 |
| ছবি: নয়ন কুমার / বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
ঢাকা: দেশের প্রধান বিমানবন্দরের ঝুঁকিপূর্ণ রানওয়েতেই পাঁচ বছর ধরে দেশি-বিদেশি উড়োজাহাজ অবতরণ ও উড্ডয়ন করছে। এই রানওয়ে ব্যবহার করেই প্রতি বছর প্রায় ৪২ লাখের বেশি মানুষ বিদেশে যাচ্ছেন ও আসছেন।
২০০৬ সালেই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বর্তমান রানওয়ের আয়ুষ্কাল শেষ হয়। এরপর পাঁচ বছর ধরে জোড়াতালি দিয়ে চলে উড়োজাহাজ অবতরণ ও উড্ডয়ন।
বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে নিম্নমানের জোড়াতালি মেরামতের রানওয়েতে উড়োজাহাজ ওঠানামা মোটেই নিরাপদ নয়।
এই রানওয়ে ব্যবহার করে ফ্লাইট পরিচালনাকারী দেশি ও বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো একাধিকবার আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিকভাবে রানওয়ের বিষয়ে অভিযোগ জানালেও এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি।
বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞ ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পরিচালনা পর্ষদের প্রাক্তন সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম বাংলানিউজকে বলেন, বিশ্বের ৬০ শতাংশ বিমান দূর্ঘটনা হয় রানওয়েতে। অথচ বাংলাদেশের প্রধান বিমানবন্দরের রানওয়ের অবস্থা খুবই করুণ।
দ্রুততার সঙ্গে বিমানবন্দরের রানওয়ে মেরামতের কাজ শেষ না করা হলে দেশের প্রধান গেটওয়ে শাহজালাল বিমানবন্দরটি আন্তর্জাতিক মানে ক্যাটাগরি-২ থেকে ক্যাটাগরি-৩ এ নেমে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
গত ৩০ এপ্রিল থাইল্যান্ডের একটি সামরিক বিমান শাহজালালে অবতরণ করতে গিয়ে রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ে। এর আগে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স দুটি উড়োজাহাজ অবতরণ করতে গিয়ে রানওয়ের বাইরে চলে যায়।
সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা গেছে, শাহজালাল বিমানবন্দরের রানওয়ে বেহাল। রানওয়ের মাঝ বরাবর ফাটল দেখা দিয়েছে, ওপরের আস্তর উঠে পাথর বেরিয়ে গেছে, কোথাও দেবে গিয়েছে কিংবা কোথাও খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। এ ধরনের ছোট বড় অসংখ্য ফাটলের দেখা গেছে বিমানবন্দরের ১০ হাজার ৫০০ ফুট রানওয়ে জুড়ে। বিশেষ করে আশুলিয়ার দিক থেকে (যেখান থেকে উড়োজাহাজ অবতরণ করে থাকে) রানওয়ের অবস্থা খুবই খারাপ। এখানে রানওয়ের অনেকটা জায়গা জুড়ে আস্তর উঠে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে।
বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞদের মতে, উড়োজাহাজ অবতরণের কাজটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। আর অবতরণের দিকের রানওয়ে যদি এরকম বেহাল হয় তাহলে তা আতঙ্কের।
উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালে সবশেষ এই বিমানবন্দরের রানওয়েতে ২০ সেন্টিমিটার এসফল্ট কংক্রিট আস্তরণ দেওয়া হয়। ১০ বছর মেয়াদী এই মেরামতের আয়ু শেষ হয় ২০০৬ সালে। এর পর থেকে আর কোনো মেরামতের উদ্যোগ না থাকায় রানওয়ে সার্ফেসে লম্বালম্বি ও আড়াআড়িভাবে ফাটলের সৃষ্টি হয়েছে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, শুধু রানওয়ের অবতরণের দিকটিই নয়, পুরো রানওয়ের জায়গায় জায়গায় ছোট বড় অসংখ্য ফাটলের সৃষ্টি হয়েছে। ফাটলের ভেতর থেকে রানওয়ের লাইটের তার বের হয়ে গেছে। এছাড়া ট্যাক্সিওয়ের অবস্থাও একই রকম। ট্যাক্সিওয়ে থেকে প্রলেপ উঠে পাথর বের হয়ে গিয়েছে। এসব ছোট ছোট পাথর প্রায়শই উড়োজাহাজের ভেতর ঢুকে ইঞ্জিনের ব্লেড ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
এভাবে পাথর ঢুকে দেশের জাতীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্স বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজ ছাড়াও বিদেশি এয়ারলাইন্সের উড়োহাজাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে একাধিকবার।
এ বিষয়ে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ অনেকবার বিমানবন্দরের তত্ত্বাবধায়ক বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানায়। তারা এও জানিয়েছিল যদি অতি সত্বর ট্যাক্সিওয়েসহ রানওয়ে মেরামত করা না হলে তারা এখান থেকে তাদের ফ্লাইট বন্ধ করে দেবে। বিষয়টি আমলে না নেওয়ায় এক পর্যায়ে ২০০৮ সালের মার্চে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ বাংলাদেশ থেকে ফ্লাইট বন্ধ করে দেয়।
সূত্র জানায়, শাহজালালের রানওয়ের বর্তমান যে অবস্থা তাতে কোনো ধরনের সুপরিসর ও হেভিওয়েট উড়োজাহাজ বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করতে পারবে না।
এ বিষয়ে বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ’র চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদ হোসেন বলেন, এই রানওয়ে দিয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী যেমন যাওয়া আসা করেন তেমনি দেশের একজন শ্রমিকও। বিদেশিওরা এই রানওয়ে ব্যবহার করেই বাংলাদেশে প্রবেশ করে। তাই এই রানওয়ে হতে হবে নিরাপদ।
তবে বিমানমন্ত্রী ফারুক খান বর্তমান রানওয়ের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেও বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ যেভাবে এটিকে সচল রেখেছে তার জন্য কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
রোববার বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী ফারুক খান শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে মেরামত কাজের উদ্বোধন করেন।
রানওয়ে মেরামত ও শক্তি বৃদ্ধির জন্য এসফল্ট কংক্রিট আস্তরণ ফেলার কাজ করা হবে। এই মেরামত কাজের ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮৭ কোটি টাকা।
২০১৩ সালের জুনে কাজটি সম্পন্ন হলেই এটি আবার ঝুঁকিমুক্ত রানওয়ে হয়ে উঠবে বলে মনে করছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। তখন যেকোনো উড়োজাহাজ নিরাপদে উড্ডয়ন ও অবতরণ করতে পারবে বলে জানিয়েছেন তারা।
বাংলাদেশ সময়: ১৫২৫ ঘন্টা, জুন ৩, ২০১২
আইএইচ/মাহমুদ মেনন, হেড অব নিউজ; সম্পাদনা: জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর
Jewel_mazhar@yahoo.com