বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো ও বড় চলচ্চিত্রের আসর ‘কান চলচ্চিত্র উৎসব’। প্রতি বছর ফ্রান্সের কান শহরে ঐতিহ্যবাহী এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। ১৬ মে বুধবার থেকে এবারের উৎসবের পর্দা উন্মোচন হচ্ছে। কান চলচ্চিত্র উৎসবের এটি ৬৫তম আয়োজন। এ উৎসব চলবে আগামী ২৭ মে পর্যন্ত।
হলিউড-বলিউড সহ বিশ্বের সব ফিল্ম ইন্ড্রাষ্ট্রির সেলিব্রিটি অভিনেতা-অভিনেত্রী, নির্মাতা, প্রযোজক ও কলাকুশলীদের পদচারণায় টানা ১২ দিন মুখর থাকবে ফ্রান্সে কান নগরী। গতবারের চেয়েও এবার উৎসব আরো বেশি জমে উঠার আশা করছেন আয়োজক কর্তৃপক্ষ।
অস্কারের পর বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন উৎসব হিসেবে গন্য করা হয় কান চলচ্চিত্র উৎসবকে। বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী এ উৎসবটি ১৯৩৯ সাল থেকে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। বিশ্ব চলচ্চিত্রে ভেনিস ও বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবের মতোই কান চলচ্চিত্র উৎসবকেও মর্যাদাপূর্ণ উৎসবের সম্মান দেয়া হয়ে থাকে। দক্ষিণ ফ্রান্সের রিজোর্ট শহর কানে প্রতি বছর মে মাসেই এ উৎসবের আয়োজন করা হয়। ‘পালে দে ফেস্টিভাল্স এ দে ক্রোঁগ’ নামক ভবনটিতে মূল উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এ ভবনটি কেবলমাত্র কান উৎসবের আয়োজনের জন্যেই নির্মাণ করা হয়।
ইটালির ভেনিসের মোস্ত্রা উৎসবকে টেক্কা দিতেই তখনকার চলচ্চিত্র বোদ্ধারা এই উৎসবের চালু করেন৷ সে সময় নাৎসিবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জবাব হিসেবেই কান এর যাত্রা শুরু হয়। ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর আয়োজিত হয় কান চলচ্চিত্র উৎসবের প্রথম আসর ৷ মাত্র দু’দিন স্থায়ী হয় এ আসরটি। প্রথম আসরে একটি মাত্র ছবি প্রদর্শিত হয়। সে ছবিটি ছিলো ভিক্টর হুগোর কালজয়ী উপন্যাসের আলোকে নির্মিত হলিউডের ছবি ‘হ্যাঞ্চব্যাক অব নতরদাম`৷ নাৎসি হিটলার পোল্যান্ড আক্রমণের পর সে বছরের কান চলচ্চিত্রের প্রথম আসরটি অসমাপ্ত থেকেই শেষ হয় ৷
চলচ্চিত্র বোদ্ধারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নতুনভাবে আবারও ফ্রান্সের এই চলচ্চিত্র উৎসবের যাত্রা শুরু করে ৷ উৎসব৷ ১৯৪৬ সালে ১৬টি দেশের অংশ গ্রহণে কান উৎসব নতুন করে পথচলা শুরু করে৷ ১৯৪৮ ও ১৯৫০ সালে বাজেটের সমস্যার কারনে এ উৎসবের আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু পরের বছর ১৯৫১ সালে ফ্যান্স ও ইতালির মধ্যকার সুসম্পর্ক হওয়ায় এ উৎসবের আয়োজন আবারও করা হয়। এরপর থেকে নিয়মিত আয়োজনে ৬৫ বছর পার হয়ে গেছে ৷ বর্তমানে এটি বিশ্বের সবকটি ফিল্মডোমের জন্যে একটি আর্ন্তজাতিক প্লাটফর্ম হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
১৯৬২ সালে এ উৎসবে ফ্রান্স ইউনিয়ন অফ ফিল্ম ক্রিটিক সদস্যদের দ্বারা ইন্টারন্যাশনাল ক্রিটিক উইক-এর সংযোজন করা হয়। এটি ছিল উৎসবের প্রথম প্যারালাল অধ্যায়। এর মাধ্যমে বিশ্বের সবকটি দেশে থেকে একজন নামী পরিচালকের প্রথম ও দ্বিতীয় কাজটিকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা। ১৯৬৫ সালে প্রথমবার সশ্রদ্ধ স্বীকৃতি দেয়া হয় জিন কোকটিকে তার মৃত্যুর পর। এর পরের বছ ১৯৬৬ সালে ফেস্টিভালের প্রথম মহিলা প্রেসিডেন্ট হিসেবে সম্মানিত করা হয় অলিভিয়া ডি হেভিল্যান্ডকে।
১৯৭০ সালে উৎসবে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়। ১৯৭২ সালে রবার্ট ফেভরি লি ব্রিট কে নতুন প্রেসিডেন্ট এবং মরিস বেসিকে ম্যানেজিং ডিরেক্টর করা হয়। সে সময় থেকে ফেস্টিভালে প্রদর্শিত চলচ্চিত্রের উপর নতুন নিয়ম চালু করা হয়। এতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ব্যবস্থা নেয়া হয়।
এরপর ধাপে ধাপে কান উৎসবে যোগ হতে থাকে বিভিন্ন ক্যাটগরির। ১৯৯৫ সালে অফিসিয়াল সেকশনের সংযোজন করা হয়। ২০০০ সালে গিল জ্যাকোবকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। আর ২০০২ সাল থেকে এ উৎসবের নামকরন করা হয় ‘ফেস্টিভাল ডি কানস’। এ বিশাল যাত্রায় কান উৎসবে এসেছে ভিন্ন মাত্রা। প্রতি বছরই বিশ্বের ফিল্মবোদ্ধারা উপহার দিচ্ছে নতুন নতুন সংযোজন। পুরনো সে সময়ের কান উৎসবের স্মৃতিচারন করে ৮১ বছর বয়সী চেয়ারম্যান গিল জ্যাকব বলেন, সে সময় কোন সংবাদ মাধ্যমকে দেখা যেতনা। আমরা নিজেরা নিজেদের কাছে খুব ভালোভাবে পরিচিত ছিলাম ৷ ছোট্ট একটা কলোনির মতই আমরা একে অন্যের সঙ্গে ৎড়িত ছিলাম। সিনেমার তারকারাও সহজেই সাধারণ মানুষদের মাঝে মিশে যেতেন৷ প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু বদলে গেছে। এখন এ উৎসব পুরো বিশ্বের কাছে পরিচিত। সে কান উৎসব এখন অনুষ্ঠিত হয় বিশাল পরিসরে । গেল বছরও বিশ্বের ২২ শে মে ৬৪ তম আন্তর্জাতিক কান চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন হয়। গত বছর সেরা পুরস্কার ‘গোল্ডেন পাম` জিতে নিল মার্কিন চলচ্চিত্রকার টেরেন্স ম্যালিক`এর ছবি ‘দ্য ট্রি অফ লাইফ`৷
কান চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দেয়ার জন্য বিশ্বের নামজাদা চিত্রনির্মাতা ও শিল্পীরা উন্মুখ হয়ে থাকেন৷ হলিউডের পাশাপাশি বলিউডের তারকাদের প্রতিক্ষায় থাকে এ উৎসবের। গত বছর ৩৩টি দেশের ৪৯ ছবি প্রদর্শিত হয়েছে উৎসবে৷ উডি অ্যালেনের লেখা ও পরিচালনায় নির্মিত ছবি ‘মিডনাইট ইন প্যারিস` ছবিটি দিয়ে উদ্বোধন করা হয় উৎসবের৷ মূল প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল ১৯টি ছায়াছবি৷ গত বছর সেরা পরিচালকের পুরস্কার জয় করে নেন ডেনিশ চিত্রনির্মাতা নিকোলাস ভিন্ডিং রেফিন তাঁর ‘ড্রাইভ` ছবির জন্য৷ শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার পেলেন ফরাসি অভিনেতা জঁ দুজারদঁ৷ ছবির নাম ‘দ্য আর্টিস্ট`৷ তিনি৷ সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার জয় করলেন হলিউড তারকা কার্সটেন ডান্সট, বিতর্কিত ড্যানিশ চলচ্চিত্রকার লার্স ফন ট্রিয়ের`এর ‘মেলানকলিয়া` ছবিতে অভিনয়ের জন্য৷ ইটালীয় চিত্র পরিচালক বারনার্দো বার্তোলুচ্চিকে সম্মানসূচক ‘গোল্ডন পাম` পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল।
এবারের উৎসব শুরু হয়েছে ১৬ মে বুধবার থেকে। প্রতি বছরের মতো এবারও জমকালো আয়োজনে ফ্রান্সের কান শহরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এ উৎসব। কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের এটি ৬৫তম আয়োজনের উৎসব চলবে আগামী ২৭ মে পর্যন্ত।
সেখান থেকে বাছাইকৃত সেরা ছবিগুলো প্রদর্শণ করা হবে উৎসবের এই ১২ দিন। প্রদর্শন করা ছবিগুলো থেকে জুরি বোর্ডের রায়ে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে পুরস্কার প্রদান করা হবে উৎসবের শেষ দিন ২৭ মে ।
এবার কান চলচ্চিত্র উৎসবের মূল প্রতিযোগিতার জন্য জমা পড়েছে এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা ও আফ্রিকার ১ হাজার ৭০০টি ছবি। সেখান থেকে বাছাইকৃত বিভিন্ন ক্যাটিগরির প্রায় ১৬০ টির মতো ছবি উৎসবে প্রদর্শিত হচ্ছে। হলিউড ও বলিউডের সব নামী দামী তারকারা কানের লাল গালিচার শোভা বর্ধন করতে প্রস্তুত আছেন ৷ এবারও নিকোল কিডম্যান, ব্র্যাড পিটের মত তারকাদের দেখা মিলবে কান উৎসবে৷ মাত্র একটি ছবি দেখিয়ে যে কান উৎসবের শুরু হয়েছিলো, যুগের পরিক্রমায় আজ সেটি এক বিশাল যজ্ঞে পরিণত হয়েছে৷
এবারের চলচ্চিত্র উৎসবের জুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ইতালিয়ান পরিচালক নেনি মরেটি। এছাড়াও জুরি বোর্ডে সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন- পেলিস্টিয়ান অভিনেত্রী-পরিচালক হিয়াম আব্বাস, ব্রিটিশ পরিচালক অ্যান্দ্রিয়া আর্নল্ড, ফ্রেঞ্চ অভিনেত্রী ইমানুয়্যেল ডিভোস, ফ্রেঞ্চ ফ্যাশন ডিজাইনার জিন পল গিল্টার, জার্মান অভিনেতা ডিয়ানি ক্রুগার, স্কটিশ অভিনেতা অ্যাওয়ান ম্যাকগ্রিজর, আমেরিকান পরিচালক আলেকজান্ডার পেনি এবং হাইতিয়ান পরিচালক রাওল পিক। এছাড়া আন-সারটেন ক্যাটিগরিতে জুরি বোর্ড প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন ব্রিটিশ অভিনেতা টিম রথ।
হলিউডের কিংবদন্তি অভিনেত্রী মেরিলিন মনরোর মৃত্যুর ৫০ বছর উপলক্ষে চলতি কান উৎসব কমিটি তার প্রতি বিশেষ সম্মান প্রদর্শণ করছে। এজন্য পুরো উৎসব ভেন্যুতে মেরিলিনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তার বেশ কিছু ছবি স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়াও এবারের উৎসবের আনুষ্ঠানিক পোস্টার করা হয়েছে রহস্যময়ী অভিনেত্রী মেরিলিন মনরোকে কেন্দ্র করে।
এবারের উৎসবের উদ্বোধনী ছবি হচ্ছে ‘মুনরাইজ কিংডম’। পরিচালক ওয়েস এন্ডারসনের এ ছবিটিতে রয়েছেন তারকা ব্রুস উইলিস এবং বিল মারে। এবার কমপিটিশন, আন সারটেইন রিগার্ড, আউট অফ কমপিটিশন, মিডনাইট স্ক্রিনিংস, ৬৫ এনিভারসিরি, স্পেশাল স্ক্রিনিংস, শর্ট ফিল্ম, সিনে ফাউন্ডেশন ক্যাটিগরিগুলোতে প্রায় ১৬০ টিরও বেশি ছবি প্রদর্শিত হবে।
এ বছরের কান চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা ছবির দৌড়ে অনেকের মতে এগিয়ে আছে কানাডীয় পরিচালক ডেভিড ক্রোনেনব্যার্গের ‘কসমোপোলিস’ ছবিটি। এতে প্রধান চরিত্র বিশাল ধনকুবেরের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ‘রবার্ট প্যাটিনসন’। কেউ কেউ আবার শিরোপা জয়ের দৌড়ে সম্ভাবনাময় হিসেবে মনে করছে অস্ট্রেলিয়ান পরিচালক এন্ড্রু ডোমিনিকের ‘কিলিং দেম সফটলি’ ছবিটিকে। এতে প্রধান চরিত্রের অভিনেতা ব্র্যাড পিট। এই দুই ছবির প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে ধরা হচ্ছে ব্রিটিশ পরিচালক কেন লোচের ‘দ্য এঞ্জেলস শেয়ার’ ছবিটিকে। সেরা ছবির দৌড়ে আরো রয়েছে অস্ট্রীয় পরিচালক মিশায়েল হানেকের রোমান্টিক ছবি ‘আমুর’। এবারের কান উৎসবে সমাপনী ছবি হিসেবে থাকছে ফরাসি পরিচালক ক্লোদ মিলারের ‘তেরেজ ডেকেরু’।
বাংলাদেশ সময় ১৬২০, মে ১৬, ২০১২ সম্পাদনা : বিপুল হাসান, বিভাগীয় সম্পাদক
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।