 |
ঢাকা: রাজধানী ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে দুর্নীতি, ভুল চিকিৎসা, প্রতারণা, দালালদের দৌরাত্ম্য সবই আছে। কেবল একটি মাত্র জিনিসই নেই বিশ্বব্যাপী ‘সমাদৃত’ এ হাসপাতালটিতে; আর তা হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ব্যবসায়ী মনোভাব প্রতিষ্ঠানটিকে সেবা-বিরোধী করে তুলেছে। এমনকি রোগী বা মরদেহ জিম্মি করে অর্থ আদায়ের নজিরও পাওয়া গেছে।
জরায়ুতে টিউমার ধরা পড়ার পর চার বছর আগে নীলফামারির সৈয়দপুর উপজেলার বাঁশবাড়ী এলাকার আবদুল মজিদ মণ্ডলের মেয়ে রিপা সরকারকে ভর্তি করা হয়েছিল অ্যাপোলোতে। অস্ত্রোপচার করে টিউমার অপসারণের পর রিপাকে ছাড়পত্র দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু কিছুদিন পর আবার পেটে ব্যথা শুরু হয় রিপার। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় কোনো রোগ ধরা পড়ছিল না। সর্বশেষ ২৮ জুন আশঙ্কাজনক অবস্থায় রংপুরের আইডিয়াল জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে। সেখানে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে যেটা অপসারণ করা হয়েছে, সেটা অ্যাপোলো হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের সময় পেটের ভেতর রেখে দেওয়া কাপড় (মপ)।
কয়েক মাস আগের ঘটনা। ঠাণ্ডা, সর্দি, জ্বর ও মাথাব্যথা নিয়ে হিউবার্ট রয় নিন্টু (৪৫) ভর্তি হন অ্যাপোলো হাসপাতালে। ভর্তির পর চিকিৎসকরা তাকে ইনজেকশন দেন। এতে তার অবস্থার অবনতি ঘটে। শরীর ফুলে যায়। এরই মধ্যে দুই দফা স্ট্রোক করে করে তার। ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) লাইফ সাপোর্টে রাখার ১২ দিন পর মৃত্যু ঘটে তার। কিন্তু মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পরও ৭০ হাজার টাকা মূল্যের আরেকটি ইনজেকশন পুশ করা হয় নিন্টুর শরীরে।
রোগীর স্বজনদের কাছে চিকিৎসা-ব্যয় হিসেবে বিল ধরিয়ে দেওয়া হয় সাড়ে ৫ লাখ টাকার। পুরো টাকা না দেওয়া হলে লাশ দেওয়া হবে না বলে জানিয়ে দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। স্বজনদের অভিযোগ, নিন্টুর মৃত্যু হয়েছে ভুল চিকিৎসায়। তারা হাসপাতাল চত্বরে বিক্ষোভ মিছিল করেন। বাড্ডা থানায় একটি জিডিও করা হয়।
অ্যাপোলো হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু আর অস্ত্রোপচারের পর পেটের ভেতর কাপড় রেখে সেলাই করে দেওয়ার ঘটনা নতুন নয়।
এমন ঘটনা এখানে প্রায়ই ঘটছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। লাইফ সাপোর্টের নামে চলছে মোটা অঙ্কের টাকা আদায়। ভুল চিকিৎসায় কেউ মারা গেলে বা অতিরিক্ত বিল আদায় করে নিলেও হাসপাতালের বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারছেন না রোগীর স্বজনরা। পুরো বিল পরিশোধ করে তবেই লাশ বা রোগীকে হাসপাতাল থেকে ফেরত নিতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অ্যাপোলো হাসপাতালে ব্যবসায় পরিণত হয়েছে স্বাস্থ্যসেবা। সরকারি কোনো তদারকি না থাকায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দিনে দিনে বেপরোয়া হয়ে উঠছে। তাদের প্রশ্ন, চিকিৎসাসেবা দেওয়ার নামে এ হাসপাতালে হচ্ছেটা কি?
অ্যাপোলোতে ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে অহরহ। গত বছর আগস্টের মাঝামাঝি একজন উর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তার এক মেয়েকে অসুস্থ অবস্থায় ভর্তি করা হয় এখানে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ওই রোগীর শরীরে ম্যালেরিয়ার জীবাণু শনাক্ত করা হয়। এর ভিত্তিতে চিকিৎসা চলার এক পর্যায়ে রোগীর মৃত্যু ঘটে।
অ্যাপোলোর নিজস্ব আয়-ব্যয়ের হিসাব খতিয়ে দেখা যায়, যেখানে ২০০৯ সালে নিট লাভ ছিল সাত কোটি ১২ লাখ ২৪ হাজার ১১২ টাকা, সেখানে এক বছরের মাথায় নিট লাভের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ২৩ কোটি ৭৭ লাখ ১৬ হাজার ৫৭৬ টাকা। পরের বছর ২০১১ সালে তাদের নিট লাভের পরিমাণ ছিল ১০০ কোটি টাকার বেশি।
অন্যান্য নামি হাসপাতালের চেয়ে অ্যাপোলোতে চার্জ নেওয়া হচ্ছে কয়েক গুণ বেশি। সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, নানা প্রক্রিয়ায় ইচ্ছামাফিক বিল আদায় করছে তারা।
অ্যাপোলো হাসপাতাল সূত্র জানায়, জরুরি বিভাগে প্রথম ঘণ্টার জন্য সার্ভিস চার্জ এক হাজার টাকা। পরের প্রতি ঘণ্টার জন্য ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয়। আর ডাক্তার ফি রাত ১১টা পর্যন্ত ৭০০ টাকা এবং রাত ১১টার পর এক হাজার ৪০০ টাকা। ওষুধ বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিল আলাদা। এছাড়া একেক ধরনের ওটির জন্য একেক হারে চার্জ রয়েছে। এ হাসপাতালে মোট ২৩টি ক্যাটাগরির বেড রয়েছে। এর মধ্যে সর্বনিম্ন স্ট্যান্ডার্ড ক্যাটাগরির বেডের ভাড়া দৈনিক দুই হাজার ৫০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ স্যুটের ভাড়া ১৬ হাজার টাকা। তবে বেশির ভাগ বেডের ভাড়া দৈনিক আট হাজার টাকা। এ হাসপাতালে বেড চালু আছে ৩৫৮টি। এ ছাড়া নতুন নতুন প্যাকেজ আকারে চেকআপের নামে রোগীদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি হারে টাকা। বিশেষ করে হোল বডি চেকআপ ফি বাবদ নেওয়া হচ্ছে পুরুষদের জন্য ১৫ হাজার আর নারীদের জন্য ১৭ হাজার টাকা। একইভাবে হার্ট চেকআপ প্যাকেজের নামে নেওয়া হচ্ছে ১১ হাজার টাকা, লিভার স্ক্রিনিংয়ের জন্য ৯ হাজার ৫০০ টাকা, ডায়াবেটিক প্যাকেজ চেকআপের জন্য আট হাজার টাকা।
অ্যাপোলোর লাইফ সাপোর্ট নিয়ে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রয়োজনে ভেনটিলেটর ব্যবহার কিংবা রোগী মারা যাওয়ার পরও ভেনটিলেটর ব্যবহারের মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার হচ্ছে। বেসরকারি ফার্মের একজন চাকুরে হৃদরোগের উন্নত চিকিৎসা নিয়ে বাঁচার আশায় শেষ সম্বল বিক্রি করে ভর্তি হন ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে। খরচের তালিকা অনুযায়ী দৈনিক নির্দিষ্ট একটি অঙ্কের টাকা বিল আসার কথা ভাবেন তিনি। আংশিক সুস্থ হয়ে ওঠেন। প্রয়োজন না হলেও তাকে দেওয়া হয় লাইফ সাপোর্ট। রাখা হয় আইসিইউতে। কেন আইসিইউতে রাখা হলো, চিকিৎসকের কাছে পেলেন না এর সদুত্তর। এক মাস পর তাকে ধরিয়ে দেওয়া হয় ১৩ লাখ টাকার বিল।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, অ্যাপোলোর অধিক মুনাফা-প্রবণতার বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের নজরে রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় অ্যাপোলোসহ বড় হাসপাতালগুলো নিয়ে নানা অভিযোগ পাওয়া যায়। অধিদপ্তরের ওপর এসব বিষয় মনিটরিং করার দায়িত্ব রয়েছে।
বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে অ্যাপোলো হাসপাতালে রোগী ভাগিয়ে আনার ঘটনাও ঘটছে। আর এ কাজটি করছেন চিকিৎসকরাই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে অ্যাপোলোর একজন চিকিৎসক বলেন, প্রতি মাসে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসকরা দুই শতাধিক রোগী পাঠান এ হাসপাতালে। এর বিনিময়ে তারা বিশেষ কমিশন পেয়ে থাকেন। অনেক সময় চেকের মাধ্যমে কমিশনের অর্থ পরিশোধ করা হয়। মার্চে ২৪৮ জন রোগী আসে বিভিন্ন চিকিৎসকের মাধ্যমে। এর মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বারডেম, ল্যাবএইড, সোহরাওয়ার্দী, হৃদরোগ হাসপাতাল থেকেও সেখানে কর্মরত চিকিৎসকরা রোগী পাঠিয়েছেন।
বাংলাদেশ সময়: ১০৪৯ ঘণ্টা, জুলাই ০৪, ২০১২
সম্পাদনা: রানা রায়হান, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর;জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর jewel_mazhar@yahoo.com