১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, শুক্রবার মে ২৪, ২০১৩ ৩:৪৬ পিএম BDST banglanew24
17 Jun 2012   09:39:01 AM   Sunday BdST
E-mail this

বিশ্ব বাবা দিবস: ছদ্মবেশে বাবা


মাজেদুল নয়ন, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
বিশ্ব বাবা দিবস: ছদ্মবেশে বাবা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদের সামনে রাতুল তার বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিল। গায়ের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের জার্সি-জিন্স প্যান্ট আর ঠোঁটের কোনে ৭ টাকা দামের সিগারেট বন্ধুদের সঙ্গে তার পার্থক্য রাখেনি। যেসব বন্ধু গাড়ি চেপে ক্লাস করতে আসে বা শহরের দামি ফাস্টফুডের দোকানে খেয়ে হৈ-হুল্লোড় করে তাদের সঙ্গে মিশে গেছে সে। এটা ২০১১ সালের ঘটনা, যখন রাতুল ৩য় বর্ষের ছাত্র।

২০০৯ সালে পেশাগত দ্বায়িত্ব পালনের জন্যেই বাণিজ্য অনুষদের ডিন ড. বদরুল ইসলামের চেম্বারে গিয়েছিলাম। তখন প্রথম দেখেছিলাম রাতুলকে। আমি, রাতুল আর তার বাবা রহমত আলী (ছদ্মনাম) অপেক্ষা করছিলাম স্যারের রুমের সামনে। ফোনে আমার সঙ্গে কথা হয়েছিল স্যারের। কিন্তু অন্য দুজন ফোন না করেই প্রায় এক ঘন্টা ধরে অপেক্ষা করছিলেন।

স্যারের কাছে সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময়ই রুমে ঢোকেন রহমত আলী। দাড়ি থাকায় ৬০ কোটা না ছুঁলেও বয়ষ্ক লাগছিল তাকে। স্যারের সামনে দাড়াঁন কাচু-মাচু হয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চতূর্থ শ্রেণীর এ কর্মজীবির সাহস নেই স্যারের সামনে চেয়ারে বসার। কর্মক্ষেত্রের মর্যাদার শ্রেণীভেদ তাকে চোখ তুলে সন্মান দেখানোর ক্ষমতাও দেয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাতে পাশ করলেও কর্মচারীদের কোটা পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় ভর্তি হতে পারছিল না রাতুল । রহমতের দুই ছেলের মধ্যে ছোট সে। ডিন স্যারকে বলতে বলতে গলা কাপছিল, ‘স্যার বড় ছেলেটা পড়া লেখা করতে পারে নাই, ছোটটারে অনেক কষ্টে এইটুক আনছি। এখন যদি আপনে একটু দয়া করতেন।’

প্রশাসন ও নিয়মের বিভিন্ন হিসাব-নিকাশ বুঝালেন বদরুল স্যার। রহমত আলীর চোখের পানি দাড়ি ছুঁয়ে ফেলেছিল। হঠাৎ করেই বয়সে কনিষ্ঠ বদরুল স্যারের পায়ে ধরে চাপা স্বরে কান্না করতে করতে ছেলের ভর্তি ভিক্ষা চাইলেন তিনি। বললেন, ‘আপনে চাইলে পারেন। আমার ছেলেটারে খুব কষ্ট কইরা পড়াইছি। আমারে একটু দয়া করেন।’ মন গলল স্যারের। আশ্বস্ত করলেন।

পকেট থেকে মোটা রুমালটি বের করে চোখের পানি মুছে যে হাসিমাখা মুখ তার। একটু পরেই জানলাম মুখের হাসিও একটি কৌশল।

স্যারের সঙ্গে কথা শেষ হলো। বের হয়ে বাণিজ্য অনুষদের সামনে দেখলাম রহমত আলী আর রাতুলকে। মুখে একটু শাসন আর সস্তির ছাপ। কে বলবে, কিছুক্ষণ আগে নিজের সবটুকু আত্মসন্মান বলি দিয়ে সন্তানের জন্যে কারো কাছে ভিক্ষে চেয়েছিলেন তিনি।

পাশ দিয়ে হাটতে হাটতে শুনলাম, রহমত আলী রাতুলকে বলছেন, ‘স্যারের সঙ্গে কথা হইছে, আমারে খুব ভাল জানে, চা খাওয়াইলো, গল্প করলো। হইয়া যাইবো আশা করি।’

তখনই বোঝা গেল, স্যারের রুম থেকে বের হয়ে আসার আগে দুঃখ ছাপের মুখে হাসির রেখা ফুটিয়ে তোলা ছিলো বাবার এক কৌশল। যেন রাতুল ধরতে না পারে তার বাবার কষ্ট। ২০১১ সালেও ধরতে পারেনি রাতুল। রহমত আলীর কৌশল প্রকাশ করতে দেয়নি সন্তানের জন্যে তার আত্মসম্মান বিসর্জন।

এইতো বাবা’র ছদ্মবেশ। আজ ১৭ জুন, মাসের তৃতীয় রোববার বিশ্ব বাবা দিবসে সেই ছদ্মবেশের কথাই বারবার মনে পড়ছে।   

কার বাবাই না ছদ্মবেশী।

শনিবার রাতে এক সহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে কোন একজন বাবার সাক্ষাৎকার নিতে বের হয়েছিলাম। যেতে যেতে ওই সহকর্মীও জানালেন তার বাবার ছদ্মবেশে থাকার কথা।

শাহীন (ছদ্মনাম) নামের সহকর্মী জানালেন, তার বাবা কত বেতন পেতেন চাকুরি করে, তিনি এখনো সঠিক জানেন না। তবে ছোট বয়স থেকেই বাবা-মা দুজনের কাছ থেকেই শুনে আসছেন কষ্টে চলছে তাদের সংসার।

একটু বড় হয়ে প্রথম বাবার পকেটে তার পরিচয়পত্রটি দেখেন শাহীন। সরকারি  একটি বিভাগের যে পদটিতে তিনি চাকুরি করতেন, সেটা সর্ম্পকে ধারনা না থাকলেও, পরিচয়পত্রে বাবা যে পোশাক পড়ে আছেন, সেটির মর্যাদা যে খুব বেশি না, তা বুঝতে দেরি হলো না। ইউনিফর্মের শোল্ডার তাকে একটি পেশার কথা মনে করিয়ে দেয়।

শাহীনের বাবা, কখনো এ পোশাক বাসা থেকে পরে বের হতেন না। অফিসে যাওয়ার আগে আলমারি থেকে যে ব্যাগটি নিয়ে বের হতেন, অফিসে যেয়ে সেখান থেকে ইউনিফর্ম বের করে পড়তেন তিনি। আবার বাসায় এসে আলমারিতে ঢুকিয়ে রাখতেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে শাহীন জানতে পারলেন, ঐ পদের বেতন আনুমানিক কত হতে পারে। অবাক হলেন, এতো বেতন দিয়ে ঢাকায় তাদের চার ভাই-বোনকে কিভাবে পড়াশোনা করিয়েছেন, খাইয়েছেন তার বাবা। তখনই আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে, কেন বাবা ছুটির দিনেও অফিস করতেন, অফিস ছুটি হলেও কেন ফিরতে রাত হতো! কোনদিন বাবা বলেননি তিনি টাকার জন্যে ওভার টাইম করছেন, সন্তানদের মানুষ করার জন্যে। টাকা না আসলে যে, ঢাকায় থাকা যাবে না, স্কুলে পড়াশোনা করানো যাবে না। আরো কত কত...।

কি ছদ্মবেশী এই মমতাময়ী লোকটা!!

পিতৃপ্রধান সমাজের উৎপত্তি আদিম কৃষি যুগ থেকে। কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার পুরুষদের উপার্জনে অনেক বেশি সক্রিয় করে তুলেছিল। সঙ্গে সঙ্গে হয়তো এ ছদ্মবেশের প্রবর্তনও করেছিল।

শাহীন বলেন, মাকে কিন্তু সহজেই বুঝে নেওয়া যায়। মায়ের কষ্টগুলো চোখে দেখা যায়। কিন্তু বাবার কষ্ট বুঝে নিতে হয়, কিংবা কখনোই বোঝা যায় না। পুরুষতান্ত্রিক চর্চা তাকে মন খুলে কাঁদতে দেয় না, বলতে দেয় না, সংসারে অন্য সবার কাছ থেকে হয়তো আলাদা করে রাখে। সংসার আর কর্মক্ষেত্রের দুটি আলাদা পরিবেশের মধ্যে নিজেকে খাপ খাওয়াতে হয় তাকে।

যুগে যুগেই বাবারা একরকম তা জানা গেলো শাহীনের জানানো আরেকটি ঘটনায়। এটা তার দাদার দায়িত্ববোধ তার বাবার প্রতি। জেনেছেন দাদীর কাছ থেকে। তার দাদী জানান শাহীনের বাবাকে ছোটবেলায় লেখা পড়ার প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে টানা ৪১ দিন শলার কাঠি দিয়ে রুটিতে সূরা ফাতিহা লিখে ছেলেকে খেতে দিতেন তার বাবা।

বাবার ভালবাসায় শুধু মায়া থাকে না, থাকে দ্বায়িত্ববোধের ভার। সন্তান জন্ম নেয়ার পর থেকে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে দেন সন্তানের জন্যে।

টিএসসি’তে কথা হচ্ছিল জামালপুরের রিকশাওয়ালা বাতেনের সঙ্গে। তার বড় মেয়ে রাবেয়া এবার এসএসসি পাশ করেছে আর দুই ছেলেই এখনো স্কুলে পড়ে। নিজের খরচ থেকে যা বাচে তার সবটাই বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। বড় মেয়েকে এইচএসসি’তে ভর্তি করাতে হবে। ইচ্ছা মেয়ে বড় হয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে।

মাঝে মাঝে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া যাত্রীরাও খারাপ ব্যবহার করে এমনকি গায়ে হাত তোলে। অনেকেই তার মেয়ের বয়সী। রাবেয়া কি কখনো জানতে পারবে, তাদের বড় মানুষ করার জন্যে রাজধানীতে কি কষ্টে জীবন কাটে বাতেনের। বাতেনকে মার খেতে হয় স্কুল পড়ুয়া ছেলেদের হাতে। রিকশার টিউব লিক করে না দেয়ার জন্যে যখন তখন পায়ে ধরে মাফ চাইতে হয় ট্রাফিক পুলিশের কাছে। কি অদ্ভুত ছদ্মবেশী রিকশাওয়ালা বাবা বাতেন।

দিবস উপলক্ষে নয়’ ছদ্মবেশী বাবাদের জন্যে শ্রদ্ধা আর ভালবাসা।

বাংলাদেশ সময় ২০০০; ১৭ জুন ২০১২
এমএন/সম্পাদনা: মাহমুদ মেনন, হেড অব নিউজ
menon@banglanews24.com

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
VISA Center Inc
Holy Hajj BD
RehabHousing.com

ফিচার

8877
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান