 |
| ছবি: বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
ঢাকা: সর্বব্যাপী দলীয়করণে ক্ষমতাসীন মহাজোটের বাজেট বাস্তবায়নের প্রশাসনিক দক্ষতা ও যোগ্যতা ধ্বংস হয়ে গেছে বলে দাবি করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এমকে আনোয়ার।
সোমবার বিকেলে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
কার্যত সংসদে বাজেট পেশের মাত্র দু’দিন আগে গত ৫ জুন উপস্থাপিত খালেদা জিয়ার বাজেট ভাবনার ধারাবাহিকতায় বিএনপি এ বাজেট প্রতিক্রিয়া তুলে ধরে।
এ সময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. এম ওসমান ফারুক, সাহিব উদ্দিন আহমেদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
কনজিউমার অ্যাসোশিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) বরাত দিয়ে এমকে আনোয়ার বলেন, ‘সাধারণ মানুষের কথা চিন্তাই করা হয়নি এ বাজেটে। এ বাজেটে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ সীমিত হবে এবং মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। দুরূহ হয়ে পড়বে বাজেটের বাস্তবায়ন।’
‘অনুন্নয়ন ব্যয়ের লক্ষমাত্রা ঠিক থাকলেও রাজনৈতিক চাপের মুখে তা ভেস্তে যাবে এবং অনুন্নয়ন ব্যয় বছর শেষে আরও বৃদ্ধি পেয়ে সম্পদের উপর চাপ সৃষ্টি করবে’ দাবি করে তিনি বলেন, ‘বছর শেষে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির কলেবর সংকুচিত হয়ে পড়বে।’
‘‘বাজেট বাস্তবায়নের জন্য যে প্রশাসনিক দক্ষতা ও যোগ্যতা প্রয়োজন তা সর্বব্যাপী দলীয়করণের ফলে অনেকাংশে ধ্বংস হয়ে গেছে’ মন্তব্য করে এমকে আনোয়ার বলেন, ‘দেশের অবনতিশীল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, নিয়োগ-বাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্য, দুর্নীতি ও অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন দুরূহ হবে। অর্থমন্ত্রী নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষকে দুই হাতে ভরে দিয়েছেন করের বোঝা। আর দিয়েছেন নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ার নিশ্চয়তা।’
তিনি বলেন, ‘আসন্ন অর্থ বছরের জন্য ১ লক্ষ ৯১ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকার এ বাজেট দেশের প্রয়োজনের তুলনায় বড় না হলেও অর্থায়নে সরকারের সামর্থ্য, বাজেট বাস্তবায়নে প্রশাসনিক দক্ষতা ও যোগ্যতা এবং সর্বোপরি সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও সদিচ্ছার ঘাটতির কারণে বাস্তবায়ন দুরূহ হবে।’
তিনি বলেন, ‘আগামী অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি ৫২ হাজার ৬৮ কোটি টাকা যা জিডিপির ৫ শতাংশ। ঘাটতির ২ শতাংশ অর্থায়ন হবে বৈদেশিক সাহায্য থেকে এবং ৩ শতাংশ অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে। বলা হয়েছে এ ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ৩৩ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হবে- যার মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে নেওয়া হবে ২৩ হাজার কোটি টাকা, জাতীয় সঞ্চয়পত্র থেকে পাওয়া যাবে ৭ হাজার ৪শ’ কোটি টাকা।’
তিনি বলেন, ‘মোট রাজস্ব প্রাপ্তি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লক্ষ ৩৯ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা যা ২০১১-১২ অর্থ বছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে প্রায় ২২ শতাংশ বেশি। বৈদিশিক অনুদান প্রাপ্তির লক্ষ্যমাত্রা ২০১১-১২ অর্থ বছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি এবং ২০১১-১২ অর্থ বছরের প্রকৃত প্রাপ্তি ২ হাজার ৫৮ কোটি টাকার প্রায় তিনগুণ।’
আনোয়ার বলেন, ‘দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের ভাবমূর্তি যেভাবে কলুষিত হয়েছে এ পরিস্থিতিতে বৈদেশিক অনুদানের এ অর্থ পাওয়া দুরাশা মাত্র। বৈদেশিক ঋণের নীট প্রাপ্তি হিসাব করা হয়েছে ১২ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা যা ২০১১-১২ অর্থ বছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ৭ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকা হতে প্রায় ৭০ শতাংশ বেশি এবং ২০১০-১১ অর্থ বছরের প্রকৃত প্রাপ্তি ২ হাজার ৬২৯ কোটি টাকার প্রায় ৫ (৪.৭৭) গুণ। এই অর্থ প্রাপ্তির লক্ষ্যমাত্রাও বাস্তবতা বর্জিত বলে মনে হয়। বাকী রইল বাজেট ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ উৎস হতে ঋণের হিসাব।’
তিনি বলেন, ‘২০১১-১২ অর্থ বছরে ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১৮ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা বৃদ্ধি করে ২৯ হাজার ১১৫ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০১২-১৩ অর্থ বছরে এ উৎস থেকে ঋণে র লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৩ হাজার কোটি টাকা যা ২০১১-১২ অর্থ বছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা হতে ২১ শতাংশ কম। এ হিসাব বছর শেষে বেড়ে গিয়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থার উপর চাপ সৃষ্টি করবে যার ফলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ সীমিত হবে এবং মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। অপরদিকে সরকারের ভ্রান্ত নীতির ফলে জাতীয় সঞ্চয় প্রকল্পগুলো থেকে নীট প্রাপ্তি ২০১১-১২ অর্থ বছরের লক্ষ্যমাত্রা ৬ হাজার কোটি টাকা হতে কমিয়ে সংশোধিত বাজেটে ৩ হাজার ৫শ’ কোটি টাকা করা হয়েছে। প্রথম ১০ মাসে এখাতে নীট বিনিয়োগ হয়েছে মাত্র ৩৮০ কোটি টাকা। বছর শেষে এ খাত থেকে প্রাপ্তি ৫শ’ কোটি টাকায় উন্নীত হতে পারে। এর বিপরীতে ২০১২-১৩ অর্থ বছরে এ খাত থেকে প্রাপ্তির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ হাজার ৪শ’ কোটি টাকা যা সংশোধিত বাজেট অংকের দিগুণের বেশি এবং ২০১১-১২ অর্থ বছরের সম্ভাব্য প্রাপ্তির প্রায় ১৫ গুণ। এটা অতি উচ্চাকাংখী এবং বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। এর বোঝা গিয়ে পড়বে সহজলভ্য ব্যাংকিং খাতের উপর। একই সঙ্গে বছর শেষে উন্নয়ন কর্মসূচি আরো সংকুচিত হবে যা অর্থনীতেতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। ২০১২-১৩ অর্থ বছরে অনুন্নয়ন ব্যয় ১০ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয়েছে। ২০১১-১২ সালে এর বৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২২ শতাংশ। এ উদ্যেগটি সঠিক। কিন্তু রাজনৈতিক চাপের মুখে তা ভেস্তে যাবে এবং অনুন্নয়ন ব্যয় বছর শেষে আরও বৃদ্ধি পেয়ে সম্পদের উপর চাপ সৃষ্টি করবে।’
‘৫৫ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট বিশাল আকারের না হলেও এ বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সম্পদ আহরণ ও ব্যবস্থাপনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে গিয়ে ব্যাংকিং ব্যব¯হা থেকে ঋণ গ্রহণ এবং বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নতুন নোট ছাপানোর সহজ পন্থা গ্রহণের মাধ্যমে সামগ্রিক অর্থনীতির ভীত আরও শিথিল ও অস্থিতিশীল হয়ে যেতে পারে। ফলে দিন শেষে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির কলেবর সংকুচিত হয়ে পড়বে।’
‘বাজেট বাস্তবায়নের জন্য যে প্রশাসনিক দক্ষতা ও যোগ্যতা প্রয়োজন তা সর্বব্যাপী দলীয়করনের ফলে অনেকাংশে ধ্বংস হয়ে গেছে।’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘অবাঞ্ছিত, অনৈতিক ও বেআইনি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে জনপ্রশাসন তাদের অতীত গৌরব ও আত্মবিশ্বাস অনেকাংশে হারিয়েছে। সরকারের ওসরকারি দলের এ জাতীয় জনবিরোধী হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে যেসব সরকারি কর্মকর্তা দাঁড়াবার চেষ্টা করেছেন তাদের বিভিন্ন ভাবে হয়রানি, এমনকি দৈহিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে যার কোন প্রতিকার সরকারের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি।’
তিনি বলেন, ‘অর্থমন্ত্রীর দাবিকৃত সাফল্যের "বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ আইন) ২০১০ ‘এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদ অবাধ লুটপাটের যে দায় মুক্তি দেওয়া হয়েছে কোন সভ্য দেশে তার কোন দৃষ্টান্ত নেই। এ আইন বিবেকবান সরকারি কর্মকর্তার বিবেকে আঘাত করেছে এবং সৎভাবে দায়িত্ব পালনে নিরুৎসাহিত করছে। তাছাড়া দেশের অবনতিশীল আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, নিয়োগ-বাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্য, দুর্নীতি ও অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন দুরূহ হবে।’
এমকে আনোয়ার বলেন, ‘বাজেটে রাজস্ব প্রাপ্তির লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ২২ শতাংশ বৃদ্ধি করে ১ লক্ষ ৩৯ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ অর্থ মূলত: পরোক্ষ কর থেকেই আসবে যার সিংহভাগ বর্তাবে নিম্নবিত্ত সাধারণ মানুষের উপর। অর্থমন্ত্রী নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষকে দুই হাতে ভরে দিয়েছেন করের বোঝা। আর দিয়েছেন নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ার নিশ্চয়তা। প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৩ শতাংশ, করভার বৃদ্ধি ২২ শতাংশ, মূল্যস্ফীতি দুই অংকের। এ সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান কয়েক ধাপ নেমে যাবে। বাজেটে ব্যক্তি শ্রেণীর আয়কর দাতাদের করমুক্ত আয়েরসীমা ১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকায় অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। অপরদিকে নিম্নতম করের সীমা দুই হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে তিন হাজার টাকা করা হয়েছে। কিন্তু আয়টা আসবে কোথা থেকে তা বলা হয়নি। দুই অংকের মূল্যস্ফীতির বিরূপ প্রভাব উপেক্ষা করে করমুক্ত আয়ের সীমা অপরিবর্তিত রাখা এবং করভার দেড়গুণ করে দেওয়ায় নিম্ন আয়ের জনগণের জীবনযাত্রার মান আরো নেমে যাবে যা দারিদ্র নিরসন কর্মসুচির উপর বিরূপ প্রভাব বিস্তার করবে।’
তিনি বলেন, ‘ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতির বাজারে ন্যুনতম কর বাড়ানো সামাজিক ন্যায় বিচারের পরিপন্থি। এর মাধ্যমে কম আয়ের মানুষকেও করের আত্ততায় নিয়ে আসা হচ্ছে। এখানেই শেষ নয়। খুচরা ব্যবসায়ীদের এখন নতুন হারে কর দিতে হবে। ফলে পাইকারি পর্যায়ে যা-ই থাকুক না কেন, খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়িয়ে দেবেন তারা। এরই মধ্যে কনজিউমার অ্যাসোশিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বলেছে- সাধারণ মানুষের কথা চিন্তাই করা হয়নি এ বাজেটে। তাঁদের অসহায়ত্ব দূর করার কোন দিক নির্দেশনাও দেওয়া হয়নি। করমুক্ত আয়ের সীমা ২ লক্ষ ২৫ হাজার টাকায় উন্নীত করা এবং সর্বনিম্ন করসীমা ২ টাকায় টাকায় অপরিবর্তিত রাখাই সমীচীন বলে মনে হয়।’
এছাড়া রপ্পানি উৎসে কর কর্তন, মোবাইল রিচার্জে নতু কর, নতুন গাড়ি আমদানিতে কর বাড়ানো, মূল্য সংযোজন কর, পুঁজিবার প্রণোদনা, কালো টাকা সাদা করা, পদ্মা সেতু দুর্নীতি, কৃষি খাতে ভর্তুকি, স্যানিটেশন ব্যবস্থা, পোল্টি শিল্প, মূলস্ফীতি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, বাড়ি ভাড়া, জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ-গ্যাস সঙ্কট, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের লোকসান, নতুন কর্মসংস্থান, দারিদ্র দূরীকরণ ইত্যাদি বিষয়ও উঠে আসে তার বক্তব্যে।
বাংলাদেশ সময়: ১৯২৭ ঘণ্টা, জুন ২৫, ২০১২
এমএম/ সম্পাদনা: অশোকেশ রায় ও জাকারিয়া মন্ডল, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর