 |
(কবিতাসংশ্লিষ্ট সাতটি নির্ধারিত প্রশ্ন নিয়ে ‘সপ্তজিজ্ঞাস’ নামের এ আয়োজন। বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কমের পক্ষ থেকে তানিম কবিরের করা প্রশ্নগুলোর জবাব দিয়েছেন কবি আল-ইমরান সিদ্দিকী...)
কবিতা কেন লিখেন— একজন কবি এই প্রশ্নটির উত্তর দিতে বাধ্য কি না? যদি বাধ্য নন— তো কেন? আর হোন যদি— আপনার প্রতিও একই প্রশ্ন; কেন লিখেন কবিতা?
কবি কোনো কিছুতেই বাধ্য নয়।‘কবি’ শব্দটির সমার্থক মনে করি ‘অবাধ্য’।কবিতা লেখা শুরু করার কারণ আর লিখে যাওয়ার কারণ, দুটো ভিন্ন হতে পারে। আমি নিজের জন্য লিখি (‘নিজের জন্য লিখি’কে আপাতত আর ব্যাখ্যা করবো না)। আমার লেখা কারো যদি কিছুটা ভালো লেগে থাকে, তবে সেটা উক্ত কারণের পাশাপাশি আরো এক কারণ।
‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’— এই ‘কেউ কেউ’ বা ‘কারও কারও’ কবি হয়ে ওঠায় ঐশীপ্রাপ্তির কোনও ঘটনা থাকে কি? নাকি পুরো ব্যাপারটাই রেওয়াজ নির্ভর? আপনার কী মনে হয়?
মুন্সি বেটোভেন বলেছেন, ‘শুধু রেওয়াজ নিয়ে পড়ে থেকো না, শিল্পের গভীরে নিজেকে নিক্ষেপ কোরো, শিল্পের খাতিরে; অনুধাবনই পারে মানুষেকে ঐশী উচ্চতায় দাঁড় করিয়ে দিতে।’ রেওয়াজ তো বিষয় বটে, রিয়ালাইজেশন আরো বড় বিষয়। ‘তুমি প্রতিদিন তিনটা করে কবিতা লিখবে, দেখবে একদিন অনেক বড় কবি হয়ে গেছো’— বাপের উপদেশ মেনে কেউ কবি হয় না, ভেতরে কিছু থাকতে হয়। কবির কাজ হলো ভেতরের সেই অঙ্কুরকে ফ্লরিশ হওয়ার দিকে নিয়ে যাওয়া। কবিকে অনুধাবন করতে হয়, প্রতিটি বর্ণ, আকৃতি, মোশনের সুর, ইন্টাররিলেশন। উচ্ছ্বাস ও অবদমনের ভেতর দিয়ে, চিররহস্য উপভোগের ভেতর দিয়ে, নিজ গড়নকে যে নিজের কাছে স্পষ্ট করতে থাকে সেই তো কবি!
এখনকার কবিদের ছন্দবিমুখতার কারণ কী বলে মনে হয় আপনার? কবিতার জন্য ছন্দের প্রয়োজনীয়তা কতোটুকু?কবিতার স্বতঃস্ফূর্ত বিস্তারে ছন্দ আপনার কাছে সহায়ক নাকি প্রতিবন্ধক?
একাডেমিক ছন্দে(গদ্যছন্দ ব্যতীত অপরাপর ছন্দ) কেউ লিখুক বা না লিখুক, ছন্দ জানাটা জরুরি। শিল্পের সকল শাখার মূল হলো সুর। সুরে যার আগ্রহ, সে ছন্দ সম্পর্কে ধারণা রাখতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক। স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্ত ছন্দের ব্যাপারে যেমন অনেককে উন্নাসিক মনে হয় তেমনি গদ্যছন্দের ক্ষেত্রেও অনেকের উন্নাসিকতা থাকে! কবি অনেকভাবে কবিতা লিখে দেখবে এটা তো দরকারি। বলা যায়, অক্ষরবৃত্ত সর্বজনগ্রাহ্য একটি ছন্দ কিন্তু সেই গ্রহণযোগ্যতা স্বরবৃত্ত বা মাত্রাবৃত্তের নেই কেনো? এর সম্ভাবনা কি আদৌ শেষ হবার? আমার তেমন মনে হয় না। ঠিক একইভাবে, গদ্যছন্দ যে একসেস দেয়, তা অনেক কিছু এক্সপ্লোর করার সুযোগও এনে দেয়। ধরুন, একটি লাইন যেভাবে পাঠকের সাথে কমিউনিকেট করবে, আপনার কি মনে হয় সেটি ভেঙে একাধিক লাইনে আনলে অন্যভাবে কমিউনিকেট করার সম্ভাবনা রাখে না? আমার তো তেমন মনে হয় রাখে। আপনি বাক্য কোথায় ভাঙবেন তা ছন্দই কেনো সবসময় ঠিক করে দেয়? আপনার চিত্রকল্প, কবিতায় আপনি যে ফ্রেমগুলো ব্যবহার করেন তারা কেন ঠিক করে দেয় না আপনি কোথায় ভাঙবেন! সুর কি শুধু ধ্বনী দিয়েই তৈরি করবেন আপনি নাকি রেখা, রঙ, গতিকেও বিবেচনায় আনবেন? ’প্রতিবন্ধকতা’ শব্দটি তো যার যার প্রয়োজন ও সামর্থ্যের সাথে সম্পর্কিত! কবিতার স্বতঃস্ফূর্ত বিস্তারের কথা বলছেন? খোদ ছন্দের স্বতঃস্ফূর্ত বিস্তারের কথা বলতে পারতেন! কারো কারো কবিতা পড়লে ছন্দ খুব বিশ্রীভাবে চোখে লাগে।
দশকওয়ারী কবিতা মূল্যায়নের প্রবণতাটিকে কিভাবে দেখেন? আপনার দশকের অন্যান্য কবিদের কবিতা থেকে নিজের কবিতাকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার উপাদানসমূহ কী বলে মনে হয় আপনার?
দশক দিয়ে সাধারণত জেনারেশন বোঝায় এবং সেখানে কাঁটাতারের বেড়া নেই। ফলে এপারে শহীদ কাদরী ওপারে উৎপলকুমার বসু, শক্তি চট্টোপাধ্যায় একই সাখে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের কবি। কবিতায় দশকসন্ধির কবিও থাকে। দুই দশকের মাঝখানে আরো একটি দশক থাকে। কবিতার দশকওয়ারী মূল্যায়ন হতে পারে। সেক্ষেত্রে ‘ভ্যালু এন্ড হিস্ট্রি’র বিষয়টিও বিবেচনায় আসবে স্বাভাবিক,— ষাটের শুরুতে কবিরা যে কাজ করেছে সত্তরের শেষে এসে আপনি সেই কাজে নতুন কোনো মাত্রা যোগ না করলে কিভাবে সমান গুরুত্ব পেতে পারেন?
আমার কবিতার কথা যদি বলেন, তো বলবো আমি অনেকের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেকেই খুড়ি ক্রমাগত। সেভাবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করিনি কখনো। যদি করেও থাকি সেটা আমি আপনাকে বলতে পারি না, সেটা বেহায়াপনা। আমার চেষ্টাটা আমি বলতে পারি, আমার অর্জন কখনো দেখাতে পারি না!
তিরিশের দশক থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত— প্রত্যেকটি দশক থেকে যদি তিনজনের নাম করতে বলা হয় আপনাকে— কারা আসবেন? উল্লিখিত কালখণ্ডে কোন দশকটিকে আপনার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়?
আমার তো কোনো কোনো দশকে তিনের অধিক কবিকে পছন্দ, সমান তালে। আবার কোনো দশকে একজনও নেই। এভাবে বলা মুশকিল। তিরিশ অবশ্যই খুব গুরুত্বপূর্ণ যে কারণে আপনিও প্রশ্নে বিশ বা চল্লিশ উল্লেখ না করে তিরিশ থেকে শুরু করলেন। কবি গৌতম বসু কোথায় যেন বলেছিলেন— ‘ষাটের কবিদের মূল্যায়ন করার সময় এখনো আসেনি। ষাটের সম্ভাবনা তো শেষ হয়ে যায়নি। অর্জন নিয়ে কথা বলা সহজ নয় যতোটা সহজ সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলা।’ আমি বরং নতুন দশক নিয়ে বলি। নতুন দশকে যাদের লেখা আমার ভালো লাগে তারা হলেন— হিজল জোবায়ের, অমিত চক্রবর্তী, রিয়াদ চৌধুরী, তানিম কবির, রঞ্জন শুভ্র, অসীম ইশতিয়াক, রুদ্র হক, ইলিয়াস কমল, সালেহীন শিপ্রা, রজত সিকস্তী, গ্যাব্রিয়েল সুমন, সাইয়েদ জামিল, মেহরুবা নিশা ও সুদীপ্ত সাঈদ।
দেশভাগোত্তর দুই বাংলার কবিতায় মৌলিক কোনও পার্থক্য রচিত হয়েছে কি? এ-বাংলায় ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বৈরতন্ত্রবিরোধী আন্দোলন। ওপার বাংলায়ও নকশালবাড়ি আন্দোলনসহ উল্লেখযোগ্য কিছু রাজনৈতিক পটপরিবর্তন— এসমস্ত কিছুর আলাদা আলাদা প্রভাব কবিতায় কতোটা পড়েছে বলে মনে করেন?
‘আন্দোলন’-এর ফল হলো ‘ন্যারেটিভ’। ওপারে সত্তর দশেকর কবিতা যথেষ্ট ন্যারেটিভ ছিলো। মানুষ তার পারিপার্শ্বিক অবস্থা দ্বারা আলোড়িত হয়, নিস্তরঙ্গও থাকে। এ কবিতার সত্য, সত্য জীবনেরই। দুই বাংলার কবিরা এ পর্যন্ত যা লিখেছে তা সমবৈচিত্রের।
কবিতার বিরুদ্ধে জনবিচ্ছিন্নতা ও দুর্বোধ্যতার অভিযোগ বিষয়ে কিছু বলুন। কবির কি পাঠকের রুচির সাথে আপোষ করে কবিতা লেখা উচিৎ? বর্তমানে বাংলা কবিতার পাঠক কারা?
আগে যে শ্র্রেণী বাংলা কবিতার পাঠক ছিলো এখনো তারাই কবিতার পাঠক। কবিকে ঘনিষ্ঠ হতে হয় তার কবিতা ও কবিতার উপায় উপকরণের সাথে; জনঘনিষ্ঠতা বিবেচ্য নয়। আপনি যদি সৃষ্টিবিশ্ব সম্পর্কে নিশ্চিৎ করে কিছু বলতে পারেন তবেই না কবিতাকেও সেভাবে দেখতে চাইতে পারেন। বিশ্বজগতের দিকে তাকিয়ে বলতে পারি,— মাল্টিপল ইন্টারপ্রেটেশন একটি ধ্রুবসত্য বিষয়। কবির সতত স্রষ্টার সততার সমান্তরাল হবে। আপোষ কিসের? একটি ইন্সট্রুমেন্টাল কম্পোজিশনকে কেউ দূর্বোধ্য বললে থামিয়ে দিতে হবে তাকে? প্রকৃতি কি থামায় নাকি তার গ্যালাকটিক সঙ্গীত? কবিচিত্ত মানেই অনুধাবন... গোপনীয়তা... সঙ্গীত...। ঐশী উচ্চতা থেকে কালে কালে যে বলে ‘গোপন করো’, ‘গোপন করো’— কবিও গোপন করে; রঙ, রূপ, রস দিয়ে আড়াল করে।
।।
আল-ইমরান সিদ্দিকী
জন্ম : ০২ অক্টোবর ১৯৮৩
জন্মস্থান : নিলফামারী, বাংলাদেশ
।।
বাংলাদেশ সময় : ১৪২৮ ঘণ্টা, ২৯ নভেম্বর ২০১২