 |
ঢাকা : ‘আমার মেয়েটার এখন কি হবে? মেরিট লিস্টে নাম থাকা সত্ত্বেও আমি ওকে সিটি কলেজে ভর্তি করতে পারিনি। এ চিন্তায় মেয়ে খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।’ আক্ষেপের সুরে এসব বলতে বলতে কেঁদেই ফেললেন সিটি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান ইরা’র বাবা ইলিয়াস রহমান খান।
ইরা’র বাবার মতো আরো অনেক অভিভাবক সিটি কলেজে ভর্তি বাণিজ্যের অভিযোগ জানালেন বাংলানিউজের কাছে। অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীর ভর্তি বিড়ম্বনার জন্য দায়ী করলেন কলেজটির প্রিন্সিপাল-শিক্ষকদের।
তাদের অভিযোগ, উচ্চ মাধ্যমিক ভর্তি পরিক্ষায় মেধা তালিকায় স্থান করে নেওয়ার পরও অসৎ উদ্দেশ্যে কলেজ কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু শিক্ষার্থীকে ভর্তি হওয়ার সুযোগ বঞ্চিত করেছে। তাদের পরিবর্তে টাকার বিনিময়ে ভর্তি করেছে অপেক্ষমান তালিকায় থাকা তুলনামুলক কম মেধাবীদের।
খাগড়াছড়ি থেকে সিটি কলেজে ভর্তি হতে আসা হীরা চাকমা বাংলানিউজকে বলেন, ‘মোবাইলে এসএমএস পেয়েছি ১৭ জুন রাতে। খাগড়াছড়ি থেকে ঢাকায় আসতে ১৮ জুন সারাদিন কেটে গেছে পথে। ১৯ জুন কলেজে এসে জানতে পারি ভর্তি বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ মেধা তালিকায় আমার অবস্থান ১৮৬। দু’দিন কলেজে এসেও ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাইনি।’
শিক্ষার্থীরা জানান, মোবাইলে আসা এসএমএসে ভর্তি হওয়ার জন্য নির্ধারিত কোন দিন-তারিখের উল্লেখ ছিল না। ১৭ জুলাই রাতে এসএমএসে ফলাফল জানানো হয়। পরদিন ১৮ জুন শবে মেরা’জ থাকায় অনেকেই ধারণা করেন, সেদিন ভর্তি প্রক্রিয়া বন্ধ থাকবে। আবার কারো কারো ভর্তির জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করতেই একদিন সময় লেগে যায়।
১৯ জুন ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা কলেজে এসে ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ বলে জানতে পারেন। এসময় তারা কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে ভর্তি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্পষ্ট কোন উত্তর পায়নি বলে অভিযোগ করেন বাংলানিউজের কাছে।
শিক্ষার্থীদের দাবি, এ বিষয়ে কোন নোটিশ কিংবা ঘোষণা কলেজ থেকে দেওয়া হয়নি। কলেজের ভর্তি নিয়ন্ত্রণ কক্ষে জানতে চাইলে উল্টো হয়রানির শিকার হতে হয়েছে।
কারো কারো দাবি, ‘১৯ জুন কলেজ থেকে জানানো হয়- মেধা তালিকায় স্থান প্রাপ্তদের যারা ভর্তি হতে পারেনি তাদের বিষয়ে ২০ জুন বিকাল ৩টায় বিস্তারিত জানানো হবে। কিন্তু ২০ জুন বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেও কলেজ কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে মুখ খোলেননি।’
অনেক শিক্ষার্থী মোবাইল ফোন থেকে তাদের এসএমস খুলে মেধা তালিকায় সুযোগ পাওয়ার বিষয়টি বাংলানিউজকে নিশ্চিত করেন। কেউ কেউ ঠিক সময়ের অনেক পরে এসএমএস পেয়েছেন বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
এদের মধ্যে মেধা তালিকায় ৫৮৭ পাওয়া শিক্ষার্থী নাজিম জানান, ‘১৯ জুন সকাল ৮টায় এসএমএস পেয়েছি। সেদিনই কলেজে এলেও আমাকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। যারা ভর্তি বাতিল করছে সবাই তাদের নিয়ে ব্যস্ত ছিল। এখন বলুন, আমার দোষটা কোথায়? ভর্তি না হতে পারলে আমার ১ বছরের ক্ষতিপূরণ কে দেবে?’
মেধাতালিকায় ২৪তম স্থান পাওয়া শিক্ষার্থী তামান্না জান্নাত এসএমএস না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে বাংলানিউজকে বলেন, ‘সবার কাছে এসএমএস এলেও আমার মোবাইলে কোন এসএমএস আসেনি। বন্ধুদের কাছে খোঁজ নিয়ে আমি কলেজে আসার পর আমার স্থান জানতে পারি। ২০ জুন কলেজে এসে আমি ভর্তি হওয়ার কোন সুযোগ পাইনি। উল্টো সারাদিন কলেজে থেকে এর ওর কাছে দৌড়ঝাঁপ করে হয়রান হয়েছি।’
তামান্নার সঙ্গে আসা তার বোন বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমার বোন আইডিয়াল কলেজ, ভিকারুন্নেসায় চান্স পেয়েও ভর্তি হয়নি, সিটি কলেজে ভর্তি হবে বলে। তাদের অনিয়মে আমার বোনের একবছর নষ্ট হলে এর দায়ভার কে নেবে?’
পত্রিকায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রচারিত ভর্তি বিজ্ঞপ্তির সূত্র ধরে সাইফুল ইসলাম সবুজ নামে এক অভিভাবক বাংলানিউজের কাছে অভিযোগ করেন, ‘২৮ জুন ভর্তির শেষ দিন বলে পত্রিকায় একাধিকবার বিজ্ঞাপন প্রকাশ হয়েছে। অথচ ১৮ জুন সিটি কলেজে গিয়ে জানতে পারলাম ভর্তি শেষ। মেধা তালিকায় স্থান পাওয়া শিক্ষার্থী বাকি থাকতে কেমন করে ভর্তি শেষ হয়ে যায় তা বুঝতে পারছি না। আর অপেক্ষমান তালিকা থেকে ভর্তি করতে হলে তো ২৮ জুনের পরেই করা উচিত। সিটি কলেজ কর্তৃপক্ষের এমন আচরণে স্পষ্ট যে, তারা ভর্তি নিয়ে মহাবাণিজ্যে লিপ্ত।’
অভিভাকরা আরো দাবি করেন, মোবাইলে আসা এসএমএসে ভর্তির নির্ধারিত দিন সম্পর্কে কিছু লেখা ছিল না। এ বিষয়ে সিটি কলেজের ওয়েবসাইটে বিস্তারিত দেওয়া থাকলেও অনেকেই ওয়েবসাইটের এ তথ্য সম্পর্কে জানেন না। ফলে বিভ্রান্তিতে পড়তে হয়েছে। তাছাড়া এত স্বল্প সময়ে ভর্তি শেষ হয়ে যাবে, এমনটিও কেউ আশা করেনি।
তবে কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর শাহজাহান খান শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, ‘কিছু অসাধু শিক্ষার্থী শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করতে এসব কথা ছড়াচ্ছে।’
বাংলানিউজকে তিনি বলেন, ‘ভর্তি প্রক্রিয়ায় কোন রকম অস্বচ্ছতা করা হয় নি। স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতির মধ্য দিয়ে আমরা ভর্তি প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছি।’
অধ্যক্ষ বলেন, ‘সিটি কলেজের সুনাম দীর্ঘদিনের। এর সুনাম ক্ষুণ্ন করার জন্য কেউ কেউ কলেজ নিয়ে বাজে কথা ছড়াতে পারে। কিন্তু এভাবে কলেজের কোন ক্ষতি করা যাবে না। আমরা কারো কথায় ভর্তিতে ব্যতিক্রম আনবো না।’
ভর্তি নিয়ে বাণিজ্যের কথা পুরোপুরি অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘প্রশ্নই আসে না। আমাদের সব কাগজপত্র দেখতে পারেন। সবকিছু নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্য দিয়েই হচ্ছে। অযথাই দুষ্টু কিছু মানুষ আমাদের নিয়ে গুজব ছড়াচ্ছে।’
এদিকে সিটি কলেজের ভর্তি নিয়ে অনিয়মের অভিযোগে বুধবার বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত আড়াই ঘণ্টা কলেজের সামনে ধানমণ্ডি সড়ক অবরোধ করে রাখে শিক্ষার্থীরা। তারা দফায় দফায় নিউমার্কেট-মিরপুর সড়ক অবরোধ করতে গেলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। এ সময় তারা অধ্যক্ষের অপসারণের দাবিতে বিভিন্ন শ্লোগান দেয়।
সন্ধ্যায় কলেজ অধ্যক্ষের সঙ্গে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের একটি প্রতিনিধিদল সাক্ষাৎ করে। শিক্ষক- অভিভাবক আলোচনা চলাকালে কলেজ গেটের বাইরে আবারো উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে ভেতরে থাকা অভিভাবক ও প্রতিনিধিদের উপর চড়াও হন কলেজের শিক্ষকরা। একপর্যায়ে অভিভাবকদের সঙ্গে শিক্ষকদের হাতাহাতির উপক্রম হয়। কলেজের ভেতর থেকে বাইরে অপেক্ষমান শিক্ষার্থীদের উপর গরম পানি ঢালার অভিযোগও করেন কোন কোন শিক্ষার্থী।
ধানমন্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (সার্বিক) আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
বাংলাদেশ সময়: ১২২৪ ঘণ্টা, জুন ২১, ২০১২
সম্পাদনা: জাকারিয়া মন্ডল, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর