৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, শনিবার মে ১৮, ২০১৩ ৫:৫১ পিএম BDST banglanew24
14 Jun 2012   07:09:37 PM   Thursday BdST
E-mail this

কার্লোস ফুয়েন্তেস এর উপন্যাস

আউরা [পর্ব-৪]


অনুবাদ : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আউরা [পর্ব-৪] কার্লোস ফুয়েন্তেস এর উপন্যাস

আউরা [পর্ব-১],  [পর্ব-২], [পর্ব-৩]

চলে গেলেন লাতিন আমেরিকান খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক কার্লোস ফুয়েন্তেস। ১৫ মে দিনগত রাতে এই মেক্সিকান কথাসাহিত্যিকের জীবনাবসান ঘটে। তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। ফুয়েন্তেস ছিলেন আধুনিক স্প্যানিশ ভাষা ও সাহিত্যের মহান রূপকারদের একজন।

ফুয়েন্তেস জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৮ সালে পানামায়। তাঁর প্রথম বই ছিল একটি ছোটগল্প সংকলন, প্রকাশিত হয় ১৯৫৪ সালে। প্রথম উপন্যাস Where the Air is Clear প্রকাশিত হয় ১৯৫৮ সালে।
এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে ফুয়েন্তেসের ২০টির বেশি উপন্যাস,  বেশ কয়েকটি ছোটগল্প সংকলন ও নাটক। তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে— The Death of Artemio Cruz, The Old Gringo, The Crystal Frontier, Aura প্রভৃতি।

ফুয়েন্তেস বিশ্বের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কারই পেয়েছেন। এসবের মধ্যে রয়েছে স্প্যানিশ ভাষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সারভান্তেস সাহিত্য পুরস্কার। এছাড়া বহুবার নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের জন্য উঠে এসেছে তার নাম। কিন্তু নোবেল পুরস্কার তার ভাগ্যে জোটেনি।

ফুয়েন্তেসের ‘আউরা’ বেরিয়েছিলো ১৯৬২ সালে; আতঙ্ক, বিভীষিকা, সৌন্দর্য আর সংরাগে আশ্চর্যভাবে ভরপুর এই গা ছমছমে উপন্যাসটি রচনাকৌশলেও স্মরণীয়। একাধিকবার কার্লোস ফুয়েন্তেস তাঁর লেখায় মধ্যম পুরুষের জবানি ব্যবহার করেছেন, “সেকেন্ড পারসন ন্যারেটিভ” সামলানো যে কেমন কঠিন, অথচ সামলে ওঠবার পর তার আবেদন কোনোভাবেই কমে না।

বাংলানিউজের পাঠকদের জন্য ফুয়েন্তেসের সম্মানে প্রকাশ করা হলো তার উপন্যাস ‘আউরা’। অনুবাদ করেছেন কলকাতার বিখ্যাত অনুবাদক— মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

 

http://www.banglanews24.com/images/PhotoGallery/2012June/aura20120614191425.jpgযখন তুমি নিজেকে ছাড়িয়ে নাও, অবসন্ন, তার আলিঙ্গন থেকে, তুমি শুনতে পাও তার-প্রথম ফিশফিশ কথা : ‘তুমি আমার স্বামী।’ তুমি তাতে সায় দাও। সে তোমায় বলে ভোর হ’য়ে এলো এখন, তারপর তোমায় ছেড়ে চ’লে যায়, যাবার আগে ব’লে যায় সে আজ রাতে তার নিজের ঘরে তোমার জন্যে অপেক্ষা করবে। তুমি আবারও তাতে সায় দাও, তারপর ঘুমিয়ে পড়ো, পরম স্বস্তিতে, বোঝা নেমে গেছে এখন, সারা শরীর বাসনাশূন্য হ’য়ে আছে। এখনও শরীর জুড়ে ছড়িয়ে আছে আউরার শরীরের স্পর্শ, তার শিহরন, তার আত্মনিবেদন।

জেগে-ওঠা তোমার পক্ষে কঠিন হ’য়ে পড়ে। দরজায় বেশ কয়েকটা টোকা, আর, অবশেষে, তুমি বিছানা ছেড়ে নামো, একটু গোঙাও, এখনও আধেক ঘুমে লীন। আউরা, দরজার অন্য ধারে, তোমাকে বলে দরজাটা না-খুলতে : সে শুধু বলে যে সেনিওরা কোন্সুয়েলো তোমার সঙ্গে কথা বলতে চান, তিনি তাঁর ঘরেই তোমার জন্যে অপেক্ষা ক’রে আছেন।

দশ মিনিট পরে তুমি গিয়ে ঢোকো বিধবার উপাসনা ঘরে। তিনি ব’সে আছেন বালিশগুলোর গায়ে ঠেশ দিয়ে, নিশ্চল, তাঁর চোখ দুটো লুকিয়ে আছে ওই নির্মীলিত, কুঞ্চিত, মরণশুভ্র পল্লবের আড়ালে; তুমি লক্ষ ক’রে দ্যাখো তাঁর চোখের তলার ফুলে-ওঠা চামড়ার কুঞ্চনগুলি, তাঁর শরীরের চামড়ার পরম ক্লান্তিকে।

চোখ না-খুলেই তিনি তোমায় বলেন : ‘তোরঙ্গটার চাবি নিয়ে এসেছেন তো আপনি?’
‘হ্যাঁ, তা-ই তো মনে হচ্ছে... হ্যাঁ-হ্যাঁ, এই-যে।’
‘আপনি এবার দ্বিতীয় অংশটা পড়তে পারেন। ওই একই জায়গায় আছে সেটা। কাগজগুলো একটা নীল ফিতে দিয়ে বাঁধা।’

তুমি তোরঙ্গটার কাছে চলে যাও, এবারে একটু কেমন যেন বিবমিষা নিয়েই; তোরঙ্গটার চারপাশে কিলবিল করছে ইঁদুরগুলো, ভাঙাচোরা মেঝের ফাঁকফোকর থেকে তারা তাদের জ্বলন্ত চোখ পিট-পিট ক’রে তোমায় দেখছে, আর দেখেই হুড়মুড় ক’রে ছুটে পালাচ্ছে প’চে-যাওয়া দেয়ালটার গর্ত-ফোকরগুলোর দিকে। তুমি তোরঙ্গটা খোলো আর দ্বিতীয় দফার কাগজগুলো বার ক’রে নাও, তারপর ফিরে আসো বিছানার পায়ের দিকে। সেনিওরা কোন্সুয়েলো তার শাদা খরগোশটার গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। গলা অব্দি বোতাম আঁটা জামার তলা থেকে খড়খড়ে একটা বিচ্ছিরি হাসির শব্দ বেরিয়ে আসে, তিনি তোমায় জিজ্ঞেস করেন : ‘আপনি জন্তু জানোয়ার ভালোবাসেন?’
‘না, খুব-একটা বাসি না। হয়তো কোনোদিনই আমার কোনো পোষ্য ছিলো না ব’লে।’
‘তারা কিন্তু ভালো বন্ধু হয়। ভালো সঙ্গী। বিশেষ ক’রে আপনি যখন বুড়িয়ে গেছেন, আর একা আছেন, নিঃসঙ্গ।’
‘হ্যাঁ, তা নিশ্চয়ই হবে।’
‘তারা কিন্তু সবসময়েই শুধু তারাই, সেনিওর মোন্তেরো। তাদের কোনো ভড়ং-টড়ং নেই।’
‘তার নামটা যেন কী বলেছিলেন আপনি?’
‘ওই খরগোশের? সে হ’লো সাগা। ভারি বুদ্ধিমতী, এই সাগা। সে শুধু তার স্বজ্ঞার বশেই চলে। সে স্বাভাবিক, স্বাধীন।’
‘আমি ভেবেছিলুম খরগোশটা বুঝি পুরুষ।’
‘তা-ই বুঝি? তাহ’লে আপনি এখনও তফাৎটুকু ধরতে পারেন না।’
‘না, মানে, সবচেয়ে জরুরি বিষয় হ’লো যে সে আছে ব’লে আপনি নিজেকে একেবারে একা ব’লে ভাবেন না।’
‘তারা কিন্তু চায় যে আমরা যেন একাই হ’য়ে পড়ি, সেনিওর মোন্তেরো, কারণ তারাই আমাদের বলে যে সাধুত্ব অর্জন করার একমাত্র উপায় হ’লো এই নিঃসঙ্গতা। তারা ভুলে যায় যে নিঃসঙ্গতার মধ্যে লোভ বা লালসা আরো বহু গুণ বেড়ে যায়।’
‘আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, সেনিওরা।’
‘আহ্, আপনি যে বুঝতে পারেননি সেটাই বরং ভালো। এখন তাহ’লে গিয়ে কাজে লেগে পড়ুন, দোহাই।’
তুমি তাঁর দিকে পেছন ফেরো, দরজার দিকে হেঁটে যাও, ছেড়ে আসো তাঁর ঘর। হলওয়েতে এসে তুমি দাঁত কিড়মিড় করো। তোমার এই সৎসাহসটুকু নেই কেন যে তুমি তাঁকে ব’লে দিতে পারছো না তুমি এই তরুণীটিকে ভালোবাসো! কেন তুমি ওই ঘরটায় ফিরে গিয়ে তাঁকে সোজাসুজি শেষ কথাটা ব’লে দিতে পারছো না যে তুমি তোমার হাতের কাজটা শেষ হ’য়ে গেলেই আউরাকে সঙ্গে নিয়ে এখান থেকে চ’লে যাবে? তুমি আবার দরজাটার দিকে এগিয়ে যাও, দরজাটা ঠেলে খুলতে শুরু করো, এখনও একটু দ্বিধা আছে তোমার, অনিশ্চিতভাব, আর দরজার পাল্লার ফাঁক দিয়ে তুমি দেখতে পাও সেনিওরা কোন্সুয়েলো দাঁড়িয়ে আছেন এখন খাড়া, সটান, রূপান্তরিত, সামরিক একটা উর্দি তাঁর হাতে : নীল একটা উর্দি, সোনার বোতামের সার, লাল স্কন্ধভূষণ, মাথায় মুকুটপরা ঈগল— উজ্জ্বল সব পদক— এমন-এক উর্দি যেটাকে ওই বৃদ্ধা হিংস্রভাবে দাঁতে ঠেকান, মমতায় ভ’রে গিয়ে চুমো খান, তাঁর কাঁধে সেটাকে সাজিয়ে রেখে তিনি টলোমলো ক’রে নাচের তালে-তালে কয়েকবার পা ফ্যালেন। তুমি দরজাটা বন্ধ ক’রে দাও।

‘যখন তার সাথে আমার দেখা হয়, মেয়েটির বয়েস ছিলো পনেরো,’ স্মৃতিকথার দ্বিতীয় অংশ তুমি পড়তে থাকো। কোন্সুয়েলোর সবুজ দুটি চোখ, কোন্সুয়েলো ১৮৬৭ তে যার বয়েস ছিলো মাত্র পনেরো, যখন হেনেরাল ইয়োরেন্তে তাকে বিয়ে করেন আর নিজের সঙ্গে তাকে নিয়ে যান পারী, নির্বাসনে। কোন-এক প্রেরণার মুহূর্তেই তিনি লিখেছিলেন, যে-বাড়িটায় তাঁরা থাকতেন, সেটাকে তিনি বর্ণনা করেছিলেন, বর্ণনা করেছেন কোথায়-কোথায় বেড়াতে গিয়েছেন— সব সফর, সব নাচ, সব কোচবাক্স, দ্বিতীয় সাম্রাজ্যের জগৎটাতেই, কিন্তু সবই কেমন যেন নিস্প্রাণভাবে। একদিন তিনি দেখেছিলেন সেই কিশোরী একটা বেড়ালকে যন্ত্রণা দিচ্ছে : দুই ঠ্যাঙের মাঝখানে চেপে রেখেছে তাকে, তার শক্ত ফোলানো ঘাঘরাটা ওপরে ওঠানো, এদিকে তিনি ভেবেই পাচ্ছেন না কী করে মেয়েটির দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন।  

তুমি হিসেবটা করে ফেলেছো এখন : সেনিওরা কোন্সুয়েলোর বয়েস এখন হবে, নিশ্চয়ই, একশো নয়। তাঁর স্বামী মারা গিয়েছিলেন ঊনষাট বছর আগে। তিনি সবসময়েই সবুজ পোশাক পরনে। সব সময়েই অপরূপা, সুন্দরী, এমনকী একশো বছর পরেও।  

৪.

এখন তাহ’লে তুমি তো জেনে গেলে আউরা কেন এই বাড়িতে আছে; ওই বেচারি, আধপাগল বুড়ি মহিলার মধ্যে রূপযৌবনের বিভ্রমটা চিরকালের জন্যে বাঁচিয়ে রাখবে ব’লে। আউরা, তাকে এখানে রাখা হয়েছে কোনো আয়নার মতো, যেন সেই দেবধামের দেয়ালের কুলুঙ্গিতে রাখা আরো-একটি দেবপ্রতিমার মতো, যেখানে জড়াজড়ি ক’রে আছে কত রকমের নৈবেদ্য, সুরক্ষিত সব হৃৎপিণ্ড, কাল্পনিক সব সাধুসন্ত আর দানোরাক্ষস; সেখানেই যোগ হয়েছে এই মায়ামুকুর— আউরা।

তুমি পাণ্ডুলিপিটা সরিয়ে রেখে নিচের তলায় নেমে আসো, তোমার আন্দাজ তোমার সন্দেহ সকালবেলায় আউরা শুধু একটিমাত্র জায়গাতেই থাকতে পারে— ঠিক যে-জায়গাটা লোভাতুর ওই বুড়ি মহিলাটি তার জন্যে নির্দিষ্ট ক’রে দিয়েছে।

হ্যাঁ, তাকে তুমি রসুইখানাতেই পেয়ে যাও, যে-মুহূর্তে সে একটা কচি পাঁঠার মুণ্ডু জবাই করেছিলো : যে-ভাপ উঠে আসে ছিন্ন খোলামেলা গলনালী থেকে, ছড়িয়ে-পড়া রক্তের গন্ধ, জন্তুটার দুই চোখের চকচকে আস্তর, সব তোমাকে বমি পাইয়ে দিল। আউরা প’রে আছে, শতছিন্ন রক্তমাখা একটা জামা আর তার কেশপাশ এলোমেলো হ’য়ে আছে, সে তোমার দিকে তাকায়, এমনভাবে তাকায় যেন তোমাকে চিনতেই পারেনি, আর তার ওই কশাইগিরি নিয়েই ব্যস্ত হয়ে থাকে।

তুমি রসুইঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসো : এবারে সত্যি গিয়ে ওই বৃদ্ধার সঙ্গেই কথা বলবে, সত্যিই তাঁর মুখের ওপর ছুঁড়ে মারবে তাঁর লোভলালসা আর অত্যাচারের চেহারাটা। যখন তুমি দরজাটা ঠেলে খোলো তিনি তখন দাঁড়িয়েছিলেন আলোর সেই গুণ্ঠনের আড়ালে, শূন্য হাওয়া নিয়েই পালন করছিলেন কোনো-এক শাস্ত্রাচার, একটা হাত সামনে বাড়ানো মুঠোকরা, যেন কিছু-একটা তুলে ধ’রে আছে শূন্যে, অন্য হাতটা আঁকড়ে আছে কোনো অদৃশ্য বস্তু, যেটা বারে-বারে ঠুকে মারছেন একই জায়গায়। তারপর তিনি তাঁর হাত দুটি মোছেন তাঁর বুকে, দীর্ঘশ্বাস ফ্যালেন, আর ফের হাওয়াকেই ফালা-ফালা ক’রে কাটতে থাকেন, যেন— হ্যাঁ-হ্যাঁ, তুমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছো এখন— যেন কোনো জন্তুর গা থেকে ছালচামড়া ছাড়িয়ে নিচ্ছেন...

তুমি হলওয়ে, বৈঠকখানা আর খাবার ঘর দিয়ে ছুটে চ’লে যাও, চ’লে যাও সেখানে যেখানে আউরা কচি পাঁঠাটার ছাল ছাড়াচ্ছে, নিজের কাজেই সম্পূর্ণ তন্ময়, তোমার প্রবেশ কিংবা তোমার প্রলাপ— কিছু সম্বন্ধেই তার কোনো হুঁশ নেই, এমনভাবে সে তোমার দিকে তাকিয়ে আছে যেন তুমি হাওয়া দিয়ে তৈরি কোনোকিছু।

তুমি সিঁড়ি বেয়ে উঠে যাও তোমার ঘরের দিকে, পাল্লা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ো, দরজার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকো যেন তুমি ভয় পাচ্ছ এক্ষুণি তোমার পেছন-পেছন তোমায় অনুসরণ ক’রে কেউ-একজন এসে ঢুকবে। হাঁফাচ্ছো তুমি, ঘেমে নেয়ে যাচ্ছ, তোমার বিভীষিকা তোমার নিশ্চয়জ্ঞানের বলি। যদি কেউ বা কিছু ঘরে ঢোকবার চেষ্টা করে, তুমি তাহ’লে তাকে ঠেকাতেই পারবে না, তুমি তাহলে দরজা থেকে সরে আসবে, তুমি ঘটনাটাকে ঘটতে দেবে। উদ্বেগে শঙ্কায় উদ্বেল হ’য়ে তুমি আরাম কেদারাটাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে আসো ওই খিলবিহীন দরজায়, ঠেলে তার গায়ে ঠেকিয়ে রাখো খাটটা, অবসন্ন, তোমার ইচ্ছাশক্তি তোমার দেহ থেকে গলগল ক’রে বাইরে বেরিয়ে গেছে; তোমার চোখ দুটি বোজা, আর তোমার দুই হাত আঁকড়ে জড়িয়ে আছে তোমার বালিশ— যে-বালিশটা তোমার নয়। কিছুই তো তোমার নয়।

হতবুদ্ধি হতচেতন তুমি প’ড়ে যাও অভিভূত দশায়, কোনো-এক স্বপ্নের গহন গভীরে তোমার একমাত্র উদ্ধারের পথ যেটা, মাথা খারাপদশাকে না বলবার একমাত্র উপায় তোমার। ‘উন্মাদিনী, পাগলিনী,’ তুমি বারে-বারে আওড়াও নিজেকে ঘুম পাড়িয়ে দেবার জন্যে, আর মনশ্চক্ষুতে বারে-বারে তুমি তাঁকে দেখতে পাও তিনি কাল্পনিক, ছাগলছানাটির চামড়া ছাড়াচ্ছেন কাল্পনিক একটি ছুরি দিয়ে। ‘উন্মাদিনী ইনি, পাগলিনী।’


অন্ধকার পাতালের গহনে, তোমায় এই বোবা স্বপ্নে, যেখানে তার মুখ খুলে আছে স্তব্ধতায়, তুমি দেখতে পাও তিনি তোমার দিকেই এগিয়ে আসছেন ওই অন্ধকার খাদ থেকে, তুমি দেখতে পাও তিনি বুকে হেঁটে আসছেন তোমারই দিকে।

স্তব্ধতায়, তাঁর রক্তমাংসহীন হাত দুটি নাড়িয়ে, তোমার দিকেই আসছেন যতক্ষণ-না তাঁর মুখ ছোঁয় তোমার মুখ আর তুমি দেখতে পাও বৃদ্ধাটির রক্তাক্ত মাড়ি, তাঁর দন্তহীন মাড়ি, আর তুমি আঁতকে চিৎকার ক’রে ওঠো আর তিনি চ’লে যান আবার, তাঁর হাত দুটি নেড়ে, তাঁর রক্তমাখা এপ্রনে যা তিনি ব’য়ে এনেছিলেন সেই হলদে দাঁতগুলি তিনি বীজের মতো বুনে-বুনে দেন সেই গহন খাদে।
তোমার ওই আর্তচিৎকার আউরারই এক প্রতিধ্বনি, সে দাঁড়িয়ে আছে তোমারই সামনে তোমার স্বপ্নের মধ্যে, আর সে আর্ত চেঁচিয়ে উঠেছে যেহেতু কারও-একজনের হাত ছিঁড়ে দুই ফালা ক’রে দিয়েছে তার তাফতার সবুজ ঘাঘরা, আর তারপর সে তার মুখ ফেরায় তোমার দিকে তার দুই হাতে তার ছেঁড়া ঘাঘরাটার দুই ফালি। তোমার দিকে ফেরে সে আর শব্দ না-ক’রে হাসে, তার নিজের দাঁতের পাটির ওপরই চেপে বসিয়ে দিয়েছে কেউ ওই বুড়ি মাহিলার দাঁত, আর সেই ফাঁকে তার দুই পা, তার দুই নগ্ন পা টুকরো-টুকরো হ’য়ে যায় আর উড়ে-উড়ে চ’লে যায় ওই পাতালেরই দিকে...

দরজায় একটা টোকা, তারপর ঘণ্টার আওয়াজ, রাতের খাবারের জন্যে ডাক। তোমার মাথাটা এমন ধ’রে আছে এমন ব্যথা করছে যে তুমি ঘড়ির কাঁটাগুলি অব্দি দেখে উঠতে পারো না, তবে তুমি ঠিক জানো এ নিশ্চয়ই অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। তোমার মাথার ওপরে তুমি স্কাইলাইটেরও ওপাশে দেখতে পাও রাতের মেঘগুলি। তুমি কোনোরকমে কষ্ট ক’রে উঠে পড়ো, অভিভূত, বিমূঢ়, ক্ষুধার্ত। তুমি কলের তলায় ধরে রাখো কাচের কুঁজোটা, অপেক্ষা করো জল পড়ার, কখন তা উপচে ওঠে ঘড়াটায়, তারপর ঘড়ার জলটা তুমি ঢেলে দাও বেসিনে। তুমি তোমার মুখ ধোও, তোমার দাঁত মাজো ওই খ’য়ে যাওয়া দাঁত মাজার বুরুশ দিয়ে যার গায়ে দলা পাকিয়ে আছে সবজে দাঁতের মাজন, তোমার চুল ভিজিয়ে নাও— তুমি খেয়ালও করো না যে তুমি এসব নিত্য কর্ম সারছো ভুল অনুক্রমে, ভুল পর্যায়ে— ডিমের ছাদের আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে তুমি নিখুঁতভাবে আঁচড়ে নাও তোমার চুল, যে-আয়নাটা লাগানো আছে আখরোট কাঠের ওয়ার্ডরোবের পাল্লার গায়ে। তারপর তুমি গলায় প’রে নাও তোমার গলবন্ধ, গায়ে চড়াও তোমার জ্যাকেট, আর নিচে নেমে চ’লে যাও ফাঁকা খাবার ঘরটায়, যেখানে শুধু একটাই আসন সাজিয়ে পাতা আছে— তোমার।

তোমার রেকাবিটার পাশেই, তোমার ন্যাপকিনের তলায়, প’ড়ে আছে এমন-এক জিনিস যার গায়ে হাত বুলিয়ে তুমি আদর করতে শুরু ক’রে দাও— একরত্তি কাপড়ে তৈরি পুতুল, যেটা ভ’রে আছে এমনসব গুঁড়োয় যা তার বাজেভাবে শেলাই করা কাঁধ দুটি থেকে ঝ’রে পড়ছে, তার মুখটা আঁকা হয়েছে চিনে কালিতে, তার শরীরটা উদোম, দু-একটা বুরুশের টানে আঁকা। তুমি ওই ঠাণ্ডা খাবার খেতে শুরু ক’রে দাও— মেটে, টোম্যাটো, লাল মদ— তোমার ডান হাত দিয়ে, আর বাম হাতে তুমি ধ’রে থাকো ওই ছেঁড়াকাপড়ের বান্ডিলে বানানো পুতুল।

যান্ত্রিকভাবেই তুমি খেয়ে চলো, গোড়ায় তুমি খেয়ালই করনি যে নিজে তুমি কেমন সম্মোহিত দশার মধ্যে আছো, কিন্তু পরে তুমি যুক্তির একটু আভাস পেলে তোমার অমন দুঃসহ ঘুমের কারণের, তোমার দুঃস্বপ্নেরও, আর শেষটায় তুমি তোমার ঘুমের ঘোরে চলাফেরার ধরনের সঙ্গে তুমি মিল খুঁজে পেলে আউরা আর সেনিওরা কোন্সুয়েলোর, প্রায় একই ভঙ্গি এই স্বপ্নচালিত হাঁটাচলার। আচমকা ওই বিচ্ছিরি ছোট্ট পুতুলটা তোমায় তীব্র এক বিরাগে ভরিয়ে দিলে, যার মধ্যে তুমি সন্দেহ করতে শুরু করলে গোপন এক অসুখ, এক সংক্রমণ। তুমি সেটাকে মেঝেয় প’ড়ে যেতে দিলে। তুমি তোমার ঠোঁট মুছলে ন্যাপকিন দিয়ে, তাকালে তোমার হাতঘড়িটার দিকে, আর তোমার মনে প’ড়ে গেলো যে আউরা তার ঘরে তোমার জন্য প্রতীক্ষা ক’রে আছে।

তুমি সন্তর্পণে সেনিওরা কোন্সুয়েলোর ঘরের দরজা অব্দি গেলে, কিন্তু ভেতরে টু শব্দটিও নেই। তুমি আবার তোমার ঘড়ির দিকে তাকালে, সবে নটা বেজেছে। তুমি ঠিক করলে অন্ধকারেই হাতড়ে-হাতড়ে ওই অন্ধকার ছাদের তলার পাতিওটা অব্দি যাবে, সেই যখন তুমি এ-বাড়ি এসে প্রথম ঢুকেছিলে তারপর থেকে কখনোই ওই পাতিওয় আর তুমি যাওনি, যেদিন তুমি এখানে এসে পৌঁছেছিলে তখনও তো কিছুই তুমি দ্যাখোনি।

বাংলাদেশ সময় ১৮৩৭, জুন ১৪, ২০১২
সম্পাদনা : ফেরদৌস মাহমুদ, শিল্প-সাহিত্য সম্পাদক

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
VISA Center Inc
Holy Hajj BD
RehabHousing.com

শিল্প-সাহিত্য

8877
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান