 |
একদিন এক জুমিয়া ওচাইয়ের কাছে গেল। ওচাই হলো গ্রামের পুরোহিত। জুমিয়া ওচাইয়ের কাছে একটি মন্ত্র শিখতে চাইল। প্রথমে ওচাই জুমিয়াকে মন্ত্র শেখাতে রাজি হলো না। কিন্তু নাছোড়বান্দা জুমিয়ার অনুরোধ ওচাই তাকে একটি মন্ত্র শিখিয়ে দিল। ওচাই জুমিয়াকে বলল, এই মন্ত্র পড়ে তুমি সব কাজ অনায়াসে করাতে পারবে। এক হাজার বার মন্ত্র পড়লেই একটি ভূত এসে হাজির হবে। সে তোমার সব কাজ করে দেবে। একথা শুনে জুমিয়া খুব খুশি হলো। মন্ত্রটা সে ভালোভাবে শিখে নিল। আর ওচাইকে অনেক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানিয়ে বাড়িতে চলে গেল।
এর মধ্যে অনেক দিন গেল, মাস গেল। নদীতে অনেক জল গড়াল। একদিন জুমিয়া ভাবল, মন্ত্রের ক্ষমতা একবার পরীক্ষা করেই দেখা যাক। যেই ভাবনা সেই কাজ। সে এক হাজার বার মন্ত্র পড়ে যেই শেষ করল আর অমনি কিম্ভুতকিমাকার আর অদ্ভুত রাগী একটা ভূত এসে হাজির হলো। ভূত বলল, প্রভু আজ থেকে আমি আপনার ভৃত্য। হুকুম করুন মালিক, আমি আপনার জন্য কী করতে পারি? ভূত আরও বলল, বিন্দুমাত্র সময় ক্ষেপণ না করে আপনার সব আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করব। কিন্তু একটা শর্ত আছে। আপনি যদি আমাকে কাজ দিতে ব্যর্থ হন, তবে আমি আপনার ঘাড় মটকাব।
জুমিয়া ভাবল, ভূতের আবার শর্ত! ওসব নিয়ে তার চিন্তা-ভাবনা করার দরকার নেই। সে ভূতকে এত কাজ দিবে যে ও সবসময় ব্যস্ত থাকবে। জুমিয়া ভূতকে বলল, তোমার শর্তে আমি রাজি। এখন যাও, প্রথমে আমার জুমক্ষেতে ভালোভাবে পরিষ্কার করো।
জুমিয়া ভাবল, ওর বিশাল জুমক্ষেত পরিষ্কার করতে হয়ত ভূতের অনেক দিন লেগে যাবে। কিন্তু একি! কিছুক্ষণ পর ভূত জুমিয়ার সামনে এসে হাজির হলো।
ভূত বলল, জুমক্ষেতের কাজ শেষ। এবার কী কাজ করব? হুকুম করুন মালিক।
ওকে দেখে, ওর কথা শুনে জুমিয়া হতভম্ব হয়ে গেল। জুমিয়াকে ভূত বলল, আমাকে অন্য আরেকটি কাজ দিন।
জুমিয়া বলল, মাঠে যাও। মাঠ থেকে সব বাঁশ আর গাছগুলো তুলে ফেল।
ভূত তৎক্ষণাৎ অদৃশ্য হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে এলো। এসেই সে জুমিয়াকে বলল, কাজ শেষ। সে জুমিয়াকে আরেকটি কাজ দিতে বলল।
জুমিয়া বলল, যাও, আমার জুমক্ষেত থেকে বড় সড়ক পর্যন্ত একটা সড়ক তৈরি করো।
ভূত এই কাজটিও নিমিষে করে ফেলল। মুহূর্তের মধ্যে আবার এসে হাজির হলো। তারপর জুমিয়াকে বলল আরো কাজ দিতে।
জুমিয়া একটা পর একটা কঠিন কাজ দিতে লাগল। কিন্তু বিস্ময়কর হলো ভূত সব কাজ মহূর্তের মধ্যেই শেষ করে ফেলে। জুমিয়া এই ভেবে চিন্তিত হয়ে পড়ল, কীভাবে একটি কাজ দিয়ে ভূতকে অনেকক্ষণ ব্যস্ত রাখা যায়। অনেক ভেবে-চিন্তে সে ভূতকে বলল, এবার আমি তোমাকে খুব সহজ একটি কাজ দিব।
ভূত বলল, দয়া করে কাজের কথাটি বলুন প্রভু।
জুমিয়া বলল, শোনো, আমার একটি প্রিয় কুকুর আছে। কিন্তু এর লেজ সব সময় বেঁকে থাকে। ওর বাঁকা লেজ আমার পছন্দ নয়। তুমি কুকুরের লেজটি সোজা করে দাও। ভূত বলল, এটা খুবই সহজ কাজ। আমি এখনই করে দিচ্ছি।
এবার জুমিয়া কাজের সঙ্গে একটি শর্ত জুড়ে দিল। জুমিয়া বলল, কিন্তু তুমি যদি কুকুরটির লেজ সোজা করতে ব্যর্থ হও তবে আমার কুকুরটি তোমাকে কামড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবে।
ভূত বলল, চিন্তা করবেন না প্রভু। এরকমটি কখনোই ঘটবে না।
ভূত অদৃশ্য হয়ে গেল। সে কুকরটি খুঁজতে লাগল। কুকুরটি খুঁজে পেয়ে সে দুই হাত দিয়ে কুকুরের লেজটি ধরে সোজা করে ফেলল। কিন্তু যেই সে লেজটি ছেড়ে দিল অমনি আবার তা বাঁকা হয়ে গেল। তারপর ভূত দড়ি দিয়ে লেজটাকে সোজা করে বেঁধে রাখল। কিছু দিন এ অবস্থায় রেখে দিল। তারপর যেই বাঁধন খুলে দিল অমনি আবার লেজটি আগের মতো বাঁকা হয়ে গেল। ভূত তখন একটা বাঁশের চোঙ এনে লেজটি তাতে ঢুকিয়ে রাখল। কিন্তু যেই ভূত চোঙ থেকে লেজটি বের করল অমনি তা আবার আগের মতো হয়ে গেল। কুকুরটির লেজ সোজা রাখতে না পেরে ভূত এবার খুব ভয় পেয়ে গেল। জুমিয়ার শর্ত মনে পড়ল তার। সে এই কাজ করতে না পারলে কুকুরটি তাকে কামড়ে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবে। তাই সে কুকুরের ভয়ে ভীত হয়ে পড়ল। ভয়ে সে দৌড়ে পালাল। তারপর আর কখনো ফিরে আসেনি।
এরপর থেকে তারা বিশ্বাস করে, ভূত সব সময় কুকুরকে ভয় পায়।
বি. দ্র :-- গল্পটি Tripura State Tribal Cultural Research Institute & Museum, Government of Tripura-এ প্রকাশিত D. K. Tyagi এর Tribal Folk Tales of Tripura বই থেকে নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ সময় ১৪৩০, জুন ৪, ২০১২
সম্পাদনা : ফেরদৌস মাহমুদ, শিল্প-সাহিত্য সম্পাদক