 |
আলো অন্ধকারের শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে আছি। চোখে ভরে নিচ্ছি পৃথিবীর অযুত অদৃশ্য চিত্রকল্পের দৃশ্যমান রূপ। আবেগের রঙ মেশানো সেই চিত্রকল্পের পাখা একটু পরেই উড়ে যাবে ভাষাসমেত- কোনও বোধের সংসারে, এই আমাকে অচেতন করে। চেতন ফিরে পেতে আমার দীর্ঘ সময় লাগে। আলো অন্ধকারের সেই জগতে আমি একা। আমি ভ্রমণ করছি তার সড়ক-মহাসড়ক, গলিপথ, দুরন্ত ফড়িং, সবুজ ঘাসের বিস্তীর্ণ মাঠ, পাহাড়-অরণ্য, সমুদ্র-তীর, নদীর সরুতা। ভ্রমণের ক্লান্তি শেষে আমি ফিরে আসি, অবসাদে নুয়ে পড়ার ঠিক আগ মুহূর্তে আমি দেখি তাকে, আমার প্রিয়তা, আমার আরাধ্য সেই তাকে! নিজের গহীন গোপনে তাকে উন্মোচিত করতে গিয়ে দেখি সঙ্গম শেষের ক্লান্তি তাকেও ছুঁড়ে ফেলেছে যেন সীমাহীন অবসাদের কাছে। জড়াজড়ি করে থাকি। ‘কবিতার সাথে পানকৌড়ি পাখিদের সাথে সংসার’ লিখেছিলাম ‘জলপদ্মের বিষণ্ন প্রেমিক এখন জলের ভেতরেই গড়ে তুলেছি ব্যক্তিগত আশ্রম’। জল বলতে কি জল? জল বলতে ঘোর; ঘোর বলতে কি শুধুই ঘোর? নাকি কুয়াশায় আচ্ছন্ন কোনও পৃথিবীর নাম। নাকি ফিরে পাওয়া মাতৃজরায়ুর সেই আবাসন। এমন কেন হল? কেন শত সহস্রের মাঝে এসে একলা হলাম। কেন গ্রহণ করে নিচ্ছি সমস্ত বৈরিতা। জীবনের প্রকৃত রূপ কি এই? নাকি সেই রূপ- তুষার ঝড়ে আটকে পড়া কোন পথিকের উপর যেমন সাঁই সাঁই বরফের ফলা আছড়ে পড়ে, সেই? নাহ, এই তবে হোক আমার জীবন। অন্ধকারের গলিপথ পেরিয়ে আমি কুড়িয়ে ফিরবো সেই তারাকে, যে ঝরে পড়েছে গতকাল পরশু অথবা গত হয়ে যাওয়া কোনও রাতে, ঝরে পড়ে আছে কোন ঝোপ-ঝাড় কাশবন-ঘাসবনের আড়ালে, লুকিয়ে আছে। একটুকরো আলোর জন্য মরে যাবো অথবা মণি হারানো দুরন্ত পাগলপ্রায় সাপ হয়ে উঠবো। আচ্ছা এইভাবে যদি হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত কোনওদিন ঘুম থেকে জেগে দেখি কোনও আলোর সমুদ্রের মাঝে অন্ধকারের একটুকরো পাটাতনের উপর ভাসছি আমি, অস্বীকার করবো সেই একটুকরো অন্ধকার, যে ভাসিয়ে রেখেছে, বাঁচিয়ে রেখেছে- তাকে? না আমার আলো চাই- অন্ধকার চাই- গোধূলি সন্ধ্যা চাই- ভোরের আধো ফোটা রক্তিম আভা চাই। পৃথিবীর সব ভালোবাসি আমি, এই শহর- রাস্তার পাশের টুকরো ইট- ছেঁড়া কাগজ- রজনীগন্ধ্যার শুকনো ডাঁটা- ম্রিয়মাণ আলোর চা দোকান- হকার মার্কেট- গেরস্থের বাড়ি, যেখানে কড়াইয়ে ডালের বাগার চলছে- এই শহরের সব সন্ত্রাসী- পাড়ার মোড়ে ল্যাম্পপোস্ট ধরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই উদ্ধত তরুণটি- যে এলাকার ভয় দেখিয়ে বলেছিলো ‘এই এলাকা আমার, এই এলাকায় যেন আর না দেখি’। অথচ আমি সামান্যই মাতাল ছিলাম। গাইছিলাম হয়তো বেসুরো কোনও প্রিয় গান। তাকেও বাসি, বাসি ইমারত- উঁচু ছাদ- রাজনৈতিক সভা- ইস্টিশনের লাল বাতি- সবুজ বাতি আর অসংখ্য পতিতাদের, যাদের আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছি- তাদের উঁচু পাহাড় থেকে সমতল ভূমি, কখনও মালভূমির গায়ে কালো ঘাস। আমি ভালোবেসে ফেলেছি এই শহরের সব দেয়াল- দেয়াল লিখন- সিনেমার পোস্টার। আমাকে হেঁটে যেতে হয়েছে যেই সব পথের উপর দিয়ে, আমার ঘর, হলুদ আলো, গতরাতে ফেলে যাওয়া আধবোতল এখনও যে মহুয়া মাতাল গন্ধ ছড়াচ্ছে। এখনো পিঁপড়ে আর মাছিদের আনন্দোৎসব শেষ হয়নি। আমি ঘুমোই যে খাটে তাকে ভালোবাসি, ভালোবাসি এই পুরো পৃথিবী। তবু পাখির বদলে আমার গায়ে উড়ে আসে ঢিল। আমি নষ্ট হয়ে গেছি, নষ্ট হয়ে গেছি। নষ্ট হতে পেরে গর্বিত প্রায় রাতেই আমি উদোম হয়ে আমার জন্মোৎসব পালন করি। আমার সাথে মেতে ওঠে আমার সমস্ত কবিতার পঙ্ক্তিমালা, আমার স্বপ্ন, আমার ঘরের প্রতিটি আসবাব। আমি জানি; আমি এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মানুষ- আমি প্রেরিত পুরুষ। আমার উপর নাজিল হয়ে চলছে প্রতিদিন এক-দুই অসংখ্য পঙ্ক্তিমালা। একদিন আমার পৃথিবীই আমাকে খুঁজবে হন্যে হয়ে, যেমন আমি খুঁজে ফিরছি সেই আলোময় অত্যুজ্জ্বল তারা। আমার স্বপ্নগুলোই একদিন মহীরূহ হয়ে উঠবে।
...আমি এই পৃথিবীর নষ্ট সন্তান- সবচেয়ে আলোকিত পুরুষ।
বাংলাদেশ সময়: ১৫২০ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০১২
সম্পাদনা: তানিম কবির