 |
| ছবি: বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
খুলনা: পুঁজিবাজারে ধারাবাহিক দরপতন ও বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতায় খুলনা ১ বছরে ৩০ হাজার বিনিয়োগকারী বাজার ছেড়েছেন। ফলে, এখানকার ব্রোকারেজ হাউজে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কমে গেছে।
বাংলানিউজের বিশেষ অনুসন্ধানীতে জানা যায়, দেশের পুঁজিবাজারে ভয়াবহ ধসের আগে বিনিয়োগ করে যাদের পুঁজি আটকে গেছে তারা এখনও উত্তোরণের পথ খুঁজে পাচ্ছেন না। ধসের পর পুঁজিবাজারে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে না আসায় নতুন করে বিনিয়োগের পথও সংকুচিত হয়েছে।
ইতোমধ্যে অনেকে সমন্বয় করে লোকসান কমিয়ে আনতে গিয়ে আরও বেশি লোকসানে পড়েছেন। এর ফলে ধীরে ধীরে বাজারে সক্রিয় বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কমছে।
জানা যায়, শিল্পনগরী খুলনায় ডিএসই ও সিএসইর অধীনে ২০টি ব্রোকারেজ হাউজে ১ বছর আগেও ২ লাখের বেশি বিনিয়োগকারী ছিলেন। যাদের মধ্যে ছিলেন চিংড়ি ব্যবসায়ী, পাট ব্যবসায়ী, গৃহিনী, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, চিকিৎসক এমনকি সরকারি বেসরকারি চাকরিজীবী।
যারা প্রতিদিনই হাউজে এসে লেনদেন করতেন। ফলে, তিল পরিমাণ জায়গা থাকতো না ব্রোকারেজ হাউজগুলোতে। এসব বিনিয়োগকারী প্রতিদিন প্রায় ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা লেনদেন করতেন।
ভয়াবহ দরপতনের কারণে আজ সেখানে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ও লেনদেন অর্ধেকে নেমে এসেছে। যে হাউজগুলোতে বিনিয়োগকারীদের বসার জায়গা থাকতো না, সেখানে এখন অনেকটা সুনসান নীরবতা দেখা যায়।
খুলনা ইনভেস্টরস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওয়াদুদ ডাকুয়া বাংলানিউজকে জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত খুলনার ৩০ হাজার বিনিয়োগকারী বাজার ছেড়েছেন। কেননা দফায় দফায় দরপতনের কারণে এখানকার দুই-তৃতীয়াংশ বিনিয়োগকারী তাদের পুঁজির অর্ধেক বা দুই-তৃতীয়াংশ হারিয়ে এখন হা-হুতাশ করছেন।
তিনি আরও জানান, পুঁজিবাজারে ভয়াবহ ধসে খুলনার লক্ষাধিক বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে যারা স্বল্পপুঁজি ও ঋণ নিয়ে এ ব্যবসা করতেন বর্তমানে তাদের অবস্থা খুবই করুণ। তারা না পারছেন ঋণ পরিশোধ করতে, না পারছেন অর্থের অভাবে অন্য ব্যবসা করতে। ফলে, এখানকার কয়েক হাজার বিনিয়োগকারী বেকার হয়ে পড়েছেন।
খুলনা বিনিয়োগকারী স্টুডেন্ট ফোরামের আহ্বায়ক মাসুম হোসেন মাহিন বাংলানিউজকে জানান, দরপতনের কারণে এখানকার হাজার হাজার বিনিয়োগকারী পুঁজি হারিয়ে মার্জিন ঋণের বোঝা ঘাড়ে বইছেন। যাদের প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান।যেকারণে ওই সব বিনিয়োগকারীদের অনেকেই এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।
বাজার ছেড়েছেন এমন এক বিনিয়োগকারী মো. আল-আমীন বাংলানিউজকে জানান, বেকারত্বের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেছিলেন। দীর্ঘ দরপতনে পুঁজি হারিয়ে তিনি এখন অনেকটাই নিঃস্ব।
তিনি আরও জানান, দীর্ঘ ১ বছর ভালো বাজারের অপেক্ষায় থেকে থেকে তিনি কোনো ফল না পাওয়ায় এখন অন্য ব্যবসা করছেন।
আইল্যান্ড ব্রোকারেজ হাউজের খুলনা শাখার ব্যবস্থাপক তাপস কুমার সাহা বাংলানিউজকে জানান, পুঁজিবাজারে দীর্ঘ সময় ধরে মন্দাভাব অব্যাহত থাকায় বিনিয়োগকারীরা বেকার হয়ে পড়েছেন। দরপতনে পুঁজি হারিয়ে তারা এখন অর্থকষ্টে ভুগছেন। না পারছেন বলতে, না পারছেন সইতে। এ অবস্থায় ক্ষোভে-দুঃখে বিনিয়োগকারীরা এ ব্যবসা থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছেন।
তিনি আরও জানান, মূল পুঁজি হারিয়ে বিনিয়োগকারীরা একদিকে যেমন অন্য ব্যবসা করতে পারছেন না অন্যদিকে খুলনায় বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় তারা পড়েছেন উভয় সংকটে।
সিনহা ব্রোকারেজ হাউজের খুলনা শাখার কর্মকর্তা মো. এজাজ বাংলানিউজকে জানান, এক বছর ধরে বিনিয়োগকারীর বাজার নিয়ে কোনো আশার খবর পাচ্ছেন না। বরং অনেকে বাজার আরও খারাপ হবে এমন কথা বলছে। যে কারণে অতিরিক্ত লোকসানের ভয়ে অনেক বিনিয়োগকারী শেয়ার বিক্রি করে বাজার ছাড়ছেন।
তিনি আরও জানান, চলতি মাসে কয়েকদিন ধরে অনেক বিনিয়োগকারী তাদের পোর্টফোলিওতে থাকা সব শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছেন।
এদিকে, বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, আস্থার সঙ্কট পুঁজিবাজার বিপর্যয়ের প্রধান কারণ। সমস্যার মূল জায়গায় সমাধান না হলে এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। কারণ পুঁজিবাজারে প্রধান যে দুটি জিনিস প্রয়োজন তার কোনোটাই উপস্থিত নেই। একটি তারল্য অন্যটি বাজারের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা। এ ক্ষেত্রেও বর্তমান অবস্থা প্রতিকূল।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের বাজারমুখী করা প্রসঙ্গে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ডিসিপ্লিনের প্রফেসর ড. সাইফুল ইসলাম বাংলানিউজকে জানান, বাজার উন্নয়নে সরকার বা নিয়ন্ত্রক সংস্থা এ পর্যন্ত অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু তার বেশিরভাগই বাস্তবায়ন হয়নি।
তিনি মনে করেন, এসব পদক্ষেগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করতে পারলে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগকারীরা আবারও বাজারমুখী হবেন।
তিনি আরও জানান, পুঁজিবাজার ধসে পরাজিত এসব বেকার বিনিয়োগকারীদের ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সুদ মওকুফ করার কথা থাকলেও এখানকার অনেকেই সে সুবিধা পাননি। তাদের যদি সুদ মওকুফ করা হলে অনেকে এ ব্যবসায় থাকার চেষ্টা করবেন।
বাংলাদেশ সময়: ০৪৫৪ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ২১, ২০১২
সম্পাদনা: প্রভাষ চৌধুরী, নিউজরুম এডিটর