 |
ঢাকা: পেশাগত কাজে খবরের পেছনে প্রতিদিনই ছুটতে হয় রাজধানীর এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে। পাবলিক পরিবহনে যাতায়াতের সুবাদে জনতার অজস্র অভিব্যক্তি, ক্ষোভ আর প্রত্যাশার রেশ তাই জমা হয় চেতন-অবচেতন মনে।
সংবাদকর্মী হিসেবে হয়তো পেশাগত সীমারেখা পেরিয়ে আমজনতার এমন বিছিন্ন সাবলিল অনুভূমিতের সঙ্গে একাত্ম হওয়া যায় না, কিন্তু এসব অনুভূতি নাগরিক হিসেবে নিজের ভাবনাকেও স্পর্শ তো করেই। কখনও তো আমাররই মনের কথা উঠে আসে নিরীহ জনতার জবানিতে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার প্রধান প্রবেশপথ থেকে বাসে চড়েছি-গন্তব্য পুরান ঢাকা। রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশন পর্যন্ত পৌছে মারাত্মক যানজটে আটকে পড়ে বাস, রমজানের দুপুরে নাকাল হতে থাকে অসহায় জনতা।
এরই মধ্যে আমার সামনের সীটে এসে বসেন সত্তরোর্ধ শক্তপোক্ত এক প্রবীণ, মুখে তার শ্বেতশশ্রু, হাতে খবরের কাগজ। কিছুক্ষণের মধ্যেই পত্রিকার খবরের উদ্ধৃতি দিয়ে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কড়া মন্তব্য ছুঁড়তে থাকেন তিনি।
এরই মধ্যে তার আলোচনায় যোগ দেন যানজটে নাকাল হতে থাকা আরো ক’জন সহযাত্রী।
ওই বৃদ্ধ বলতে থাকেন, ‘‘হাসিনার (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) মুখ ভালা না। আওয়ামী লীগেরে তো আপনারা চিনেন না। মুখের কারণে ২১ বছর ক্ষমতায় আইবার পারে নাই।’’
জবাবে তাক বিএনপির লোক অভিহিত করে এক যুবক বলে ওঠেন, ‘‘আপনাগোর নেত্রী খালেদা (বিরোধী দলীয় নেতা) তো অনেক শিক্ষিত, তাই কথা কম বলেন। শেখ হাসিনা তো লেখাপড়া করে নাই, ক্যামনে কতা কইবো।’’
ধীরে ধীরে জমে উঠে তর্ক। যোগ দেন আগ্রহী আরো কয়েক যাত্রী।
একজন বলেন, ‘‘এ সরকারের সময় চালের দাম ৪০ টাকা। বিএনপি থাকলেও তাই অইতো। আসলে রাজনীতি আর সরকার আমাদের চালায় না, বরং ক্ষতি করে। রাজনৈতিক দলের সংঘর্ষে আমরা জনগণই মরি। নেতারা ঠিকই ভাল হালে থাকে।’’
আরেক জনের মন্তব্য, ‘‘এই দেশে আইন কেউ মানে না, তাই যতো অশান্তি। বিদেশে আইন মানে বলেই তারা উন্নত। অর্থ বা খাবারের কমতি নাই।’’
বাসে আলোচনার সূত্রপাত করা ওই বৃদ্ধ আবার সরব হন। নিজেকে শেখ হাসিনার স্বামী প্রয়াত পরমাণু বিজ্ঞানী ওয়াজেদ মিয়ার ক্লাসমেট দাবি করে তিনি বলেন, ‘‘শেখ মুজিব আমাকে নিজ হাতে আপেল-আঙুর খাওয়াইছেন। শেখ হাসিনা বাপের কিছুই ধইরা রাখতে পারলো না।’’
যানজট ঠেলে বাস এগুতে থাকলো, সঙ্গে ডালপালা ছড়াতে থাকলো জনতার তর্কও।
আরেক বৃদ্ধ বললেন, ‘‘মনে তো কত দুঃখের কতাই জমা অইয়া রয়েছে। কইলে সারাদিনেও শেষ অইবো না। দেশ যে কোন দিকে যাইতাছে, কেউ বুঝবার পারতাছি না। দিন দিন দলগুলোর মধ্যে (রাজনৈতিক দল) হিংসা ভইরা উঠতাছে। কেউ কেউরে মানতে পারে না।’’
তিনি বলেন, ‘‘দুই দিন পর পর বিদ্যুতের দাম বাড়াইতাছে। বাড়তাছে বাসের ভাড়া, বাড়ি ভাড়া আর চাল-তেলসহ সবকিছুই। কিন্তু বেতন কয় ট্যাহা বাড়ে!’’
এমন আলোচনা অর্থহীন নাকি অর্থবহ কিনা তা বিচার না করলেও এসব কি দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির নাজুকতাকেই নির্দেশ করে না?
দু’ঘণ্টার বেশি সময় যানজটে ধুঁকতে ধুঁকতে পুরান ঢাকায় যখন বাস থেকে নামছি, ততক্ষণে ‘তার্কিক’দের প্রায় সবাই নেমে গেছেন!
বাংলাদেশ সময়: ১৪২২ ঘণ্টা, আগস্ট ২, ২০১২
সম্পাদনা: জাকালিয়া মন্ডল, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর