়ং-হেল্মল্টজ্ সূত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

এই সূত্র দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, তিনটে বিভিন্ন রঙের (সবুজ, নীল ও লাল) অনুভূতির সৃষ্টি হয় মানুষের চোখের রেটিনার সাথে সংযুক্ত তিন ধরনের স্নায়ুর কর্ম-
তৎপরতার ফলে। পরবর্তী আধুনিক মনোবিজ্ঞান একের পর আমাদের মন সম্পর্কীয় রহস্য উদঘাটন করে এর জয়যাত্রা অব্যাহত রেখেছে এবং মনের ভালো ও খারাপ অবস্থার দিক নিয়ে গবেষণা ও চিকিৎসা চালাচ্ছে।

কিন্তু চিকিৎসার সঙ্গে সঙ্গে সন্তানের প্রতি মনোযোগ ও লক্ষ্য রাখার কাজটিও গুরুত্বের সঙ্গে করতে হবে। আপনার ছেলে বা মেয়ে কোথায় যায়, কি করে, সেটা আগে-ভাগে জেনে সতর্ক হতে না পারলে বিপদই নেমে আসবে। সাম্প্রতিক সময়ে এই বাংলাদেশেই এমন বহু মানসিক অস্থিরতা ও অপরাধের খবর প্রকাশিত হয়েছে, যা বেদনাদায়ক। এই বেদনা রোধের পূর্ব-প্রস্তুতি স্বরূপ শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে তীক্ষ্ণ নজর দিতে হবে।

প্রসঙ্গত বলা যায়, কবি মহাদেব সাহার পেশাগত পরিচয় ছিল সাংবাদিক। একদার অপ্রতিদ্বন্দ্বী দৈনিক ইত্তেফাক-এর তিনি ছিলেন সহকারী সম্পাদক। রোমান্টিক-প্রেমের কবিতায় সিদ্ধহস্ত এই কবি একবার রচনা করেছিলেন সুন্দর কিছু পংক্তি: ‘বিষাদ ছুঁয়েছে আজ/ মন ভালো নেই/ মন ভালো নেই/ ফাঁকা রাস্তা, শূন্য বারান্দা/সারাদিন ডাকি সাড়া নেই....।

বাংলা সাহিত্যের আরেক জনপ্রিয় কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও ছিলেন সাংবাদিক। তারও চম‍ৎকার কিছু লাইন আছে: ‘মন ভালো নেই মন ভালো নেই মন ভালো নেই/কেউ তা বোঝে না সকলি গোপন মুখে ছায়া নেই/চোখ খোলা তবু চোখ বুজে আছি কেউ তা দেখেনি….।’

কবিতা ও সাহিত্যের এমন রোমান্টিক ভাবালুতা যদি বাস্তব জীবনে চলে আসে, আপনার বা আমার ঘরের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়, তখন কিন্তু চরম বিপদ। ১০ অক্টোবরই শুধু নয়, শরীর ও মনকে ভালো রাখতে খাদ্য, পুষ্টি, পরিবেশ, ব্যায়াম, বিশ্রাম দিয়ে এবং প্রকৃতি ও সুন্দরের দিকে ধাবিত হয়ে বছরের প্রতিটি দিনকেই ভরিয়ে তুলতে হবে।

ড. মাহফুজ পারভেজ: কবি-কথাশিল্পী- গবেষক। অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

বাংলাদেশ সময়: ১৫৫০ ঘণ্টা, অক্টোবর ১০, ২০১৭
জেডএম/

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Alexa