 |
গত কয়েকদিন ধরে ধারাবাহিকভাবে সংসদ সদস্য হাসানুল হক ইনুর সাক্ষাৎকার বাংলানিউজের বদৌলতে পড়ার সুযোগ হয়েছে। বাংলানিউজকে সেজন্য ধন্যবাদ, মোটামূটি সেন্সরবিহীন অবস্থায় হাসানুল হক ইনুর সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করার জন্য। ধন্যবাদ এই কারণে, এই ধরনের সাক্ষাৎকার প্রকাশের মাধ্যমে জনগণ চলমান নেতৃত্ব সম্পর্কে একটা স্বচ্ছ ধারণা লাভ করার সুযোগ পায়। একইসাথে সরকারের অন্তর্নিহিত নানান খুঁটি-নাটি বিষয় সম্পর্কেও জনগণ জানতে পারে। বাংলানিউজের সাংবাদিক বন্ধুরাও সমাজের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা ও নিরবচ্ছিন্ন সেবা প্রদানের ক্ষেত্রেও আরো একধাপ এগিয়ে যান বলে মনে হয়।
বাংলানিউজের যারা সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন, তারা শুরুতেই লিখেছেন হাসানুল হক ইনু চৌকস রাজনীতিবিদ। চৌকস কিনা জানি না, তবে বোধহয় অঘটন-ঘটন পটিয়স বললে আরো বেশি মানানসই হতো। মহাজোট সরকারের শরিক হিসেবে অবশ্যই তিনি এবং তার দল সরকারের অংশ, সুতরাং সরকারের সাফল্য, ব্যর্থতার সমান অংশীদার তিনি এবং তার দল। এই দায়-দায়িত্ব কতিপয় শব্দের মার-প্যাঁচ দিয়ে এড়ানো যাবে না।
আমাদের সবচাইতে দুর্ভাগ্য যে, আমাদের নেতা-নেত্রীরা জনগণের কাছে জবাবদিহি বেশ ভালোভাবেই এড়িয়ে চলেন বা বলা যায় এক্ষেত্রে তারা সবচাইতে স্বাধীন। যেন তাদের কাজের কথা জিজ্ঞেস করার কেউ এখানে আর বর্তমান নেই। না হলে এতো রক্তপাত আর এতো আন্দোলনের পর আমাদের যে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে উঠলো বা আমরা যার চর্চা করে চলেছি, তাকে সকল কাজের কেন্দ্রবিন্দু করার ক্ষেত্রে কেউই কোনো ব্যবস্থা বা উদ্যোগ নেননি, বরং একে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে নিজে পার পাওয়ার চেষ্টা করেন।
আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে সঠিক বক্তব্য তুলে ধরার পাশাপাশি এর বিকল্প কিংবা সরকারের নিজের সৃষ্ট সমস্যা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা বা উপদেশ তুলে ধরাইতো একজন সাংসদের কাজ। সাংসদ যেমন আইন-প্রণয়নে ভূমিকা রাখবেন, তেমনি সরকারের ত্রুটি-বিচ্যুতিও তুলে ধরবেন। সমাধানের পথও বাতলে দেবেন। আওয়ামী লীগ বিভিন্ন সমাজগোষ্টী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে বলে যথার্থই মত ব্যক্ত করছেন ইনু ভাই। এক্ষেত্রে ধন্যবাদের দাবিদার তিনি। তবে শুধু কি বলেই শেষ! আওয়ামী লীগকে তথা মহাজোট সরকারকে সঠিক পথে চালানোর জন্য দলগত ও জোটগতভাবে বিগত তিনটি বছর আপনি কি করেছেন, তা কি খোলাসা করে বলা উচিত ছিলো না? পত্র-পত্রিকা কিংবা সংসদ সচিবালয়ের রেকর্ড বা ডায়রিতে কিন্তু এক্ষেত্রে পজিটিভ কোনো তথ্য আছে বলে কারো জানা নেই। আমাদের সাংবাদিকবন্ধুরা আপনাকে যথেষ্ট রিলাক্সড মুডে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন, না হলে জনগণের জবাবদিহিতার এই ব্যাপক অংশটুকুতে আপনার কাছ থেকে জবাব আদায় করে নিতেন।
আপনি ১৪ দল এবং এর সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী অবস্থানের কথা বলেছেন, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আপনাদের অবস্থানের কথা বলেছেন; বেশ ভালো কথা। কিন্তু মহাজোট সরকার গঠনের পর ১৪ দলের কোনো কার্যক্রমতো জনগণের চোখে পড়েনি। ১৪ দলের মূল ঘোষণার কোনো কিছুইতো বাস্তবায়নের জন্য আপনি এবং আপনার দল কোন ভূমিকা পালন করেননি। রাজনীতিতে স্ব-বিরোধিতা রেখে জনগণের জন্য কল্যাণ করা দূরূহ, ইনু ভাই।
আপনার বক্তব্যের সবচাইতে মারাত্মক ভ্রান্তি হচ্ছে এটি অতিমাত্রায় শব্দদোষে দুষ্ট। আর তা হলো আমাদের অর্থমন্ত্রী সম্পর্কে তীর্যক মন্তব্য। আপনার বক্তব্য পড়ে আমার মনে হয়েছে, আপনি খোদ অর্থমন্ত্রী সম্পর্কে হয় অজ্ঞ, নয়তো চিরাচরিত বিরোধিতার খাতিরে এবং সেই আপনার অঘটন-ঘটনের মুদ্রাদোষের তত্ত্ব বা ফর্মুলা বাস্তবায়নে ব্যতিব্যস্ত। আপনার ভালো করে জানা থাকার কথা যে, হার্ভার্ড এবং অক্সফোর্ডে যারা পড়ে বা রিসার্চফেলো হিসেবে কাজ করেন, ডিজিটাল পদ্ধতি সম্পর্কে তারা অবশ্যই যে কোনো সাধারণের চাইতে বেশি ধারণা রাখেন। আর আমাদের অর্থমন্ত্রী মহোদয়তো বিশ্বের এই নামকরা দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন, গবেষণা করেছেন, ছিলেন একসময় বিশ্বব্যাংকের জাদরেল কর্মকর্তা, তৃতীয় বিশ্বে যখন ইউএনডিপির বিভিন্ন ঋণদান বিষয়ক প্রজেক্ট কার্যক্রম চলতো, তার মূল অ্যাডভাইজার হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন আজকের এই অর্থমন্ত্রী। এছাড়া সবচাইতে মর্যাদাকর যে প্রতিষ্ঠান সবসময় একজন অর্থনীতিবিদের কাছে লোভনীয়, এই অর্থমন্ত্রী একসময় সেই এসকাপের একজন নামকরা নির্বাহীও ছিলেন। বয়সের ভারে হয়তো একটু ব্যতিক্রমধর্মী বক্তব্য দিয়ে থাকেন, তাই বলে তার যোগ্যতার প্রশ্নে সন্দেহ করাটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ডিজিটাল শব্দটি মুখে-মুখে উচ্চারণ যত সহজে করা যায়, একটি ঘুণেধরা, বহু পুরনো, মান্দাতার আমলের প্রশাসন ও সমাজব্যবস্থায় কোনো প্রকারের অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত সমাজে তার প্রচলন অনেক দুঃসাধ্য কাজ। গোটা সমাজের, গোটা প্রশাসনের সিস্টেম এর ভার কেবলমাত্র খোদ অর্থমন্ত্রীর ঘাড়ে চাপানোর কোনো মানে হয় না।
আপনাদের সরকারের নানান ভ্রান্তনীতি এই অর্থমন্ত্রীর ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার দুর্বিনীত প্রয়াস, তাতো আমরা দেখতে পাচ্ছি। অর্থমন্ত্রী মহোদয় নেহায়েত ভালো মানুষ, আর এই ভালো মানুষটিকে আপনারা কলুষিত করার সবটুকু চেষ্টা করেও যখন কাবু করতে পারেননি, তখন ডিজিটাল পদ্ধতিতে তার অজ্ঞতার ধুয়ো তোলার ব্যর্থ চেষ্টা না করলেই কি নয়? অবশ্য এক্ষেত্রে আপনাদের জুড়ি মেলা ভার। কারণ, সত্তর-আশির দশকে এই আপনারাই বাংলাদেশের আরো এক প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. আখলাকুর রহমানকে আপনাদের তথাকথিত কৃষিতে ধনতন্ত্রের বিকাশ নামক আজগুবি থিওরি প্রকাশ করে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন। আপনারা সবই পারেন। বেচারা অর্থমন্ত্রীও, সব ক্ষেত্রে যখন সমঝোতা করে চলেছেন, তাহলে এক্ষেত্রে করলে আর কি হয়! অবশ্য এক্ষেত্রেও নেত্রীর অনুমোদন দরকার আছে। ইনু ভাইতো মহাজোট নেত্রীর কৃপা দর্শন পাওয়ার জন্য অনেক কসরত করে চলেছেন, খালেদা জিয়াকে নিয়েও চমকপ্রদ, উদ্ভট বক্তব্য দিয়েছিলেন, সে যাত্রায়ও কাজ হয়নি, এখন আবার অর্থমন্ত্রীর পেছনে লেগেছেন, দেখা যাক ইনু সাহেবের আশা শেখ হাসিনা পূরণ করেন কিনা। কারণ ইনু যখন চোখ বোঁজেন, তখন দেখেন তার পূর্বসূরীরা এই রকম খণ্ডিত জাসদের নেতা হয়ে সরকারের মন্ত্রী হয়ে পতাকা উড়িয়ে দাপটের সাথে চলেছিলেন, সরকারের তিনবছর হয়ে গেলো, তার এই সাধটুকু অপূর্ণই রয়ে গেলো।
টেলিকমিউনিকেশনের দায়িত্ব নেওয়ার পর এই সংস্থাটিকে ডিজিটালাইজড করার নামে আপনারা যে কি অবস্থা করেছেন, তাতো দেশের জনগণ দেখতে পাচ্ছে। বাংলাদেশে যে কয়টা সংস্থা সবচাইতে বেশি দুর্নীতিগ্রস্থ এই সংস্থাটি সেগুলোর একটি। এই সংস্থাটিকে যুগোপযোগী এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে আপনার ভূমিকা কোথায়? আজ বিভিন্ন মোবাইল কোম্পানির সাথে রাষ্ট্রীয় এই বৃহৎ সংস্থাটি কোনোভাবেই পেরে উঠছে না, তারপরেও তো আপনি মহাজোট সরকারের টেলিযোগাযোগ সংসদীয় কমিটির সভাপতি। আজতো ফ্রি সার্ভিস দিয়েও এই সংস্থার একটা ল্যান্ড লাইন জনগণের কাছে দেওয়া যাচ্ছে না। এই হলো হাসানুল হক ইনু ভাইয়ের উন্নত সেবার নমুনা। গোড়াতে গলদ রেখে পুরো সমাজ ও দেশ বদলানোর চেষ্টা কেবল ব্যর্থই হবে। অন্যের সমালোচনা করার আগে সব সময় নিজের চেহারা আয়নায় দেখা উচিত। অপরের কাজের সমালোচনা করার আগে, আমি নিজে কতটুকু দায়িত্ব পালন করেছি বা নিজে কতটুকু দায়িত্ব সচেতন ও অর্পিত দায়িত্ব কতটুকু সুচারুভাবে করতে পেরেছি, তা দেখা উচিৎ।
কারণ আজকের যুগ, আপনার ভাষায় ডিজিটাল যুগ, তথ্যের অবাধ প্রবাহ বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে অনায়াসে চলে যায় মুহুর্তে।
তারপরেও খোলাখুলি অনেক কথা বলার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
Salim932@googlemail.com
বাংলাদেশ সময় ১০১৭ ঘণ্টা, জুন ২০, ২০১২
সম্পাদনা: মাহমুদ মেনন, হেড অব নিউজ;menon@banglanews24.com;
জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর
jewel_mazhar@yahoo.com