অধীনস্থদের অনায়াসে ‘তুমি’ ডাকসহ বিভিন্ন অসম্মানজনক সম্বোধন এখন বাংলাদেশের অফিস-আদালতে নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার। এক্ষেত্রে চাকুরির কোড অব কন্ডাক্ট বা বস-অধীনস্থদের বয়স কোনোটাই বিবেচনায় আনা হয় না। সম্বোধনের পালাটা নির্ভর করে পদবির ওপর। সদ্য-কাজে-যোগ-দেওয়া বসদের দৃষ্টিতেও আগামী মাসে অবসরে-যাওয়ার-অপেক্ষায়-থাকা অধীনস্থরা কেবলই অধীনস্থ আর ‘তুমি’। বোধ করি, অধীনদের ‘তুমি’ সম্বোধন না করলে বসদের ‘ইজ্জত’ থাকে না!
মাননীয় মন্ত্রীদের তরফ থেকে এই অবহেলা-অপমান আরো ভয়াবহ। অকারণ ধমকি-ধামকিতে অধীনস্থদের তটস্থ-সন্ত্রস্হ রাখার মধ্যে মন্ত্রীদের কেউ কেউ বেশ ‘ভাব-সাব’ উপভোগ করে থাকেন।
‘বলরাম দাস’ নামটির মধ্যে বল বা শক্তির ইংগিত থাকলেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর চড় কিংবা থাপ্পড়ের সামনে অসহায়ভাবে চুপসে-গুটিয়ে গেল বলরামের শক্তি-সামর্থ্য। যতদূর জানা যায়, সামান্য কয়েক শ’ টাকা ‘লেন-দেনের অপরাধে’ রেলকর্মী বলরামকে প্রকাশ্য মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের হাতে চড় খাওয়ার অপমানটা হজম করতে হয়েছে। কেউ কী জানেন, বলরামদের মতো রেল কিংবা রেলের ঠিকেদারী প্রতিষ্ঠানের নিমপ্নদস্হ চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীদের মাসিক বেতন কতো? এই বেতনে কি সুস্হভাবে সংসার চালানো সম্ভব? বলরামের বেতনের সংগে সততা ও নৈতিকতার কোনো সম্পর্ক আমরা খুঁজতে যাচ্ছি না।
বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, প্রয়োজনের তুলনায় নিমপ্নদস্হ সরকারী-বেসরকারী কর্মচারীদের বেতনটা নেহাতই হাস্যকর। এইতো সেদিনও মামলার তদন্তে গিয়েও যাতায়ত ভাড়া পেতেন না পুলিশের সাব-ইন্সপেকটর বা উপ-পরির্দশকরা। ফলে তদন্তে গিয়ে ঘুষ চাইতে দ্বিধা করতেন না তারা। স্কুল ও কলেজগামী দুটি সন্তানের পিতার সাত হাজার টাকার বেতনে বাড়িভাড়াই তো হয় না।
অন্য খরচ কোথা থেকে আসবে! এ-যেন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্নীতির প্রতি ঝুঁকে পড়ার উৎসাহ।
হালে দুর্নীতির সংজ্ঞা কী? আমার বড় খালু ছিলেন মেইল ট্রেনের গার্ড। তখন চুয়াত্তুরের মন্বন্তর। সাধ আর সাধ্যের লড়াইটা তখন বেশ কঠিন। ফলে খালু সাহেব দু’একজন বিনা-ভাড়ার-যাত্রী তুলতেন। ভৈরবে তোলা মাছ, নরসিংদীতে তোলা সবজির ছিটেফোঁটা এনে সংসারের ১৩টি মুখের গ্রাস মেটাতেন। দৈনিক সংবাদের বার্তা সম্পাদক কাজী রফিকের বাবাও রেলের গার্ড ছিলেন। খালুর জানি দোস্তদের একজন ছিলেন তিনি। ওনাদের আলোচনায় প্রায়ই উঠে আসতো অ্যাকাউন্টস বিভাগের ’দুর্নীতি’।
৮২৩ টাকা ২০ পয়সা বেতনের বদলে ওনারা পেতেন পাক্কা ৮শ’। ২৩ টাকা ২০ পয়সা অ্যাকাউন্টসের ভদ্রলোকেরা কেটে রাখতেন ওপর ওয়ালাদের সংগে ভাগ বাটোয়ারার জন্যে। ওপরওয়ালাদের কখনো এজন্যে জবাবদিহি করতে হয়নি। বড় আপা তখন ডিগ্রি পরীক্ষার্থী। ছোট আপা স্কুল ফাইনাল দেবেন। এমন সময়টা বেছে নিয়ে চালানো হলো খড়্গ। খালুকে বদলি করা হলো চাঁদপুরে। সেই বদলি ঠেকাতে সিআরবি’র ওপর ওয়ালারা নিয়েছিলেন মাত্র ছয় হাজার। তখন ছয় হাজারে চাটগাঁর হালিশহরে দুই কাঠা জমি মেলে। খাল বাধ্য হয়েছিলেন পৈতৃক সম্পদ হস্তান্তরে।
বলরাম দাস আমার খালুর মতোই একজন। ‘অবৈধ পথে’ দৈনিক শ’ তিনেক টাকা ঘরে তোলেন। নিম্নপদস্হ হবার কারণে ওনারা চড়-থাপ্পড় খান। কখনো বড় বিপদ থেকে পরিত্রাণ পেতে পৈতৃক সম্পদে হাত দেন। এভাবে জীবনে সম্পদ ও সম্মান দুটোই তাদের যায়। তৃণমূল পর্যায়ের এইসব অপরাধ দমনে মাননীয় মন্ত্রী বেশ সরব ও সোচ্চার। কিন্তু মন্ত্রীদের পেয়ারের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নামে এতো সব ফ্ল্যাট আর চারতলা-পাঁচতলা-বহুতলা বাড়ি, এতো ঝা-চকচকে গাড়ি আসে কোথা থেকে? অবশ্য বিভিন্ন জিজ্ঞাসাবাদে, আয়কর বিরণীতে সম্পদের উৎস হিসেবে প্রায় সবারই আলাদিনের চেরাগ এক ও অভিন্ন ---- শ্বশুরবাড়ি!! অধিকাংশ সময়ে পরে হয়তো জানা যায়, ওইসব আলোচিত ভদ্রলোকের শ্বশুর মহাশয় সাধারণ চাষী অথবা অতিসাধারণ মধ্যবিত্ত। কিন্তু তবু তারা দিব্যি থাকেন রসেবশে; তাদের সম্মান-মর্যাদায় অসম্মানের আঁচড়টি পর্যন্ত পড়ে না। আসলে তাদেরকে কেউ ঘাঁটাতে চান না। একেই বলে মানীর মান....!! কিন্তু যত দোষ নন্দঘোষ ওই ছা-পোষা, আন্ডারপেইড, নিম্নপদস্থ কর্মচারীরা। ওদের কপালে জোটে কিল-চড়-থাপ্পড়ের অলংকার!
মাননীয় রেলমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে ধন্যবাদ। তিনি রেলকে ‘দুর্নীতিমুক্ত’ করতে সরেজমিন পরিদর্শনের পাশাপাশি শারীরিক ‘শিক্ষা’ দেবার রেওয়াজটি চালু করেছেন। অন্য মন্ত্রীরাও এই তরিকা ইস্তেমাল করে দেখতে পারেন। মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে ‘দুর্নীতি’ কিংবা স্বজনপ্রীতির অভিযোগ পেলে তার চেয়ে আরও ক্ষমতাবান মন্ত্রীরা বা সকল মন্ত্রীর অভিভাবক যিনি, স্বয়ং তিনি প্রকাশ্যে অভিযুক্ত জুনিয়র মন্ত্রীদের দিতে পারেন এরকম নগদানগদ শাস্তি বা ‘পুরস্কার’।
চড়-থাপ্পড়ের গণতান্ত্রিক চর্চাটা রেলমন্ত্রীর কাছে হঠাৎই কেন বেশ জরুরি হয়ে উঠলো যখন সরকারের নানাদিকে দুর্নীতির বদনাম?‘ম্যাংগো-পিপল’ বা আমজনতাও যদি মনে করে কোনো মাননীয় মন্ত্রী ‘দুর্নীতি’ বা ‘অনিয়ম-অন্যায়’ করেছেন, তাহলেও কি সে বিচার তারা করতে পারবে বা বিচার পাবে?
প্রশ্ন হলো, সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এপিএস-এর গাড়িতে ৭০ লাখ টাকা পাওয়ার পরও তার উপযুক্ত বিচার হলো না কেন? তাহলে ‘ম্যাঙ্গো পিপল’ বা আম জনতার কেন বিচার হবে? এক যাত্রায় দুই ফল কেন?
ইমেল: abid.rahman@ymail.com
সম্পাদনা: জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর
jewel_mazhar@yahoo.com